মার্কিন নির্বাচন: একটি স্বপ্নের জয়

বদিউল আলম মজুমদার

নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এতে প্রথমবারের মতো ‘বারাক হোসেন ওবামা’ নামের একজন কৃষঞাঙ্গ, যে জাতি গোষ্ঠীকে এখন আফ্রিকান-আমেরিকান বলে আখ্যায়িত করা হয়, নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হিসেবে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী জন ম্যাককেইনের বিরুদ্ধে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি ছিল বারাক হোসেন ওবামার জন্য একটি ঐতিহাসিক বিজয়। তবে আমার মতে, সত্যিকার অর্থে এটি ছিল ওবামার কণ্ঠে উচ্চারিত একটি প্রত্যাশা বা স্বপ্নের জয়।

অতীতে ওবামার পূর্বপুরুষদের অনেককেই ক্রীতদাস হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছিল। তাই তিনি একজন দাসবংশোদ্ভূত। তাঁর পিতা ছিলেন একজন মুসলমান।

৯/১১-এর ঘটনার পর মুসলমানদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই উগ্রবাদী হিসেবে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়, যদিও তিনি একজন খ্রিষ্টান হিসেবে বড় হয়েছেন। বস্তুত, মুসলমান আর উগ্রবাদ এখন অনেক পশ্চিমার কাছে সমার্থক হয়ে গেছে। তাঁর কৈশোরের একটি সময় কেটেছিল সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ায় এবং ‘হোসেন’ তাঁর নামের অংশ, যা অনেকের মনে এ সন্দেহকে আরও প্রকট করেছে। উইলিয়াম এয়ার নামের একজন উগ্রবাদী মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও তোলা হয়। তাঁর গির্জার বিতর্কিত পাদ্রি জেরোমি রাইটকে জড়িয়েও তাঁকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। ধনী-গরিবের মধ্যে সমতা ও ন্যায়পরায়ণভিত্তিক একটি সমাজ কাঠামো দাবি করার কারণে তাঁকে সোস্যালিস্ট হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করা হয়, মার্কিন সমাজে যা একটি গুরুতর অপবাদ।

এ ছাড়া ওবামা ছিলেন মাত্র ৪৭ বছর বয়স্ক একজন অপেক্ষাকৃত তরুণ। বিশ্বের সর্বাধিক পরাক্রমশালী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং ‘কমান্ডার ইন চিফ’ হওয়ার মতো তেমন কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাই তাঁর ছিল না। তিনি ছিলেন ইলিনয় অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত ‘জুনিয়র’ বা কনিষ্ঠ সিনেটর। সিনেটর হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন মাত্র ২০০৫ সালে। এর আগে তিনি ছিলেন ইলিনয়ের ‘স্টেট সিনেটর’। এ দুটি নির্বাচিত পদে থাকাকালীন তিনি তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেননি। বস্তুত তাঁর অনভিজ্ঞতাই নির্বাচনে একটি বড় ইস্যু ছিল, যা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিরা বারবার উত্থাপন করেছিলেন।

এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ওবামা বিপুল ভোটে ম্যাককেইনের মতো একজন ‘ওয়ার হিরোকে’−যিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় অনেক বছর বন্দী হিসেবে উত্তর ভিয়েতনামের জেলে কাটিয়েছিলেন−বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। মোট ৫৩৮টি ‘ইলেকট্ররাল কলেজ’ ভোটের মধ্যে তিনি পান ৩৬৪টি বা ৬৮ শতাংশ। তিনি পপুলার ভোট পান ৫৩ শতাংশ। ওহাইও, ফ্লোরিডা, ইন্ডিয়ানা, নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো, আইওয়া, ভার্জিনিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা, নেভাডার মতো নয়টি অঙ্গরাজ্যে, যেখানে গত নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী জর্জ ডব্লিউ বুশ বিজয়ী হয়েছিলেন, তিনি জয়লাভ করেছেন। এ ছাড়া তিনি ইন্ডিয়ানা ও ভার্জিনিয়ার মতো ‘রেড স্টেট’ বলে খ্যাত অঙ্গরাজ্যে, যেখানে বরাবরই রিপাবলিকানরা জিতে এসেছেন, সেখানেও বিজয়ী হয়েছেন।

কৃষঞাঙ্গরাই শুধু তাঁকে ভোট দেননি, মেক্সিকান আমেরিকানসহ অন্য সংখ্যালঘুরাও বিপুল হারে তাঁকে সমর্থন দিয়েছেন। শ্বেতাঙ্গদেরও তিনি বিপুল সমর্থন পেয়েছেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তিনি শ্বেতাঙ্গদের ৪৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, যা গত দুই নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী আল গোর ও জন কেরির থেকে বেশি। শুধু তা-ই নয়, লাখ লাখ শ্বেতাঙ্গ মার্কিন নাগরিক স্বপ্রণোদিত হয়ে ওবামার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের তরুণরা, যারা সাধারণত ভোটাধিকার প্রয়োগ করে না, তারাও বিপুল সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে এসেছে ওবামার সমর্থনে।

অনেক মার্কিন নাগরিকই ভোট প্রয়োগ করেন না, ফলে আমাদের তুলনায় সে দেশে ভোট প্রদানের হার অপেক্ষাকৃত কম। তবে এবার সারা মার্কিন মুলুকে সর্বাধিকসংখ্যক, প্রায় ১২৭ মিলিয়ন বা ১২ দশমিক ৭ কোটি ভোটার ভোট প্রদান করেছেন। নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যাও বেড়েছে প্রায় ১০ মিলিয়ন। ভোট প্রদানের হারও ছিল প্রায় ৬১ শতাংশ, যদিও তা ফ্লোরিডা, ওহাইও, ভার্জিনিয়ার মতো ‘সুইং স্টেট’ বলে খ্যাত অনেক অঙ্গরাজ্যে, যেখানে ওবামার সঙ্গে ম্যাককেইনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে, সেখানকার হার ছিল আরও অনেক বেশি। তাদের অনেকেই ওবামার প্রার্থিতায় উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হয়েই ভোটার হয়েছে এবং ভোট প্রদান করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রভাব সিনেট ও ‘হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ’ বা প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনের ওপরও পড়ে। এবারও ওবামার জনপ্রিয়তার ‘কোটেইল’ বা লেজ ধরে দলের অন্য পদের অনেক প্রার্থী নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পেরেছেন। এবারকার নির্বাচনে ১০০ আসনবিশিষ্ট মার্কিন সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টি আটটি অতিরিক্ত আসনে জয়ী হয়ে দলীয় সিনেটরের সংখ্যা ৫৭-তে উন্নীত করেছে, তিনটি আসনের নির্বাচনী ফলাফল এখনো অনির্ধারিত। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টি এ পর্যন্ত ২৫৯টি আসনে জয়ী হয়েছে এবং তাদের প্রতিনিধির সংখ্যা এবার দুই ডজনের মতো বেড়েছে, যদিও কয়েকটি আসনের ফলাফল এখনো অনির্ধারিত। অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদেও ডেমোক্রেটিক পার্টি সর্বসাকল্যে অতিরিক্ত তিনটি পদ লাভ করেছে। এটি সুস্পষ্ট যে প্রথম কৃষঞাঙ্গ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে ওবামা অনেক আকাশচুম্বী প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। এসব প্রতিবন্ধকতাই তিনি শুধু কাটিয়ে উঠতে পারেননি, তিনি ধর্ম-বর্ণ-বয়স-দল ও সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে সর্বস্তরের বহু মার্কিন নাগরিককে উৎসাহিত, অনুপ্রাণিত ও তাঁর প্রচারণায় যুক্ত করতে পেরেছিলেন। হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক স্বপ্রণোদিত হয়ে তাঁর পক্ষে প্রচারণায় নেমেছিলেন। এমনকি অনেকে চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে এবং লেখাপড়ায় বিরতি টেনে নির্বাচনী প্রচারণায় সার্বক্ষণিকভাবে অংশ নিয়েছিলেন। শোনা যায়, প্রতিটি পরিবারের কাছে ওবামার সমর্থক স্বেচ্ছাব্রতীদের পক্ষ থেকে প্রতিদিন তাঁর জন্য ভোট চেয়ে অন্তত চার-পাঁচটি টেলিফোন আসত এবং আসত প্রায় একই সংখ্যক ই-মেইল। আমার নিজেরই জানা এক ব্যক্তি নির্বাচনের আগের শেষ চার দিনে কয়েকজন স্বেচ্ছাব্রতীর সহায়তায় ওবামার পক্ষে প্রায় চার হাজার টেলিফোন কল করেছিলেন।

কীভাবে ওবামা এ অসাধ্যকে সাধন করতে পেরেছেন? কী ছিল তাঁর ম্যাজিক? আমার মনে হয়, পুরো মার্কিন জাতিকে তিনি একটি স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন, এটিই ছিল তাঁর ম্যাজিক। তাঁর দেখানো স্বপ্নটি ছিল একদিকে জাতীয়, আরেকদিকে ব্যক্তিগত। তিনি মার্কিন জাতিকে স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন মন্দা কাটিয়ে উঠে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির, ইরাক-আফগানিস্তান ও সারা বিশ্বে জর্জ বুশের একতরফা মার্কিন আগ্রাসী নীতি বদলানোর, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মার্কিন নাগরিকদের জন্য একটি ন্যায়পরায়ণভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার, বৈশ্বিক উষঞতার সমস্যা সমাধানের, কৃষঞাঙ্গ আমেরিকানদের প্রতি শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের ঐতিহাসিক অবিচারের অবসান ঘটিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠাসহ আরও অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তনের। বস্তুত ‘চেইঞ্জ’ বা পরিবর্তনই ছিল ওবামার মূল নির্বাচনী স্লোগান। আর এ পরিবর্তনের স্লোগান মার্কিন জাতিকে আলোড়িত করতে পেরেছিল, যার প্রতিফলন ঘটেছিল নির্বাচনের দিনে ওবামার পক্ষে ভোটারদের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে।

এ ছাড়া নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর ক্ষেত্রে তাঁর প্রদর্শিত ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও দক্ষতার মাধ্যমে তিনি অনেক মার্কিন নাগরিকের কাছে আবারও প্রমাণ করতে পেরেছেন যে ‘আমেরিকান ড্রিম’ এখনো সে সমাজে বিদ্যমান। অর্থাৎ যেকোনো মার্কিন নাগরিক নিজ প্রচেষ্টা, পরিশ্রম ও মেধা কাজে লাগানোর মাধ্যমে সাফল্যের উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে, সে সুযোগ মার্কিন সমাজে এখনো রয়েছে। নিঃসন্দেহে ওবামার অভূতপূর্ব সফলতা ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেক নাগরিকের মনে নতুন করে স্বপ্ন সৃষ্টি করতে পেরেছে, তাদের আশান্বিত করেছে এবং তাদের মনে ভরসা যুগিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ওবামা কথার ফুলঝুরির মাধ্যমে শুধু ‘বদলে দেওয়া’র স্বপ্ন দেখিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি এ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করার লক্ষ্যে একটি কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামোও গড়ে তুলেছিলেন।

অভিজ্ঞতার দিক থেকে প্রায় শূন্য ঝুলি ওবামা এভাবেই দেখিয়েছিলেন তাঁর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা। তাঁর গড়ে তোলা সাংগঠনিক কাঠামো হাজার হাজার স্বেচ্ছাব্রতীকেই শুধু প্রচারণায়ই যুক্ত করেনি, লাখ লাখ মার্কিন নাগরিককে তাঁর প্রচেষ্টাকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিল। ফলে তিনি সকল স্তরের নাগরিক থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুদানের মাধ্যমে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের অধিক তহবিল সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, যা ছিল একটি ঐতিহাসিক রেকর্ড। উল্লেখ্য, ধনাঢ্যদের দল বলে পরিচিত রিপাবলিকানরা সাধারণত তহবিল সংগ্রহের দিক থেকে ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় অনেক অগ্রগামী থাকে, কিনতু ওবামা প্রতিপক্ষকে এ ক্ষেত্রেও দারুণভাবে পরাস্ত করতে পেরেছিলেন।

আমরা কি মার্কিন নির্বাচনের ও ওবামার অকল্পনীয় বিজয়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে আমাদের দেশে কাজে লাগাতে পারি না? আমাদের নেতা-নেত্রীরা কি পারেন না বাংলাদেশের দুর্ভাগা জনগণকে একটি পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাতে? এমন পরিবর্তন, যেখানে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, কালো টাকা তথা দুর্বৃত্তায়নমুক্ত একটি সমাজব্যবস্থা কায়েম হবে। যেখানে সামন্তবাদী প্রথার বিলোপ ঘটবে, গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে এবং সুশাসন নিশ্চিত হবে।

দরিদ্রের ও সাধারণ মানুষের বঞ্চনার অবসান ঘটবে। তারা রাষ্ট্রের মালিকে পরিণত হবে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থের পরিবর্তে তাদের কল্যাণে কাজ করবে। আমাদের নেতা-নেত্রীরা কি পারেন না তাঁদের দলগুলোকে উগ্রবাদী, যুদ্ধাপরাধী ও দুর্বৃত্তমুক্ত করে নতুন করে সাজাতে এবং এগুলোকে ফায়দাবাজদের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের সংগঠনে পরিণত করতে? মোটকথা একটি সার্বিক পরিবর্তনের সূচনা করতে? আমাদের ইতিহাসের শিক্ষা ভুললে চলবে না যে−if peaceful changes are not possible, violent changes are inevitable. অর্থাৎ শান্তিপূর্ণভাবে পরিবর্তন না এলে, সহিংস পরিবর্তন অবসম্ভাব্য − আর এটি সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন−সুশাসনের জন্য নাগরিক।

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, ১৫ নভেম্বর ২০০৮

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s