কেমন সংসদ পেলাম

ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। অনেকেই আশা করেছিলেন, এই নির্বাচন থেকে আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগত মানে পরিবর্তন আসবে- অপেক্ষাকৃত সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়ে আসবেন। আমরা কি তা পেয়েছি? ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর পক্ষ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের তাদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত হলফনামা ও আয়কর রিটার্নের প্রদত্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেছি। আমাদের বিশ্লেষণ থেকে নতুন সংসদ ও নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটিত হয়েছে।

সরকারি গেজেটে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, নবম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোট ২৬২টি আসনে জয়ী হয়েছে, যার মধ্যে আওয়ামী লীগ নিজে ২২৩টি, জাতীয় পার্টি ২৭টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ২টি ও জাসদ ৩টি আসন পেয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ৩২টি আসন লাভ করেছে, যার মধ্যে বিএনপির ২৯টি, জামায়াতে ইসলামীর ২টি এবং বিজেপির ১টি আসন অন্তর্ভুক্ত। বাকিগুলোর মধ্যে এলডিপি ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৪টি আসনে জয়ী হয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী।

প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের ৪১ জন সাবেক সাংসদ ৪৩টি আসনে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগের ২ জন সাবেক সাংসদ স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন। বিএনপির ১২৯ জন সাবেক সাংসদ বিভিন্ন টিকিটে ১৩৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এদের মধ্যে ৫৮ জন বিএনপির টিকিটে, ২ জন বিকল্প ধারার, ১ জন এলডিপির এবং ১৫ জন স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। বিএনপির সাবেক সাংসদদের মধ্যে মাত্র ১৪ জন পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। অষ্টম সংসদের জামায়াতে ইসলামী দলভুক্ত ১১ জন সাংসদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবাই পরাজিত হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সাবেক এমপিদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ফলে এসব বিতর্কিত ব্যক্তির পক্ষে ভোটারদের, বিশেষত নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির ভোটারদের মুখোমুখি হওয়া অত্যন্ত দুরূহ ছিল। তাই ‘এন্টি ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টর’ বা পদে অধিষ্ঠিত থাকাজনিত সুনাম-দুর্নামের কারণে বিএনপি-জামায়াতের অনেক সাবেক এমপি নির্বাচনে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।

নবনির্বাচিত সাংসদদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, ২৯৯টি আসন থেকে ১৯৩ জন সাংসদের মধ্যে ১৬৩ জন বা ৫৬ শতাংশ নতুন মুখ। তারা অতীতে কোনদিন সংসদে নির্বাচিত হননি। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৩২ জন বা ৫৮ শতাংশ নতুন মুখ। এদের মধ্যে আরও রয়েছেন বিএনপির ১৩ জন, জাতীয় পার্টির ১৪ জন, জামায়াতের ২ জন এবং স্বতন্ত্র ২ জন। প্রথমবারের মতো নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধেই গুরুতর কোন অভিযোগ নেই এবং মহাজোটের মহাবিজয়ের পেছনে তাদের অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ইমেজ একটি বড় কারণ।

নবনির্বাচিত ২৯৩ জন সাংসদের মধ্যে ১৪ জন সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত এবং এদের সবাই আওয়ামী লীগের সদস্য। এছাড়াও ৫৮ জন নারী ৬২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৯ জন ২৩টি আসনে বিজয়ী হয়েছেন, যার মধ্যে দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রীদ্বয় অন্তর্ভুক্ত। নির্বাচিত নারীদের মধ্যে ১৬ জন (১৮ আসন) আওয়ামী লীগ এবং ৩ জন (৫ আসন) বিএনপি দলভুক্ত। দুর্ভাগ্যবশত ২৯৩ জন নবনির্বাচিত সাংসদের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ নারী, যদিও নারীরা আমাদের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক এবং ভোটার তালিকায়ও তাদের সংখ্যা বেশি।

নির্বাচিত সাংসদদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত। আওয়ামী লীগের এমপিদের ৮২ শতাংশের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। বিএনপির এমপিদের ৭৯ শতাংশের একই ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে। শুধু ৭ শতাংশ নবনির্বাচিত সাংসদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি ও তার কম। উল্লেখ্য, কিছু সাংসদ তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন এবং কারও কারও উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি তথাকথিত ‘ডিপ্লোমা মিল’ থেকে সংগৃহীত।

পেশার দিক থেকে আওয়ামী লীগ দলভুক্ত নবনির্বাচিত সাংসদদের ৫৩ শতাংশ পেশা হিসেবে ব্যবসা তাদের হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। পক্ষান্তরে বিএনপি এমপিদের ৬৯ শতাংশের পেশা ব্যবসা। সার্বিকভাবে ৫৯ শতাংশ নবনির্বাচিত সাংসদ ব্যবসা তাদের পেশা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে নবম জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের হার আরও বেশি হবে, কারণ অনেক সাংসদই তাদের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস হলফনামায় উল্লেখ করেননি। উদাহরণস্বরূপ, ১০ জন সাংসদ পেশা হিসেবে রাজনীতি উল্লেখ করেছেন, আবার কেউ কেউ বলেছেন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা।

নবনির্বাচিত সাংসদদের মধ্যে অনেক সৎ ব্যক্তি রয়েছেন। আবার অনেকের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মহাজোটের ২৬২ জন এমপির মধ্যে ১১১ জন বা ৪৩ শতাংশের বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারি মামলা ছিল এবং ৭৪ জন বা ২৮ শতাংশের বিরুদ্ধে বর্তমানে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। পক্ষান্তরে ২৩ জন বা ৭২ শতাংশ চারদলীয় জোটভুক্ত এমপির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ছিল, বর্তমানে ৫৯ শতাংশ বা ১৭ জনের বিরুদ্ধে একই ধরনের মামলা রয়েছে। সার্বিকভাবে ২৯৯ জন এমপির মধ্যে ১৩৯ জন বা ৪৬ শতাংশের বিরুদ্ধে অতীতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল এবং বর্তমানে ৯২ জন বা ৩১ শতাংশের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। হলফনামায় প্রদত্ত ঘোষণা অনুযায়ী, অন্তত ১৮ জন সাংসদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার অধীনে খুনের মামলা রয়েছে। নির্বাচিতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপের অভিযোগ রয়েছে এবং তাদের মধ্যে অন্তত ২ জন যুদ্ধাপরাধী বলে অনেকের অভিযোগ।

নবনির্বাচিত সাংসদদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। আমরা অন্তত ৫৪ জন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত প্রার্থীকে চিহ্নিত করতে পেরেছি- ২৯ জন বিএনপির এবং ১৭ জন আওয়ামী লীগের- যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এসব বিতর্কিত ব্যক্তির মধ্যে ২৪ জন নির্বাচিত হয়েছেন, যার মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৭ জন এবং বিএনপি’র ৬ জন রয়েছেন। নির্বাচিতদের মধ্যে একজন দুর্নীতির অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্তও রয়েছেন।

একথা সুস্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, কারও বিরুদ্ধে মামলা হওয়া মানেই তিনি অপরাধী নন- অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হতে হবে। এছাড়া আমাদের দেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে অনেক সময় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। যাদের বিরুদ্ধে অতীতে মামলা ছিল, তাদের অনেকেই অবশ্য খালাস পেয়েছেন কিংবা তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রেও অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, শোনা যায় চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর কয়েক হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরও করা হয় না। উপরন্তু অনেক প্রার্থী তাদের হলফনামায় মামলার তথ্য গোপন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই মামলার তথ্য থেকে সত্যিকারের অপরাধীর সংখ্যা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তবুও এসব তথ্য সংসদ নির্বাচনে যে অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি নির্বাচিত হয়েছেন, তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। অর্থাৎ অপরাধের রাজনীতিকরণ আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা।

হলফনামায় প্রাপ্ত তথ্য থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, বিএনপি অপেক্ষাকৃত বেশি সংখ্যক বিতর্কিত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েছে এবং ভোটাররাও তাদেরকে চরমভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। বস্তুত বিএনপি তার মনোনয়নে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়নি বলে অনেকের অভিযোগ, যার ফলে অনেক ভোটার দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্তত দু’জন ছিলেন যারা খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এবং রাষ্ট্রপতির অনুকম্পায় ক্ষমা পেয়ে জেলমুক্ত। এছাড়াও ছিলেন অনেক গডফাদার এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ও দুর্নামগ্রস্ত ব্যক্তি। উপরন্তু চারদলীয় জোটের অংশীদার জামায়াতের প্রার্থীদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। অনেক ভোটারের মধ্যেই এ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে, এসব বিতর্কিত ব্যক্তিকে নির্বাচিত করার অর্থ দাঁড়াবে তাদের অতীতের সব গর্হিত কাজের প্রতি সমর্থন জোগানো, যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলবে। ফলে দুর্নীতিবাজ-দুর্বৃত্তদের ঠেকানোর মানসিকতাই ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক ভোটারদের মধ্যে কাজ করেছে বলে প্রতীয়মান হয়, যা চারদলীয় জোটের বিপক্ষে গিয়েছে। এক অর্থে এটি ছিল অনেকটা ‘রেফারেন্ডাম’ বা গণভোটের মতো।

নবনির্বাচিতদের হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে প্রদত্ত সম্পদের তথ্যও প্রণিধানযোগ্য। এনবিআরের সূত্র মতে, নির্বাচিত সাংসদদের মধ্যে মাত্র দু’জনের টিআইএন নম্বর নেই, অর্থাৎ তারা করদাতা নন। তবে তাদের একটি বড় অংশ কোটিপতি। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী নির্বাচিতদের মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশ কোটিপতি, যাদের নিজ ও নির্ভরশীলদের নামে ন্যূনতম এক কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। তবে এ হিসাবে কোটিপতিদের সংখ্যা অনেক কম করে দেখানো হয়েছে, কারণ সাংসদদের অনেকেই তাদের হলফনামায় সম্পদের তালিকা দিলেও মূল্য উল্লেখ করেননি এবং তাদের আমাদের হিসাব থেকে বাদ রাখা হয়েছে। যৌথ মালিকানার সম্পদও আমাদের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অনেকে সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই নির্বাচিতের সব ঘোষিত-অঘোষিত সম্পদের বর্তমান মূল্য ধরলে আমাদের সংসদ কোটিপতিদের ক্লাবে পরিণত হবে বলে অনেকের ধারণা। কোটিপতি হওয়ায় কোন দোষ নেই, তবে জাতীয় সংসদ কোটিপতির ক্লাবে পরিণত হওয়া প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের- যেখানে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে- ধারণার পরিপন্থী। এছাড়াও প্রশ্ন থেকে যায়, তাদের সম্পদের উৎস বৈধ কি অবৈধ?

এটি সুস্পষ্ট যে, অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি নবম সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন, যা কোনভাবেই কাঙিক্ষত নয়। অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের বহু নতুন মুখও সংসদে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন, যাদের মধ্য থেকে একঝাঁক নতুন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসা সম্ভব- এমন নেতৃত্ব যারা ব্যক্তি বা কোটারি স্বার্থের পরিবর্তে জনকল্যাণে নিবেদিত হবেন। আমরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপায়িত হবে কিনা, তা বহুলাংশে নির্ভর করবে আমাদের নেতৃত্বের উদারতা, চিন্তাশীলতা ও প্রজ্ঞার ওপর।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক
তথ্য সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ১৪ জানুয়ারি ২০০৯

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s