সুজন- সুশাসনের জন্য নাগরিক ড. বদিউল আলম মজুমদার,লেখালেখি সংসদ নির্বাচন: অপরাধীরা যোগ্য বিবেচিত হতে পারে না

সংসদ নির্বাচন: অপরাধীরা যোগ্য বিবেচিত হতে পারে না

বদিউল আলম মজুমদার
আসন্ন সংসদ নির্বাচনে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের আপিলসাপেক্ষে, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি উঠেছে। এর পেছনে যুক্তি হলো, যে কোনো, এমনকি নিকৃষ্টতম অপরাধীরও দণ্ডের বিরুদ্ধে  আপিল করার অধিকার থাকে; তাই আপিলে দণ্ড অনুমোদিত হওয়ার পরই দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। অনেকে এ দাবির বিরোধিতা করছেন এবং যুক্তিও তুলে ধরছেন। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারিত করা আছে। এই অনুচ্ছেদের (২)(ঘ)-এর বিধান অনুযায়ী, ‘কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে।’ এ বিধানটি সুস্পষ্টভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দণ্ডভোগের পর পাঁচ বছর পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি কখন থেকে অযোগ্য হবেন- আদালত কর্তৃক প্রথম দণ্ড প্রদানের দিন থেকে, না আপিল নিষ্পত্তির পর থেকে?

দুর্ভাগ্যবশত আমাদের গণপ্রতিনিধ্ত্বি আদেশ, ১৯৭২ এবং এর পরবর্তী সংশোধনগুলোতেও এ ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। উল্লেখ্য, ভারতীয় গণপ্রতিনিধ্ত্বি আইন, ১৯৫১-এর বিধান অনুযায়ী, শুধু সিটিং বা কর্মরত সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রেই কেবল আপিল নিষ্পত্তির পর অযোগ্যতার বিধানটি প্রযোজ্য। অর্থাৎ প্রতিবেশী ভারতে দণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তিরা আদালত কর্তৃক প্রথম দণ্ড ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য। গণপ্রতিনিধ্ত্বি (সংশোধিত) আদেশ, ১৯৭২ দণ্ড প্রাপ্তদের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে অস্পষ্টতা থাকলেও, জরুরি ক্ষমতা বিধিমালা, ২০০৭-এর অধীনে দণ্ড প্রাপ্তদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। বিধিমালার ১১(৫) ধারা অনুযায়ী, ‘এই বিধিমালার অধীন দায়েরকৃত কোনো মামলায় কোনো ব্যক্তি দণ্ড প্রাপ্ত হইলে এবং ওই দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করা হইলে, ওই দণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তি জাতীয় সংসদসহ যে কোনো স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হইবেন।’ লক্ষণীয়, উপরিউক্ত বিধানে ভাষাগত একটি ত্রুটি রয়েছে। বিধানটি পড়ে মনে হয়, দণ্ড প্রাপ্তদের মধ্যে যারা আপিল দায়ের করবেন, তারাই শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য হবেন। এটি সম্ভবত মুদ্রণ বিভ্রাটের কারণে ঘটেছে। তবে আইনের মূল স্পিরিট বা চেতনা সুষ্পষ্ট- জরুরি বিধিমালার অধীনে দণ্ডপ্রাপ্তরা আপিল করা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।
এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন থেকে যায়- জরুরি বিধিমালা প্রত্যাহার করা হলে এর অধীনে দণ্ডিতরা কি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন? স্মরণ করা প্রয়োজন, জরুরি বিধিমালার আওতায় দণ্ডিতরা বিদ্যমান কোনো না কোনো আইনের বিধানের আলোকে দণ্ডিত হয়েছেন। ফলে জরুরি বিধিমালা প্রত্যাহার হলেও দণ্ড বহাল থেকে যাবে। তবে যেহেতু সংশোধিত গণপ্রতিনিধ্ত্বি আদেশের বিধান অস্পষ্ট, তাই কখন থেকে দণ্ডপ্রাপ্তরা সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ)-এর বিধানানুযায়ী সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য হবেন তা আদালতকেই নির্ধারণ করতে হবে।
দুর্ভাগ্যবশত আমাদের আদালতের রায়ও এ ব্যাপারে অস্পষ্ট এবং অনেক ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণদণ্ডপ্রাপ্তদের সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতার বিষয়টি আদালতের সামনে উত্থাপিত হয় ১৯৯৬ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বনাম একেএম মাঈদুল ইসলাম [১৯৯৬ সালের রিট পিটিশন নং ১৭৩২] মামলার মাধ্যমে। মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ জনতা টাওয়ার মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হন। মাঈদুল ইসলাম তা চ্যালেঞ্জ করেন। রিটার্নিং অফিসার এরশাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন, যার বিরুদ্ধে মাঈদুল ইসলাম আদালতের আশ্রয় নেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তার রায়ে [একেএম মাঈদুল ইসলাম বনাম বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন, ৪৮ডিএলআর (এডি)১৯৯৬] এরশাদের অযোগ্যতার প্রশ্নটির সুরাহা না করে বিষয়টিকে রিটার্নিং অফিসারের পক্ষ থেকে ‘নির্বাচনী বিরোধ’ হিসেবে দেখা যু্‌ক্তিযুক্ত বলে মতামত দেন, একইসঙ্গে বিচারালয়ের এখতিয়ারহীনতা কিংবা আইনগত বিদ্বেষের অভিযোগ ছাড়া উচ্চ আদালতের নির্বাচনী বিরোধের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয় বলে পর্যবেক্ষণ দেন। উল্লেখ্য, নির্বাচনী বিরোধ মীমাংসার দায়্ত্বি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের, আদালতের নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দণ্ডপ্রাপ্তদের, আপিলসাপেক্ষে, সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার বিষয়টি সুরাহা করেননি। পরবর্তী সময়ে ২৪ আগস্ট, ২০০০ তারিখে হাইকোর্ট এরশাদের দণ্ড বহাল রাখেন এবং ৩০ আগষ্ট সংসদ সচিবালয় তার সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেন। এরশাদ দণ্ড সম্পর্কিত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল এবং প্রজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে একটি রিট দায়ের করেন। রিট আবেদনে দাবি করা হয়, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর আপিল চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়ার আগে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য নন। মামলার রায়ে [হুসেইন মুহল্ফ্মদ এরশাদ বনাম আবদুল মুক্তাদির চৌধুরী, ৫৩ ডিএলআর (২০০১)] বিচারপতি মোঃ জয়নাল আবেদীন ও বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সংসদ সচিবালয়ের প্রজ্ঞাপনটি অবৈধ ঘোষণা করেন। কিন্তু বিচারপতিদ্বয় আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হিসেবে এরশাদের কখন থেকে অযোগ্যতা শুরু হবে সে ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন।
সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলামের মতে, যদি কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান, তাহলে তাকে সে লক্ষ্যে আদালতের কাছে আবেদন করতে হবে এবং তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১(ক) ও ৪২৬ ধারার আওতায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া ও দণ্ডের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ পেতে হবে। কারণ আপিল করা হলেও দণ্ড বহাল থেকে যায় এবং আপিলকারী দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হিসেবে গণ্য হন। অনেক আইনজ্ঞের মতে, আমাদের সাংবিধানিক আকাঙক্ষা হলো, বিচারিক আদালতের দোষী সাব্যস্তদের দণ্ডপ্রাপ্তির সূচনা থেকেই সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য করা। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি সুষ্পষ্ট, জরুরি বিধিমালার অধীনে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কোনো অবস্থায়ই সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। জরুরি বিধিমালা প্রত্যাহার হলেও তাদের দণ্ড বহাল থাকবে। যদি তারা দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেন, তাহলে তাদের দণ্ড ও দোষী সাব্যস্ত হওয়া আপিল আদালত কর্তৃক বাতিল করা না হলে তারা সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। প্রচলিত আইনে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডিতদের ব্যাপারে একই শর্ত প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ আমাদের গণপ্রতিনিধ্ত্বি আদেশে নীরবতা এবং আদালতের রায়ের অস্পষ্টতা সত্ত্বেও দুই বছরের অধিক মেয়াদকালের জন্য দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীরা উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না- এজন্য আদালত কর্তৃক তাদের দণ্ডাদেশ ও দোষী সাব্যস্ত হওয়া স্থগিত হতে হবে। এ প্রসঙ্গে নৈতিকতার বিষয়টিও জড়িত। আমরা মনে করি, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেওয়ার আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি নৈতিকতার বিবেচনায় সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এমনকি দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের দুর্নাম রয়েছে এমন ব্যক্তিদেরও নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে বিরত রাখার আজ সময় এসেছে। আর আদালত কর্তৃক চার্জশিট গঠন করা হয়েছে এমন ব্যক্তিদের কোনোভাবেই মনোনয়নের জন্য বিবেচনায় আনা ঠিক হবে না। উল্লেখ্য, ভারতীয় নির্বাচন কমিশন তার ২০০৪ সালের ২২ দফা সংস্কার প্রস্তাবে গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আদালত কর্তৃক চার্জশিটভুক্ত হলেই নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করার পক্ষে সুপারিশ করেছে। জম্মু ও কাশ্মীরের ‘রিপ্রেজেনটেশন অব পিপল অ্যাক্টে’ এমনি একটি বিধানও রয়েছে।
লেখক : সম্পাদক, সুজন
সুশাসনের জন্য নাগরিক

তথ্য সূত্র: সমকাল, ১৭ নভেম্বর ২০০৮

Related Post

কেমন সংসদ পেলামকেমন সংসদ পেলাম

ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। অনেকেই আশা করেছিলেন, এই নির্বাচন থেকে আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগত

স্থানীয় সরকারের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ করণীয়স্থানীয় সরকারের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ করণীয়

ড. বদিউল আলম মজুমদার স্থানীয় সরকার হলো স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে স্থানীয় বিষয়সমূহের ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে গঠিত প্রতিষ্ঠান। উন্নয়ন, সুশাসন ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার গুরুত্ব্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের সংবিধানে

দুর্নীতি দমন: কথায় নয়, কাজে বড় হতে হবেদুর্নীতি দমন: কথায় নয়, কাজে বড় হতে হবে

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ১৬-০১-২০১০ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা’ গ্রহণকে ‘অগ্রাধিকারের পাঁচটি বিষয়’-এর মধ্যে দ্বিতীয়—দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধের পরই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার