সমঝোতা, না অগণতান্ত্রিক পন্থা?

 

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ১১-০১-২০১২

আমাদের মাননীয় সিইসি ও অন্য দুই কমিশনারের মেয়াদ আগামী মাসের প্রথমার্ধেই শেষ হবে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি সবার মতামতের ভিত্তিতে যাতে পরবর্তী সিইসি এবং অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডেকেছেন। এই প্রথমবারের মত এধরণের উদ্যোগ নেওয়া হলো। আমরা আনন্দিত যে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি রাষ্ট্রপতির আহ্বানে সাড়া দিয়ে সংলাপে অংশ নিতে রাজি হয়েছে। এ উদ্যোগের জন্য রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানাই।

নিঃসন্দেহে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন অপরিহার্য। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই প্রয়োজন এর আর্থিক স্বাধীনতা ও স্বাধীন সচিবালয়। ইতিমধ্যে কমিশনের স্বাধীন সচিবালয় বহুলাংশে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর আর্থিক স্বাধীনতা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। কমিশনের সব ব্যয় এখনো সংযুক্ত তহবিলের দায়যুক্ত ব্যয়ে পরিণত হয়নি। এ ছাড়া যেকোনো প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করবে কি না, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে যোগ্য ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিরা ওই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্ত কি না। উপরন্তু কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্যও প্রয়োজন সৎ, দক্ষ ও সাহসী ব্যক্তিদের এখানে নিয়োগ প্রদান।

রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপকালে সৎ, যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রদানের লক্ষ্যে কমিশন গত বছর একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনের প্রস্তাব করে। বিএনপি সেই সংলাপে অংশগ্রহণ করেনি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অংশ নিলেও প্রস্তাবটির প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেনি। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বর্তমান সংলাপে অংশগ্রহণকারী কিছু দল একই প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। Continue reading

Comprehensive solution needed

 

The president has initiated a dialogue with political parties to ensure that the appointments of the next batch of election commissioners are acceptable to all concerned. We are pleased that the opposition BNP has decided to join the dialogue. We thank the president for the initiative.

Some political parties recommended the formation of a search committee to identify eligible persons for appointment to the EC. A few months ago the EC also made a similar proposal, to which the ruling Awami League paid no heed. Our experience shows that partisan individuals often get appointed to constitutional and statutory bodies despite the use of search committees.

Past experiences also show that search committees sometimes recommend undesirable persons for appointment. For example, the search committee for filling the vacancies in the Human Rights Commission recommended the appointment of a university professor accused of sexual harassment of students — a story which was well-known because of published newspaper stories about the accusation. To the embarrassment of all concerned, the person, after appointment, had to be removed in a hurry following a public outcry. Thus, forming a search committee is not sufficient for appointment of right persons to the right positions, although it is necessary.

The search committee for picking election commissioners, we recommend, should also have representation from citizen groups. For, there are accusations of partisan leaning against many present heads of constitutional and statutory bodies. Continue reading

সরকারের সামপ্রতিক সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কবর দেওয়ার শামিল-গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

গত ২৯ wW‡m¤^i ২০১১, সকাল ১০.৩০টায়, জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে, সুজনেউদ্যোগে স্থানীয় সরকার বিষয়ে সামপ্রতিক সরকারি সিদ্ধান্ত ও নাগরিক ভাবনা শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়সুজন সহ-সভাপতি জনাব এম হাফিজ উদ্দিন খান সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেনবৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সুজন নিবার্হী সদস্য জনাব এস এম শাহজাহান, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া, রাজনীতিবিদ ইনাম আহমেদ চৌধুরী হুমায়ূন কবীর হিরু, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, অধ্যাপক কামাল আতাউর রহমান, সংবাদিক মনির হায়দার, সিংড়া পৌরসভার মেয়র জনাব জনাব শামীম আল রাজী, আড়াইহাজার উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান মুজাহিদুর রহমান হেলো, নারায়ণগঞ্জ সদরের ভাইসচেয়ারম্যান ফাতেমা মনির, নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার ভাইসচেয়ারম্যান সাজ্জাদ আহমেদ, ইসলামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জনাব আবুল হোসেন খান, এডভোকেট তাসনীম রানা প্রমূখ

 এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো আমাদের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যেই স্থানীয় সরকার সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছেস্থানীয় সরকার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে দেশে সুপ্রিম কোর্টের রায় লঙ্ঘন করা হয়, সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়, সেই দেশের সরকারের কাছ থেকে জনগণের প্রতাশা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেন

 মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার তিনি তার প্রবন্ধে বলেন, বর্তমান সরকার ৩টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেপ্রথমত, সরকার পুনঃপ্রচলিত উপজেলা আইনটিকে সংশোধন করেছেমোটা দাগে এ সংশোধনের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে উপজেলা পরিষদের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, পরিষদের পরিবর্তে উপজেলা চেয়ারম্যানকে নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান এবং ষ্ট্যান্ডিং কমিটির সংখ্যা বাড়িয়ে পরিষদের দুই ভাইস চেয়ারম্যানকে সকল ষ্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি করা হয়সংশোধনীটি পাশ করার আগে উপজেলা পরিষদে মূলত সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যানদের সঙ্গে একটি দ্বিমূখী ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বিরাজমান ছিলবতর্মানে এটি একটি ত্রিমূখী দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছেদ্বিতীয়ত সরকার ৬১টি জেলায় দলীয় কিংবা অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের মধ্য থেকে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছেনএটি আমাদের সংবিধানের নগ্ন লঙ্ঘন বলে তিনি   মন্তব্য করেনএকইসঙ্গে এটি আমাদের উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তেরও পরিপন্থীএছাড়া এর মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে একটি চরম দ্বন্দ্বাত্বক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে বলে আমাদের আশঙ্কাবিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক সর্বসম্মত রায়ে বলেন, ছয়মাসের মধ্যে জেলা পরিষদে নির্বাচিত ব্যক্তিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবেআদালতের রায় আজও বাস্তবায়িত হয়নি এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে এ রায় উপেক্ষা করেইর্বশেষ সিদ্ধান্তটি হলো, ঢাকা মহানগরীকে ঢাকা উত্ত ঢাকা দক্ষিণে বিভক্ত করা এবং পরবর্তীতে দুইজন সরকারি কর্মকর্তাকে এগুলোর প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ প্রদানঢাকা মহানগরকে বিভক্ত করে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানো যাবে নাএর জন্য প্রয়োজন হবে একটি বলিষ্ঠ গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচিকেননা বিভক্তি এবং বিকেন্দ্রীকরণ এক বিষয় নয়এসময় তিনি বলেন, সরকারের এসকল কর্মসূচির প্রভাব সুদূরপ্রসারীএর ফলে আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ধ্বংস হয়ে যেতে পারেএটি আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য সুফল বয়ে আনবে না, ক্ষমতাসীন দলের জন্যও নাএসব অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তের মাশুল শুধু বর্তমান সরকারকেই নয়, পুরো জাতিকেই হয়তো ভবিষ্যতে গুণতে হবে

জনাব এ এস এম শাহজাহান বলেন, বতর্মান স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জগাখিচুরিতে পরিণত হয়েছেতিনি আরো বলেন, স্থানীয় সরকার নিবার্চিত ব্যক্তিদের দ্বারাই পরিচালিত হওয়ার কথা আর তা কার্যকর না হলে সরকার ও জাতির জন্য বোঝা হয়ে যাবেআর এ সমস্যার সমাধান সংলাপের মাধ্যমেই হতে হবেসরকার দলীয় কিংবা অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের মধ্য থেকে প্রশাসক নিয়োগ প্রদান করেছে উল্লেখ করে অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, এর সাথে নিশ্চয়ই অর্থের যোগাযোগ এবং পরবর্তী নির্বাচনে জয় লাভের বাসনা রয়েছেদেশের মানুষ সরকারের এসকল সিদ্ধান্ত মেনে নেবে নাজনাব ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, স্থানীয় সরকারকে কেন্দ্র করে আমাদের দীর্ঘ দিনের লালিত ¯^cœ‡K কবর দেবার কোন অধিকার বর্তমান সরকারের নেইএজন্য স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হলে সকল স্তরের জনগণকে নিয়ে আন্দোলন করতে হবেজনাব হুমায়ূন কবীর হিরু বলেন, বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের কোন পর্যালোচনা করে বলে মনে হয় নাস্থানীয় সরকার কি, কীইবা এর গুরুত্ব এ নিয়েও কোনো আলোচনা-পযালোচনা করে নাএ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য আমাদেরকে সামাজিক অন্দোলন গড়ে তুলতে হবেভাইস চেয়ারম্যান জনাব ফাতেমা মনির বলেন, তিন বছর অতিবাহিত হয়ে গেল আমাদের কোন দায়-দায়িত্ব নেই, ক্ষমতা নেইআমরা কোন কাজ করতে পারি নাসরকার আমাদেরকে হাসির পাত্রে পরিণত করেছেজনাব আবুল হোসেন খান স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবগুলো স্তরের বরাদ্দ বৃদ্ধির পরামর্শ প্রদান করেন এবং জেলা পরিষদের অধীনে জেলায় একটি মিনি পার্লমেন্ট গঠনের প্রস্তাব করেন তিনি অবিলম্বে জেলা পরিষদ নিবার্চ দাবি করেন

 

কুমিল্লা সিটি নির্বাচন: আমরা কেমন মেয়র ও কাউন্সিলর পাব?

 

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ২৫-১২-২০১১

২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি নবগঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচন। এই নির্বাচনে মেয়র পদে নয়জন, সাধারণ আসন থেকে কাউন্সিলর পদে ২১৭ জন এবং সংরক্ষিত আসনে কাউন্সিলর পদে ৬৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আইনগতভাবে সব প্রার্থীকেই তাঁদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামার মাধ্যমে সাত ধরনের তথ্য—তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, আয়ের উৎস, মামলার বিবরণী, নিজের এবং নির্ভরশীলদের সম্পদের বিবরণী ও দায়দেনার তথ্য ইত্যাদি—মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে জমা দিতে হয়েছে আয়করদাতা হলে আয়করের বিবরণী। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, আসন্ন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কারা প্রার্থী হলেন এবং কী তাঁদের ব্যাকগ্রাউন্ড। উল্লেখ্য, ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’ এবং কতিপয় নাগরিকের উদ্যোগে বহু লড়াই-সংগ্রাম ও উচ্চ আদালতে আবু সাফা গংদের জালিয়াতি প্রতিহতের পর প্রার্থীদের এসব তথ্য প্রদানের আইনগত বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়েছে।

প্রার্থীদের হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যের বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় যে মেয়র পদে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী নয়জন প্রার্থীর পাঁচজনই (৫৫ শতাংশ) স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির অধিকারী। বাকি চারজন এইচএসসি ও তার নিচে। মূল প্রার্থীদের মধ্যে আফজল খান বিএ, এলএলবি; মনিরুল ইসলাম এসএসসি; এয়ার আহমেদ সেলিম অষ্টম শ্রেণী পাস; নূর-উর রহমান মাহমুদ তানিম বিএসএস; এবং আনিসুর রহমান মিঠু বিএ, এলএলবি।

সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে ২১৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে এসএসসির নিচে ৯৯ জন (৪৫.৬২ শতাংশ), স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ৫০ জন (২৩.০৪ শতাংশ)। বাকিদের মধ্যে এসএসসি ২৮ জন (১২.৯০ শতাংশ), এইচএসসি ৩৯ জন (১৭.৯৭ শতাংশ) এবং একজনের শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ নেই। সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলর প্রার্থী ৬৯ জনের মধ্যে ২৪ জনের (৩৪.৭৮ শতাংশ) শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসির নিচে, এসএসসি নয়জন (১৩.০৪ শতাংশ), এইচএসসি ১৬ জন (২৩.১৮ শতাংশ), স্নাতক ১৫ জন (২১.৭৩ শতাংশ) এবং পাঁচজন (৭.২৪ শতাংশ) স্নাতকোত্তর। অর্থাৎ সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের বড় অংশেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা তার নিচে এবং তাঁদের অধিকাংশই অষ্টম-নবম শ্রেণী পাস। Continue reading

জেলা প্রশাসক নিয়োগ:কেন এই স্বেচ্ছাচারিতামূলক সিদ্ধান্ত?

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ১৯-১২-২০১১

গত ১৫ ডিসেম্বর রাতে, বিজয় দিবসের প্রাক্কালে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৬১টি জেলায় দলীয় ব্যক্তিদের নিয়ে জেলা প্রশাসক নিয়োগ প্রদান করেছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা সহযোগী সংগঠনের নেতা। কেউ কেউ এই নিয়োগকে বিজয় দিবসের উপহার বলে আখ্যায়িত করেছেন। নিঃসন্দেহে নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য এটি একটি উপহার, কিন্তু আমাদের আশঙ্কা যে জাতির জন্য এটি একটি দুঃসংবাদ।

জেলা পরিষদ আইন ২০০০-এর ৮২(১) ধারার অধীনে জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। আইনের এই বিধানকে অত্যন্ত ‘গর্হিত’ বলে আখ্যায়িত করে আমাদের বর্তমান মাননীয় অর্থমন্ত্রী তাঁর ২০০২ সালের জেলায় জেলায় সরকার গ্রন্থে লেখেন: ‘সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান না করেই নিজেদের মনোনীত ব্যক্তিকে দিয়ে জেলা সরকার গঠন করতে পারে। এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা বা (সম্ভবত দলীয় প্রীতি) কোনো সুযোগ একটি গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানে থাকা নিতান্তই লজ্জা ও ক্ষোভের বিষয়।’

দুর্ভাগ্যবশত প্রশাসক নিয়োগের এই সিদ্ধান্ত শুধু গর্হিত ও স্বেচ্ছাচারিতামূলকই নয়, এটি আমাদের সংবিধানের নগ্ন লঙ্ঘনও। একই সঙ্গে এটি আমাদের উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তেরও পরিপন্থী। এ ছাড়া এর মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে একটি চরম দ্বন্দ্বাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে বলে আমাদের আশঙ্কা। আর যেখানে দ্বন্দ্ব ও হানাহানি, সেখানে ইতিবাচক ও গঠনমূলক কিছু হয় না।

আমাদের সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ অর্থাৎ সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুসারে নির্বাচিত জেলা পরিষদ জেলায়, নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ উপজেলায়, নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ ইউনিয়নে, নির্বাচিত সিটি করপোরেশন সিটিতে এবং নির্বাচিত পৌর পরিষদ পৌরসভায় শাসনকার্য পরিচালনা করবে। অনির্বাচিত ব্যক্তি বা প্রশাসকের কোনোরূপ ভূমিকা পালনের সুযোগ সংবিধানে রাখা হয়নি। তাই জেলা পরিষদ বা অন্য কোনো স্থানীয় সরকার আইনে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ করার বিধান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আর এই অসাংবিধানিক বিধানের অধীনে প্রশাসক নিয়োগ প্রদানও অসাংবিধানিক হতে বাধ্য। Continue reading

স্মরণ: প্রচলিত ধারা তাকে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে

বদিউল আলম মজুমদার
শুধু প্রগতিশীল চিন্তা লালনকারীই নয়, মঞ্জু ছিলেন অত্যন্ত নম্র, ভদ্র ও বিনয়ী। একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও মঞ্জুকে আমি কোনোদিন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতে দেখিনি। বস্তুত তিনি যে বিখ্যাত আজিজ মিঞার ছেলে অতি ঘনিষ্ঠরা ছাড়া কেউ তা জানতও না। এক কথায়, মঞ্জু একজন অতি সহজ-সরল ও নিরীহ প্রকৃতির মানুষ ছিলেন।

গত ২৫ অক্টোবর আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অতি ঘনিষ্ঠ নূরুদ্দিন জাহিদ মঞ্জু পরলোকগমন করেন। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমি তখন দেশের বাইরে এবং সেখান থেকেই আমি তার অকালমৃত্যুর কথা সংবাদপত্রে পড়ে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত হয়েছি। মৃত্যুকালে মঞ্জুর বয়স হয়েছিল প্রায় ৬৪ বছর। তবুও আমি তার মৃত্যুকে অকালমৃত্যু বলছি। কারণ চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষের ফলে ৬০-৬৫ বছর বয়স্ক ব্যক্তিকে এখন আর বৃদ্ধ বলে মনে করা হয় না। মানুষের গড় আয়ু এখন অনেক বেড়েছে, এমনকি বাংলাদেশেও। যেমন, গত তিন দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯০ বা তার বেশি বয়সের জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিনগুণ।

এ ছাড়াও ৫০-৬০ বছর বয়সেই মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার শ্রেষ্ঠ সময়। লেখাপড়া শেখা, জীবন-জীবিকার সন্ধান এবং পারিবারিক দায়দায়িত্ব পালনের পর ষাটের দিকেই মানুষের সত্যিকারের নতুন জীবন শুরু হয়। সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে তখনই সমাজের জন্য মানুষের অবদান রাখার সর্বশ্রেষ্ঠ সময়। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর জীবনের এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মঞ্জু আমাদের থেকে চিরবিদায় নেন।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মঞ্জুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। আমি তখন বাণিজ্য বিভাগে অনার্সের ছাত্র। তখনও বাণিজ্য অনুষদ সৃষ্টি হয়নি। মঞ্জু আমার এক বছরের জুনিয়র ছিলেন, তবুও আমাদের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে। কিন্তু পাস করার পর লেকচারার হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের কারণে আমি তার শিক্ষক হয়ে যাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনা সচরাচরই ঘটে। আমার মনে আছে, মঞ্জুসহ একদল ছাত্রকে, বাণিজ্য বিভাগে তখন ছাত্রী ছিল না, আমি শিক্ষা সফরে খুলনা নিয়ে গিয়েছিলাম। সে সময়ও শিক্ষক-ছাত্রের সঙ্গত দূরত্ব রেখেই আমাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। Continue reading

ঢাকাকে ভাগ করবেন না

ঢাকাকে ভাগ করবেন না

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ২৮-১১-২০১১

গত ২৩ নভেম্বর সরকার স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর সংশোধনকল্পে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করেছে। বিলটির উদ্দেশ্য মূলত ঢাকা মহানগরকে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণে বিভক্ত করে দুজন উপযুক্ত ব্যক্তি বা সরকারি কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা। প্রধান বিরোধী দল সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরোধী। ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলর এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এর বিরোধিতা করছেন। এমনকি নাগরিক সমাজও এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। সংবাদপত্রের অনলাইন জরিপ ও নাগরিকদের সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনা থেকে মনে হয়, যেন তারা কেউ এই উদ্যোগকে সমর্থন করছে না। তবু ঢাকা মহানগরকে বিভক্ত করতে সরকার যেন বদ্ধপরিকর।

ঢাকা মহানগরকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্তের সমর্থনে সরকারের পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, জনসংখ্যার চাপ ও দুর্নীতির কারণে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এর মাধ্যমে করপোরেশনের সেবার পরিমাণ ও মান বৃদ্ধি পাবে। এ যুক্তিগুলো একটু গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।

জনসংখ্যার চাপের বিষয়ে আসা যাক। ঢাকা শহরের ওপর জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে। আর এর ফলেই ঢাকা শহর মহানগরে পরিণত হয়েছে। জনগণের ঢাকামুখী হওয়ার দুটি কারণ। প্রথমত, আমাদের কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা। কেন্দ্র তথা ঢাকা থেকেই সবকিছু পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রায় সব অফিস-আদালতই ঢাকায় অবস্থিত। তাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরাট অংশকেই ঢাকায় বসবাস করতে হয়। এ ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদির পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় যেসব কর্মকর্তা ঢাকার বাইরে কর্মরত, তাঁদের পরিবার পরিজনও ঢাকায় বসবাস করে। দ্বিতীয়ত, পল্লি অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, তাই জীবন-জীবিকার সন্ধানেও মানুষকে ঢাকামুখী হতে হয়। Continue reading