বিশেষ সাক্ষাৎকার : বদিউল আলম মজুমদার

main-logo.gif

বিশেষ সাক্ষাৎকার : বদিউল আলম মজুমদার

অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিন দিনই অস্থির হচ্ছে। অনিশ্চিত অবস্থার দিকে যাচ্ছে দেশ। বিএনপির দুদিনের হরতাল শেষে আজ আবার হরতাল দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সংলাপের কথা উচ্চারিত হচ্ছে, কিন্তু সমঝোতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই অস্থির ও অনিশ্চিত সময় থেকে উত্তরণ বিষয়ে কালের কণ্ঠের মুখোমুখি হয়েছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলী হাবিব

কালের কণ্ঠ : হেফাজতের সাম্প্রতিক অবরোধ ও সমাবেশ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে যে তাণ্ডব হয়েছে, এই পরিস্থিতিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
বদিউল আলম মজুমদার : এটি নিঃসন্দেহে একটি দুঃখজনক ঘটনা। তারা যা করেছে, তা নিন্দনীয়। তারা যে তাণ্ডব চালিয়েছে, সহিংসতা ঘটিয়েছে, এটা অগ্রহণযোগ্য। হ্যাঁ, অবরোধ-সমাবেশ করার অধিকার তাদের আছে। তবে এই অধিকার ততক্ষণই আছে, যতক্ষণ না তারা অন্যের অধিকার হরণ করছে। অন্যের নাগরিক অধিকার, চলাফেরার অধিকার, নিরাপত্তা ব্যাহত না করে সমাবেশ-অবরোধ করার অধিকার তাদের আছে। কিন্তু ৫ মে সমাবেশ করার নামে তারা যা করেছে, তাতে অন্যের নাগরিক অধিকার ব্যাহত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা অনেক দোকান পুড়িয়ে দিয়েছে, ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। অনেক দরিদ্র মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। এটা অবশ্যই নিন্দনীয়। এর দায় তারা এড়াতে পারে না। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠতে পারে, ৫ মের ঘটনাবলির জন্য সরকারের দায় কতটুকু? সরকার কি দায় এড়াতে পারে? আমার তো মনে হয়, সরকারও এর দায় এড়াতে পারে না। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার জানা উচিত ছিল, তারা কী করতে পারে। কী ধরনের সহিংসতা তারা চালাতে পারে, কী রকম বিশৃঙ্খলা তারা সৃষ্টি করতে পারে। সেটা সরকার যদি না জানে, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা যদি না জানে, তাহলে ধরে নিতে হবে, গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে না। আর এমন সহিংসতার ঘটনা ঘটবে, এটা জেনেশুনে যদি সরকার তা করে থাকে অর্থাৎ সমাবেশের অনুমতি দিয়ে থাকে, তাহলে সেটা হবে সরকারের দায়িত্বহীনতার পরিচয়। আর যদি না জানে, তাহলে সেটা সরকারের ব্যর্থতা। হেফাজতের কর্মসূচি ছিল অবরোধের। কেন তাদের শহরের বাণিজ্যিক কেন্দ্রে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হলো- এ প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতে হবে। Continue reading

নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে সুজনের পক্ষ থেকে কিছু প্রশ্ন

 Press Conference 4.5.13সম জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে যথাযথভাবে সীমানা পুনঃনির্ধারণের দাবী জানিয়েছে নাগরিক সংগঠন সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক। এর অন্যথা হলে অর্থাৎ ভোটার সংখ্যার দিক থেকে বড় আসনগুলোর জনগণ বঞ্চিত হবে এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বাধাগ্রস্থ হবে। আজ সকাল ১১টায়, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সুজন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সুজন নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন। সুজন সভাপতি জনাব এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিতেত্বে ‘নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে কিছু প্রশ্ন’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজমুদার। এছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে উপসি’ত ছিলেন সুজন নির্বাহী সদস্য ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার এবং  সুজন এর কোষাধ্যক্ষ জনাব আব্দুল হক প্রমুখ। Continue reading

সংকট উত্তরণে প্রয়োজন নাগরিক ঐক্য

logo
ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র
আগামী আট-নয় মাসের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রথম আবশ্যকীয় পদক্ষেপ অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তবে শুধু নির্বাচিত সরকারই গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। বহুদলীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না করা, ব্যক্তিতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, দলতন্ত্র ও ফায়দাতন্ত্র পরিহার করা। পরিচ্ছন্ন ও জনমুখী শাসন কাঠামো গড়ে তোলা। বাক-স্বাধীনতাসহ নাগরিকদের সব অধিকার সমুন্নত রাখা। সব রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার চর্চা করা, যথাযথ আইনি কাঠামো প্রণয়ন ও তা পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। সব কাজে সবার অন্তর্ভুক্তিকরণ, সমতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করা। সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।আর এ ধরনের একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের জন্য প্রয়োজন কতগুলো শক্তিশালী, কার্যকর সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সংগঠন। যেমন- জাতীয় সংসদ, আদালত, স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, রাজনৈতিক দল, সংঘবদ্ধ নাগরিক সমাজ ইত্যাদি। এসব প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্রের পিলার বা খুঁটিস্বরূপ।

এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বলিষ্ঠ ভূমিকার ওপরই মূলত নির্ভর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্রের কার্যকারিতা। উদাহরণস্বরূপ, সংসদের কার্যকারিতার মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ও সব দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ সুগম হয়। স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ রোধ এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষিত হয়। নির্বাচিত ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সর্বস্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং সর্বোপরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গভীরতা অর্জনের পথ প্রশস্ত হয়। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং নির্ভীক ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠিত হলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভবপর হয়। Continue reading

‌‌নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি জানালেন’ – গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

Picture_Roundtable

গত ২০ এপ্রিল ২০১৩, সকাল ১০ টায়, জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে, সুজন-এর উদ্যোগে বিরাজমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নাগরিক ভাবনা শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সহ-সভাপতি জনাব এস এম শাহজাহান। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন সম্পাদক . বদিউল আলম মুজমদার। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, ব্যরিস্টার রফিক-উল-হক, ড. রওনক জাহান, জনাব আলী ইমাম মজুমদার, সৈয়দ আবুল মকসুদ, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা, রাজনীতিবিদ জনাব সরদার আমজাদ হোসেন, অধ্যাপক আবু সায়ীদ, জনাব ইনাম আহমেদ চৌধুরী, অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, লেঃ জেঃ (অবঃ) মাহবুবুর রহমান ও জনাব রুহিন হোসেন প্রিন্স, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, অধ্যাপক হামিদা বানু, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, জনাব নুরুল কাদির, সুজন সম্পাদক . বদিউল আলম মজুমদার, সাংবাদিক গোলাম মর্তোজা মুনির হায়দার, এডভোকেট আহসানুল করিম চৌধুরী বাবুল আবুল হাসনাত প্রমূখ। Continue reading

হঠকারিতা ও অপরিণামদর্শিতার পরিণতিই অস্থিতিশীলতা

Samakal_logo

বদিউল আলম মজুমদার

৬ এপ্রিলকে কেন্দ্র করে সারাদেশে এক চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাময় পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। হেফাজতে ইসলামের ঘোষিত ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ এবং তা প্রতিহত করার লক্ষ্যে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামসহ ২৭টি সংগঠনের ডাকা হরতাল এক ভয়াবহ দ্বন্দ্বাত্মক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে জনগণ তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ছিল, কারণ তারা সরকারের ওপর ভরসা করতে পারছিল না।

তবে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি দেখে যে, কিছু বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত ঘটনা ব্যতীত কোনো বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই লংমার্চ ও হরতাল শেষ হয়েছে, যদিও দুই ব্যক্তি এতে প্রাণ হারিয়েছেন। সব মৃত্যুই বেদনাদায়ক এবং আমরা মনে করি যে, এ ধরনের অহেতুক মৃত্যু এড়ানো যেত।

লংমার্চ ও হরতালকে ঘিরে গত কয়েক দিন থেকে চারদিকে টান টান উত্তেজনা এবং কী হতে যাচ্ছে তা নিয়ে নানা জল্পপ্পনা-কলপ্পনা চলছিল। দ্বন্দ্বাত্মক পরিস্থিতি সহিংসতায় রূপ নেবে কি-না এবং সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কি-না তা নিয়ে অনেকেই চিন্তিত ছিল। আবার অনেকে চিন্তিত ছিল ঢাকায় আসতে বাধাগ্রস্ত হয়ে হেফাজতের সমর্থকরা যদি অবস্থান ধর্মঘট করে বা লাগাতার হরতাল ডেকে সারাদেশকে দীর্ঘমেয়াদিভাবে অচল করে দেয়, তাহলে তার পরিণতি কী হবে! সরকার কীভাবে তা সামাল দেবে? আদৌ সামাল দিতে পারবে কি-না! মোট কথা, জনমনে নানা প্রশ্নম্ন দেখা দিয়েছিল এবং সব প্রশ্নম্ন একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতিরই প্রতিফলন।

আপাতদৃষ্টিতে লংমার্চ সমর্থক ও হরতাল সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির ফলেই বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু আমাদের আশঙ্কা, এ অস্থিতিশীলতার উৎস আরও গভীরে প্রোথিত। বহুদিন থেকে একের পর এক সরকারের হঠকারিতা ও অদূরদর্শিতাই বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মূল কারণ।

গত কিছুদিন থেকে আমরা তিনটি গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি : যুদ্ধাপরাধের বিচার, এ বিচারকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে জনমনে আশঙ্কা। এসব সমস্যার কারণে গত কয়েক মাসে সারাদেশে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছে। গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত তিন মাসে ১৭১ জন খুন হয়েছেন। এ সময়ে ২৩০টি সহিংস ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৬ হাজার ৪৯ জন। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়ের পর সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৩৭ জন। নিহতদের মধ্যে জামায়াত শিবিরের ৪৪ জন, পুলিশ ৯ জন, গ্রামপুলিশ ১ জন, ৩ জন নারী, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মী ও সমর্থক ১০ জন এবং সাধারণ মানুষ ৭০ জন। এ ছাড়া দেশের অনেক জেলায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে। ওইসব হামলায় ৪২০টি মন্দির, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর ও অগি্নসংযোগ করা হয়েছে। উপরন্তু মার্চ মাসেই বিএনপি-জামায়াতের ডাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হরতাল হয়েছে ২৯টি। (যুগান্তর, ২ এপ্রিল ২০১৩)। Continue reading

নিরবচ্ছিন্ন গণতন্ত্রের জন্যই দরকার শক্তিশালী স্থানীয় সরকার

prothom-alo-logo_v4

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ০৩-০৪-২০১৩

সম্প্রতি একটি স্থানীয় সরকারবিষয়ক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের জন্য গণতন্ত্র অপরিহার্য (প্রথম আলো, ২১ মার্চ ২০১৩)। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেই বলতে হয়, বিষয়টি আসলে সম্পূর্ণ উল্টো, নিরবচ্ছিন্ন গণতন্ত্রের জন্যই শক্তিশালী স্থানীয় সরকার অপরিহার্য। বস্তুত বর্তমান নির্বাচনসর্বস্ব, ভঙ্গুর, অস্থিতিশীল ও অকার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য আমাদের ক্রমাগত দুর্বল ও নামসর্বস্ব স্থানীয় সরকারব্যবস্থা বহুলাংশে দায়ী। আর স্থানীয় সরকারের বর্তমান দুরবস্থার জন্য মূলত দায়ী আমাদের দুই প্রধান দলের নেতা-নেত্রীদের প্রজ্ঞাহীনতা, স্বার্থপরতা ও আইন-আদালতের প্রতি অশ্রদ্ধা।

আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র’। আর গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে: ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ অর্থাত্ ইউনিয়নে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলায় নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ এবং জেলায় নির্বাচিত জেলা পরিষদ শাসনকার্য পরিচালনা করবে। বস্তুত, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতে, স্থানীয় সরকারের উদ্দেশ্যই হলো স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা [কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ, ৪৪ডিএলআর(এসি)(১৯৯২)]। একইভাবে জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত সংসদ এবং সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ দল রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্যে নির্বাহী দায়িত্ব পালন করবে। তাই সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য শুধু মন্ত্রী-সাংসদদের নির্বাচনই যথেষ্ট নয়; এর জন্য আরও প্রয়োজন সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সর্বস্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা।
প্রসঙ্গত, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘“প্রশাসনিক একাংশ” অর্থ জেলা কিংবা এই সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য-সাধনকল্পে আইনের দ্বারা অভিহিত অন্য কোন এলাকা।’ আর প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থাকা সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক হলেও সংবিধান প্রণয়নের ৪০ বছরের মধ্যে একবারও জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। বরং ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর, বিজয় দিবসের প্রাক্কালে, জেলা পরিষদে অনির্বাচিত দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দানের মাধ্যমে বর্তমান সরকার আমাদের গণতন্ত্রের কফিনে একটি বড় পেরেক ঠুকে দিয়েছে। প্রসঙ্গত, এই নিয়োগ দানের সময় অঙ্গীকার করা হয়েছিল যে কয়েক মাসের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে জেলা পরিষদ গঠন করা হবে। কারণ, নির্বাচন না হলে পরিষদ গঠিত হয় না। সে অঙ্গীকার আজও রক্ষা করা হয়নি। Continue reading

নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ

prothom-alo-logo_v4

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ২১-০৩-২০১৩

বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনকে সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ অনুযায়ী প্রত্যেক আদমশুমারির পর নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ বাধ্যতামূলক। আইনের এ বিধান অনুসরণে কমিশন গত ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ, যথাযথভাবে সীমানা পুনর্নির্ধারণের ওপর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বহুলাংশে নির্ভর করে।

কমিশনের প্রকাশিত সীমানা পুনর্নির্ধারণের খসড়া তালিকাটি নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করা জরুরি। খসড়া তালিকাটি কি বিদ্যমান আইন অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে? এটি কি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ? এ ক্ষেত্রে কমিশন ‘জেরিম্যান্ডারিং’ বা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছে কি না?

অধ্যাদেশের ৬ ধারা অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ নির্ধারিত একক নির্বাচনী এলাকার সংখ্যার ভিত্তিতে সারা দেশকে বিভক্ত করতে হবে। এই বিভক্তির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সুবিধা (administrative convenience), আঞ্চলিক অখণ্ডতা (compact area) এবং সর্বশেষ আদমশুমারি থেকে পাওয়া জনসংখ্যার বিভাজনকে (distribution of population) যত দূর সম্ভব বিবেচনায় নিতে হবে। তা কি যথাযথভাবে করা হয়েছে?

কমিশন কর্তৃক জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ‘সীমানা পুনর্নির্ধারণে নিম্নোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে: ১. প্রতিটি জেলার ২০০৮ সালে নির্ধারিত মোট আসনসংখ্যা অপরিবর্তিত রাখা; ২. নির্বাচনী এলাকাগুলোর আগে নির্ধারিত সীমানা যত দূর সম্ভব বহাল রাখা; ৩. সংসদীয় আসন জেলাভিত্তিক বণ্টন এবং এক এক জেলায় অবস্থিত সংসদীয় আসনের এলাকা অন্য জেলায় সম্প্রসারণ না করা; ৪. যেখানে সম্ভব উপজেলা অবিভাজিত রাখা; ৫. যত দূর সম্ভব ইউনিয়ন, সিটি, পৌর ওয়ার্ড একাধিক সংসদীয় আসনের মধ্যে বিভাজন না করা এবং ৬. ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও যোগাযোগব্যবস্থা তথা জনগণের যাতায়াতের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় রাখা।’ Continue reading