জবাবদিহিতা: নির্বাচনী ইশতেহারে চাই অর্থবহ অঙ্গীকার

বদিউল আলম মজুমদার
প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক দলগুলো প্রথাগতভাবে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। নির্বাচন-পরবর্তীকালে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা কী করবে তারই রূপরেখা হলো নির্বাচনী ইশতেহার। ইশতেহারগুলোতে অনেক ভালো কথা থাকে, থাকে অনেক প্রতিশ্রুতি। নিঃসন্দেহে ভোটারদের একটি অংশ এসব প্রতিশ্রুতির দ্বারা প্রভাবিত হন। তাই নির্বাচনী ইশতেহার হলো রাজনৈতিক দল আর ভোটারদের মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তি। তবুও ক্ষমতায় গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করে না। ফলে জনগণ হয় প্রতারিত।

গত দুটি নির্বাচনে আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের দিকে তাকালেই প্রতারণার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ব্যক্ত করে, যার মধ্যে স্বচ্ছ, দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা; সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চয়তার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা; এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট ও অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা প্রতিহত করতে দুর্নীতি উচ্ছেদ কার্যক্রমের প্রতি অগ্রাধিকার প্রদান ছিল অন্যতম। এ ছাড়া সরকারি প্রচারমাধ্যমকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে স্বায়ত্তশাসন প্রদান, বিচার বিভাগকে পৃথক্করণ ও স্বাধীনতা প্রদান, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন কায়েম, নারী ও শিশুর সার্বিক উন্নয়ন, বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনসহ দারিদ্র্য বিমোচন ইত্যাদি ছিল ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার।

দুর্ভাগ্যবশত, এসব অঙ্গীকার পালনে আওয়ামী লীগের সরকার প্রায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তারা স্বচ্ছ, দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বস্তুত আওয়ামী লীগের আমলে নগ্নভাবে দলীয়করণের সূচনা হয়েছে। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। উদীচীর অনুষ্ঠানে, কমিউনিস্ট পার্টির সভায় ও রমনা বটমূলে বোমা হামলা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দুর্ভাগ্যবশত যেসব উগ্রবাদী এসব ঘটনার জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো রকম ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে, বরং সন্ত্রাসের অভিযোগ এনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করা হয়েছে। এ ছাড়া জয়নাল হাজারীসহ অনেক গডফাদারের আবির্ভাব ঘটেছে আওয়ামী লীগের আমলে। উপরনতু দুর্নীতির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়-স্বজনদের অনেকেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে।

সরকারি প্রচারমাধ্যমকে স্বায়ত্তশাসন প্রদানেও আওয়ামী লীগের সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এ লক্ষ্যে সাবেক সচিব আসাফ্উদ্দৌলাহ্র নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হলেও কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সরকারি প্রচারমাধ্যম বহুলাংশে দলীয় প্রচারমাধ্যমেই পরিণত হয়েছিল এবং সরকারের গুণগান গাওয়াতেই লিপ্ত ছিল। ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগের সরকার বিচার বিভাগকে পৃথক্করণ ও স্বাধীনতা প্রদানের বিষয়টিতেও কোনো সফলতা প্রদর্শন করতে পারেনি।

বিকেন্দ্রীকরণ ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও আওয়ামী লীগের সরকার রক্ষা করেনি। বরং এ ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও দায়-দায়িত্বের আরও কেন্দ্রীকরণ হয়েছে। উপজেলা ও জেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন করা হলেও নির্বাচনের মাধ্যমে এগুলোর বাস্তবায়ন ঘটেনি। এ ছাড়া উপজেলা আইনে সংসদ সদস্যদের নেতৃত্বে উপজেলা পরিষদ গঠনের বিধান করা হয়, যা বাস্তবায়িত হলে একটি ‘বিকৃত’ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠত।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অবশ্য আওয়ামী লীগের সফলতা ছিল, যদিও এগুলোর অধিকাংশই ইশতেহারে উল্লেখ ছিল না। যেমন, পার্বত্য শান্তিচুক্তি, ভারতের সঙ্গে পানিচুক্তি, নারী নীতি প্রণয়ন, স্থানীয় সরকারে নারীর জন্য আসন সংরক্ষণ, সফলতার সঙ্গে ১৯৯৮ সালের দুর্যোগ মোকাবিলা ইত্যাদি।

২০০১ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ৩২টি বিষয়ে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। এতে বলা হয় যে নির্বাচিত বিএনপির সরকারের প্রথম কাজ হবে দলমত-নির্বিশেষে সবার সমর্থন ও সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে জনগণের জান-মাল ও সম্?ম নিশ্চিত করা এবং দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্যে সরকারের লক্ষ্য হবে যেকোনো মূল্যে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং হত্যা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস দমন করে দেশকে মানুষের বসবাসযোগ্য করে তোলা। এ লক্ষ্যে আইনশৃঙ্ক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহ এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে যথার্থই প্রশিক্ষিত, যোগ্য, শক্তিশালী ও কার্যকর করা। প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে জনগণকে শাসন করার জন্য নয়, সেবা করার কাজে লাগানো।

বিএনপির ইশতেহারে দুর্নীতি দমন বিভাগকে পুনর্গঠন করে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ নামে একটি সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে ন্যায়পাল নিয়োগ, রাষ্ট্রীয় এবং রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সব প্রতিষ্ঠানের ক্রয়-বিক্রয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং এসব ক্ষেত্রে সকল প্রকার প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করার ওয়াদা করা হয়। স্নরণ করা যেতে পারে যে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রথম ১০০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা উপলক্ষে ১৯ অক্টোবর, ২০০১ তারিখে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এবং দলীয় সংসদ সদস্যদের সাবধান করে দিয়েছিলেন যে তাদের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ এলে তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবেন এবং সে ‘ব্যবস্থা হবে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর’।

ইশতেহারে আরও অঙ্গীকার করা হয় যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসহ সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং সমপর্যায়ের সকল ব্যক্তির সম্পদের হিসাব গ্রহণ ও প্রকাশ করা হবে। প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাকে দলীয়করণ ও আত্মীয়করণের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। আইনের শাসন নিরঙ্কুশ করার জন্য বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হবে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা হবে। অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারি রেডিও ও টেলিভিশনকে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে যথার্থই স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে।

এ ছাড়া বিএনপি প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার শপথ ব্যক্ত করে। এ লক্ষ্যে উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ গঠন এবং পরিকল্পিত প্রক্রিয়ায় এগুলোকে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ইউনিয়ন পরিষদকে অধিকতর কর্মক্ষম, গতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘সকলের জন্য বিদ্যুৎ’ এ স্লোগান ব্যবহার করে বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে বিদ্যুৎ-ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ও উন্নয়নের অঙ্গীকার করে। আরও অঙ্গীকার করে এ লক্ষ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের। এ ছাড়া বিএনপি নারীর পশ্চাৎপদতা দূরীকরণ, তাদের প্রতি বৈষ্যমের অবসান এবং তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সংসদে নারী আসন বৃদ্ধি ও সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে।

সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো যে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোটের শাসনামলে পুরো দেশ সন্ত্রাস, দুর্নীতি তথা দুর্বৃত্তায়নের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। বস্তুত দেশে একটি লুটপাটতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। মাননীয় সংসদ সদস্যদের অনেকেই হয়ে পড়েন দুর্বৃত্তায়নের অন্যতম হোতা এবং তাঁরা সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন। তাঁদের অনেকেই নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় এ ধরনের জমিদারি কায়েম করেন। এ ছাড়া প্রতিশ্রুতি মতো কারোরই সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হলেও এটিকে অকার্যকর করে রাখা হয়। হাওয়া ভবনের মতো বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সৃষ্টির ফলে দলবাজি ও ফায়দাবাজি ব্যাপক আকার ধারণ করে। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন দলীয়করণের চরম শিকারে পরিণত হয়। দেশে জঙ্গিবাদের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। শুধু তা-ই নয়, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আহসান উল্লাহ মাস্টার, কিবরিয়া হত্যাসহ অনেক সহিংস ঘটনা ঘটে। এমনকি বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ওপরও বর্বরোচিত হামলা হয়।

শুধু নির্বাচনী ইশতেহারেই নয়, বিএনপি সরকার গঠন করে বিচার বিভাগকে প্রশাসন থেকে পৃথক ও স্বাধীন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ লক্ষ্যে ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্যোগকে ভণ্ডুল করে দেয়। কিনতু পাঁচ বছরের শাসনামলে চারদলীয় জোট সরকার এ প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হয়। আরও ব্যর্থ হয় সরকারি গণমাধ্যমকে স্বায়ত্তশাসন প্রদানে। সরকার ন্যায়পালও নিয়োগ দেয়নি।

সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও বিএনপি স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে প্রায় পুরোপুরি অকার্যকর করে ফেলে। জেলা ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হয়। ‘গ্রাম সরকারে’র মতো একটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি (যা হাইকোর্ট কর্তৃক পরবর্তী সময়ে সংবিধানের লঙ্ঘন বলে রায় দেওয়া হয়েছে) এবং মাননীয় সংসদ সদস্যদের অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলে ইউনিয়ন পরিষদ বহুলাংশে একটি অর্থহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

বিদ্যুৎ খাতের লুটপাট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে চারদলীয় জোটের চরম ব্যর্থতা প্রায় সর্বজনবিদিত, যার মাসুল এখন জাতি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়নের কথা নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হলেও এ ক্ষেত্রে জোট সরকারের রেকর্ড অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। তাদের আমলে গোপনে নারী নীতির সংশোধনের মাধ্যমে নারীদের আরও পশ্চাৎপদ করে রাখার অপচেষ্টা চালানো হয়। এ ছাড়া সংসদে নারী আসনসংখ্যা ৩০ থেকে ৪৫-এ উন্নীত করা হলেও জোট সরকার নারীদের জন্য সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে।

দারিদ্র্য নিরসন ও বৈষম্য দূরীকরণের প্রতিশ্রুতি প্রদান সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের আমলেই ধনী-দরিদ্রের এবং শহর-গ্রামের মধ্যে বৈষম্য ক্রমাগতভাবে আকাশচুম্বী হয়েছে। উভয় আমলেই তেলে মাথায় তেল দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। ফলে দারিদ্র্যের ব্যাপকতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেনি।

আমরা আশা করি, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুতকালে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অতীতের ব্যর্থতার কথা স্নরণে রাখবে এবং সুস্পষ্ট অঙ্গীকার প্রদান করবে। আরও আশা করি যে ইশতেহার প্রণয়নকালে তারা প্রথাগত ছকের বাইরে আসবে। গতানুগতিকভাবে নির্বাচনী ইশতেহারে দল ক্ষমতায় গেলে কী করবে না-করবে তা লিপিবদ্ধ থাকে। আমরা চাই, নির্বাচনে পরাজিত হলে এবং ক্ষমতায় না গেলেও রাজনৈতিক দলগুলো কী করবে তাও তাদের ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করবে। বিরোধী দল/জোটের অংশ হিসেবে তারা দায়িত্বশীল আচরণ করবে, নির্বাচনী ফলাফল মেনে নেবে, রাজপথের পরিবর্তে জাতীয় সংসদকে সকল সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করবে, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবে, সর্বোপরি দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ক্ষমতাসীন সরকারকে সহায়তা করবে ইত্যাদি অঙ্গীকার সকল রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দল ক্ষমতার শুধু ‘এ হার্ট বিট এওয়ে’ বা একটি হৃদস্পন্দন দূরে অবস্থান করে।

আমরা মনে করি, নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট টাইমফ্রেম বা সময়সীমা নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন। যেমন, প্রথম ১০০ দিনে, প্রথম বছরে, দ্বিতীয় বছরে, তৃতীয় বছরে, চতুর্থ বছরে এবং শেষ বছরে কী করবে তার একটি মোটা দাগের কর্মপরিকল্পনা ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। আরও বাঞ্ছনীয় ক্ষমতাসীন দলের/জোটের পক্ষ থেকে তাদের বাস্তবায়িত কর্মসূচির বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা, যাতে ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত প্রতিশ্রুতিগুলো ফাঁকা বুলিতে পরিণত না হয়। নতুন সরকারের একটি অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে, বিশেষত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো। এ ছাড়া দেশের জন্য দলের একটি দীর্ঘমেয়াদি (যেমন, ২০২১ সালের জন্য) প্রত্যাশা বা ভিশন ইশতেহারে লিপিবদ্ধ থাকা আবশ্যক।

আমরা আরও মনে করি, নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের প্রথাগত পদ্ধতির পরিবর্তন আবশ্যক। নির্বাচনী ইশতেহার সাধারণত কোনো বিজ্ঞ ব্যক্তি লেখেন, যা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট অনেকেরই সুস্পষ্ট ধারণা থাকে না। ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতায় থাকাকালে এটি পর্যালোচনা করে না এবং তা করতে দায়বদ্ধতাও অনুভব করে না। আশা করি, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় সদস্যসহ সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করবে এবং তা বাস্তবায়নের অগ্রগতি ভোটারদের নিয়মিতভাবে অবগত করবে।

নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পাওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি তা হলো: দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন রোধ; কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা; কার্যকর সংসদ নিশ্চিতকরণ; কার্যকর প্রশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা; বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ; দারিদ্র্য দূরীকরণ; অর্থনৈতিক সুশাসন ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিতকরণ; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সমস্যা দূরীকরণ; নিরক্ষরতাবিরোধী আন্দোলন সৃষ্টিকরণ; জ্বালানির সংস্থান; নারী ও বঞ্চিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠা; প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জাতীয় সম্পদের সংরক্ষণ; খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণ; উগ্রবাদের বিস্তার রোধ ইত্যাদি। দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে একটি নতুন সামাজিক চুক্তি প্রণীত হওয়া আবশ্যক বলে আমরা মনে করি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ অবশ্যই নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ছাড়া সরকার পরিচালনার মূলনীতি কী হবে তা নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন−সুশাসনের জন্য নাগরিক।
তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, ২৪ নভেম্বর ২০০৮

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s