নির্বাচনী ইশতেহারের জন্য বিবেচ্য বিষয়সমূহ

ড. বদিউল আলম মজুমদার

(পূর্ব প্রকাশের পর)

৪. বিকেন্দ্রিকরণ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ :(ক) সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের আলোকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রচলন করে এগুলোর ওপর ‘স্থানীয় শাসনের’ ভার প্রদান, কুদরত-ই-এলাহী পনির মামলার রায় বাস্তবায়নের এবং ‘সাবসিডিয়ারিটি প্রিন্সিপলে’র আলোকে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ। (সাবসিডিয়ারিটি প্রিন্সিপল: সকল সমস্যা সর্বনিম্ন চ্চরে সমাধানের প্রথম প্রচেষ্টা, যেগুলো এ স্তরে সমাধান সম্ভব নয়, সেগুলোই শুধু পরবর্তী ওপরের চ্চরে সমাধানের প্রচেষ্টা; এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের দায়-দায়িত্ব সীমিত হয়ে পড়বে।) (খ) সকল স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচন সম্পন্নকরণ এবং স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। (গ) স্থানীয় সরকার কমিশনকে কার্যকরকরণ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য প্রাথমিকভাবে জাতীয় উন্নয়ন বাজেটের ৪০ শতাংশ বরাদ্দ এবং পরবর্তীতে ক্রমাগতভাবে তা বৃদ্ধি করার উদ্যোগ গ্রহণ। (ঘ) মাননীয় সংসদ সদস্যদেরকে স্থানীয় উন্নয়ন কাজ থেকে বিরতকরণ।

৫. অর্থনীতি, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও ন্যায়পরায়ণতা

(ক) বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুশাসন এবং শহর-গ্রামের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য দূরীকরণ ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা অর্জনের লক্ষ্যে জাতীয় উন্নয়ন বাজেটের ৮০ শতাংশ যাতে সাধারণ জনগণের কল্যাণে ব্যয় হয় তা নিশ্চিতকরণ। দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে একটি নতুন সামাজিক চুক্তি প্রণয়ন। (খ) শিল্পনীতি পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক, দক্ষতা ও মস্তিষ্কশক্তি-নির্ভর শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা; ৰুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত, যথাযথ উৎসাহ কাঠামো তৈরি এবং ইপিজেডের পরিবর্তে ‘ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিঙ্কেজম্ব সম্পন্ন শিল্প গড়ে তুলতে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে শিল্প এলাকা স্থাপন। (গ) পোশাক শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও যথাযথ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ, কারখানাসমূহে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মালিকদেরকে উৎসাহ প্রদান এবং ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ কারখানা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘উৎসাহ কাঠামোম্ব প্রণয়ন। (ঘ) পাটশিল্পকে পুনরম্নজ্জীবিত করার লক্ষ্যে একটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। (ঙ) দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কর কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমে সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধিকরণ। (চ) সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণখেলাপী এবং প্রয়োজনে ঋণ অনুমোদনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ (যেমন, সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ) এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙখলা ফিরিয়ে আনার ক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ প্রদান। (ছ) তথ্য-প্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার ও উৎসাহ প্রদান করে এটিকে একটি বিকাশমান শিল্প ও গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতে পরিণতকরণ। (জ) দারিদ্র্য দূরীকরণ ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ, বেকারদের জন্য ব্যাপক বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের আয়োজন এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক উৎসাহ কাঠামো সৃষ্টিকরণ। (ঝ) কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে উন্নত বীজ, নতুন ধরনের ফসল উৎপাদন ও উন্নত প্রযুক্তি প্রবর্তনের লক্ষ্যে কৃষকদেরকে প্রশিক্ষিতকরণ ও উৎসাহ প্রদান এবং প্রয়োজনে তাদেরকে সরাসরি ভর্তুকি দেয়ার বিধান। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা জরুরি। (ঞ) ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে খাস জমি বিতরণ, কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং সমাজে বৈষম্য দূরীকরণ ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। (ট) তৃণমূলের জনগণকে স্থানীয় সংগঠন গড়ে তুলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে যৌথ কার্যক্রম গ্রহণে প্রণোদিতকরণ এবং একটি ‘রুরাল ব্যাংকিংম্ব ব্যবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে ভর্তুকির ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ঋণ, শস্য বীমা, জীবন বীমা, অক্ষমতা বীমা ইত্যাদির সুযোগ প্রদান। (ঠ) ক্ষুদ্র সঞ্চয় ব্যবহার করে গড়ে ওঠা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার ব্যবসায়িক মালিকানা সঞ্চয়ীদেরকে প্রদান এবং ‘মিউচুয়াল ফাণ্ডম্ব গঠন করে দরিদ্র গোষ্ঠীর সম্পদের মালিকানা বৃদ্ধিকরণ। (ড) বিদেশে কর্মরত প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ (রেমিটেন্স) উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো (যেমন – সমবায় গঠন, মালিকানা ফাণ্ড, বণ্ড ফাণ্ড ইত্যাদি) সৃষ্টি এবং বিদেশে কর্মসংস্থানে আগ্রহীদের ভাষা ও প্রায়োগিক দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ। (ঢ) বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে দেশের জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ এব
এ সম্পর্কিত সকল চুক্তির বিধান প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ। (ণ) হরতালের মতো ধবংসাত্মক ও মানবাধিকার লংঘনকারী কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রধান বিরোধী দলগুলোর সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে যথাযথ আইন প্রণয়ন।

৬. শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজিক সমস্যা ও জ্বালানী

(ক) সার্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, বৈষম্যহীন, গণমুখী এবং সাংবিধানিক আকাঙক্ষা অনুযায়ী অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা চালুকরণ এবং মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে সমপর্যায়ে আনয়ন।

(খ) জনগণের চেতনাবোধ উন্মেষ ও তাদের সচেতনতার স্তর উন্নীত করার লক্ষ্যে নিরক্ষরতা দূরীকরণের লৰ্যে একটি আন্দোলনের সূচনাকরণ।

(গ) দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষকদের জাতীয় কোষাগার থেকে উপযুক্ত বেতন-ভাতা প্রদান, তাদের ওপর আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও সংসদ সদস্যদের খবরদারিত্বের অবসান এবং স্থানীয়ভাবে তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ।

(ঘ) গ্রামীণ শিক্ষার মানোবনতির মাধ্যমে গ্রামে-গঞ্জে যে স্থায়ী ‘নিম্ন শ্রেণী’র সৃষ্টি হয়েছে তা অবসানের লক্ষ্যে শিক্ষা এবং শিক্ষকদের মানোন্নয়নের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব্ব প্রদান।

(ঙ) কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সেশনজটের ও শিক্ষক নিয়োগে দলীয়করণের অবসান এবং এ সকল প্রতিষ্ঠানকে সত্যিকারার্থে বিদ্যা ও মুক্ত চিন্তা চর্চার বিদ্যাপীঠে পরিণতকরণ। দলের অঙ্গ সংগঠন বিলুপ্তির আইনি বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন।

(চ) স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙখলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠাকরণ। কম বিত্তের জনগণের জন্য সুলভে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ।

(ছ) সামাজিক সমস্যা (যেমন – জন্মনিয়ন্ত্রণ, মাদকাসক্তি, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাসন, পারিবারিক নির্যাতন ইত্যাদি) দূরীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি সংগঠনসমূহের মাধ্যমে জনগণকে জাগিয়ে তুলে ও সংগঠিত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। (জ) আর্সেনিকমুক্ত ও নিরাপদ পানীয়জলের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ‘সারফেস ওয়াটারম্ব ব্যবহারের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। (ঝ) জ্বালানি খাতে সকল দুর্নীতি ও অনিয়মের মূল উৎপাটন করে জরুরিভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বিকল্প জ্বালানির (যেমন, সৌর বিদ্যুৎ) উৎস সৃষ্টির জন্য কার্যকরভাবে উৎসাহ প্রদান।

৭. নারী ও বঞ্চিতদের অধিকার

(ক) নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দশম জাতীয় সংসদে ৩৩ শতাংশ, একাদশ সংসদে ৪০ শতাংশ এবং দ্বাদশ সংসদে (অর্থাৎ সম্ভবত ২০২২ সালে) ৫০ শতাংশ নারী সদস্য যেন সরাসরিভাবে নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেন সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ।

(খ) স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ভবিষ্যতে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে ৪০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ। (গ) নারী নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। (ঘ) যৌতুক, বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন, নারী ও কন্যাশিশুদের অপুষ্টি এবং তাদের প্রতি বঞ্চনার কার্যকরভাবে অবসানের লক্ষ্যে যথাযথ আইন প্রণয়ন ও সামাজিক আন্দোলনের সূচনাকরণ। (ঙ) প্রতিবন্ধীদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এবং তাদের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগ সৃষ্টির কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ।

(চ) আধিবাসী ও ৰুদ্র জাতি-গোষ্ঠীর সাংবিধান স্বীকৃত অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তাদের সকল ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ গ্রহণ।

এটি একটি নির্বাচনী ইশতেহার সংক্রান্ত খসড়া ধারণাপত্র। এর মূল উদ্দেশ্য জনগণের মাঝে আলাপ-আলোচনার সূচনা এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রভাবিত করা। এটি নিতান্তই খসড়া বলে আমরা সকলের পরামর্শ ও মতামত কামনা করছি, একইসাথে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুসমূহ সম্পর্কে স্ব-স্ব অবস্থান থেকে সোচ্চার হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। (সমাপ্ত)

[লেখক : সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক]
তথ্য সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ১৯ নভেম্বর ২০০৮

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s