সাংসদেরা কি লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত?

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ০১-০৯-২০১২

আমাদের সংসদ সদস্যরা কি ‘অফিস অব প্রফিট’ বা প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত—এ প্রশ্ন নিয়ে সম্প্রতি একটি বিতর্ক শুরু হয়েছে। ব্যারিস্টার হারুন উর রশিদের মতে, তাঁরা অবশ্যই লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত (দ্য ডেইলি স্টার, ১৬ আগস্ট ২০১২)। পক্ষান্তরে ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের বক্তব্য যে তাঁরা লাভজনক পদে আসীন নন। এ বিতর্ক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক; কারণ, এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে আমাদের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে—(ক) মেয়াদ-অবসানের কারণে, সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে, ভাঙিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে …’ [অনুচ্ছেদ ১২৩(৩)(ক)]। অর্থাৎ আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সংসদ সদস্যরা তাঁদের পদে বহাল থাকাকালীন অবস্থায়। আর তাঁরা যদি প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে আসীন থাকেন, তা হলে তাঁরা পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। কারণ, আমাদের সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি…(ঘঘ) আইনের দ্বারা পদাধিকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করিতেছে না, এমন পদ ব্যতীত তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন…।’

আর সংবিধানের ৬৬(২-এ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কোনো ব্যক্তি কেবল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপ-মন্ত্রী হইবার কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোন লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলিয়া গণ্য হইবেন না।’ অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদেরকেই শুধু প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য নন।

যেহেতু সুনির্দিষ্ট করে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিতদের প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদ অধিষ্ঠিত নয় বলে সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া হয় যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অন্যান্য যাঁরা বেতন-ভাতা পান, তাঁরা প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত এবং সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য। আর সংসদ সদস্যরা যেহেতু রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা পান এবং তাঁরা সাংবিধানিকভাবে অব্যাহতিপ্রাপ্ত নন, তাই তাঁরা প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত, ফলে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে অযোগ্য। Continue reading

দুর্নীতি প্রতিরোধে ‘হুইসেলব্লোয়ার’ আইন

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ২৪-০৮-২০১২

২০১১ সালের জুন মাসে ‘হুইসেলব্লোয়ার’ (whistleblower) বা জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১ জাতীয় সংসদে পাস হয়। আইনটির উদ্দেশ্য হলো, জনস্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে কোনো ব্যক্তি যদি সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কোনো কর্মকর্তার অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করেন, তাঁকে সুরক্ষা প্রদান। এটি একটি যুগান্তকারী আইন এবং এটি পাসের জন্য আমরা বর্তমান সরকার ও নবম জাতীয় সংসদকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আইনটি সম্পর্কে জনসচেতনতা নেই বললেই চলে।

আইনের ২(৪) ধারায় সরকারি অর্থের অনিয়মিত ও অননুমোদিত ব্যয়; সরকারি সম্পদের অব্যবস্থাপনা; সরকারি সম্পদ বা অর্থ আত্মসাৎ বা অপচয়; ক্ষমতার অপব্যবহার বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা (maladministration); ফৌজদারি অপরাধ বা বেআইনি বা অবৈধ কার্য সম্পাদন; জনস্বার্থ, নিরাপত্তা বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ বা কোনো কার্যকলাপ; অথবা দুর্নীতি’বিষয়ক তথ্য ‘জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট তথ্য’ বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

হুইসেলব্লোয়ার হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তাই এ ধরনের ব্যক্তিদের সুরক্ষা প্রদান আবশ্যক। এ কারণে তাঁদের পরিচয় গোপন রাখার বিধানও আইনে রয়েছে। আরও বিধান রয়েছে তথ্য প্রকাশকারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি, দেওয়ানি, বিভাগীয় মামলা দায়ের বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কোনোরূপ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞার। তবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিত্তিহীন তথ্য প্রকাশ করে কাউকে হয়রানি করলে তথ্য প্রকাশকারীর বিরুদ্ধে শাস্তির বিধানও আইনে রয়েছে।

আইনটির বিধানগুলো অত্যন্ত কঠোর। আইনের ২(৪) ধারা পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের, বিশেষত সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যেমন: সরকারি সম্পদের অব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ অনেকের বিরুদ্ধেই আনা সম্ভব। তাই আইনের পরিধি আরও সীমিত করা প্রয়োজন বলে মনে হয়।

এ ছাড়া, বর্তমান অবস্থায় আইনটির অনেকগুলো সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যার একটি হলো সংজ্ঞাগত। যেমন: প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং অনৈতিক কাজের সংজ্ঞা কী। এ ছাড়া, বিচার বিভাগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে এবং অবৈধ ও অনৈতিক কাজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে বিবেচনা করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে।

আইনটি নিয়ে আরেকটি আশঙ্কা হলো, যদিও ৫(৪) ও ৫(৫) ধারায় তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় গোপন রাখার বিধান রয়েছে, আইনের ধারা ৫(৬) অনুযায়ী, ‘এই ধারায় অন্য যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো মামলার শুনানিকালে আদালতের নিকট যদি প্রতীয়মান হয় যে,…তথ্য প্রকাশকারীর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ ব্যতীত…মামলার ন্যায়বিচার নিশ্চিত সম্ভব নয়, তাহা হইলে আদালত সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় প্রকাশ করিতে…পারিবে।’ এই শর্তের ফলে মামলায় অভিযুক্তদের আইনজীবীর পক্ষ থেকে ন্যায়বিচারের খাতিরে তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় প্রকাশ করার দাবি আদালতে জোরালোভাবে উত্থাপন করা হবে। তাই তথ্য প্রকাশকারীর পরিচিতি গোপন রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এ ছাড়া, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় প্রকাশ করার বিরুদ্ধে আইনটিতে কোনো সুরক্ষা নেই। এসব সীমাবদ্ধতার কারণেও আইনটি সংশোধন করা আবশ্যক। Continue reading

Is the interim government the solution?

The Daily Star

Recently, in the BBC Hardtalk programme, our prime minister proposed the formation of an interim government during the next general election with the participation of the opposition. As expected, the opposition leader summarily rejected the proposal. We thank the PM for her proposal to break the deadlock regarding the coming election, although a similar formula was rejected in the past. However, it would have been perhaps more appropriate to engage in a dialogue with the opposition about the proposal, rather than announcing it in a BBC programme.

At the outset, it must be made clear that the PM's proposal is not consistent with the established tradition of parliamentary democracy. In parliamentary democracy, after the expiry of the term of the Parliament, the president asks the departing cabinet to continue until the election as interim government. Thus, the proposed interim government is an aberration and we doubt that it would be helpful in making the next election free and fair.

The Fifteenth Amendment of the Constitution enacted last year requires holding the next election during the three months prior to the expiry of the term of the Ninth Parliament. That is, the present MPs would be in office at the time of the election for the Tenth Parliament, even through, as per the PM's desire, the Parliament may not meet during the last three months. Such a constitutional requirement would be seriously detrimental to creating a level playing field for all parties.

At present, MPs from the treasury bench play the roles of "new zaminders" in their constituencies. They control almost everything there, including the local police. The filing of complaints at the local police station and even the issuing of charge-sheets by police now require a green light from MPs or the ruling party leaders. With such a state of affairs, MPs would be able to use the police to influence the outcome of the election. They could also keep the opposition candidates away from their constituencies through frivolous cases and violence. Continue reading

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই কি সমাধান?

ড. বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ০৩-০৮-২০১২

সম্প্রতি বিবিসি টেলিভিশনের ‘হার্ডটক’ অনুষ্ঠানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি ছোট মন্ত্রিসভা নিয়োগের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া অবশ্য প্রস্তাবটি তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনের লক্ষ্যে এই প্রাথমিক উদ্যোগের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই, যদিও একই ধরনের প্রস্তাব অতীতে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। তবে প্রস্তাবটি বিবিসির অনুষ্ঠানে প্রকাশ না করে এ নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে একটি সংলাপের সূত্রপাত করাই বেশি যুক্তিযুক্ত হতো বলে আমরা মনে করি।

প্রস্তাবটি সম্পর্কে একটি বিষয় প্রথমেই সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রথাগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদের মেয়াদ শেষে মন্ত্রিসভা পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি বিদায়ী মন্ত্রিসভাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তাই প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংসদীয় গণতন্ত্রের রেওয়াজের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ, ফলে এটি একটি জগাখিচুড়ি ব্যবস্থার জন্ম দেবে, যা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সহায়ক হবে কি না তা নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ রয়েছে।

২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের ফলে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের তিন মাসে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা [অনুচ্ছেদ ১২৩(৩)]। অর্থাৎ যখন দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তখন নবম সংসদের সদস্যরা, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবমতো, সংসদ অধিবেশনে না বসলেও স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। বর্তমানে আমাদের সাংসদেরা, বিশেষত সরকারি দলের সাংসদেরা, ‘নব্য জমিদারে’র ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে স্থানীয়ভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। এমনকি থানায় মামলা নেওয়া এবং চার্জশিট দেওয়াও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ভর করে স্থানীয় সাংসদ বা সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের সবুজ সংকেতের ওপর। তাই বর্তমান সাংসদদের সদস্যপদ বহাল থাকাকালীন নির্বাচন হলে, তাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন প্রভাবিত করতে পারবেন। এমনকি মামলা-হামলার মাধ্যমে বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের এলাকাছাড়াও করতে পারেন বলে অনেকের আশঙ্কা। একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন—প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? শেখ হাসিনা, না খালেদা জিয়া? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ, আমাদের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর একনায়কত্ব সৃষ্টির বীজ নিহিত আছে। বস্তুত, অতীতের সংসদীয় পদ্ধতিতে নির্বাচিত সব প্রধানমন্ত্রীই আমাদের দেশে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছেন। Continue reading

বুয়েট: বিব্রত হওয়া শিক্ষামন্ত্রীর কাজ নয়

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ২৭-০৭-২০১২

নুরুল ইসলাম নাহিদ মহাজোট মন্ত্রিসভার এক সৎ, যোগ্য এবং জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তি। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়নসহ তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন এবং করছেন। তাই তিনি আমার প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন মানুষ। তবুও বুয়েট-সমস্যা নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য—আন্দোলনকারীরা তাঁর প্রতি সম্মান দেখিয়ে কর্মসূচি স্থগিত করায় তিনি বিব্রত— আমাকে হতাশ করেছে।

আমি মনে করি যে জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিব্রত বা ক্ষুব্ধ হওয়া তাঁর কাজ নয়, তাঁর কাজ সমস্যার সমাধান করা। বুয়েটসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই জনগণ ভোট দিয়ে মহাজোটকে ক্ষমতায় পাঠিয়েছেন, সমস্যাকে জিইয়ে রাখা বা সমস্যার ‘রাজনীতিকীকরণের’ জন্য নয়। সরকারবিরোধীরা অবশ্য ক্ষমতাসীনদের জন্য বিপদ সৃষ্টির লক্ষ্যে সমস্যার আগুনে ঘি ঢালার চেষ্টা করতেই পারে, কিন্তু সরকারের কাজ দ্রুততার সঙ্গে তা সমাধান করা। কারণ, সমস্যা রেখে দিলে তা থেকে নতুন ডালপালা গজায় এবং আরও জটিল আকার ধারণ করে।

আর সমস্যার জন্য অজুহাত সৃষ্টি করা বা অন্য উদ্দেশ্য খোঁজা (অর্থাৎ চক্রান্তের অভিযোগ তোলাও) মন্ত্রীর কাজ নয়। তবে চক্রান্ত যদি থেকেই থাকে, তাহলে চক্রান্তকারীদের খুঁজে বের করে তাদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। তাঁর কাজ হলো সমস্যার ত্বরিত সমাধান করা। আর অজুহাত সমস্যার সমাধান করে না বরং তা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দায়মুক্তি দেয় এবং নিষ্ক্রিয় করে ফেলে।

আমি এক আমেরিকান দম্পতিকে চিনতাম, যাঁরা ছিলেন দাম্পত্য জীবনে অত্যন্ত সুখী। আমি একদিন তাঁদের ‘সিক্রেট’ জানতে চাইলাম। ভদ্রমহিলা বললেন, তাঁদের মধ্যেও ঝগড়া-বিবাদ হয়, কিন্তু তাঁরা কোনো সমস্যারই, যত ক্ষুদ্রই হোক, সমাধান না করে রাতে ঘুমান না। আজীবন এ চর্চার ফলেই নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা পুঞ্জীভূত হয়নি এবং তাঁরা সমস্যার ভারে নুয়ে পড়েননি। ব্যক্তির জীবনে যা সত্য, সরকারের বেলায়ও তা প্রযোজ্য। Continue reading

সরকার ও বিশ্বব্যাংক: পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারির পরিণতি

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ১৩-০৭-২০১২

পদ্মা সেতু নিয়ে যা হলো তার পরিণতি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। পদ্মা সেতু নির্মিত না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতেই, (দি ডেইলি স্টার, ৩ জুলাই ২০১২) সেতুটির কারণে ২০১৫ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী ৩১ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি বা দেশজ উৎপাদন বাড়বে ছয় বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা)। একই সময়ে দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে ৫০ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান ১০ দশমিক ২ শতাংশ। বাৎসরিক হারে জাতীয়ভাবে দারিদ্র্য কমবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং দক্ষিণাঞ্চলে ২ শতাংশ। এ ছাড়া নয় হাজার হেক্টর জমি নদীভাঙন থেকে রক্ষা পাবে। জমি রক্ষা, বিদ্যুৎ-গ্যাসলাইন ও ফাইবার অপটিক লাইন স্থাপন এবং ফেরি সার্ভিস বন্ধ থেকে সরকারের সাশ্রয় হবে প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা। তাই পদ্মা সেতু নির্মাণ বন্ধ সব বাংলাদেশি, বিশেষত দক্ষিণবঙ্গের মানুষের পেটে লাথি মারারই সমতুল্য হবে।

বিশ্বব্যাংক দাবি করেছে, দুর্নীতির সুস্পষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। আমাদের সরকার অবশ্য বরাবরই দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এবং কিছু কর্মকর্তা। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে না নিয়ে এবং পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এটির সমাধান না করে, সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বিশ্বব্যাংকের কঠোর সমালোচনায় লিপ্ত হন এবং দুর্নীতি প্রমাণ করার জন্য সংস্থাটির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও এতে সুর মিলিয়ে বলেন যে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতি প্রমাণ করতে না পারলে সরকার তাদের কাছ থেকে ঋণ নেবে না (যার মানে দাঁড়ায়, বিশ্বব্যাংক দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারলেই সরকার তাদের কাছ থেকে ঋণ নেবে)। কেউ কেউ বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও উত্থাপন করেন এবং নানামুখী বাগাড়ম্বরে লিপ্ত হন।

একই সঙ্গে মন্ত্রীদের অনেকেই বলতে থাকেন যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ আমাদের প্রয়োজন নেই—পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য বহু দেশ আমাদের ঋণ দিতে আগ্রহী। প্রয়োজনে নিজেদের অর্থ দিয়েই আমরা তা করব। এমনকি মালয়েশিয়ার একটি গ্রুপের সঙ্গে আমরা সমঝোতা চুক্তি সম্পাদনেরও উদ্যোগ নিয়েছি, যা বিশ্বব্যাংকের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের সমতুল্য। অর্থাৎ কূটনৈতিকভাবে সমস্যাটি সমাধানের পরিবর্তে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে অনেকটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও জেদাজেদির পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছি, যার মাশুল হয়তো পুরো জাতিকেই গুনতে হবে। Continue reading

শুধু সমঝোতা নয়, সমাধান চাই

শুধু সমঝোতা নয়, সমাধান চাই

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ০৩-০৬-২০১২

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষ থেকে আমরা বহুদিন ধরে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের প্রস্তাব করে আসছি। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও একই আহ্বান জানিয়ে আসছে। সমাজের অন্যান্য শ্রেণীর প্রতিনিধিরাও এর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। বস্তুত, দেশের অধিকাংশ জনগণই এখন চায়, আমাদের রাজনীতিবিদেরা আলাপ-আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে কতগুলো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছাক এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করুক, যাতে যথাসময়ে সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের দুই বিদেশি অতিথিও—হিলারি ক্লিনটন ও প্রণব মুখার্জি—একই পরামর্শ দিয়ে গিয়েছেন, যদিও তাঁদের পরামর্শ থেকে নাগরিকদের মতামত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

ক্ষুধা-দারিদ্র্য, বৈষম্যসহ আমরা বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত। তবে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন, দলতন্ত্র, ফায়দাতন্ত্র, রাজনৈতিক সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি ইত্যাদি তথা সুশাসনের অভাব বা অপশাসন আজ আমাদের অন্যতম সমস্যা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে যে বিতর্ক ও অচলাবস্থা বিরাজমান, তা আমাদের ‘মাদার অব অল প্রবলেমস’ বা সব সমস্যার মাতৃতুল্য বলে মনে হয়। কারণ, এ অচলাবস্থা সবার অংশগ্রহণে আমাদের আগামী জাতীয় নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে ফেলেছে, রাজনৈতিক অঙ্গনকে আরও সহিংস করার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে, যার ফলে অতীতের মতো আবারও চরম অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে আমাদের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আবারও ভেঙে পড়তে পারে। আর এমন পরিস্থিতিই অগণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করে। তাই আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখতে এবং শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে সংলাপ ও সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই।

স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী দল সংলাপের দাবিতে সোচ্চার। তারা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অন্তত পরিবর্তিত রূপে এবং নামে হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চায়, যাতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। প্রসঙ্গত, পরাজিত পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হলেও, দেশি-বিদেশি সব পর্যবেক্ষকের মতে, অন্তর্বর্তী/ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত গত চারটি নির্বাচনই মোটামুটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। ফলে গত তিনটি নির্বাচনে বিরোধী দল ক্রমাগতভাবে বেশি আসন নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের ইতিহাসে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল। Continue reading