সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনে কারা জিতলেন

বদিউল আলম মজুমদার

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চারটি সিটি করপোরেশন ও নয়টি পৌরসভা নির্বাচনে নয়জন মেয়র, সাধারণ আসনে ১৯৯ জন (সিটি করপোরেশনে ১১৮ জন, পৌরসভায় ৮১ জন) এবং সংরক্ষিত মহিলা আসনে ৬৬ জন কাউন্সিলরসহ (সিটি করপোরেশনে ৩৯ জন, পৌরসভায় ২৭ জন)−মোট ২৮৭ জন বিজয়ী হয়েছেন। ভোটাভুটির এ যুদ্ধে বিজয়ীদের সবার নাম আমরা জানি এবং অনেকের দলীয় পরিচিতিও জানি। যেমন, ১৩ জন নবনির্বাচিত মেয়রের মধ্যে ১২ জনই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সমর্থিত। কিন্তু আমরা কি তাঁদের সম্পর্কে আর বেশি কিছু জানি? উদাহরণস্বরপ, তাঁদের মধ্যে কতজন নতুন মুখ? আমরা কি তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, আয় ও সম্পদের পরিমাণ, আয়কর ও জীবনযাত্রার তথ্য জানি? আমরা কি তাঁদের বিরুদ্ধে আনীত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের সঙ্গে পরিচিত? তাঁরা কি হলফনামায় ও আয়কর রিটার্নে অসত্য তথ্য দিয়েছেন বা তথ্য গোপন করেছেন?

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চারজন সিটি করপোরেশন মেয়রের মধ্যে তিনজনই নতুন মুখ। আগের মেয়াদের মেয়রদের তিনজন কারাগারে এবং তাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। একমাত্র পুনর্নির্বাচিত সিটি মেয়র সিলেটের বদরউদ্দিন কামরান বর্তমানে কারাগারে। দুজন ভারপ্রাপ্ত মেয়র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছেন। গত মেয়াদের পৌরসভার মেয়রদের মধ্যে নয়জনই পুনঃপ্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং মাত্র চারজন জয়ী হন। উল্লেখ্য, তাঁদের মধ্যে তিনজনই হয় জেলে ছিলেন, না হয় বর্তমানে জেলে। সাধারণ আসনে নির্বাচিত সিটি করপোরেশন কাউন্সিলরদের মধ্যে ৮০ শতাংশ এবারের নির্বাচনে অংশ নেন এবং ৫২ শতাংশ আসনে তাঁরা জয়ী হন। পক্ষান্তরে সংরক্ষিত আসনে মাত্র ৩৬ শতাংশ পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থাৎ সাধারণ আসনে যেখানে ৪৮ শতাংশ নতুন মুখ, সেখানে সংরক্ষিত আসনে নতুন মুখ ৬৪ শতাংশ। পৌরসভার ৩১ শতাংশ আসনে কাউন্সিলররা পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা তাঁদের দাখিল করা হলফনামায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীদের ক্ষেত্রে সে বাধ্যবাধকতা ছিল না। নির্বাচিত সিটি করপোরেশন মেয়রদের তিনজনই স্মাতক ও স্মাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, একজন উচ্চমাধ্যমিক পাস। পক্ষান্তরে সিটি করপোরেশন মেয়র পদপ্রার্থীদের ৬০ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্মাতক ও স্মাতকোত্তর, ২২ শতাংশ উচ্চমাধ্যমিক পাস এবং বাকিদের যোগ্যতা তারও নিচে। নির্বাচিত সাধারণ আসনের ১১৮ জন সিটি কাউন্সিলরদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ২৭ শতাংশ স্মাতক ও স্মাতকোত্তর, ২২ শতাংশ উচ্চমাধ্যমিক ও ২০ শতাংশ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস। পক্ষান্তরে নির্বাচিত ৩৯ জন নারী কাউন্সিলরের মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্মাতক ও স্মাতকোত্তর এবং তাঁদের ৫১ শতাংশের শিক্ষার স্তর মাধ্যমিকের নিচে। উপরিউক্ত তথ্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, নবনির্বাচিত সিটি করপোরেশন মেয়রদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত হলেও, উচ্চশিক্ষার হার সাধারণ আসনের কাউন্সিলরদের অপেক্ষাকৃত কম এবং সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলরদের আরও কম। উল্লেখ্য, নিরক্ষরতা বা অল্প শিক্ষিত হওয়া নির্বাচনের জন্য অযোগ্যতা নয় এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য শুধু হলফনামায় প্রকাশের বিধান নির্বাচনী বিধিতে অন্তর্ভুক্ত। তবে আমাদের অভিজ্ঞতায়, অনেক সাধারণ ভোটারই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা বেঁধে দেওয়ার পক্ষে।

নির্বাচিত সিটি করপোরেশন মেয়রদের চারজনই পেশাগত দিক থেকে ব্যবসায়ী বা অতীতে ব্যবসায়ী ছিলেন। একজন তাঁর হলফনামায় দাবি করেছেন, বর্তমানে তাঁর কোনো ব্যবসা নেই। সিটি করপোরেশন মেয়র পদপ্রার্থীদের ৬০ শতাংশের পেশা ব্যবসা, ১৫ শতাংশ আইনজীবী এবং বাকিরা কৃষি ও সেবামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। একজন মেয়র পদপ্রার্থী নিজেকে বেকার, আরেকজন গৃহশিক্ষক বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত ১১৮ জন কাউন্সিলরের ৮১ শতাংশ ব্যবসায়ী। পক্ষান্তরে সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত ৩৯ জনের মধ্যে ৪১ শতাংশ গৃহিণী এবং ১৮ শতাংশ সমাজসেবায় নিয়োজিত বলে তাঁদের হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।

পৌর মেয়র পদপ্রার্থীদের ৫৯ জনের মধ্যে ৭০ শতাংশ তাঁদের হলফনামায় পেশা হিসেবে ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন। নির্বাচিত নয়জনের মধ্যে ৭৮ শতাংশ তাঁদের পেশা ব্যবসা বলে দাবি করেছেন। যদিও একজন ব্যবসা ও কৃষি উভয়ই লিখেছেন। সাধারণ আসন থেকে ৮১ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ৮৩ শতাংশ ব্যবসায়ী। অন্যদিকে সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিতদের ৭৪ শতাংশ গৃহিণী বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।

উপরের তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, শুধু জাতীয় সংসদই নয়, আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্রমান্বয়ে ব্যবসায়ীদের করায়ত্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো: এসব নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, যাঁদের অধিকাংশই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তাঁরা ব্যবসায়ী হিসেবে রাজনীতিতে এসেছেন, নাকি রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে ব্যবসায়ী হয়েছেন? উল্লেখ্য, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়ীদের আখড়ায় পরিণত হলে, তা হবে সংবিধানের ৯ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিগণ সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় শাসনসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে উৎসাহ দান করিবেন এবং এই সকল প্রতিষ্ঠানসমূহে কৃষক, শ্রমিক এবং মহিলাদিগকে যথাসম্ভব বিশেষ প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হইবে।’ অর্থাৎ সাংবিধানিক আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী, সর্বস্তরের জনগণের প্রতিনিধিদের নিয়ে স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠান গঠিত হবে, যাতে পিছিয়ে পড়াদের বিশেষ প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৪৬ জন প্রার্থীর মধ্যে, তাঁদের হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, ১২ জন বা ২৬ শতাংশ অতীতে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন এবং তাঁরা এসব মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। বর্তমানে নয়জনের বা ২০ শতাংশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু আছে, যাঁদের মধ্যে আগে খালাস পাওয়া তিনজন অন্তর্ভুক্ত। নির্বাচিত চার সিটি করপোরেশন মেয়রের মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধেই বর্তমানে ফৌজদারি মামলা রয়েছে−শুধু রাজশাহীর খায়রুজ্জামান লিটনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। বরিশালের শওকত হোসেন হিরনের বিরুদ্ধে দুটি এবং খুলনার তালুকদার আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে পাঁচটি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। সিলেটের জনাব কামরানের বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে।

চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত সাধারণ আসনের ১১৮ জন কাউন্সিলরের মধ্যে মোট ৩০ জনের বা এক-চতুর্থাংশের বিরুদ্ধে বর্তমানে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে জেলখানা বা পলাতক অবস্থায় রয়েছেন পাঁচজন। সিলেট সিটি করপোরেশনের সাধারণ আসন থেকে ২৭ জন নবনির্বাচিত কাউন্সিলরের মধ্যে ১১ জনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে মামলা রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ কারাবাস করেছেন এবং দুজন এখনো কারাগারেই রয়েছেন। বরিশালের সাধারণ আসন থেকে ৩০ জন নবনির্বাচিত কাউন্সিলরের মধ্যে মামলা রয়েছে পাঁচজনের বিরুদ্ধে। খুলনার ৩১ জন নবনির্বাচিত কাউন্সিলরের মধ্যে মামলা রয়েছে সাতজনের বিরুদ্ধে। দুজন কারারুদ্ধ এবং একজন পলাতক অবস্থায় নির্বাচিত হয়েছেন। রাজশাহীর সাতজন নবনির্বাচিত কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

মোট ৫৯ জন পৌরসভা মেয়র পদপ্রার্থীর মধ্যে ২১ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ফৌজদারি মামলা ছিল, যা থেকে তাঁরা অব্যাহতি পেয়েছেন। বর্তমানে তাঁদের ১৩ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে নয়জনের বিরুদ্ধে অতীতেও মামলা ছিল এবং বর্তমানেও রয়েছে।

নয়টি পৌরসভায় নির্বাচিত মেয়রদের মধ্যে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারি মামলা ছিল। বর্তমানেও পাঁচজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তবে সীতাকুণ্ডের শফিউল আলম, দুপচাঁচিয়ার জাহাঙ্গীর আলম, মানিকগঞ্জের রমজান আলী, গোলাপগঞ্জের জাকারিয়া আহমদের বিরুদ্ধে অতীতেও মামলা ছিল, এখনো রয়েছে। নবনির্বাচিত পৌরসভার মেয়রদের মধ্যে দুজন−মানিকগঞ্জের রমজান আলী ও দুপচাঁচিয়ার জাহাঙ্গীর আলম−কারাগার থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেছেন। জাহাঙ্গীর আলম অবশ্য নির্বাচনের দুই দিন আগে জামিনে মুক্তি পান। এ ছাড়া গোলাপগঞ্জের জাকারিয়া আহমদ কিছুদিন আগে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

উপরিউক্ত তথ্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র পদে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন তাঁদের অনেকেই বিতর্কিত। যে পাঁচজন মেয়র পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন তাঁদের চারজনের বিরুদ্ধেই−সিলেটের কামরান, গোলাপগঞ্জের জাকারিয়া আহমদ, মানিকগঞ্জের রমজান আলী ও দুপচাঁচিয়ার জাহাঙ্গীর আলম−গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দুজন এখনো কারাগারে এবং একজন−দুপচাঁচিয়ার জাহাঙ্গীর আলম−ছয় মাসের সাজাপ্রাপ্ত, যাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে আপিল পেন্ডিং। বস্তুত নয়জন নির্বাচিত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়রের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। মনে রাখা প্রয়োজন, মামলা থাকা ও দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক কথা নয়। আবার অনেক মামলা রাজনৈতিক কারণে দায়ের ও প্রত্যাহার করা হয়। সিটি করপোরেশনের সাধারণ আসনে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের মেজরিটি বা ৫২ শতাংশ পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন এবং তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কারও কারও বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য হলফনামায় গোপনের স্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে। যেমন, দুপচাঁচিয়ার পুনর্নির্বাচিত মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলার−যে মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন−তথ্য লুকানোর অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে দায়ের করা হয়েছে। তাই এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, চারটি সিটি করপোরেশন ও নয়টি পৌরসভা নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের গুণগত মানে পরিবর্তনের সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষা বহুলাংশে অপূর্ণই রয়ে গিয়েছে।

সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র পদে ১০৫ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ৪৬ জন বা ৪৪ শতাংশ আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন এবং এগুলোর কপি আমরা পেয়েছি, যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলো আংশিক বা অসম্পূর্ণ। সিটি করপোরেশনের ৪৬ জন মেয়র পদপ্রার্থীর মধ্যে ৩০ জন বা ৬৫ শতাংশ আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন। পৌরসভার মেয়র পদপ্রার্থী ৫৯ জনের মধ্যে ১৬ জন বা ২৭ শতাংশ আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। অর্থাৎ সিটি করপোরেশন মেয়র পদপ্রার্থীদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি আয়করদাতা নন।

মেয়র পদপ্রার্থী আয়করদাতাদের মধ্যে তিনজন ব্যতীত−এমন তিনজন যাঁরা নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি−অন্যদের প্রায় সবার আয়কর প্রদানের পরিমাণ যৎসামান্য। নির্বাচিত সিটি করপোরেশন মেয়রদের মধ্যে দুজনের আয় করযোগ্য আয়ের নিচে বলে তাঁরা দাবি করেন এবং তাঁরা কোনো ট্যাক্স প্রদান করেননি, যদিও তাঁদের বড় অঙ্কের সম্পদ রয়েছে। অন্য দুজনের প্রদত্ত করের পরিমাণও ১০ হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকার মধ্যে। পৌরসভার মেয়রদের মধ্যে একমাত্র গোলাপগঞ্জের জাকারিয়া আহমদ ২৫ হাজার ২৮৯ টাকা আয়কর পরিশোধ করেছেন। নির্বাচিত মেয়রদের অনেকের আয়কর রিটার্নের সঙ্গে হলফনামায় প্রদত্ত সম্পদের সামঞ্জস্য নেই। কয়েকজনের সম্পদের পরিমাণ থেকে দায়দেনা বেশি বলে মনে হয়। তবে তাঁদের কেউ কেউ সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মূল্য উল্লেখ করেননি। হলফনামা অনুযায়ী কয়েকজন মেয়র পদপ্রার্থী ‘টেকনিক্যালি’ দেউলিয়া। এ ছাড়া তাঁদের অনেকের বার্ষিক আয় ও সম্পদের পরিমাণ অতিসামান্য, কিংবা নেই। দুপচাঁচিয়ার জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেছেন, তিনি পিতার ওপর নির্ভরশীল।

নির্বাচিত মেয়রদের প্রদত্ত আর্থিক তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য মনে হয় তাঁদের জীবনযাত্রা সম্পর্কিত তথ্যগুলো। নির্বাচিত সিটি করপোরেশন মেয়রদের যে তিনজনের তথ্য পাওয়া গেছে তা থেকে দেখা যায়, তাঁদের গড় মাসিক পারিবারিক খরচ ১০ হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকার মধ্যে। গাড়ির গড় মাসিক জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ তিন হাজার থেকে চার হাজার ২০০ টাকা। গড় মাসিক টেলিফোন বিল ৪২৫ থেকে ৫৬১ টাকা এবং গড় মাসিক বিদ্যুৎ বিল ৪৯৮ টাকা থেকে ৯৬৭ টাকা।

সদ্যসমাপ্ত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনে অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি শুধু নির্বাচিতই হননি, তাঁদের অনেকে হলফনামায় ও আয়কর রিটার্নে অনেক অসত্য তথ্য দিয়েছেন কিংবা তথ্য গোপন করেছেন। দুর্ভাগ্যবশত নির্বাচন কমিশন তাঁদের মনোনয়নপত্র বাছাইপর্বে বাতিলের উদ্যোগ নেয়নি। যদিও হাইকোর্ট থেকে এ ব্যাপারে একটি নির্দেশনা ছিল। তথ্যের অসংগতির জন্য কমিশন এখন পর্যন্ত কারও নির্বাচন বাতিলও করেনি। আশা করি কমিশন এ ব্যাপারে দ্রুততার সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

সাম্প্রতিক নির্বাচনী অভিজ্ঞতা থেকে আশাবাদী হওয়ার কি কিছুই নেই? সাম্প্রতিক নির্বাচনে অনেক ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে যা থেকে আশাবাদী হওয়া যায়। যেমন, প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য হলফনামা আকারে প্রদান করার আইনগত বাধ্যবাধকতা প্রথমবারের মতো সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের তথ্য জেনে-শুনে-বুঝে ভোটাধিকার প্রয়োগের লক্ষ্যে ভোটারদের ‘পলিটিক্যাল এডুকেশন’ প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। এ ছাড়া হাতিয়ার হতে পারে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে। উপরন্তু, সাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে লিফলেট তৈরি করে ভোটারদের অবগতির জন্য সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সুজনের ওয়েবসাইটে (http://www.shujan.org) সন্নিবেশিত এসব তথ্য ব্যবহার করে গণমাধ্যম অনুসন্ধানী রিপোর্টও তৈরি করেছে, যা ভোটারদের সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে।

এসব কার্যক্রমের ফলে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থী নির্বাচনের পক্ষে প্রথমবারের মতো একটি বড় ধরনের আওয়াজ ওঠে, যা ভবিষ্যৎ ইতিবাচক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। তবে দ্রুততার সঙ্গে পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন সর্বগ্রাসী দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সবার সর্বাত্মক প্রতিরোধ এবং এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, ৩০ আগস্ট ২০০৮

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s