গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করণীয়

‘নির্বাচন প্রাক্কালে জাতির কাছে নির্বাচনী ইশ্তেহারের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার যে প্রতিশ্রুতি করেছে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি’। গত ১১ জানুয়ারি ২০০৯, ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং সিপিডি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পীকার নির্বাচন ও ক্যাবিনেটে নতুন মুখ আসা ইতিবাচক। এখন প্রবীণদের সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে, যাতে ক্যাবিনেটের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া তিনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে বলেন, নাগরিক সমাজেরও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখা এবং মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমাদেরকে নতুন ক্ষেত্র হিসেবে ‘জনতার সংসদ’ গড়ে তুলতে হবে।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, এ সরকার দিন বদলের প্রতিশ্র“তি দিয়ে এসেছে। জনগণের মধ্যেও রয়েছে দিন বদলের আকাক্সক্ষা। তাই আমরা আশা করব – সরকার পরিচালনা ভবিষ্যতে ‘অটোমেটিক পাইলটে’ থাকবে না। মূল প্রবন্ধে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের করণীয়গুলোকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়। নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা, দুর্নীতিবাজদের বিচার নিশ্চিত করা, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার উদ্যোগ নেয়া, ‘সংবিধান পর্যালোচনা কমিটি’ গঠন ইত্যাদিকে স্বল্প-থেকে-মধ্যমেয়াদি করণীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘমেয়াদী করণীয়র মধ্যে তিনি দরিদ্রদেরকে ক্ষমতায়িত করা, তাদের সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদে তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা; খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষির ওপর অগ্রাধিকার প্রদান এবং কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক সংস্কার ও উগ্রবাদের বিস্তার রোধ ইত্যাদি বিষয়কে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেন। এছাড়া মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের তদবীরের মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠিকে অবাঞ্ছিত সুযোগ-সুবিধা প্রদান, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমে অযাচিত হস্তক্ষেপ, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি ও প্লট প্রদান প্রদান থেকে বিরত থাকারও আহ্বান জানানো হয়।

জনাব এনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পিআরএসপি নয়, সরকারের উচিত পরিকল্পনা কমিশনের নেতৃত্বে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করা। ড. হামিদা হোসেন সরকারের প্রতিশ্র“তি ও কার্যক্রমকে পর্যবেক্ষণ করতে ‘জনগণের কমিশন’ গঠনের আহ্বান জানান। জনাব শেখ শহিদুল ইসলাম সরকারের বাহুল্য ব্যয় সম্পূর্ণ বন্ধ করার অনুরোধ জানান। এছাড়া তিনি ছাত্রদের ব্যবহারের রাজনীতি বন্ধের জোরালো দাবি উত্থাপন করেন। জনাব আবুল হাসান চৌধুরী সবক্ষেত্রেই মুক্ত আলোচনার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি রেখে বলেন, পানি, জ্বালানি এবং পরিবেশ সম্পৃক্ত বিষয়কে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এ সকল প্রচেষ্টা বাঞ্ছাল হয়ে যাবে। জনাব সালমা খান বলেন, স্থানীয় জনগণের সমস্যা লাঘবে করণীয়সমূহের একটি আসনভিত্তিক তালিকা প্রস্তুত করা যেতে পারে। পারিবারিক আইনে নারীর প্রতি বৈষম্য এবং নারী নীতি বিষয়ে সরকারের অবস্থান সুস্পষ্ট করা উচিত বলেও তিনি মত দেন। সরকার পরিচালনায় নারীদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়াকে ইতিবাচক দিক হিসেবে চিহ্নিত করে বিশিষ্ট সাংবাদিক জনাব জগলুল আহমেদ চৌধুরী বলেন, ম্যান্ডেট অনুসারে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে সরকার যাতে অব্যাহত ও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায় তার জন্য মিডিয়া এবং নাগরিক সমাজের চাপ রাখা উচিত। সাবেক যুগ্ম-সচিব জনাব কে. এম নুরুল হুদা বলেন, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতার বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা উচিত।

এছাড়া আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন ড. মেহের-ই-খোদা, জনাব হান্নানা বেগম, জনাব এম এন ইসলাম তপন, জনাব রেহানা সিদ্দিকী, জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রমুখ। বৈঠকে উত্থাপিত সুজনে’র প্রস্তাবসমূহের সাথে উপস্থিত সকলেই একমত পোষণ করেন।

মূল প্রবন্ধ ডাউনলোড করুন

Advertisements