জনগণ তাদের ‘আপনজনদের’ ভোট দিলে সমস্যা কোথায়?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: ‘সুশীল সমাজের কাছে এক তুচ্ছ নাগরিকের কিছু প্রশ্ন’ শিরোনামে ৩০ আগস্ট ২০০৮ দৈনিক আমাদের সময়ে প্রকাশিত নিবন্ধে সৈয়দ বোরহান কবীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের অবতারণা করেছেন- গরিব মানুষ যদি তাদের আপন লোকদের ভোট দেয় তাহলে গণতন্ত্রের সমস্যা কোথায়? দেশেরই বা সমস্যা কোথায়?

সমস্যা মোটেই নেই, যদি ভোটারদের এ সকল আপনজনরা সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত হন। যদি তারা দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগে অভিযুক্ত না হন। যদি তারা সমষ্টির স্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থে পরিচালিত না হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত জনাব কবীরের উল্লিখিত আপনজনদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে।

একথা সত্য যে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তবুও সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে কোনো পাবলিক ফিগার বা জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিশেষত দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগ উত্থাপিত হলে সাধারণত তারা পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়ায় বিরত থাকেন। কারণ যাদেরকে জনগণ তাদের স্বার্থ ও সম্পদের ‘আমানতকারী’ হিসেবে নির্বাচিত করেছেন, তাদের জন্য সততা ও স্বচ্ছতার উচ্চতর মানদণ্ড প্রদর্শন করা আবশ্যক। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে সংস্কৃতি আমাদের দেশে এখনও গড়ে উঠেনি।

দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগে অভিযুক্ত আপনজনদের ভোটারদের দ্বারা নির্বাচিত হওয়া গণতন্ত্রের জন্য অবশ্যই ক্ষতিকর। কারণ উৎসবের আমেজে প্রতি পাঁচ বছর পর ভোট দেয়াই গণতন্ত্র নয়। ট্রান্সপারেন্ট ব্যালট বক্সে এবং নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে অবাধে তা প্রদানের অধিকারও গণতন্ত্র নয়। বস্তুত নির্বাচন গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের সূচনা মাত্র। দুই নির্বাচনের মাঝখানে ক্ষমতাসীনরা কী-করেন, না-করেন এর ওপরই নির্ভর করে গণতন্ত্র কায়েম হওয়া। নির্বাচিতরা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার না করেন, সততা-স্বচ্ছতা-সমতা-ন্যায়পরায়ণতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে কাজ করেন, জনমত-মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, শাসন প্রক্রিয়ায় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন এবং ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থের পরিবর্তে সমষ্টির স্বার্থ সমুন্নত রাখেন, তাহলেই গণতন্ত্র ও সুশাসন কায়েম হবে। কিন্তু বিতর্কিত ব্যক্তিরা নির্বাচিত হলে, যারা সকল নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নিজেদের আপনজনদের পেট্রোনাইজ বা ফায়দা দিতে অভ্যস্ত এবং সাধারণত দলবাজিতে লিপ্ত, তারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে বাধ্য।

বিতর্কিত ব্যক্তিরা নির্বাচিত হলে তা রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তারা যদি তাদের অতীতের অপকর্ম থেকে ভবিষ্যতে নিজেদের বিরত রাখতে না পারেন, তাহলে আবারো ইজারাতন্ত্র, লুটপাটের নিরঙ্কুশ অধিকার- প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই ইজারাকে স্থায়ী করার জন্য তারা অতীতের ন্যায় নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে ম্যানুপুলেট করতে পারেন এবং সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আবারো অকার্যকর করে তুলতে পারেন। এমনি পরিস্থিতিতেই উগ্রবাদের বিস্তার ঘটে এবং রাষ্ট্রের কার্যকারিতাই দুর্বল হতে থাকে। অতীতে এমনি ঘটেছিল এবং ভবিষ্যতে তা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা।

এ ছাড়াও দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের ফলে সৃষ্ট অপশাসন গরিব মানুষদেরই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া অর্থনৈতিকভাবে প্রায় একই অবস্থায় ১০০ ডলার মাথাপিছু আয় থাকলেও গত ৩৭ বছর ধরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় মাত্র প্রায় ছয়গুণ বেড়েছে, পক্ষান্তরে দক্ষিণ কোরিয়ার বেড়েছে প্রায় ২০০ গুণ। প্রায় প্রাকৃতিক সম্পদহীন কোরিয়ার তুলনায় উর্বর মাটি, মিষ্টি পানি আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত বাংলাদেশেরই অনেক দ্রুতহারে উন্নত হওয়ার কথা ছিল! একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গত ৩৭ বছরে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর ব্যক্তিরা, যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে লুটপাটের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হলেও, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি, তাদের অনেকের এখনও নুন আনতে পান্তা ফুরায়।

বিতর্কিতরা নির্বাচিত হয়ে গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে যেন বিপন্ন করতে না পারে, সে লক্ষ্যেই ২০০৩ সালের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের একদল নির্দলীয় নাগরিকের উদ্যোগে ‘সুজন- সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর সৃষ্টি, যদিও জনাব কবীরের লেখা থেকে মনে হতে পারে যে, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পটপরিবর্তনের পর এ সংগঠনের আবির্ভাব। গত ছয় বছরে নির্বাচনি প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলের সংস্কারের লক্ষ্যে কতগুলো সুদূরপ্রসারি প্রস্তাব উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে ‘সুজন’ বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্য দিয়ে ক্ষমতায়িত করার উদ্যোগ নেয়, যেন তারা জেনে-শুনে-বুঝে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। ২০০৩ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ছাড়াও ভোটারদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করার প্রচেষ্টা পৌরসভা নির্বাচন ও ২০০৪-০৫ সালে অনুষ্ঠিত ৫টি উপনির্বাচনেও অব্যাহত রাখা হয় এবং এর ফলেই দেশের উচ্চ আদালতের রায়ে প্রার্থীদের তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই ‘সুজন’ রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগ তুলেই ক্ষান্ত হয়নি, তা ঠেকানোর সুস্পষ্ট উদ্যোগও গ্রহণ করেছে এবং গত ছয় বছর থেকে নিবেদিতভাবে করে যাচ্ছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যেন বিরোধ মেটাতে পারে, সে লক্ষ্যে ২০০৬ সালের জলিল-মান্নান ভূঁইয়া সংলাপের সময় থেকেই নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করার ভূমিকা পালন করে আসছে।

আর জনাব কবীরের দাবি সত্ত্বেও, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনে গরিব মানুষরা আসলেই কি তাদের আপনজনদের ভোট দিয়েছে? আমার ধারণা, তারা তাদের পেট্রন বা ফায়দা প্রদানকারীদেরই নির্বাচিত করেছে। আমাদের বর্তমান সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থায় এখনও একটি পেট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক বিরাজমান। গরিব মানুষরাও স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। নাগরিকত্বের মূল কথা রাষ্ট্রের মালিকানা এবং এ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় নাগরিকের কতগুলো অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, স্বাধীনতার বহু বছর পরও অধিকাংশ জনগণ, বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এখনও রাষ্ট্রের মালিকে পরিণত হতে পারেনি, তারা এখনও প্রভুতুল্য শাসকদের করুণার পাত্রই রয়ে গিয়েছে। ফলে যে সকল নাগরিক অধিকার এবং জাতীয় ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে সুযোগ-সুবিধা তাদের প্রাপ্য, তা তারা স্বাভাবিকভাবে পায় না। তাদের ন্যায্য অধিকারগুলো অর্জনের জন্য তাদেরকে পেট্রনের আশ্রয় নিতে হয়। বস্তুত পেট্রনদের কৃপা বা অনুগ্রহের কারণেই তারা বিভিন্ন ধরনের বৈধ-অবৈধ অধিকারের পরিবর্তে ফায়দা হিসেবে পেয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, পেট্রন দাতাদেরকে নিরাপত্তাও প্রদান করে এবং রাষ্ট্রের হয়রানি থেকে রক্ষা করে। আর নির্বাচনের সময়ে সাধারণ মানুষ সে সকল পেট্রনদেরই ভোট দেয় যারা তাদেরকে বেশি সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা দিতে পারে। তাই ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের সততা ও যোগ্যতার বিবেচনা সাধারণ ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় নয়। সদ্য সমাপ্ত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনেও তাই হয়েছে- ভোটাররা তাদের পেট্রনদেরই, যারা তাদের আপন লোক, ভোট দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি ছিল ভোটারদের জন্য একটি রেশানাল ডিসিশন বা আপাতত ‘সঠিক’ সিদ্ধান্ত।

ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন – সুশাসনের জন্য নাগরিক
তথ্য সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s