“সুশাসন ও উন্নয়ন: প্রেক্ষিত উপজেলা নির্বাচন” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত

rountable-11-febগত ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ ‘স্বশাসিত ইউনিয়ন পরিষদ এডভোকেসি গ্রুপ-বাংলাদেশ’ ও ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর যৌথ উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাব-এর ভিআইপি লাউঞ্জে একটি গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সুজন-এর সদস্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কাজী এবাদুল হক এর সঞ্চালনায় “সুশাসন ও উন্নয়ন: প্রেক্ষিত উপজেলা নির্বাচন” শীর্ষক এই গোলটেবিল আলোচনায় আরো উপস্থিত ছিলেন ‘সুজন’-এর সভাপতি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান ও এএসএম শাহজাহান, বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক, সুজন-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, ডেমোক্রেসী ওয়াচের প্রধান নির্বাহী জনাব তালেয়া রেহমান, রাজনীতিবিদ শেখ শহিদুল ইসলাম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, স্বশাসিত ইউনিয়ন পরিষদ এডভোকেসি গ্রুপের সভাপতি জনাব আবুল হোসেন খান ও সম্পাদক জনাব মতিউর রহমান তপন, নাগরিক উদ্যোগের পরিচালক জনাব জাকির হোসেন, দৈনিক দেশবাংলার সম্পাদক জনাব ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী প্রমুখ।

অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদ তাঁর বক্তব্যে বলেন সংবিধানে দ্বিধাহীনভাবে বলা রয়েছে – “আইন অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।” কিন্তু বাস্-বে এটা পাল্টে গেছে। তিনি বলেন মানুষের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণের কোন বিকল্প নেই। সকল পর্যায়ে কর্মের বিভাজন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায় থেকে দায়বদ্ধতার কাঠামো গড়ে তোলার জন্য ভারতবর্ষের মত ‘লোকাল গভমেন্ট ফাইন্যান্স কমিশন’ গঠন করা যেতে পারে। এছাড়া তিনি আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে তদবির চর্চার সংস্কৃতি পাল্টানো উচিত বলেও মন্-ব্য করেন।

বিচারপতি কাজী এবাদুল হক সকলের বক্তব্যের ওপর আলোকপাত করে বলেন, স্থানীয় সরকারগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। তারা জনপ্রতিনিধি হিসেবে থাকবে কারো আজ্ঞাবহ হিসেবে নয়। তাদেরকে জনগণের কাছে জবাবদিহি হতে হবে, অন্য কারো কাছে নয়। তিনি বলেন, নীতিগতভাবে খবরদারিত্বের ক্ষমতা এমপি আমলাদের নেই। জনাব এএসএম শাহজাহান বলেন, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছেন এটা গণতন্ত্রের জন্য ভালো, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথকেও সুগম করবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার অন্যান্য সংস্কার পদক্ষেপের অংশ হিসেবে অতি সত্ত্বর উপজেলা নির্বাচনের মত পদক্ষেপও গ্রহণ করার ঘোষণা দেবেন। জনাব হাফিজ উদ্দিন খান স্থানীয় সরকারের বর্তমান অকার্যকর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে দুঃখ প্রকাশ করেন। উপজেলা নির্বাচন বিষয়ে তিনি বলেন, আজকের গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনা ও সিদ্ধান্-সমূহ একটি কমিটি গঠন করে প্রধান উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

জনাব শাহদীন মালিক বলেন, উপজেলা নির্বাচনের বিষয়ে সংবিধান ও কোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সুপ্রীম কোর্ট কেন উপজেলা নির্বাচন করার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেবে না এই মর্মে ইতোমধ্যে একটি মামলাও হয়েছে। তিনি সুপ্রীম কোর্টের কথা উল্লেখ করে বলেন কোর্ট বলেছে তিন মাসের কথা, কিন্তু আমি মনে করি এ সময়ের মধ্যেই নির্বাচন করে ফেলা সম্ভব।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, উপজেলা নির্বাচন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক অঙ্গীকার রয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সর্বোপরি দেশের সর্বস্-রের জনগণের মাঝে এক্ষেত্রে একটি ব্যাপক ঐকমত্য বিরাজ করছে। তাই আমরা জাতীয় নির্বাচনের সাথে উপজেলা নির্বাচনের দাবি করছি। আমরা মনে করি যে, একই সময়ে না হলে, মাননীয় সংসদ সদস্যদের বিরোধীতার কারণে পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাচন আবারও না হতে পারে। এছাড়াও দু’টি নির্বাচন একত্রে সম্পাদন করা ব্যয়ের দিক থেকে সাশ্রয়ী হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোও এ ব্যাপারে আগ্রহী হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। তিনি সংবিধানের ৯, ১১, ৫৯ এবং ৬০ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেন, জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত জেলা পরিষদ, উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু আজ অবধি জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদের নির্বাচন না করে বিগত সরকারসমূহ সংবিধানের প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন করেছে।

জনাব আবুল হোসেন খান বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংস্কারের লক্ষ্যে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ-এর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন দলীয় সরকাররা ক্ষমতায় এসে তাদের প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যান। এ কারণেই স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন আদৌ সম্ভব হয় নি। তিনি বলেন, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে উপজেলা নির্বাচন দিয়ে একটি দৃষ্টান্- স্থাপন করবেন এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। জনাব মতিউর রহমান তপন বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের কাজের জবাবদিহিতা রয়েছে কিন্তু এই জবাবদিহিতা আমরা আরো বেশি করে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। ইউনিয়ন পরিষদের উন্মুক্ত বাজেট অধিবেশন, শতভাগ স্যানিটেশন ও জন্মনিবন্ধন নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন সফল উদ্যোগ বাস্-বায়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের দিকে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দৃষ্টি নিবন্ধ হওয়া আবশ্যক।

এছাড়া বিভিন্ন পর্বে উপরিউক্ত বিষয়ে মতামত প্রদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জনাব শরীফা খাতুন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোঃ শওকত হোসেন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব মোঃ জিয়াউল হক সরকার, আলহাজ্জ্ব মোঃ আব্দুল খালেক, আলহাজ্জ্ব মুনীর চৌধুরী শামীম, জনাব এস এম আবু জুবায়েদ হেলাল, জনাব সাজ্জাদ হোসেন মুকূল, জনাব আব্দুল্লাহ আল মামুন, জনাব মোঃ হাবিবুর রহমান বাদশা, জনাব মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া প্রমুখ। এ গোলটেবিল আলোচনায় উত্থাপিত ‘সুজন’ ও ‘স্বশাসিত ইউনিয়ন পরিষদ এডভোকেসি গ্রুপ-বাংলাদেশ’-এর প্রস্তাবসমূহের প্রতি উপস্থিত সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেন। এছাড়া একইসাথে জাতীয় সংসদ ও উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা; উপযুক্ত আইনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে আমলা ও এমপি’দের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা; স্থানীয় সরকারকে সম্পদ ও ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে শক্তিশালী ও কার্যকর করে তোলার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি জোর দাবিও জানানো হয়।

Advertisements