২/২, ব্লক-এ, মিরপুর রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা
৮৮০ ২২ ২২২ ৪৩৯৫৬
shujan.info@gmail.com

সারাদেশে সুজন-এর অষ্টাদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

গত ১২ নভেম্বর ২০২০, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক এর অষ্টাদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। “দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন ও ধর্ষণ-নিপীড়নমুক্ত মানবিক সমাজ চাই; প্রিয় স্বদেশে অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী চেতনার বিকাশ এবং সুশাসন চাই” স্লোগানটিকে প্রতিপাদ্য করে সারাদেশের বিভিন্ন স্তরের কমিটি দিবসটি বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে উদযাপন পালন করে। আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল আলোচনা সভা, কেক কাটা, শোভাযাত্রা, মানববন্ধন ইত্যাদি। অনলাইনে একটি আলোচনা সভা আয়োজনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে দিবসটি উদযাপিত হয়।  

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সঞ্চালনায় এই আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি)-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান এবং বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান। সংগঠনটির সহ-সম্পাদক জনাব জাকির হোসেন, কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, নির্বাহী সদস্য বিচারপতি এম এ মতিন, ড. তাফায়েল আহমেদ,  জনাব আলী ইমাম মজুমদার, ড. শাহনাজ হুদা, প্রকৌশলী মুসবাহ আলীম, প্রফেসর সিকান্দর খান, জনাব ফারুক মাহমুদ চৌধুরী, জনাব সফিউদ্দিন আহমেদ; জাতীয় কমিটির সদস্য জনাব সঞ্জীব দ্রং ও একরাম হোসেন। এছাড়াও  ভোলা জেলা কমিটির সভাপতি মোবাশ্বির উল্লাহ, নেত্রকোনা জেলা কমিটির সভাপতি শ্যামলেন্দু পাল, জামালপুর জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক তারিকুল ফেরদৌস, গাজীপুর জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আমজাদ হোসেন, পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি আব্দুল মতিন খান, নরসিংদী জেলা কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী মোশারফ হোসেন, পিরোজপুর জেলা কমিটির সভাপতি মুনিরুজ্জামান নাসিম, রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফকরুল আনাম বেঞ্জু, গাজীপুর মহানগর কমিটির সভাপতি মনিরুল ইসলাম রাজীবসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকটিতে সুজন-এর ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি প্রতিপাদ্য বিষয়ের ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। প্রবন্ধের বক্তব্য  তুলে ধরা হলো।

একথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, একটি অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক-শোষণমুক্ত-আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদানসহ অনেক ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলেও, জন্মের প্রায় অর্ধশতক পরেও আমাদের সেই স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গিয়েছে। আমরা আমাদের সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণ চাই।

সুজন মনে করে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের। নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই দায়িত্ব তাঁদের ওপর বর্তায়। তাঁদের মাধ্যমেই দেশে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সুশাসন। কিন্তু আমাদের দেশে নেতিবাচক গুণগত পরিবর্তনের প্রভাবে সুস্থ ধারার-আদর্শভিত্তিক-জনকল্যাণমূখী রাজনীতি আজ প্রায় অনুপস্থিত। বর্তমানে অনেকাংশেই তা অপরাজনীতি ও দুবৃর্ত্তায়নের শিকার। আর এই দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির দাপটে সুস্থ ধারার-জনকল্যাণমূখী রাজনীতি এখন আর দৃশ্যমান নয়। পাশাপাশি এই দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির প্রভাবেই দুর্নীতি আজ সর্বগ্রাসী। বর্তমানে এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যা দুর্নীতিমুক্ত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি সূচক অনুযায়ী দীর্ঘকাল ধরেই আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের তালিকাভুক্তপাশাপাশি ধনী-দরীদ্রের বৈষম্যও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অপরদিকে আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, সারাদেশে ধর্ষণসহ নারী নির্যাতন ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের যেসকল খবর প্রচারিত ও প্রকাশিত হচ্ছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। নির্যাতনের শিকারদের মধ্যে একটি বড় অংশ শিশু – যা চরম উদ্বেগের। শুধুমাত্র মেয়ে শিশুরাই নয়, দীর্ঘদিন থেকে ছেলে শিশুদের বলৎকারের শিকার হওয়ার ভয়াবহ অভিযোগ রয়েছে একটি বিশেষ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে। ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ধর্ষক বা নির্যাতনকারীদের বড় অংশের সাথে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা এবং এই কারণে তাদের বিচারের আওতার বাইরে থাকার সুযোগ সৃষ্টি হওয়া। ক্রমবর্ধমান ধর্ষণ-নিপীড়ন-নির্যাতনের কারণ হিসেবে সমাজ গবেষকরা দায়ী করছেন প্রধানত বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে। আর এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি টিকে আছে অপরাধীদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা, সমাজের নীরবতা, যথাযথভাবে আইন প্রয়োগ না হওয়া ইত্যাদি কারণে।

কারণে। গুম-অপহরণ-খুনকে আমাদের সমাজের নিপীড়নের আর একটি ভয়াবহ চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা যায়। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আইনের শাসনের অনুপস্থিতির একটি বড় উদাহরণ; যা দীর্ঘদিন থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন সরকারের সময়ে চলমান রয়েছে। মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হচ্ছে গণমাধ্যম কর্মীসহ মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী অনেক মানুষ। বিষয়গুলি আমাদের সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। 

একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দলিল সংবিধানকে সাজিয়েছিলাম। বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র; এদেশে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ এখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করছে‘ –একথা বলে আমরা এক ধরনের সুখানুভতিতে আপ্লুত হই। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা আজ আর সেই অবস্থানে নেই। সংবিধানে একদিকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা কে রাখা হয়েছে; পাশাপাশি রাষ্ট্রধর্ম ও এখানে জায়গা করে নিয়েছে। মাঝে মাঝে গুজব ছড়ানোসহ বিভিন্ন অছিলায় আক্রমণের শিকার হন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। স্বার্থান্বেষী মহল সবসময় ওত পেতে থাকে তাদের জায়গা-জমি, ঘর-বাড়ি দখলের জন্য। পাহাড়ে বা সমতলের আদিবাসীরাও স্বস্তিতে নেই। ক্রমেই তারা হারাচ্ছে ভিটেমাটি;  প্রায়শই তাদের নারীরা শিকার হচ্ছে ধর্ষণ ও নির্যাতনের।  

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধানতম স্বপ্ন; যা একটি বহুত্ববাদী সমাজের মূল স্তম্ভ। শত ফুল ফোটার মধ্যেই প্রকাশিত হয় বহুত্ববাদী সমাজের সৌন্দর্য। বহুমত ও বহুপথের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সহায়ক পরিবেশই বহুত্ববাদী সমাজকে টিকিয়ে রাখে। আর এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মূল চাবিকাঠিই হচ্ছে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসরণ- যা আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

গণতন্ত্রের মূল কথা সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ”জনগণ বা মালিকরা তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করবে, তাও এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। জনগণ কর্তৃক প্রতিনিধি বাছাই করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে নির্বাচন। এই নির্বাচন প্রক্রিয়া যদি সঠিক না হয়, তবে একথা বলার সুযোগ থাকে না যে, মালিকরা তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সমুন্নত রাখতে হলে সঠিক নির্বাচন প্রক্রিয়া বা সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমরা সকলেই আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থার কথা জানি; যা প্রায় ধ্বংস হতে বসেছে।        

সুশাসনের মূল কথা আইনের শাসন; যার যা করণীয় তা যথাযথভাবে সম্পাদনসুশাসনের মূল উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম গণমূখী আইন প্রণয়ন ও এর প্রয়োগ; সর্বস্তরে গণতন্ত্র ও জনঅংশগ্রহণ; স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা; মানবাধিকার সংরক্ষণ (জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে); শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ; সম্পদের সুষম বন্টন; কাজের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা; সকল ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা; অবাধ তথ্য প্রবাহ; সচেতন জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ইত্যাদি। আমাদের জাতীয় জীবনে সবগুলো উপাদানেরই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনেকটা পথ আমাদেরকে পাড়ি দিতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের দেশের রাজনীতিকে যদি আমরা দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করে সুস্থ ধারার-আদর্শভিত্তিক-জনকল্যাণমূখী রাজনৈতিক চর্চার জায়গায় নিয়ে আসতে পারি; সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করে আমাদের সমাজের দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি; সমাজকে ধর্ষণ-নির্যাতন-নিপীড়নমুক্ত করতে পারি; সমাজে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারি এবং বহুত্ববাদী চেতনাকে ধারণ করে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ করতে পারি তবে আমাদের সমাজ এমনিতেই একটি মানবিক সমাজের রূপলাভ করবে। পাশাপাশি নিরন্তর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে সুশাসনের সকল প্রতিবন্ধকতাগুলো দুর করতে হবে। কিন্তু এই স্বপ্নপূরণ অবশ্যই কষ্টসাধ্য। সেজন্য লক্ষ লক্ষ সমমনা মানুষকে সুজন-এর পতাকাতলে সমবেত করে আমাদের শক্তি, সামর্থ ও আওয়াজকে জোরালো করতে হবে। এজন্য সুজন প্রণীত রাজনৈতিক সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের লক্ষে জোরালো রাজনৈতিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নিশ্চয়ই আমরা সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের প্রিয় মাতৃভমিকে আমাদের স্বপ্নের মত করে গড়ে তুলতে সক্ষম হবো – যে স্বপ্নে বিভোর হয়ে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা ছিনিয়ে এনেছি স্বাধীনতার লাল সূর্যটাকে।    

প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও ড. রওনক জাহান, বিচারপতি এম এ মতিন, ড. তোফায়েল আহমেদ, আলী ইমাম মজুমদার, ড. শাহনাজ হুদা, অধ্যাপক সিকান্দার খান, সঞ্জীব দ্রং, একরাম হোসেন, সফিউদ্দিন আহমেদসহ জেলা নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। অধ্যাপক রেহমান সোবহান তাঁর বক্তব্যে মানুষের অধিকার রক্ষাসহ চার মূলনীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন  বাস্তবায়ন এবং ড. রওনক জাহান অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি ঐতিহ্য রক্ষার উপরেও গুরুত্বারোপ করেন।