রাজনীতিতে চলমান অনৈতিকতার পরিণতি অশুভ হতে বাধ্য

বদিউল আলম মজুমদার

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী অনেক ‘বিতর্কিত’ ব্যক্তি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, চোরাচালান, দখলদারি এমনকি হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ গত দেড় বছরে এবং এর আগে জেল খেটেছেন কিংবা পলাতক ছিলেন। অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও রয়েছে। দ্বিধাদ্বন্দ্বহীনভাবে নির্বাচনে শুধু প্রার্থীই হননি, বীরদর্পে তাঁরা প্রচার-প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছেন। বলে বেড়াচ্ছেন যে তাঁরা নিতান্তই অপপ্রচার, মিথ্যা মামলা ও হয়রানির শিকার। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, গত দেড় বছরে যেন কিছুই ঘটেনি−১১ জানুয়ারি ২০০৭ তারিখের এবং পরবর্তী দেড় বছরের ঘটনাগুলো একটি ‘দুঃস্বপ্ন’ মাত্র!

প্রায় দেড় বছর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ এবং পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগে ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ যখন সে দায়িত্ব ত্যাগে বাধ্য হন, তখন অনেক নাগরিকেরই আকাঙ্ক্ষা ছিল, আমাদের রাজনীতিতে নৈতিকতা ফিরে আসবে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা হবে। অসৎ ও অযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে−যাঁরা বাংলাদেশকে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিলেন−লজ্জাবোধ জাগ্রত হবে, তাঁরা অনুশোচনা করবেন। তাঁরা রাজনীতি থেকে বিদায় নেবেন অথবা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অযোগ্য হবেন। রাজনৈতিক দলগুলোও দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে একটি শুদ্ধি অভিযান চালাবে এবং দুর্বৃত্তদের মনোনয়ন প্রদান থেকে বিরত থাকবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, আমাদের রাজনীতির গুণগত কোনো পরিবর্তন তো হয়ইনি, বরং রাজনীতিবিদের খোলস পরা দুর্বৃত্তদের অতীতের গর্হিত সব কার্যক্রম ও আচরণ যেন অনেকের কাছে ‘গ্রহণযোগ্যতা’ পেতে শুরু করেছে। কোনো ‘ভুল’ বা অন্যায়ই যেন তাঁরা করেননি এবং অনেকে যেন অতীতের ‘স্বর্ণযুগের’ এসব নেতা নেত্রীদের পুষ্পমাল্য দিয়ে বরণ করে নিতেও প্রস্তুত! কেন এমন হলো? কারা এর জন্য দায়ী?

আমার মনে হয়, বর্তমান অবস্থার জন্য কেউই এককভাবে দায়ী নন, এতে অনেকেরই ভূমিকা রয়েছে। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং তার সহযোগীদের কিছু অনৈতিক কার্যক্রম এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবর্তনের বিপক্ষে অনমনীয় অবস্থান এবং পদে পদে বাধা প্রদান বর্তমান অবস্থার জন্য বহুলাংশে দায়ী। আমাদের সচেতন নাগরিক সমাজের নিস্ক্রিয়ত এবং অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতাও এ ব্যাপারে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বিশ্ব পরিস্থিতিরও অনেকটা শিকার।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে গত দেড় বছরে বাংলাদেশ অনেকগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পতিত হয়েছে। উপর্যুপরি বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় সিডরের তাণ্ডব এবং এসব দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে প্রশাসনিক অদক্ষতা সরকারের জনপ্রিয়তার ওপর ছিল প্রথম ধাক্কা। এরপর দ্রব্যমূল্যের বিরামহীন ঊর্ধ্বগতি, বিশেষত খাদ্যদ্রব্যের আকাশচুম্বী মূল্য এবং সরকারের আগাম প্রস্তুতি গ্রহণে অপারগতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। দলবাজ ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের স্বার্থপ্রণোদিত আচরণ মুদ্রাস্কীতি সমস্যাকে লাগামহীন পর্যায়ে নিয়ে যায়। বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের সরবরাহের ঘাটতি এবং জ্বালানির দামে উল্লম্ফনের ব্যাপারে সরকারের অবশ্য তেমন কিছুই করার ছিল না। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাজার পরিস্থিতি সরকারের জনসমর্থন এবং বলিষ্ঠ উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস করেছে।

অন্যায়ের বিহিত করার লক্ষ্য নিয়ে ক্ষমতায় এলেও কিছু বিতর্কিত কার্যক্রম সরকারের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে এবং মানুষের মনে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোতে হস্তক্ষেপের চেষ্টা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রার্থীর আগাম তালিকা তৈরির যে অভিযোগ উঠেছে তাতে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে। অভিযুক্ত দুর্নীতিবাজদের গ্রেপ্তারে কোন কোন ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব এবং অভিযুক্তদের কাউকে কাউকে মুক্তি দেওয়ার উদ্যোগের কথা শোনা যাওয়ায় এ সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।

দেড় বছর আগে কতগুলো সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের যে সম্ভাবনার দ্বার উন্নোচিত হয়েছিল, তা সংকুচিত হওয়ার সর্বাধিক বড় কারণ হলো আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতা ও নৈতিকতাবিবর্জিত আচরণ। গত তিন সরকারের আমলে যাঁদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারসহ ব্যাপক দুর্নীতি ও দুবৃর্ত্তাযনের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের অনেকেই ১১ জানুয়ারির পরও রয়ে গেছেন দলের নীতিনির্ধারক হিসেবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতীতে গুরুতর অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন করে পদায়ন করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এসব ব্যক্তি পরিবর্তনের বিপক্ষে এবং তাঁরা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন, যদিও প্রথম দিকে অনেকটা কৌশলের সঙ্গে। তাঁরা নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের সংস্কার উদ্যোগগুলোকেও বিভিন্ন অপপ্রচারের মাধ্যমে বিতর্কিত করে তোলেন। কারণ, যে পদ্ধতি তাঁদের যা ইচ্ছা তা-ই করার ক্ষমতা দিয়েছে, তার পরিবর্তন তাঁদের স্বার্থের অনুকূলে নয়। শুধু ‘বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা’র সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই নয়, তাঁরা পরিকল্পিতভাবে প্রতি পদে সরকারের সব ভালো-মন্দ উদ্যোগকে বাধা দিয়েছেন। এ কাজ করা সম্ভবপর হয়েছে, কারণ তাঁদের অনেকেই অন্যায়ভাবে অর্জিত টাকার পাহাড়ের ওপর বসে রয়েছেন এবং চারদিকে বহু বিবেক-প্রতিবন্ধী সহযোগী তাঁদের সঙ্গে সুর মেলাতে বিনা দ্বিধায় এগিয়ে এসেছেন।

সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রবল আপত্তি তাঁদের অযৌক্তিক বিরোধিতার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রতি আদমশুমারির পর নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এ ব্যাপারে আইনি বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। তা সত্ত্বেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অনৈতিকভাবে জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার ধুয়া তুলে এর ঘোরতর বিরোধিতা করতে থাকে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগের বিরোধিতা, এমনকি প্রতিরোধ করার ঘোষণা রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে নির্বাচন কমিশনের সব কার্যক্রমকে বিতর্কিত করার আরেকটি দৃষ্টান্ত। অতীতের সরকারগুলো সংবিধান লঙ্ঘন, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য, এমনকি নিজেদের নির্বাচনী ওয়াদা ভঙ্গ করে সংসদ সদস্যদের অযাচিত চাপে স্থানীয় সরকারের সকল স্তরের নির্বাচন সম্পাদন করেনি। এ কারণেই এবং অনেকগুলো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ফলেই বর্তমানে স্থানীয় নির্বাচন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শাসনামলে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব হয়নি বলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সৃষ্টি, তাই বর্তমান সরকারের আমলে সব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াই কাম্য। আমরা আনন্দিত যে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনের বিরোধিতা করে দায়ের করা একটি রিট আবেদন সম্প্রতি খারিজ করে দিয়েছেন। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ‘কিংস পার্টি’ বা এধরণের কিছু গঠনের কোনো নীলনকশা যাতে কেউ বাস্তবায়িত করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে দৃষ্টি রাখতে হবে। বস্তুত আগত চারটি সিটি করপোরেশন এবং নয়টি পৌরসভা নির্বাচন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রদর্শনের জন্য অগ্নিপরীক্ষা−এ পরীক্ষায় তাদের প্রশ্নাতীতভাবে উত্তীর্ণ হতে হবে।

লক্ষণীয়, বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের ব্যাপারে অত্যন্ত সোচ্চার। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরাও জরুরি অবস্থার প্রত্যাহার চাই। কারণ, আমরাও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকতে চাই না। তবে এ দাবির পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে। তারা মূলত চায় জরুরি বিধিমালার ১১(৫) ধারার বিলুপ্তি, যা জরুরি বিধিমালার অধীনে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের আপিল করা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য করবে। দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে শঙ্কাজনক। ভবিষ্যতে দুর্বৃত্তদের মনোনয়ন প্রদানে রাজনৈতিক দলগুলো যে সামান্যতম কুণ্ঠা বোধ করবে না, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় বর্তমান নির্বাচন থেকে। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কিছু ব্যক্তিকে ১৪ দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দিয়ে তাঁরা একটি বড় ধরনের নৈতিকতাবিবর্জিত কাজ করেছেন বলে আমাদের ধারণা। উল্লেখ্য, নির্বাচনী আচরণবিধির ৩ ধারা অনুযায়ী, ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচন রাজনৈতিক দলভিত্তিক হইবে না’ এবং দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন ঘোষণা করে তাঁরা এ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলো আবারও তাদের ‘ক্ষমতা’ প্রদর্শন করল প্রচলিত বিধিবিধান ভঙ্গ করে!

নাগরিক সমাজের দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে এবং সংস্কারের পক্ষে নৈতিক অবস্থান গ্রহণে ব্যর্থতাও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অনেকটা দায়ী। সাধারণত সমাজের সচেতন নাগরিকেরাই বিবেকের তাড়নায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। বরং অনেকেই যেন ‘বিরোধী দলীয় নেতা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন এবং সরকারের ভালো-মন্দ সব কার্যক্রমের বিরোধিতা করছেন। এর অন্যতম কারণ সমাজের সর্বক্ষেত্রে দলবাজি ও ফায়দাবাজির বিস্তৃতি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি সুস্পষ্ট যে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনো গুণগত পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যায় না। এর জন্য সরকারের কিছু বিতর্কিত কার্যক্রম, রাজনৈতিক দলগুলোর অনৈতিক আচরণ, নাগরিক সমাজের অনভিপ্রেত নীরবতা মূলত দায়ী। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বিশ্ব পরিস্থিতিও আমাদের বিপক্ষে কাজ করছে। তবে অতীতের যথেচ্ছাচারের সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি এবং পরিবর্তনের প্রতি অনীহা জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। প্রাণিকুলের বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করে বিখ্যাত বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন বলেছেন: প্রাণিকুলে সবচেয়ে শক্তিশালী কিংবা সবচেয়ে বুদ্ধিমানেরা টিকে থাকেনি, বরং বিবর্তনের সঙ্গে যারা খাপ খাওয়াতে পেরেছে তারাই টিকে রয়েছে। আমাদের পরিণতিও কি তাই হবে? আমাদের সামনেও কি আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে? যে সম্ভাব্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে আমরা আবারও অগ্রসর হচ্ছি, তাতে এ আশঙ্কা মোটেই অমূলক নয়। এমতাবস্থায় সাধারণ নাগরিকদের প্রজ্ঞা ও সঠিক সিদ্ধান্তই আমাদের একমাত্র ভরসা।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, ১৪ জুলাই ২০০৮

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s