সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচন প্রসঙ্গে

HTML clipboard

ড. বদিউল আলম মজুমদার

জাতি হিসেবে আমরা একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সংস্কার এবং কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একইসাথে প্রয়োজন নির্বাচনে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীর অংশগ্রহণ ও তাদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। আরো প্রয়োজন প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের বিস্তারিত তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, যাতে তারা জেনে-শুনে-বুঝে সজ্জনদের পক্ষ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।

প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্য দেয়ার উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে ক্ষমতায়িত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা। তবে এর সফলতা নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর: (ক) প্রার্থীদের পক্ষে অসত্য তথ্য প্রদান বা তথ্য গোপন না করা; (খ) নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সকল প্রাপ্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা; এবং (গ) কমিশনের পক্ষে অসত্য তথ্য প্রদানকারী ও তথ্য গোপনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুততার সাথে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ তিনটি ক্ষেত্রেই আমাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।

গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী আসন্ন সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থীরা ব্যাপকভাবে তথ্য গোপন করেছেন। অনেকক্ষেত্রে তারা অসত্য তথ্য প্রদান করেছেন। আমাদের নিজেদের বিশ্লেষণ থেকেও দেখা যায় যে, প্রায় সবগুলো হলফনামায়ই অসম্পূর্ণ এবং অনেকগুলো অগ্রহণযোগ্য। বস্তুত একজন রিটার্নিং অফিসার আমাদেরকে বলেছেন যে, যথাযথভাবে হলফনামাগুলো নিরীক্ষা করা হলে ৯৯ শতাংশ মনোনয়নপত্রই বাতিল হয়ে যেতো। তাই এটি সুস্পষ্ট যে, অসম্পূর্ণ হলফনামা দাখিলের কারণে ভোটারদের জানার অধিকার ক্ষুন্ন এবং তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যই বহুলাংশে ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছে।

তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও অনেকটা হতাশাব্যঞ্জক। হলফনামাগুলো মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ৩ জুলাই দাখিল করা হলেও ১১ দিন পর অর্থাৎ ১৪ জুলাই থেকে কমিশনের ওয়েবসাইটে এগুলো প্রকাশ করা শুরু হয় এবং ১৬ তারিখে সব প্রার্থীদের হলফনামার কপিগুলো ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। তাও শুধুমাত্র মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের। এ ধরনের সময়ক্ষেপণ  গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে অনুসন্ধানী রির্পোট তৈরির সুযোগ বিঘ্নিত করেছে, যা নিঃসন্দেহে ভোটারদের স্বার্থহানি ঘটিয়েছে।

কমিশন অবশ্য মনে করে যে, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগে প্রার্থীদের তথ্য প্রকাশ অনৈতিক। কমিশনের এ ধরনের যুক্তি আমাদের কাছে বোধগম্য নয় এবং আমরা মনে করি, এটি জনস্বার্থের পরিপন্থী। কারণ এ সকল তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হলে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের পক্ষে আপত্তি তোলা সহজ হতো। এছাড়াও গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ফলে আরো অনেক প্রার্থীই হয়তো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিতো। উপরন্তু প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার মাধ্যমে তাদের প্রার্থীতা ঘোষণা করেছেন এবং তারা মনোনয়নপত্রের সাথে হলফনামা আকারে তথ্য প্রদান করেছেন এটি জেনে যে, তাদের তথ্য ভোটারদের কাছে প্রকাশ করা হবে। উল্লেখ্য যে, প্রতিবেশী ভারতে হলফনামাগুলো দাখিলের সাথে সাথেই রিটার্নিং অফিসারের নোটিশ বোর্ডে সেগুলো টাঙ্গিয়ে দেয়া হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও গণমাধ্যমের কাছে সেগুলো বিলি করা হয়। এছাড়াও ভারতে ‘বিরুদ্ধ হলফনামা’ দাখিলেরও বিধান রয়েছে, যাতে প্রতিপক্ষ নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে আপত্তি তুলতে এবং মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং অফিসার তা বিবেচনায় নিতে পারেন।

প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামা ও নির্বাচনী ব্যয়ের উৎসের বিবরণী প্রার্থীর আয়কর রিটার্নসহ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার বিধান সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভা নির্বাচনী বিধিমালায় [ধারা ৫৩(২)] অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে সাধারণ নাগরিকদের রিটার্নিং অফিসার কিংবা নির্বাচন কমিশন থেকে প্রার্থীদের প্রদত্ত হলফনামার কপি, নির্বাচনী ব্যয়ের উৎসের বিবরণী, তাদের আয়কর রিটার্ন এবং নির্বাচনী ব্যয়ের রিটার্ন প্রাপ্তির কোন পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট আইনে বা নির্বাচনী বিধিমালায় নির্ধারিত করা হয়নি। অর্থাৎ নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী প্রার্থীদের প্রদত্ত তথ্য ভোটারদের জন্য প্রাপ্তির একমাত্র মাধ্যম নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট। তাই বিধি অনুযায়ী রিটার্নিং অফিসারগণ কিংবা কমিশন অন্য কোনভাবে কাউকে এ সকল তথ্য দিতে বাধ্য নয়। আমরা মনে করি যে, এটি সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনী বিধিমালার একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং এর পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।

নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের ওপর নির্ভর করার সমস্যা হলো দ্রুততার সাথে এবং সময়মত তথ্য না প্রাপ্তি। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। এক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো যে, অনেকের ওয়েবসাইট ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা, এমন কি সুযোগও নেই। গ্রাম কিংবা মফস্বল শহরে বসবাসকারী স্বল্প শিক্ষিত নাগরিকদের এবং মহানগরের বাইরে অবস্থিত গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ওয়েবসাইট ব্যবহার করার সুযোগ নেই বললেই চলে। এছাড়াও বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ইন্টারনেট লাইন স্পিডের সীমাবদ্ধতা এ সমস্যাকে আরো প্রকট করে তোলে। তাই কমিশনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে ভোটারদের ক্ষমতায়িত করার চেষ্টা তেমন একটা ফলবতী হয়নি এবং ভবিষ্যতে হবে বলেও আশা করা যায় না।

নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা প্রার্থীদের সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয় ও আয়কর রিটার্ন প্রকাশ করার ক্ষেত্রে। ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে ব্যর্থ হয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে গত ২০ জুলাই অভিযোগ করার পর কমিশন প্রার্থীদের আয়কর রিটার্নের তথ্য দাখিলের তিন সপ্তাহ পর ২১ জুলাই ‘সুজন’কে তথ্য প্রদানের লিখিত অনুমতি দেয়। একইসাথে সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয় ও আয়কর রিটার্নের কপি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা শুরু করে। তবে অদ্যাবধিও সব এলাকার প্রার্থীদের আয়কর রিটার্নের কপি কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থীদের একজনেরও আয়কর রিটার্নের কপি পাওয়া যায় নি। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নির্বাচনের আর একদিন মাত্র সময় বাকি আছে।

আমরা শুনেছিলাম যে, নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যগুলোর সারাংশ তৈরি করে ভোটারদের জ্ঞাতার্থে স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশ করবে। অদ্যাবধিও তা করা হয়নি। আশা করি কমিশন এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।

নির্বাচন কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রার্থীদের প্রদত্ত তথ্য যাচাই করে তথ্য গোপন বা অসত্য তথ্য দেয়ার জন্য তাদের বিরুদ্ধে যথার্থ ব্যবস্থা নেয়া। গণমাধ্যমে ইতোমধ্যেই অনেক তথ্যের অসঙ্গতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। আমরা শুনেছি খোদ কমিশনেও অনেক অভিযোগ এসেছে। কমিশন নিজেও স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু কমিশন এ পর্যন্ত মোট ১৬ শতাধিক প্রার্থীর একজনের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্লেখ্য যে, নির্বাচনী বিধিমালায় কমিশনকে প্রার্থীতা বাতিলের সুস্পষ্ট ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। আমাদের আশঙ্কা যে, এ অবস্থা বিরাজমান থাকলে কমিশন একটি দাঁতহীন বাঘে পরিণত হতে পারে, যা কোনভাবেই কাঙিক্ষত নয়। আমরা আনন্দিত যে, সম্প্রতি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আসন্ন সিটি ও পৌর নির্বাচনে হলফনামায় যে সকল প্রার্থীগণ তথ্য গোপন বা অসত্য তথ্য প্রদান করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ প্রদান করেছেন। আশা করি কমিশন জরুরি ভিত্তিতে এই নির্দেশনার প্রতি দৃষ্টি দেবে।

একটি বহুল প্রচলিত কথা যে, ভোরের আভা অবশিষ্ট দিনের ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠেয় প্রথম দফা নির্বাচন হিসেবে আসন্ন চারটি সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য খুব একটা ইতিবাচক নয়। প্রার্থীদের পক্ষে হলফনামায় পরিপূর্ণ ও সঠিক তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নির্বাচন কমিশন কড়াকড়িভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। দ্রুততার সাথে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও কমিশন সফল হয়নি। তথ্য গোপন বা অসত্য তথ্য দেওয়ার জন্য এখন পর্যন্ত কমিশন কারও প্রার্থীতা বাতিল করেনি। জনস্বার্থে এ কাজগুলো করা কমিশনের দায়িত্ব। ফলে প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য পেয়ে ভোটারদের ক্ষমতায়িত হওয়ার কাজটি কাঙিক্ষত মাত্রায় অর্জিত হয়নি। আমরা আশাকরি যে, কমিশন ভবিষ্যতে এ সকল অপারগতা কাটিয়ে উঠবে। কারণ এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটির সফলতার ওপরেই বহুলাংশে নির্ভর করবে আগামী দিনের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অর্থবহ নির্বাচন – যে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগতমানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে। তাই কমিশনকে সফল হতেই হবে। এমতাবস্থায় সকল সচেতন নাগরিকের কমিশনকে সহায়তার হস্ত প্রসারিত করা আবশ্যক। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোও এগিয়ে আসবে বলে আশা করি, কারণ তাদের সহায়তা ছাড়া সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও সর্বোপরি অর্থবহ নির্বাচন সম্ভবপর নয়।

[ লেখক: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক ]
তথ্য সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ৩ আগষ্ট ২০০৮

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s