আর্কাইভ

জেলা প্রশাসক নিয়োগ:কেন এই স্বেচ্ছাচারিতামূলক সিদ্ধান্ত?

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ১৯-১২-২০১১

গত ১৫ ডিসেম্বর রাতে, বিজয় দিবসের প্রাক্কালে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৬১টি জেলায় দলীয় ব্যক্তিদের নিয়ে জেলা প্রশাসক নিয়োগ প্রদান করেছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা সহযোগী সংগঠনের নেতা। কেউ কেউ এই নিয়োগকে বিজয় দিবসের উপহার বলে আখ্যায়িত করেছেন। নিঃসন্দেহে নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য এটি একটি উপহার, কিন্তু আমাদের আশঙ্কা যে জাতির জন্য এটি একটি দুঃসংবাদ।

জেলা পরিষদ আইন ২০০০-এর ৮২(১) ধারার অধীনে জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। আইনের এই বিধানকে অত্যন্ত ‘গর্হিত’ বলে আখ্যায়িত করে আমাদের বর্তমান মাননীয় অর্থমন্ত্রী তাঁর ২০০২ সালের জেলায় জেলায় সরকার গ্রন্থে লেখেন: ‘সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান না করেই নিজেদের মনোনীত ব্যক্তিকে দিয়ে জেলা সরকার গঠন করতে পারে। এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা বা (সম্ভবত দলীয় প্রীতি) কোনো সুযোগ একটি গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানে থাকা নিতান্তই লজ্জা ও ক্ষোভের বিষয়।’

দুর্ভাগ্যবশত প্রশাসক নিয়োগের এই সিদ্ধান্ত শুধু গর্হিত ও স্বেচ্ছাচারিতামূলকই নয়, এটি আমাদের সংবিধানের নগ্ন লঙ্ঘনও। একই সঙ্গে এটি আমাদের উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তেরও পরিপন্থী। এ ছাড়া এর মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে একটি চরম দ্বন্দ্বাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে বলে আমাদের আশঙ্কা। আর যেখানে দ্বন্দ্ব ও হানাহানি, সেখানে ইতিবাচক ও গঠনমূলক কিছু হয় না।

আমাদের সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ অর্থাৎ সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুসারে নির্বাচিত জেলা পরিষদ জেলায়, নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ উপজেলায়, নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ ইউনিয়নে, নির্বাচিত সিটি করপোরেশন সিটিতে এবং নির্বাচিত পৌর পরিষদ পৌরসভায় শাসনকার্য পরিচালনা করবে। অনির্বাচিত ব্যক্তি বা প্রশাসকের কোনোরূপ ভূমিকা পালনের সুযোগ সংবিধানে রাখা হয়নি। তাই জেলা পরিষদ বা অন্য কোনো স্থানীয় সরকার আইনে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ করার বিধান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আর এই অসাংবিধানিক বিধানের অধীনে প্রশাসক নিয়োগ প্রদানও অসাংবিধানিক হতে বাধ্য। Continue reading

চিকিৎসাও একটি সেবা

বদিউল আলম মজুমদার

বস্তুত যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার আকাশচুম্বী খরচের কারণে সমাজের উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যকার দূরত্ব ক্রমাগতভাবে প্রকট হচ্ছে। তবে নিম্নবিত্তের কোনো মেধাবী সন্তান যদি ব্যয়বহুল নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে এবং যা হওয়া সম্ভব, তাহলে পরিবারের আর্থিক দৈন্য তার লেখাপড়ার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তেমনিভাবে কোনো কপর্দকহীন বাস্তুহারাও যদি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে হাজির হয়, তাকেও হাসপাতাল সেবা দিতে বাধ্য। এ ছাড়া বাস্তুহারাদেরও সরকারি ও বেসরকারি উদোগে এখনও অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়|

গত জুলাই মাসে বুকের ব্যথা নিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে স্কয়ার হাসপাতালে এক রাত কাটিয়েছিলাম। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. তৌহিদুজ্জামান এনজিওগ্রাম করার পরামর্শ দেন। এনজিওগ্রামের মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে ‘বল্গক’ বা রক্ত চলাচলে প্রতিবন্ধকতা আছে কি-না তা ধরা পড়ে। পরবর্তী সময়ে গ্যাস্ট্রোএনথলজির বিশেষজ্ঞ wPwKrmK ‘কোলনোস্কপি’ বা অন্ত্রনালিতে কোনোরূপ ক্যান্সার জাতীয় ‘পলিপ’ আছে কি-না তা পরীক্ষার পরামর্শ দেন। জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের ‘কোলন ক্যান্সারে’র কারণে এখন দেশবাসীর এ রোগ সম্পর্কে মোটামুটি একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতি বছরের মতো এ বছরও হাঙ্গার প্রজেক্টের বার্ষিক অনুষ্ঠানে ১৬ অক্টোবর নিউইয়র্ক এসে †cŠuQvB। পূর্বনির্ধারত সময় অনুযায়ী ১৯ তারিখে বিখ্যাত বেথ-ইসরায়েল হাসপাতালে উপস্থিত হই কোলনোস্কপির জন্য। মরক্কো প্রবাসী ডা. মার্ক ওবাদিয়া ‘প্রসিডিউর’টি সম্পন্ন করার আগেই আমার সঙ্গে বসেন। তিনি কী করবেন তা আমাকে বুঝিয়ে বলেন এবং আমার কাছ থেকে সম্মতিপত্র স্বাক্ষর করিয়ে নেন। যদিও এটি একটি অতি সাধারণ প্রসিডিউর, তবুও ধৈর্য সহকারে তিনি আমার বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং এর ঝুঁকি সম্পর্কে আমাকে বুঝিয়ে বলেন। বিশেষত অন্ত্রনালিতে যদি কোনো ছিদ্র হয়, যার ঝুঁকি নেই বললেই চলে, তাহলেও আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে এবং আমার ওপর অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হবে। তিনি আমাকে রক্তক্ষরণের ঝুঁকির কথাও বলেন। একই সঙ্গে রোগী হিসেবে আমার কী কী অধিকার আছে সে সম্পর্কিত ১১ পৃষ্ঠার একটি ‘প্যাসেন্টস বিল অব রাইটস’ আমাকে ধরিয়ে দেন। Continue reading

সরকারের জেগে ওঠার ঘণ্টাধ্বনি

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ২২-০১-২০১১

সারা দেশে মোট ২৪২টি পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। যদিও অনিয়ম ও গোলযোগের কারণে ছয়টিতে নির্বাচনী ফলাফল আংশিক বা পুরোপুরিভাবে স্থগিত করা হয়েছে। যে ২৩৬টি আসনের নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে, বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, সেগুলোতে বিএনপি ও বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা মোট ৯২টি মেয়র পদ এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা মোট ১১টি মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছেন। পক্ষান্তরে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা যথাক্রমে ৮৬টি ও ২৩টি আসনে জয় লাভ করেছেন। এ ছাড়া মহাজোটের অংশীদার জাতীয় পার্টি দুটি এবং বিএনপির সহযোগী জামায়াতে ইসলামী পাঁচটি আসন পেয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন ১৭টি আসন। তাই সার্বিকভাবে মহাজোট ১১১টি এবং চারদলীয় জোট ১০৮টি মেয়র পদ পেয়েছে, যদিও পৌর নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিকভাবে জোটবদ্ধ হয়নি। অর্থাৎ নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে এবং এতে চারদলীয় জোট ‘হারেনি’, জাতীয় নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনের মতো মহাজোটের ব্যাপক ‘বিজয়’ ঘটেনি।

বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত ছোটখাটো ঘটনা সত্ত্বেও নির্বাচন প্রথম দিকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হলেও শেষ দিকে বেশি অনিয়ম ও গোলযোগের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সচেষ্ট ছিল। তবে, সাম্প্রতিক নির্বাচন থেকে এটি আবারও সুস্পষ্ট হলো যে রাজনৈতিক দল ও তাদের মনোনীত প্রার্থীরা যদি সদাচরণ না করেন, তাঁরা যদি ছলে-বলে-কলে-কৌশলে নির্বাচিত হওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হন এবং প্রশাসন যদি সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষতা প্রদর্শন না করে, তাহলে সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। প্রসঙ্গত, আমরা আনন্দিত হতাম, যদি কমিশন সেসব রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিত, যারা বিভিন্ন হুমকি-ধমকির মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রার্থীদের জোর করে বসিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। কারণ, এটি ছিল ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা, যা নির্বাচনী আচরণবিধি ‘নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত রাখা’ সম্পর্কিত বিধানের (বিধি ৮) লঙ্ঘন। এ ছাড়া প্রার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধিও সীমিত হয়ে গেছে, যা তাদের ঠকানোর শামিল।

নির্বাচনের ফলাফলের তাৎপর্য নিয়ে এখন প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যে বাগিবতণ্ডা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও তার শরিকদের মতে, পৌর নির্বাচনের ফলাফল বিভিন্ন কারণে এবং স্থানীয় ইস্যু দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে, তাই এটি ক্ষমতাসীনদের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি নয়। অন্যদিকে বিরোধী দলের মত অনুযায়ী, পৌর নির্বাচনের ফলাফল সরকারের জনপ্রিয়তারই প্রতিফলন এবং বর্তমান সরকারকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। উল্লেখ্য, কোনোরূপ অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে হুট করে দলভিত্তিক পৌর নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে সরকারই এটিকে ‘রেফারেন্ডাম’ বা দলের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পরীক্ষায় পরিণত করেছে। Continue reading

এমন বন্ধু থাকলে…

 

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ০৫-১২-২০১০

ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের সাম্প্রতিক বক্তব্য (যুগান্তর, ৩ নভেম্বর ২০১০) পড়ে আমরা আশ্চর্য হয়েছি। তিনি দাবি করেছেন, কমিশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সব সময় প্রস্তুত ছিল এবং এখনো আছে। কিন্তু সরকারের অনীহার কারণেই ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হলো না।

বিগত ২০০৪-০৮ সময়কালের বহু দাবি ও আন্দোলনের ফসল বর্তমান নির্বাচিত সরকার। এ আন্দোলনের পুরোভাগেই ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং তার প্রধান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যদিও চারদলীয় জোট সরকারের আমলের পাতানো নির্বাচন ঠেকানোর ব্যাপারে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা কোনোভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তাই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ দলীয় একটি নির্বাচিত সরকার প্রশাসনের সর্বস্তরে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা হয়ে দাঁড়াবে—তা অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য। এর কোনো যৌক্তিকতা আমরা খুঁজে পাই না। বরং সরকারের কার্যক্রম দেখে আমাদের মনে আশঙ্কা জাগে: গণতন্ত্র কি আমাদের রাজনীতিবিদদের জন্য শুধুই স্লোগান? আর তা কি নিতান্তই জনগণকে ‘ঘুম পাড়ানোর’ গান?

বহু তূর্যনিনাদ বাজিয়ে গত ২৯ ডিসেম্বর, ২০০৮ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের উদ্দেশ্য ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনঃপ্রবর্তন। কারণ, গণতন্ত্র আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার (অনুচ্ছেদ-১১) এবং এর জন্য আমরা অনেক আত্মত্যাগ করেছি। আর নির্বাচন গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত, যদিও নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। সত্যিকারের গণতন্ত্র তথা গণতান্ত্রিক শাসনের কার্যকারিতা নির্ভর করে নির্বাচনের পর সরকারের আচরণ ও কার্যক্রমের ওপর।

নির্বাচন কমিশনারের মন্তব্য পড়তে গিয়ে একটি অতি পুরোনো ও জনপ্রিয় গানের কলির কথা মনে পড়ে যায়, ‘উইথ ফ্রেন্ডস লাইক দিজ, হু নিডস এনিমিস!’ অর্থাৎ, এমন বন্ধু থাকলে শত্রুর কী প্রয়োজন! (যতটুকু মনে পড়ে, বেশ কয়েক বছর আগে এ নিয়ে একটি সিনেমাও হয়েছিল।) আমাদের সরকার ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের নামে যা কিছু করছে এবং অতীতে করেছে, তা দেখে মনে হয় যেন গণতন্ত্রকে অকার্যকর এবং ধিক্কৃত করার জন্য তারাই যথেষ্ট—এর জন্য অন্য কোনো শক্তি ও শত্রুর প্রয়োজন নেই। তারা যেন গণতন্ত্র ‘সবচেয়ে খারাপ ধরনের পদ্ধতি…’—চার্চিলের এ কথাকে সত্য প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর। কারণ, তারা যে গণতন্ত্রের নামে খেলায়, বস্তুত প্রহসনে লিপ্ত, তার পরিণতি অশুভ হতে বাধ্য। Continue reading

ডিসিসি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা

বদিউল আলম মজুমদার

ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বিভক্ত করার আগে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিসহ অন্যান্য স্বার্থসংশিল্গষ্ট ব্যক্তি ও ব্যক্তি সমষ্টির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা আবশ্যক। কারণ সিদ্ধান্তটি হওয়া উচিত সুচিন্তিত ও বুদ্ধিভিত্তিক।

গত ২ নভেম্বর ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে সরকারের অনীহার কথা বলতে গিয়ে আমাদের নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন আশঙ্কা প্রকাশ করেন, 'ডিসিসি নিয়ে সরকারের রাজনৈতিক পরিকল্পনা থাকতে পারে' (যুগান্তর ৩ নভেম্বর, ২০১০)। কয়েকদিন আগে 'প্রথম আলো'তে (২১ নভেম্বর ২০১০) প্রকাশিত 'উত্তর-দক্ষিণে দুই ভাগ হচ্ছে ঢাকা সিটি করপোরেশন' শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা গেল সরকারের রাজনৈতিক পরিকল্পনা। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে এ ব্যাপারে আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে।

বিপুল জনসংখ্যা আর বিশাল আয়তনের ঢাকা মহানগরকে ভাগ করে দুটি পৃথক সিটি করপোরেশন গঠন করা যেতেই পারে_ এতে দোষের কিছু নেই। এ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিতও হতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে কী উদ্দেশ্য নিয়ে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সিদ্ধান্তটি যদি রাজনৈতিক ফায়দা লোটার পরিবর্তে জনকল্যাণের বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে তা ইতিবাচক ফলই বয়ে আনবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়েই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। নির্বাচন না হলে এবং অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে পরিচালিত হলে আইনগতভাবে স্থানীয় সরকার গঠিত হয় না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে, সরকার দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরে দুটি নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির কথাই ভাবছে। মেয়র সাদেক হোসেন খোকাসহ নির্বাচিত, যদিও মেয়াদোত্তীর্ণ, কাউন্সিলরদের অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে যদি ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বিভক্ত করা হয়, তা হবে অনাকাঙ্ক্ষিত। উলেল্গখ্য, আইনের বিধান অনুযায়ী, শুধু নতুন সিটি করপোরেশন সৃষ্টির ক্ষেত্রেই প্রশাসক নিয়োগ সম্ভব।

সিটি করপোরেশন তথা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্দেশ্য মোটা দাগে তিনটি। প্রথমত, এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ অর্জিত হয়। দ্বিতীয়ত, কার্যকর স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সব সরকারি সেবার মানোন্নয়ন সম্ভব। তৃতীয়ত, সাধারণ জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। Continue reading

সাবধান থেকো তাদের থেকে…

 

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ২০-১১-২০১০

দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রদর্শন এবং পাঠকদের মধ্যে তা জাগ্রত করার ব্রত নিয়ে ৪ নভেম্বর প্রথম আলো তার দ্বাদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন করল। এ উপলক্ষে প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপনের শিরোনাম ছিল: ‘এই দেশকে (মাকে) দিয়ে কিচ্ছু হবে না।’ এই ধাক্কা দেওয়া শিরোনামের উদ্দেশ্য ছিল পাঠকদের মধ্যে দেশকে মায়ের মতো ভালোবাসার তাগিদ সৃষ্টি করা। নিঃসন্দেহে শিরোনামটি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একই সঙ্গে এটি তাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে জন্মলগ্নেই বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সেই কুখ্যাত উক্তি।

রূপকার্থে এ উপমা ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করা। হতাশা ব্যক্ত করা এর স্থায়িত্ব নিয়ে। কিন্তু ৩৯ বছর ধরে বাংলাদেশ টিকে আছে। বহু প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনও আছে। তবুও দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো অনেকের আশঙ্কার অন্ত নেই। বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই—অনেকে এখনো এ কথা বিশ্বাস করেন এবং জোর গলায় তা বলতেও ভালোবাসেন।

যাঁরা বাংলাদেশের ভবিষৎ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন, তাঁরা যেন এক ধরনের মালিকানা-সংকটে ভোগেন। দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শাসনই সম্ভবত এমন মানসিকতার উৎস—দেশ স্বাধীন হলেও নাগরিক তথা দেশের মালিকের মানসিকতা যেন তাঁদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। পরের সন্তান সম্পর্কে যেমন সহজেই উদাসীন হওয়া যায়, পরের দেশ নিয়েও তেমনি হতাশা ব্যক্ত করা যায়। নিজের উচ্ছন্নে যাওয়া সন্তানকে শোধরানোর দায়িত্ব যেমন বাবা-মা গ্রহণ করেন, তেমনি দুরবস্থার কবলে নিপতিত দেশমাতৃকাকে ভালো করার দায়িত্বও একজন নাগরিক তথা দেশের মালিক নিজ কাঁধে তুলে নেন। কারণ, দেশের ভবিষ্যতের ওপরই তাঁর নিজের এবং পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। তাই কোনোভাবেই দেশ সম্পর্কে নাগরিকের হতাশ-নিরাশ হওয়ার কোনো অবকাশ নেই, বরং তাঁরা অবস্থা পাল্টানোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। Continue reading

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও গণতন্ত্র সুসংহতকরণ

ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র
সম্প্রতি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, 'ডিসিসির চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজড। এ নিয়ে আর কোন মন্তব্য করতে চাই না। ডিসিসি নিয়ে সরকারের রাজনৈতিক পরিকল্পনা থাকতে পারে। সরকারের অনীহায়ই ডিসিসি নির্বাচন হল না। আমরা স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে সবসময় প্রস্তুত ছিলাম এখনও আছি' (যুগান্তর, ৩ নভেম্বর ২০১০)। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য পড়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন, কারণ এর তাৎপর্য অত্যন্ত ভয়াবহ।

এ দেশের অসংখ্য গণতন্ত্রকামী নাগরিকের নিরবচ্ছিন্ন দাবির মুখে প্রায় দু'বছর সেনা সমর্থিত অনির্বাচিত সরকারের অবসান ঘটিয়ে ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। নির্বাচনের আগে ঘোষিত 'দিন বদলের সনদ' শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ তার ২০২১ সালের জন্য প্রণীত রূপকল্পে সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করে : 'আমরা ২০২০-২১ সাল নাগাদ এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি যেখানেঃ একটি প্রকৃত অংশীদারিত্বমূলক সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা (বিরাজ করবে), যেখানে নিশ্চিত হবে সামাজিক ন্যায়বিচার, নারীর অধিকার ও সুযোগের সমতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার, সুশাসন, দূষণমুক্ত পরিবেশ। গড়ে উঠবে এক অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র। তাই বাংলাদেশে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা আওয়ামী লীগের সুস্পষ্ট নির্বাচনী অঙ্গীকার।

এছাড়াও আমাদের সংবিধানের চারটি মূলনীতির অন্যতম হল 'গণতন্ত্র'। উপরন্তু সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১-তে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, 'প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্রঃ।' বস্তুত বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনের মূল প্রেরণাই ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জন। তাই সংবিধান সমুন্নত রেখে আইনের শাসন কায়েম করতে হলে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র কায়েম করা সব সরকারেরই পবিত্র দায়িত্ব। Continue reading

Budget and the common folks

daily star

daily star

“Budget” is a meaningless word for her.

WHILE returning from the Aila affected areas, I watched part of the budget speech of the honourable finance minister in a rural tea stall surrounded by a group of villagers. They were surprised by my rapt attention to the speech and some wondered aloud: What’s the use of watching the budget speech? If the wood apple ripens, how does it help the crow? Will we get any share of the crores of taka of the budget?

Come to think of it, what benefits will the common folks derive from the budget? Very little of the increased GDP truly trickles down to them. The debate about whitening black money is not relevant to them. The change of the tariff rates on vehicles also does not directly affect their lives. Thus, the size of the actual budget presented matters little to most ordinary citizens. Continue reading

মুহিতের মোহিতকরণ বাজেট

jugantor_logo

অ ধ্যা প ক মো জা ফ্‌ ফ র আ হ ম দ
গতকালের পর
দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বর্তমান সরকার আগের মতোই টিআর, ভিজিএফ, কাবিখা ছাড়াও বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মায়ের ভাতা বৃদ্ধি ও ক্ষেত্র প্রসারণের প্রস্তাব করেছে। এছাড়াও পিতৃ-মাতৃহীন শিশুর কল্যাণ, পথশিশুদের কল্যাণ, দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলা, মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থান, প্রতিবন্ধী সেবা, দরিদ্রের জন্য কর্মসংস্থান, সৃজনমূলক প্রশিক্ষণ, মেটার্নাল হেলথ ভাউচার ইত্যাদির মাধ্যমে দারিদ্র্যের অভিঘাত সীমিত করার প্রচেষ্টা ও কর্মপ্রস্তাবনা বাজেটে লক্ষ্য করা যায়। এ সমস্তই দান-অনুদানের ব্যাপার। দরিদ্র মানুষের সক্ষমতা সৃষ্টি, শিক্ষা ও কর্মের সুযোগ সৃষ্টি, উৎপাদনে অংশিদারিত্বসহ সম্পদ প্রবাহের সাথে সম্পদ সৃষ্টি বিপণন ও এর লভ্যাংশের সাথে অর্থবহ সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে আত্মশক্তিতে বলীয়ান না করা হলে টেকসই দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হয় না। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ন্যাশনাল ফুড পলিসির ক্যাপাসিটি স্ট্রেনথেনিং প্রোগ্রাম-এর মাধ্যমে খাদ্য নীতিমালা ১১টি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে প্রণীত ও তাঁর অধীনে কর্ম-পরিকল্পনা তৈরি হবে বলে জানানো হয়েছে। উদ্দেশ্য খাদ্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, খাদ্যশস্য সংরক্ষণের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর কলেবর বৃদ্ধি। লক্ষ্যণীয় এ সবই উপর থেকে দেয়া দান-অনুদানের ব্যাপার। এখানে সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠীর কোনো অংশিদারিত্ব নেই, যার ফলে এ জাতীয় কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হয় এবং খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত না হয়ে ও অন্যান্য সুবিধা বঞ্চিত থেকে দারিদ্র্যের বিশেষ হেরফের হয় না। Continue reading

সুশাসন: সংসদীয় কমিটি বনাম দুদক: নাগরিক ভাবনা

palo_logo

বদিউল আলম মজুমদার

সংসদীয় ‘সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি’ ও দুদকের মধ্যে বর্তমানে একটি গুরুতর বিরোধ দেখা দিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে কমিটি দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যান জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী, অপর দুজন কমিশনার ও সাবেক সচিবকে কমিশনের গত দুই বছরের কার্যক্রম সম্পর্কিত দলিলপত্রসহ ১২ এপ্রিল কমিটির সামনে তলব করে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের তলব করা আইনসংগত হয়নি বলে দাবি করে কমিটির সামনে উপস্থিত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। কমিটি তাঁদের কারণ দর্শাও নোটিশ জারি করে ২ জুনের মধ্যে জবাব প্রেরণের জন্য বলে। একই সঙ্গে দুদকের সাবেক সচিবের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রী পরিষদকে অনুরোধ করে। জবাব সন্তোষজনক না হলে কমিটি তাঁদের বিরুদ্ধে সংসদ অবমাননার অভিযোগ এনে জেল-জরিমানার হুমকিও প্রদান করে।

নাগরিক হিসেবে আমরা আনন্দিত যে অন্তত একটি সংসদীয় কমিটি তার দায়িত্বকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে এবং কমিটির সদস্যরা সক্রিয় হয়েছেন। কমিটিগুলো সংসদের প্রাণস্বরূপ এবং এগুলোর ফলপ্রসূতার ওপরই সংসদের কার্যকারিতা বহুলাংশে নির্ভরশীল। তবে বর্তমান বিরোধ সংসদীয় কমিটির কার্যপরিধি এবং সংসদে পাস করা আইনে সৃষ্ট একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার সীমানা সম্পর্কিত কিছু গুরুতর প্রশ্নের উদ্রেক করে। আমরা আশা করি যে বিরোধটি সংবিধান, আইন, নৈতিকতা ও জনকল্যাণবোধের আলোকে নিষ্পত্তি হবে। Continue reading