“সংস্কার প্রস্তাব : বর্তমান ভাবনা” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা

roundtable-22-aprilগত ২২ এপ্রিল, ২০০৭ সকাল ১০ টায় ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাব-এর ভিআইপি লাউঞ্জে একটি গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। “সংস্কার প্রস্তাব : বর্তমান ভাবনা” শীর্ষক এই গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন’-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এম হাফিজ উদ্দিন খান-এর সঞ্চালনায় এ আলোচনায় আরো উপস্থিত ছিলেন, ‘সুজন’-এর সহ-সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এ.এস.এম শাহজাহান, সাবেক মন্ত্রী জনাব আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক সংসদ সদস্য জি.এম কাদের, প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ব্যারিষ্টার হারুনর রশীদ, এয়ার ভাইস মার্শাল জনাব এ.জি মাহমুদ, বিশিষ্ট কলামিস্ট এ, জেড, এম আবদুল আলী, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ জনাব এম.এম মুহিত, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জনাব হামিদুল হোসেন তারেক বীরবিক্রম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের চেয়ারম্যান জনাব ম. হামিদ, সাবেক অতিরিক্ত সচিব জনাব বদরে আলম খান, ব্রতী’র নির্বাহী পরিচালক জনাব শারমিন মুর্শিদ, বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক মূখ্য বার্তা সম্পাদক জনাব রফিকুল ইসলাম সরকার, প্রফেসর মোঃ আসাদুজ্জামান, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জনাব মেহের-ই-খোদা প্রমুখ।

বিচারপতি কাজী এবাদুল হক তার বক্তব্যে সংবিধানের আলোকে ব্যাখ্যা টেনে বলেন, রাজনৈতিক দলের কোন ফ্রন্ট অর্গানাইজেশন থাকা উচিত নয়। এগুলো হবে প্রফেশনাল অর্গানাইজেশন। তিনি বলেন, এটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের অন্যতম শর্ত হওয়া প্রয়োজন। তাহলে দৌরাত্ম, দুরাচার, চাঁদাবাজির মত ভয়াবহ বিষয়গুলি থেকে আমরা রক্ষা পাবো এবং দেশের জন্য তা মঙ্গলকর হবে বলে তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন। জনাব এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচিত করার জন্য যে সকল সংস্কার হওয়া প্রয়োজন তা যত দ্রুত সম্ভব করা প্রয়োজন। আর এ কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘সুজন’ নির্বাচন কমিশনের খসড়া সংস্কার প্রস্তাবের মূল্যায়ন করছে। আমরা চাই আজকের আলোচনার মধ্য দিয়ে যে দিকগুলো উঠে এসেছে তা নির্বাচন কমিশনের কাছে সুপারিশ হিসেবে পৌঁছে দিতে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবের আলোকে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, প্রার্থীদের যোগ্যতা/অযোগ্যতার মানদণ্ড, প্রার্থীদের তথ্য প্রদান, কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি ও নির্বাচনী বিরোধ নিস্পত্তি এই পাঁচভাগে বিভক্ত করে তার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ হিসেবে কমিশনের মানসিকতা হওয়া উচিত সহায়কের, নিয়ন্ত্রকের নয়। প্রতি দু’বছর পর নিবন্ধন নবায়ন করা, নির্বাচন কমিশনকে নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতা প্রদান করা, নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ, মনোনয়ন বাণিজ্য রোধের লক্ষ্যে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় দলের প্রাথমিক সদস্যদের পদ্ধতিগত ভূমিকা প্রদান (যেমন, দলীয় প্রাইমারী) নিবন্ধনের আরেকটি শর্ত হিসেবে কমিশনের প্রস্তাবে অন্-র্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি এ অংশে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। প্রার্থীদের যোগ্যতা/অযোগ্যতা প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, মেয়রদের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করার আমরা পক্ষে। আমরা সংসদ নির্বাচনে কোন প্রার্থীর একাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিপক্ষে, যদিও এজন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, যেহেতু এ মুহুর্তে সংবিধান সংশোধন সম্ভব নয়, তাই আমরা যে কোন প্রার্থীর প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করার অধিকার তিনটি আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কমিশনের প্রস্তাবের সাথে একমত। প্রার্থীদের তথ্য প্রদান প্রসঙ্গে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত তথা সজ্জনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিস্তারিত তথ্য কমিশনে জমা দেয়ার এবং কমিশনের পক্ষ থেকে এ সকল তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করার প্রস্তাব রেখে তিনি আরো বলেন, আমরা আশা করি যে – নির্বাচন কমিশন ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে এবং তথ্য প্রকাশ ও যাচাই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরো এগ্রেসিভ ভূমিকা নেবেন। কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘ইলেকশনস মিসকনডাক্ট ও ডিসকোয়ালিফিকেশন কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব ইতোমধ্যে আমরা দিয়েছি বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া তিনি তাঁর মূল প্রবন্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদেরকে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী মনোনয়নপত্রের সাথে এফিডেভিটে দাখিলকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি খরচে পোস্টার ছাপানো এবং রিটার্নিং অফিসারের উদ্যোগে প্রজেকশন মিটিং আয়োজন করা, ভোট কেনা-বেচার ব্যাপারে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই শাস্তির বিধান রাখা, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রিকল বা প্রত্যাহার করার বিধানসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় সংস্কার প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন বলে প্রস্তাব রাখেন।

জনাব এ.এস.এম শাহজাহান তাঁর বক্তব্যে দায়িত্ব, জবাবদিহিতা এবং মনিটরিং-এর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলে এক অবস্থা না থাকলে আরেক অবস্থা যাতে সৃষ্টি না হয় সে জন্য রক্ষাকবচ থাকা দরকার হবে। ব্যারিষ্টার হারুনর রশীদ সংবিধানের ১১৮ (৪) অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও এর আর্থিক ক্ষমতা প্রদানের জোর দাবি জানান। এ, জেড, এম আবদুল আলী বলেন, কমিশনকে স্বাধীন এবং প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কেননা এটি না হলে সকল সংস্কার প্রস্তাবই ব্যর্থ হয়ে যাবে। জনাব এম.এম মুহিত তাঁর বক্তব্যে বলেন, সংস্কার প্রস্তাব প্রণয়নের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের এত সময় লাগলো কেন। তিনি এটাকে সন্দেহজনক এবং নির্বাচনকে পিছিয়ে দেওয়ার একটি ব্যবস্থা হিসেবেও বক্তব্যে সমালোচনা করেন। ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা ও বিদেশী সাহায্যপুষ্ট এনজিও কর্মকর্তাদের অবসর গ্রহণের তিন বছর অপেক্ষা করার এবং দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে তিন বছর দলের সদস্য থাকার বিধান ভালো হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সামরিক কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অভিলাষ থাকা ভালো হবে না, তাহলে তা দেশের জন্য সর্বনাশ বয়ে আনবে। জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ ২০০৮ সালের এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার আহবান রেখে বলেন, আমরা স্বল্প সময়ে নির্বাচন চাই। অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ও কালোটাকার প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের জন্য সংস্কার প্রস্তাবসমূহের নববই ভাগ এক দিনের মধ্যেই বাস্-বায়ন করা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া গোলটেবিল আলোচনায় উত্থাপিত ‘সুজন’-এর প্রস্তাবিত বিষয়সমূহের সাথে উপস্থিত সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেন।

Advertisements