ভোটারগণ যেন দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন

ড. বদিউল আলম মজুমদার
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের দ্বারপ্রান্তে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের নিজেদেরকে আজ প্রশ্ন করা আবশ্যক: এর পর কী? আমরা নব নির্বাচিত সরকারের কাছে কী আশা করতে পারি? সর্বোপরি, নির্বাচনের ফলাফল যাতে কাক্ষিঙত ও জাতিকে সামনে এগিয়ে নেয়ার সহায়ক হয় সেক্ষেত্রে আমরা কী করতে পারি?

তবে নির্বাচনের মাধ্যমে ভাল কিছু আশা করতে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। অন্যথায় জাতি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে, যার পরিণতি কল্যাণকর হবে না। এর ফলে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যেতে পারে এবং আমরা শাসনের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারি, যা উগ্রবাদের আরও বিস্তার ঘটাতে সহায়ক হবে।

এমনকি সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও আমরা ঝুঁকিমুক্ত নই। ঝুঁকির উদ্রেকের কারণ হল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের ব্যাকগ্রাউন্ড। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অনেক প্রার্থীরই গুরুতর অপরাধের ইতিহাস রয়েছে এবং তারা বিতর্কিত। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন রয়েছেন যারা চার্জশীটভুক্ত আসামী। চূড়ান্ত প্রার্থীদের অন্তত দুইজন রয়েছেন, যারা খুনের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত এবং যাদের দণ্ড রাষ্ট্রপতির অনুকম্পায় মওকুফ করা হয়েছে। আরো রয়েছেন দণ্ডপ্রাপ্ত একাধিক ব্যক্তি, যারা আদালতের নির্দেশে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রার্থীদের হলফনামার প্রদত্ত তথ্য থেকে আরো দেখা যায় যে, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের প্রায় ৩৮ শতাংশের বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারী মামলা ছিল এবং প্রায় এক-চতুর্থাংশের বিরুদ্ধে বর্তমানে ফৌজদারী মামলা রয়েছে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রায় ৪৯ শতাংশের বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারী মামলা ছিল এবং বর্তমানে প্রায় ৩৫ শতাংশের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এদের মধ্যে শ’খানেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ৩০২ ধারার অধীনে খুনের মামলা রয়েছে, যাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আওয়ামী লীগ মনোনীত এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিএনপি মনোনীত। এদের অনেকের বিরুদ্ধে চার্জশীটও হয়েছে। তবে কারো বিরুদ্ধে মামলা রুজু হওয়া মানেই তিনি অপরাধী নন – অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হতে হবে। এছাড়াও আমাদের দেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে অনেক সময় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। যাদের বিরুদ্ধে অতীতে মামলা ছিল তাদের অনেকেই অবশ্য খালাস পেয়েছেন কিংবা তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রেও অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে। এছাড়াও রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক অপরাধীর বিরুদ্ধে অতীতে মামলা দায়েরও করা হয়নি। উপরন্তু অনেক প্রার্থী তাদের হলফনামায় মামলার তথ্য গোপন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাই মামলার তথ্য থেকে সত্যিকারের অপরাধীর সংখ্যা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তবুও এ সকল তথ্য থেকে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে যে অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।

এছাড়াও চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় অন্তত ২১ জন রয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। আরো রয়েছেন অনেক ঋণ খেলাপি, যারা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অনেক সরকারি ঠিকাদারও আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন – সরকারের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে এমন ব্যক্তিরা সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য। উপরন্তু অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে, যারা অতীতে সংসদ সদস্য ছিলেন, গাড়ী বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এনবিআর-এর তথ্যানুযায়ী, চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে ৪৯৩ জন বা প্রায় এক-তৃতীয়াংশের টিআইএন নম্বর নেই, অর্থাৎ তারা করদাতা নন।

কলা গাছে যেমন কমলা ফলে না, তেমনিভাবে দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তদের কাছ থেকে সদাচরণ প্রত্যাশা দুরাশা মাত্র। আমাদের প্রবাদেই আছে – যেমন কর্ম তেমন ফল। পদ্ধতি সংস্কারের ফলে অপকর্ম সাধনে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব হলেও দুর্বৃত্তদের পক্ষে সহজেই পদ্ধতি এবং প্রতিষ্ঠানের ‘ম্যানিপুলেশন’ বা অপব্যবহার করা সম্ভব, যেমনটি অতীতে ঘটেছিল। তাই কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেন না যে, নির্বাচন পরবর্তীকালে বাংলাদেশ আবারো দুর্নীতিবাজদের-দুর্বৃত্তদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে না। তবে একথা জোর দিয়ে বলা যায় যে, দুর্বৃত্তরা আবারো নির্বাচিত হলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবেন এবং অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবেন।

এমন ঝুঁকি সত্ত্বেও নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক উত্তোরণের কোন বিকল্প নেই। ইতিহাস শিক্ষা দেয় যে, অনির্বাচিত সরকার জনগণের, বিশেষত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণ বয়ে আনে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সমাজে বিশেষ কোন ক্ষমতার অবস্থান নেই এবং তারা বিশেষ কোন সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করেন না। কিন্তু নির্বাচনের সময় সমাজের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের এবং দরিদ্র মানুষের ভোট একই গুরুত্ব্ব বহন করে। তাই রাজনীতিবিদদের অন্তত নির্বাচনের সময়ে দরিদ্রদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতে হয়, কারণ সমাজে তাদের সংখ্যা অধিক। বস্তুত একটি মোটামুটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে জনগণের স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থাকে, সাধারণ জনগণের জন্য কল্যাণকর। তাই তো অমর্ত্য সেন দাবি করেছেন যে, গণতান্ত্রিক সমাজে দুর্ভিক্ষ ঘটতে পারে না।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নির্বাচন ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে কিনা তা নির্ভর করে মূলত নির্বাচন পরবর্তীকালে কী ঘটে, অর্থাৎ নির্বাচিত সরকারের গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী আচরণের ওপর। কারণ নির্বাচনই গণতন্ত্র নয় – নির্বাচন গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের সূচনা করে মাত্র। গণতন্ত্র শুধুমাত্র একদিনের আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়। বস্তুত গণতান্ত্রিক শাসন নির্ভর করে দুই নির্বাচনের মাঝখানে কী ঘটে মূলত তার ওপর। যদি নির্বাচিত নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসরণ করেন, জনগণের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চর্চা করেন, জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন, সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন, তাহলেই কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। গণতন্ত্রের সত্যিকার কার্যকারিতা আরও নির্ভর করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ‘ডিপেন’ বা গভীরতা প্রদানের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণ এবং সরকারকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার ওপর। কারণ অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, ক্ষমতা, দায়-দায়িত্ব ও সম্পদ যত জনগণের কাছাকাছি পৌঁছে, তত বেশি তা তাদের কল্যাণে আসে।

আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির চর্চা এবং সুশাসন আশা করতে পারি, যদি সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়ে আসেন। এ ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করা অবশ্য নির্ভর করে কয়েকটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর। যেমন, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিক সমাজ।

নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগত মানে পরিবর্তন আনতে হলে, সৎ, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদেরকে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে মনোনয়ন দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি-বিধানের যথার্থ ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের নির্বাচনী অঙ্গন থেকে দূরে রাখতে হবে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য ভোটারদেরকে পৌঁছে দিয়ে তাদেরকে সচেতন করতে হবে। সর্বোপরি ভোটারদেরকে নির্বাচনের দিনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সাংবিধানিকভাবে দায়বদ্ধ।

আসন্ন নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যেই তাদের মনোনয়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে, যদিও তারা অনেক বিতর্কিত ব্যক্তিকে মনোনয়ন প্রদান করেছে। নির্বাচন কমিশনও বিধি-বিধানের প্রয়োগের প্রচেষ্টা চালাছে, কিন্তু কমিশন অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কঠোরতা প্রদর্শন করতে পারেনি। কমিশন এ পর্যন্ত আচরণবিধি লঙঘন এবং তথ্য গোপনের জন্য কোন প্রার্থীকে লাল-হলুদ কার্ড দেখায়নি।

গণতন্ত্র একটি ‘স্পেকটেটর স্পোর্টস’ নয়, যেখানে রাজনীতিবিদরা শুধু খেলবেন এবং জনগণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে। ‘সুজনের’ মত সংগঠনের নিরবছিন্ন প্রচেষ্টার ফলে গত কয়েক বছরে নাগরিক সচেতনতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক নাগরিক এখন সৎ, যোগ্য প্রার্থীর নির্বাচনের লক্ষ্যে সোচ্চার। গণমাধ্যম অবশ্য এ ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অনেক গণমাধ্যম এখন প্রার্থীদের হলফনামা ও আয়কর রির্টানে প্রদত্ত তথ্য ভোটারদের কাছে দিচ্ছেন, যাতে ভোটাররা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। আমরা আশা করি যে, ভোটারগণ, বিশেষত নতুন ভোটারগণ ২৯ ডিসেম্বর দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেবেন। তাহলেই নির্বাচন পরবর্তীকালে শুভ দিনের শুভ সূচনা ঘটবে। কারণ যেমন কর্ম তেমন ফলঃ।

[লেখক : সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক]
তথ্য সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ ডিসেম্বর ২০০৮

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s