“উন্নয়ন, স্বশাসন ও স্থানীয় সরকার” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক

roundtable-10-aprilগত ১০ এপ্রিল, ২০০৭ সকাল ১০টায় ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাব-এর ভিআইপি লাউঞ্জে একটি গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ‘সুজন’-এর সভাপতি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদ-এর সভাপতিত্বে আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘সুজন’-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। ‘সুজন’-এর সহ-সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কাজী এবাদুল হক এর সঞ্চালনায় “উন্নয়ন, স্বশাসন ও স্থানীয় সরকার” শীর্ষক এই গোলটেবিল আলোচনায় আরো উপস্থিত ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান, সাবেক মন্ত্রী জনাব আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক মন্ত্রী শেখ শহিদুল ইসলাম ও জনাব আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সাবেক সচিব জনাব কাজী আজহারুল, সাবেক সংসদ সদস্য জি.এম কাদের, সাবেক সচিব জনাব মুসলেহউদ্দিন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের চেয়ারম্যান জনাব ম. হামিদ, ইউএনডিপি প্রতিনিধি জনাব দুরাফসান চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ, অধ্যাপিকা হান্নান আরা বেগম, বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক মূখ্য বার্তা সম্পাদক জনাব রফিকুল ইসলাম সরকার, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জনাব মেহের-ই-খোদা, স্বশাসিত ইউনিয়ন পরিষদ এডভোকেসি গ্রুপের সম্পাদক জনাব মতিউর রহমান তপন, নাগরিক উদ্যোগের পরিচালক জনাব জাকির হোসেন, এ্যডভোকেট মালেকা পারভীন প্রমুখ।

অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদ তাঁর বক্তব্যে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেন, সাংবিধানিক আকাঙক্ষা অনুযায়ী, শুধুমাত্র কিছু সীমিত সংখ্যক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাসমূহের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ নয়, বরং স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়ার কথা। তা সত্ত্বেও বর্তমানে আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে বিনষ্ট করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা কার্যকর ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার দেখতে চাই। স্থানীয় সরকার গণতান্ত্রিক দিক থেকে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে কাছের সরকার উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, স্থানীয় সরকারের মধ্য দিয়ে উন্নয়ন প্রক্রিয়া চললে জবাবদিহিতা, সুশাসন ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হবে। আর স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন গতি পেলে সারা দেশেরই উন্নয়ন হবে।

মূল প্রবন্ধে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কিছু আশু করণীয় রয়েছে, যার প্রথমটি হওয়া প্রয়োজন একটি যথাযথ আইনি কাঠামো তৈরি করা। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত আইন রয়েছে, যেগুলো মান্ধাতার আমলের ও যুগের অনুপযোগী। অধিকাংশক্ষেত্রে এগুলো সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও তিনি মন্-ব্য করেন। তাই পুরো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার জন্য জরুরিভিত্তিতে একটি সমন্বিত আইন করা প্রয়োজন বলে তিনি মূল প্রবন্ধে উপস্থাপন করেন। তিনি আরো বলেন, জাতিসংঘ প্রণীত স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত বিশ্ব চার্টারে (ডড়ৎষফ ঈযধৎঃবৎ ভড়ৎ খড়পধষ এড়াবৎহসবহঃ) বর্ণিত সাবসিডিয়ারীটি তত্ত্ব (ংঁনংরফরধৎরুঃ ঢ়ৎরহপরঢ়ষব) হওয়া উচিত প্রস্-াবিত আইনি কাঠামোর মূল ভিত্তি। এছাড়া তিনি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গ্রাম সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করে এর পরিবর্তে ‘গ্রাম সভা’ সৃষ্টি করা জরুরিভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন বলে তুলে ধরেন। মূল প্রবন্ধে তিনি স্থানীয় সরকার ও এর গুরুত্ব, গণতন্ত্র সুসংহতকরণে স্থানীয় সরকার, সুশাসনে স্থানীয় সরকার, উন্নয়নে স্থানীয় সরকার এর ভূমিকা বিশ্লেষণের পাশাপাশি সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও বর্তমান বাস্-বতা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে করণীয় দিকগুলোও গুরুত্ব সহকারে সকলের সামনে তুলে ধরেন।

বিচারপতি কাজী এবাদুল হক গোলটেবিল আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্-সমূহকে জনগণের প্রত্যাশা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন এগুলো সরকারের সামনে তুলে ধরার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরী করতে হলে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। জনাব হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা থেকে মাননীয় সংসদ সদস্যদের সম্পর্ক ছেদ করা জরুরি। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা এবং আইনের যথাযথ ও পরিপূর্ণ বাস্-বায়নের লক্ষ্যে সতর্কদৃষ্টি রাখা। স্থানীয় উন্নয়নের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর, যা নিশ্চিত করতে আইনের পরিবর্তন প্রয়োজন হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। জনাব আব্দুর রাজ্জাক বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা যত শক্তিশালী হবে তত জনগণের কাছে প্রশাসন যাবে এবং জনগণ সঠিক মতামত প্রকাশ ও একইসাথে নিজস্ব উদ্যোগে প্রশাসনকে গড়ে তোলার জন্যও ভূমিকা পালন করতে পারবে। জনাব শেখ শহিদুল ইসলাম বলেন, মাইক্রো লেভেল প্ল্যানিং স্থানীয় সরকার থেকে আসতে হবে। তিনি আরো বলেন, বিকেন্দ্রীকরণের সাথে সাথে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথও তাহলে সুগম হবে। ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতা দিতে হবে উল্লেখ করে বলেন, কেন্দ্রীকতা কখনোই একটি দেশের মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। জনাব দুরাফসান চৌধুরী মূল প্রবন্ধে উপস্থাপিত করণীয় বিষয়সমূহের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেন, গত ৩০ বছরে কেন্দ্রীয় সরকারকে অনেক বেশি, কোন কোন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শক্তিশালী করা হয়েছে। তিনি বলেন বর্তমানে সময় এসেছে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার। অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বর্তমান সরকারের প্রতি আহবান রেখে বলেন, গ্রাম সরকার ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে। একইসাথে তিনি উপজেলা পরিষদ পুনর্বহাল করারও দাবি জানান।

এছাড়া গোলটেবিল আলোচনায় উত্থাপিত ‘সুজন’-এর করণীয় বিষয়সমূহের প্রতি উপস্থিত সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেন।

Advertisements