সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতার মাপকাঠি ও দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী

বদিউল আলম মজুমদার

‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’−রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত একটি গানের কলি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ কলির যথার্থ একটি প্যারোডি−‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার এমপি হওয়া চাই’। সত্যিকার অর্থেই গত দেড় দশকে আমাদের দেশে এমপি হওয়া আর সোনার হরিণ পাওয়া সমার্থক হয়ে গিয়েছে। এমপি হওয়ার কারণে ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি, অভিজাত এলাকায় প্লট বা বাড়ি, ব্যবসায়িক সুবিধা এবং নির্বাচনী এলাকায় এক ধরনের ‘জমিদারি’ সৃষ্টির সুযোগটি নিঃসন্দেহে সোনার হরিণ পাওয়ার তুল্য। ফলে জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য গত দেড় দশকে আমাদের দেশে এক ভয়ানক অশুভ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে। মনোনয়ন-বাণিজ্য থেকে শুরু করে নেতা-নেত্রীকে উপঢৌকন প্রদানসহ হেন গর্হিত কাজ নেই, যা অনেক সম্ভাব্য সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী অতীতে করেননি।

সোনার হরিণ পাওয়ার তুল্য এ আকর্ষণীয় পদটি করায়ত্ত করার ক্ষেত্রে অবশ্য একটি বড় বাধা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা-অযোগ্যতার মাপকাঠি। বাংলাদেশ সংবিধান ও ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২’-এ এই মাপকাঠি নির্ধারিত করা আছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার জন্য এই মাপকাঠিকে আরও কঠোর করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। আসলেই কি তা হয়েছে? ‘সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ’-এ অন্তর্ভুক্ত বিধানগুলো কি দুর্বৃত্তদের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে অযোগ্য করবে?

সংবিধানের ৬৬(১)(২) অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যপদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী আদালত কর্তৃক ঘোষিত অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তি, দেউলিয়া, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিক, নৈতিক স্থলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিরা মুক্তি লাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে এবং রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে লাভজনক কোনো পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।

‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ’-এ আরও কিছু অতিরিক্ত যোগ্যতা-অযোগ্যতার মানদণ্ড আরোপ করা হয়েছে। উপরিউক্ত আদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী, সরকারকে কোনো মালামাল সরবরাহ করতে চুক্তিবদ্ধ; সরকারের জন্য কোনো কাজ বা দায়িত্ব পালনে চুক্তিবদ্ধ; সরকারের সঙ্গে চুক্তি বা মালামাল সরবরাহের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের অর্জিত মুনাফার অংশ পান এমন ব্যক্তি; ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক/পরিচালক হিসেবে ঋণখেলাপি; এবং দুর্নীতির কারণে সরকারি কিংবা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের চাকরি থেকে বরখাস্তকৃত, অপসারিত বা বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বরখাস্ত, অপসারণ ও বাধ্যতামূলক অবসরের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। এ ছাড়া ধারা ৭৬, ৭৭, ৭৮, ৭৯, ৮০, ৮১, ৮২, ৮৩, ৮৪, ৮৫ ও ৮৬-র অধীনে ‘দুর্নীতিমূলক আচরণ’ ও ‘করাপ্ট প্রাকটিসেস’ ও বেআইনি আচরণ বা ‘ইল্লিগ্যাল প্রাকটিসেস’-এর জন্য অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিরা মুক্তি লাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য হবেন। উপরনতু ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ’-এর ৬৬ ধারা অনুযায়ী কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধির আসন হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক শূন্য ঘোষিত হলে এবং শূন্য হওয়ার পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে তিনি সংসদ সদস্য হতে পারবেন না।

‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ’ সংশোধনের লক্ষ্যে গত এক বছরে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলসহ অন্য স্বার্থসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করে। এসব আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২’-এর ধারা ১২-তে কয়েকটি নতুন সংযোজনী অধ্যাদেশের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব সংযোজনীর ফলে কোনো ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য হবেন, যদি: কোনো বেসরকারি সংস্থার বা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী থাকা অবস্থায় অথবা পদ থেকে পদত্যাগ, অবসর কিংবা পদচ্যুত হওয়ার পর তাঁর তিন বছর অতিবাহিত না হয়; সরকারি চাকরি হতে পদত্যাগ, বরখাস্ত, অপসারিত, বাধ্যতামূলকভাবে অবসরপ্রাপ্ত কিংবা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল হওয়ার পর তাঁর তিন বছর অতিবাহিত না হয়; ব্যক্তিগতভাবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ১৫ দিন আগ থেকে যেকোনো সেবা প্রদানকারী সংস্থার বিলখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হন; কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত কৃষিঋণ ব্যতীত অন্য সব ব্যক্তিগত ও ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির অংশীদার বা পরিচালক হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার তারিখের পূর্ববর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ঋণগ্রহীতা হিসেবে কিস্তি পরিশোধে তিনি খেলাপি হন; এবং জাতীয় বা আন্তর্জাতিক আদালত/ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দণ্ডিত হন।

‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ’-এ উপরিউক্ত সংযোজনীগুলোর অন্তর্ভুক্তি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এর মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ-দুর্বৃত্তদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের মতো নৈতিক স্থলনজনিত অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের অতীতে দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আমাদের উচ্চ আদালতের রায়ও এ ব্যাপারে অস্পষ্ট, যদিও বিষয়টি একাধিকবার আদালতের সামনে আসে।

আদালতে দণ্ডপ্রাপ্তদের সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতার বিষয়টি ১৯৯৬ সালে ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বনাম এ কে এম মাঈদুল ইসলাম’ [১৯৯৬ সালের রিট পিটিশন নং ১৭৩২] মামলার মাধ্যমে একবার উত্থাপিত হয়। মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, সাবেক রাষ্ট্রপতি জনাব এরশাদ জনতা টাওয়ার মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হন। মাঈদুল ইসলাম তা চ্যালেঞ্জ করেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা জনাব এরশাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন, যার বিরুদ্ধে জনাব ইসলাম আদালতের আশ্রয় নেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তাঁর রায়ে [‘এ কে এম মাঈদুল ইসলাম বনাম বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন’, ৪৮ ডিএলআর (এডি) ১৯৯৬] জনাব এরশাদের অযোগ্যতার প্রশ্নটির সুরাহা না করে বিষয়টি রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে ‘নির্বাচনী বিরোধ’ হিসেবে দেখা যু্ক্তিযুক্ত বলে মত দেন, একই সঙ্গে ‘coram non judice’ বা বিচারালয়ের এখতিয়ারহীনতা কিংবা আইনগত বিদ্বেষের (malice in law) অভিযোগ ছাড়া উচ্চ আদালতের নির্বাচনী বিরোধের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয় বলে পর্যবেক্ষণ দেন। উল্লেখ্য, নির্বাচনী বিরোধ মীমাংসার দায়িত্ব নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের, আদালতের নয়।

পরবর্তী সময়ে ২৪ আগস্ট, ২০০০ তারিখে হাইকোর্ট জনাব এরশাদের দণ্ড বহাল রাখেন এবং ৩০ আগস্ট সংসদ সচিবালয় তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেন। জনাব এরশাদ দণ্ড সম্পর্কিত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করেন এবং প্রজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে একটি রিট দায়ের করেন। রিট আবেদনে দাবি করা হয় যে, নৈতিক স্থলনজনিত অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর আপিল চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়ার আগে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য নন। মামলার রায়ে [‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বনাম আব্দুল মুক্তাদির চৌধুরী’, ৫৩ ডিএলআর (২০০১)] বিচারপতি মো. জয়নাল আবেদীন ও বিচারপতি জনাব এ বি এম খায়রুল হক সংসদ সচিবালয়ের প্রজ্ঞাপনটি অবৈধ ঘোষণা করেন। কিনতু বিচারপতিদ্বয় আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হিসেবে জনাব এরশাদের কখন থেকে অযোগ্যতা শুরু হবে সে ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন।

বিচারপতি মো. জয়নাল আবেদীন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের ‘সিরাজুল হক চৌধুরী বনাম নুর আহম্মদ চৌধুরী’ [১৯ ডিএলআর ৭৬৬] এবং কিছু ভারতীয় আদালতের সিদ্ধান্তের উদ্ধৃতি দিয়ে রায় দেন যে, আপিল-প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পরই দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য হবেন। কিনতু দুর্ভাগ্যবশত ভারতীয় আদালতের রায় বিচারপতি মো. জয়নাল আবেদীনের মতামতকে সমর্থন করে না। (মাহমুদুল ইসলাম, কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ, দ্বিতীয় সংস্করণ, পৃ. ৩৪২) ভারতীয় আদালতের মতে, কোনো ব্যক্তি আদালত কর্তৃক প্রথম দণ্ডপ্রাপ্তির দিন থেকেই অপরাধী বলে গণ্য হবেন এবং আপিল করা সত্ত্বেও তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না, যদিও সিটিং বা কর্মরত সংসদ সদস্যদের বেলায় আপিল চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়ার পরই তা কার্যকর হবে। [‘বাবুলাল বনাম কানকার’, এআইআর, ১৯৮৮ এমপি ১৫]

ভারতীয় আদালতের রায় অনুযায়ী, নৈতিক স্থলনজনিত অপরাধে দণ্ডিতদের উচ্চ আদালত কর্তৃক আপিল গৃহীত হলেও এবং অপরাধীকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হলেও তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে অযোগ্য হবেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হলে তার দণ্ড আদালত কর্তৃক সাসপেন্ড বা মুলতবি করা আবশ্যক হবে। [‘সুবরাও পাতিল বনাম নারসিংরাও গুরুনাথ পাতিল’, এআইআর ২০০১ বম, ১০৪] সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলামের মতে, বাংলাদেশেও একই শর্ত প্রযোজ্য। তাঁর মতে, যদি কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান, তাহলে তাঁকে সে লক্ষ্যে আদালতের কাছে আবেদন করতে হবে এবং তাঁকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১(ক) ও ৪২৬ ধারার আওতায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া ও দণ্ডের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ পেতে হবে। কারণ আপিল করা হলেও দণ্ড বহাল থেকে যায় এবং আপিলকারী দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হিসেবে গণ্য হন। তিনি আরও মনে করেন যে উপরিউক্ত বিষয়টি ‘সিরাজুল হক চৌধুরী বনাম নূর আহম্মদ চৌধুরী’ মামলার বিচারকের নজরে আসেনি, তাই রায়টি ‘পার ইনক্যুরিয়াম’ (per incuriam) বা অনবধানতাবশত−অর্থাৎ আদালতের এ সিদ্ধান্ত অন্য আদালতের ওপর বাধ্যকর নয়। অনেক আইনজ্ঞের মতে, আমাদের সাংবিধানিক আকাঙ্ক্ষা হলো, বিচারিক আদালতের দোষী সাব্যস্তদের দণ্ডপ্রাপ্তির সূচনা থেকেই সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য করা। (মিজানুর রহমান খান, দণ্ডিত ব্যক্তিরা এবারও নির্বাচনে প্রার্থী হবেন?, ১৫ জুন, ২০০৮)।

ভারতীয় নির্বাচন কমিশন অবশ্য গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আদালত কর্তৃক চার্জশিটভুক্ত হলেই নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করার পক্ষে। আইনভঙ্গকারীরা যাতে আইন প্রণয়নকারী হওয়ার সুযোগ না পান, সে লক্ষ্যে কমিশন তার ২০০৪ সালের ২২ দফা সংস্কার প্রস্তাবে সুপারিশ করে যে: The Commission is of the view that keeping a person, who is accused of serious criminal charges and where the Court is prima facie satisfied about his involvement in the crime and consequently framed charges, out of electoral arena would be a reasonable restriction in greater public interests. There cannot be any grievance on this. However, as a precaution against motivated cases by the ruling party, it may be provided that only those cases which were filed prior to six months before an election alone would lead to disqualification as proposed. It is also suggested that persons found guilty by a Commission of Enquiry should … stand disqualified from contesting elections.? (www.eci.gov.in) এ প্রস্তাব ন্যায়বিচারের পরিপন্থী নয়, কারণ চার্জশিট হওয়ার আগে অভিযুক্তের পক্ষে নির্দোষ প্রমাণ করার কয়েক দফা সুযোগ থাকে। উল্লেখ্য, জম্মু ও কাশ্মীরের ‘রিপ্রেজেনটেশন অব পিপল অ্যাক্ট’-এ এমনই একটি বিধান রয়েছে।

বিচারপতি খায়রুল হকের মতে, জনাব এরশাদ বিচারিক আদালত কর্তৃক প্রথম দণ্ডিত হওয়ার দিন থেকেই সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অযোগ্য হয়েছেন। তাঁর মতে, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য হলো, যারা জনপ্রতিনিধি, তাদের কেবল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়ী হলেই হবে না, তাদের সুনাম অবশ্যই প্রশ্নাতীত হতে হবে। মামলার কৌঁসুলি ব্যারিস্টার কে এস নবী যুক্তি দিয়েছিলেন, ‘একজন নিকৃষ্ট অপরাধীরও আপিল করার অধিকার থাকে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অযোগ্যতার প্রশ্নটি কেবল আপিল নিষ্পত্তির পরই হওয়া উচিত।’ বিচারপতি খায়রুল হকের মতে, বিজ্ঞ কৌঁসুলি ‘একজন দোষী ও দণ্ডিতের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের তফাৎ করতে ভুলে গিয়েছেন।’

তবে বিচারিক আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্তির প্রথম দিন থেকেই নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার পক্ষে আরও যুক্তি রয়েছে। যেমন, ঋণখেলাপিরা, একবার ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হলে, আপিল করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। এ ছাড়া ‘গভর্নমেন্ট সার্ভেন্ট (ডিসমিসাল অন কনভিকশন) রুল্স’ অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অপসারিত হন−পরবর্তী সময়ে আপিলে দণ্ড রহিত হলে অবশ্য তাঁরা পুনর্বহাল হবেন। এর কারণ হলো, দণ্ডপ্রাপ্তরা যেন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে না পারেন। একই যুক্তি সংসদ সদস্যদের বেলায়ও প্রযোজ্য, কারণ সংসদ সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ও মন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন।

প্রচলিত আইনে দণ্ডপ্রাপ্তদের আপিল দায়ের করার পর অতীতে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলেও ‘জরুরি ক্ষমতা বিধিমালা, ২০০৭’-এর অধীনে দণ্ডপ্রাপ্তরা সে সুযোগ পাবেন না। বিধিমালার ১১(৫) ধারা অনুযায়ী, ‘এই বিধিমালার অধীন দায়েরকৃত কোন মামলায় কোন ব্যক্তি দণ্ডপ্রাপ্ত হইলে এবং উক্ত দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করা হইলে, উক্ত দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি জাতীয় সংসদসহ যে কোন স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হইবেন।’ তাই জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হলে জরুরি বিধিমালার অধীনে বিচারাধীন মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাবে এবং অভিযুক্তরা ভবিষ্যতে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। এ কারণেই সম্ভবত জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে জোর দাবি উঠেছে। আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হলো, যাঁরা এরই মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁরাও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার আশা করতে পারেন, যদিও বিষয়টি আদালত কর্তৃক নির্ধারিত হতে হবে। তাই জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের দাবির পেছনে অনেক রাজনীতিবিদের ব্যক্তিস্বার্থ জড়িত আছে।

পরিশেষে, সংসদ নির্বাচন আসন্ন। আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মাপকাঠি সম্প্রতি আরও কিছুটা কঠোর করা হয়েছে। তবে এতে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্তদের দণ্ডপ্রাপ্তির দিন থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়নি। ফলে অনেকের আশঙ্কা যে, দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীরা আবারও উচ্চ আদালতে আপিল ঠুকে দিয়েই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাবেন। তবে আশার কথা, বিদ্যমান আইনেই তাঁদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখা যায়। বিদ্যমান আইনি ও সাংবিধানিক বিধিবিধান এবং আদালতের রায় বিশ্লেষণ থেকেও দেখা যায় যে বিচারিক আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার দিন থেকেই তাঁরা সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য হবেন। দণ্ডের বিরুদ্ধে শুধু আপিল দায়ের করেই তাঁরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। এ লক্ষ্যে তাঁদের দণ্ডের ওপর আদালতের স্থগিতাদেশ পেতে হবে। আশা করি, জনস্বার্থে দুর্বৃত্তদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দেবে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন−সুশাসনের জন্য নাগরিক।

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, ১৭ অক্টোবর ২০০৮

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s