সংলাপ ।। সমঝোতা ও কাঙিক্ষত পরিবর্তন

ড. বদিউল আলম মজুমদার

বিখ্যাত বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন বলেছিলেন: It is not the strongest species that survived, nor the most intelligent, but the ones most responsive to change.

(প্রাণীকূলে সবচেয়ে শক্তিশালী কিংবা সবচেয়ে বুদ্ধিমানরা টিকে থাকেনি, বরং পরিবর্তনের সঙ্গে যারা খাপ খাওয়াতে পেরেছে তারাই টিকে রয়েছে।) ডারউইনের বিবর্তনবাদের সাথে দ্বিমত করলেও, ইতিহাসের শিৰার ভিত্তিতে অনেকেই এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত হবেন। শক্তিমান ডাইনোসর টিকে থাকে নি, তেমনিভাবে অনেক বুদ্ধিমান প্রাণীও বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।

পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর কিংবা পরিবর্তনের অগ্রদূত হওয়ার ওপর যে টিকে থাকা নির্ভর করে, তা শুধু প্রাণীকূলের জন্যই সত্য নয়, এটি রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশে মুসলিম লীগের বিলুপ্তি এবং এক কালের পরাক্রমশালী ভারতীয় কংগ্রেসের অস্তিত্বের লড়াইয়ের দিকে তাকালে এর সত্যতা অনেকাংশে অনুভব করা যায়। এমনকি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে যে সকল দেশ জ্ঞান-বিজ্ঞানকে পুঁজি করে অগ্রসর হয়েছে এবং অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটিয়েছে, তারাই পরবর্তীতে পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে কিংবা হচ্ছে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ আজ এক যুগসন্ধিক্ষণে। স্বাধীনতা অর্জনের ৩৭ বছর পরেও আমরা এখনও ক্ষুধা-দারিদ্র্যে জর্জরিত ও সমতা-ন্যায়পরায়ণতা বিবর্জিত জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিত। অধিকাংশ অর্থনৈতিক সূচকের দিক থেকে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৭১ সালে সমপর্যায়ে থাকলেও, গত তিন যুগে আমাদের মাথাপিছু আয় ১০০ ডলার থেকে বেড়েছে প্রায় পাঁচগুণ আর কোরিয়ানদের বেড়েছে ১০০ গুণেরও বেশি; যদিও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের চেতনায় যে বিস্ফোরণ ঘটেছিল তাতে কোন বাধাই আমাদের জন্য অনতিক্রম্য ছিল না, কোন অর্জনই ছিল না অসম্ভব। অথচ আমরা আমাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়িত করতেই শুধু ব্যর্থ হইনি, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উধর্বগতি, উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অতীতের অনেক ভ্রান্তনীতির কারণে আমাদের অর্থনীতি আজ চরমভাবে বিপর্যস্ত। সামাজিকভাবে আমরা এক উদীয়মান উগ্রবাদী শক্তির আজ মুখোমুখি। আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ চরমভাবে বিপন্ন, যা আমাদের অস্তিত্বের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাসহ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পঙ্গুপ্রায়। আমাদের রাজনীতি এখন ভয়ানকভাবে স্বার্থপরতা, শিষ্টাচারশূন্যতা ও দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের কবলগ্রস্ত। তাই জাতি হিসেবে বর্তমানে আমরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে। আজকে আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আমরা কোন দিকে যাব – সমঝোতা, সমাধান ও নিয়মতান্ত্রিকতার দিকে, না বিশৃঙখলা, হানাহানি ও জোর-যার-মুল্লক-তার এমন পরিস্থিতির দিকে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শেষোক্ত বিকল্পটি আমাদেরকে উগ্রবাদ, এমনকি একটি সম্পূর্ণ অকার্যকর ব্যবস্থার দিকে ধাবিত করতে পারে। সনাতন পদ্ধতি এবং আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমেই আমরা কাঙিক্ষত পথে অগ্রসর হতে পারবো।

যে দুরূহ সমস্যাগুলোর আজ আমরা মুখোমুখি, তার থেকে উত্তোরণ ঘটাতে হলে আমাদের রাজনীতিকে ঠিক করা, অর্থাৎ জনকল্যাণমুখী করা, আজ সর্বাধিক জরুরি, কারণ আমাদের রাজনীতিবিদদেরকেই কাঙিক্ষত পরিবর্তনের রূপকার হতে হবে। বর্তমান সরকার যেমন অনেকগুলো অত্যন্ত প্রশংসনীয় কাজ করেছে, তেমনিভাবে তাদের অনেকগুলো পদক্ষেপ দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। আমাদের রাজনীতিবিদরাও দেশকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়া থেকে শুরু করে আরো অসংখ্য ভাল কাজ করেছেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদের অনেকেই অতীতে সামন্তবাদী মানসিকতার উধের্ব উঠতে পারেন নি এবং সমষ্টির কল্যাণের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তি ও গোষ্ঠির কল্যাণেই নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছেন। ফলে আমাদের রাজনীতি হয়ে পড়ছে চরমভাবে কলুষিত ও দুর্বৃত্তদের আখড়ায়, যার পরিবর্তন আজ জরুরি। কেননা রাজনীতিবিদদেরকেই, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের চালকের আসনে বসতে হবে এবং জাতিকে সমস্যার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে হবে। আর সমস্যার সমাধান করতে হবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় – রাজনীতিবিদদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে, জাতীয় সংসদকে কেন্দ্রবিন্দু করে এবং জনগণকে আস্থায় নিয়ে। এ কথা বলার েক্ষা রাখে না যে, অনির্বাচিত সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে সমস্যা আরো জটিল আকারই ধারণ করবে। তাই অনির্বাচিত সরকার যেমন কাম্য নয়, তেমনি কাম্য নয় রাজনৈতিক হানাহানি যা ১১ জানুয়ারি ২০০৭ -এর পরিবর্তনের জন্য দায়ী।

বর্তমান সংলাপ – দুভাগ্যবশত যা নিয়ে ইতোমধ্যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে – আমাদের রাজনীতিকে জনকল্যাণমুখী করার পথে অনেকগুলো বাধা দূরীকরণের লক্ষ্যে ংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমঝোতা অর্জনের অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। আরো সুযোগ করে দিয়েছে অনেকগুলো জটিল সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করার। এ সুযোগের সদ্ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করবে জাতি হিসেবে আমরা কোন দিকে যাব। সমঝোতা ও সমাধানের জন্য অবশ্য প্রয়োজন হবে সংশ্লিষ্ট সকলের ক্ষুদ্র স্বার্থের উধের্ব ওঠা। প্রয়োজন হবে দলীয় নেতৃত্বের দলীয় স্বার্থের বাইরে এসে নাগরিকের – মালিকের – স্বার্থ সমুন্নত করার জন্য বদ্ধপরিকর হওয়া। আরো প্রয়োজন হবে, নির্দলীয় সরকারের প্রতিনিধিদের প্রশ্নাতীতভাবে নিরপেক্ষতা প্রদর্শন। আমাদের রাজনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তনের আকাঙক্ষা নাগরিকরা পোষণ করেন, সংলাপকালেই তা প্রদর্শিত হতে হবে। আর তাহলেই সংলাপ সফল হবে। সংলাপ সফল না হলে আমরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হব – অতীতের সংলাপের ব্যর্থতার মাশুল জাতিকে আজও গুনতে হচ্ছে।

আমরা আশা করি এবং বিশ্বাস করতে চাই যে, রাজনীতিতে বিরাজমান জটিলতার জট খুলতে শুরু করেছে এবং রোডম্যাপ অনুযায়ী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমরা আরো আশা করি যে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মত পরিবর্তন করবে এবং সংলাপে অংশ নেবে। আর সংলাপের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কতগুলো বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো, যাতে: (১) নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অর্থবহ হয়; (২) গণতন্ত্র ‘পূর্ণাঙ্গ’ ও কার্যকর হয়; (৩) সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়; এবং (৪) রাজনীতিতে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও আইনশৃঙক্ষলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের উধর্বগতি রোধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের সুরাহাও সংলাপের উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এসকল বিষয়ে কে কী করবে সে সম্পর্কে একটি ‘জাতীয় সনদ’ না হলেও, অন্তত একটি ‘যুক্ত ঘোষণা’য় স্বাক্ষর করা হবে সংলাপের স্বার্থক পরিণতি। ১৯৯০ সালের তিনজোটের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত রূপরেখাকে যুক্ত ঘোষণার প্রারম্ভিক খসড়া হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। আর সংশ্লিষ্ট সকলের স্বাক্ষরিত যুক্ত ঘোষণাকে পরীবিক্ষণের জন্য দেশের সর্বাধিক সম্মানিত নাগরিকদেরকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করার কথাও ভাবা যেতে পারে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দাবি-দাওয়া নিয়ে দর কষাকষি এবং বিভিন্ন ধরনের শর্তারোপ সংলাপকে ব্যর্থতার দিকেই ঠেলে দেবে, যার পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য।

সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচন: সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারের দক্ষতা ও আন্তরিকতার প্রয়োজন সর্বাধিক, যা তারা প্রদর্শন করবে বলে আমরা আশা করি। তাদেরকে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি কঠোর এবং নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করতে হবে। পাতানো ও পক্ষপাতদুষ্ট-নির্বাচন কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তা আমাদের জন্য বিপর্যয়ই ডেকে আনবে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর সদাচারণ ও সহায়তা ব্যতীত সুষ্ঠু নির্বাচন কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাই নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত আচরণবিধিমালাকে সমর্থন প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের পালনের জন্য কঠোর নির্দেশনা দিতে পারে, যেমনটি তারা করেছিল ১৯৯০ সালের তিন জোটের যুক্ত ঘোষণার মাধ্যমে। নির্বাচনকে অর্থবহ অর্থাৎ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগতমানের পরিবর্তন আনার জন্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া, প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা, মনোনয়ন, তথ্য প্রদান ইত্যাদি সম্পর্কিত নির্বাচন কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও তাদের প্রাথমিক সদস্যদেরকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রদানের মাধ্যমে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার, মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধ করার এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত এবং কালো টাকা ও পেশিশক্তির মালিকদের মনোনয়ন না দেয়ার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হবে। একইসাথে তাদেরকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করার এবং মনোনয়নের মানদণ্ড নির্বাচন ও তা প্রয়োগের তথ্য প্রকাশের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথাও ব্যক্ত করতে হবে। নির্বাচনকে অর্থবহ করার জন্য নির্বাচনী ব্যয় হ্রাস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত নির্বাচনী ব্যয় ১৫ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়াও নির্বাচনী ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে কমিশনের উদ্যোগে প্রজেকশন মিটিং-এর আয়োজন ও কমন পোস্টার ছাপনো গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করি। রাজনৈতিক দলগুলোও যে ভোট কেনাবেচা থেকে বিরত থাকবে এবং নির্বাচনী ব্যয় হ্রাসের লক্ষ্যে কী কার্যকর পদক্ষেপ নেবে তা সংলাপের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে হবে।

পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র: আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, “প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র,” আর এর পূর্বশর্ত হলো জাতীয় ও স্থানীয় সকল পর্যায়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠান – যেমন, জাতীয় সংসদ, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ইত্যাদি। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের নির্দেশনা অগ্রাহ্য করে এতদিন আমরা মূলত সংসদকেন্দ্রিক ‘আংশিক’ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার চর্চা করে আসছিলাম। ভবিষ্যতে কার্যকর জাতীয় সংসদের সাথে সাথে সকল স্তরে কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে তাও আজ রাজনৈতিক দলগুলোকে সুস্পষ্ট করতে হবে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সর্বস্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ‘পূর্ণাঙ্গ’ গণতান্ত্রিক পদ্ধতির চর্চা করলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্ভবত ভিন্ন হতো এবং ১১ জানুয়ারি, ২০০৭-এর ঘটনাবলী এড়ানো যেত।

সুশাসন: সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের সূচনা হয়। কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নির্ভর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর এবং রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চার ওপর। সুশাসন মানে আইনের শাসন, মানবাধিকার সংরক্ষণ, সমতা, ন্যায়পরায়ণতা, সকল স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ইত্যাদি। এছাড়াও সুশাসনের পূর্বশর্ত হলো সকল স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্বশাসন, শাসন প্রক্রিয়ায় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতা ও সম্পদের বিকেন্দ্রিকরণ। এ সকল ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দলগুলোকে ভবিষ্যত পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে।

রাজনীতিতে নৈতিকতা: রাজনীতিতে, এমনকি কোন ক্ষেত্রেই অনৈতিকতার পরিণাম মঙ্গলজনক হয় না। ইতিহাসের শিক্ষা হলো যে, অনৈতিকতার পরিণাম অশুভ। ১৯৯৫ সালের মাগুরার উপনির্বাচনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার একটি উদ্ভট পদ্ধতির আবিষ্কার না করে যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার এবং নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হতো, তাহলে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আজ হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করতো! তাই এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো, বিশেষত রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের বিধান বাস্তবায়নের জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সামন্তবাদী মানসিকতার উধের্ব উঠে গণতান্ত্রিক, আর্থিকভাবে স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ, দলবাজি-ফায়দাবাজিমুক্ত রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সংলাপের মাধ্যমে সে পরিকল্পনা জনগণকে জানাতে হবে। সংশ্লিষ্ট আইনগুলোকে কঠোর করা এবং এগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছার ওপরই বহুলাংশে নির্ভর করবে রাজনীতিতে নৈতিকতা চর্চার নিশ্চয়তা। এ লক্ষ্যে সংসদকে কার্যকর করা এবং সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সরকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে তার সুস্পষ্ট ঘোষণাও রাজনীতিবিদদেরকে দিতে হবে। রাজনীতিতে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন হবে যাদের বিরুদ্ধে অনৈতিকতা ও অন্যায় আচরণের অভিযোগ উঠেছে তাদের ন্যায় ও স্বচ্ছ বিচারের ব্যবস্থা করা। কারণ কেউই আইনের উধের্ব নয় – এটি হলো আইনের শাসনের মূল কথা। তাই অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং এ ব্যাপারে সরকারের সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে। রাজনীতিবিদদেরকেও ভবিষ্যতে অনৈতিকতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করতে হবে।

শেখ হাসিনার প্যারোলে মুক্তিকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনের নাটকীয় ঘটনা থেকে মনে হচ্ছে যে, সরকারের সাথে আওয়ামী লীগের একটি সমঝোতা হয়েছে এবং আওয়ামী লীগ সংলাপ ও নির্বাচনমুখী হবে। আমরা আশা করি যে, সমঝোতার শর্তগুলি নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং জনস্বার্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। আমরা আরো আশা করি যে, বিএনপিও সংলাপে যোগ দেবে এবং নির্বাচনে অংশ নেবে। কারণ বেগম খালেদা জিয়াকে সে বিখ্যাত উক্তি – ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’ – তা প্রমাণ করার সুযোগ এসেছে। বস্তুত শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দায়িত্বশীল আচরণ করলেই আমরা বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হতে পারবো। একইসাথে সরকারকেও প্রজ্ঞা ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।

[লেখক: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের  জন্য নাগরিক ]
তথ্য সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ১২ জুন ২০০৮

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s