গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে করণীয়

ড. বদিউল আলম মজুমদার

গত ২৯ ডিসেম্বর, ২০০৮ অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। নবগঠিত সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যান্ডেট হলো রাষ্ট্রে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং সুশাসন কায়েম করা। এ লক্ষ্যে কী কী করণীয়-দ্রুততার সাথে ও দীর্ঘমেয়াদীভাবে? এ সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা তুলে ধরাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য। এ প্রসঙ্গে জোর দিয়ে বলা প্রয়োজন যে, উল্লেখিত বিষয়গুলোই চূড়ান্ত তালিকা নয়-এগুলোর সাথে আরো অনেক কিছু যুক্ত হতে হবে।

গণতন্ত্র হলো জনগণের নিজেদের শাসন বা স্ব-শাসন। আব্রাহাম লিঙ্কনের ভাষায়, “government of the people, by the people, for the people” অর্থাৎ গণতন্ত্র হলো জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য। বহুল ব্যবহৃত এবং সর্বজনস্বীকৃত এ সংজ্ঞানুযায়ী, প্রকৃত গণতন্ত্র হলো সরাসরি গণতন্ত্র বা ‘ডিরেক্ট ডেমোক্রেসি’। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়-যে সকল সিদ্ধান্ত তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে সে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।

কিন্তু লক্ষ-কোটি জনগণ নিয়ে গঠিত আধুনিক রাষ্ট্রে সরকার পরিচালনায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। সকল নাগরিকের পৰে আইনসভায় আসন গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তাই উদ্ভব হয়েছে ‘রিপ্রেজেন্টেটিভ ডেমোক্রেসি’ বা প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার। এ ব্যবস্থায় জনগণের সম্মতির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণ সরাসরি অংশগ্রহণ না করে সে দায়িত্ব তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর অর্পণ করে। তবে প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে প্রশাসনের সকল স্তরে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা আবশ্যক, যা আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার। আর এর মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হয়। অর্থাৎ গণতন্ত্র আর সুশাসন ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়াই যথেষ্ট নয়। এজন্য আরও প্রয়োজন আইনের শাসন, মানবাধিকার সংরক্ষণ, সমাজের সকল স্তরে বিশেষত নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা, সমাজের সকল শ্রেণীর প্রতি ন্যায়পরায়ণতা, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার চর্চা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ ইত্যাদি। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এগুলোই ছিল মুক্তিযুদ্ধের পেছনের মূল চেতনা ও প্রেরণা।

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়-নির্বাচন গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত মাত্র। নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের যাত্রাপথের সূচনা হয় এবং এর সফলতা নির্ভর করে মূলত নির্বাচিত সরকার কী-করে, না-করে তার ওপর। অর্থাৎ দুই নির্বাচনের মাঝখানে নির্বাচিত সরকারের কার্যক্রম ও আচার-আচরণই নির্ধারণ করে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে কি না।

গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নবগঠিত সরকারের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। আরও করণীয় রয়েছে সংসদে যারা বিরোধী দলে রয়েছেন তাদের। সরকারকে অবশ্যই তার নির্বাচনী ওয়াদা এবং অন্যান্য বিষয়ে জনগণের ‘ম্যান্ডেট’ বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে সংসদীয় গণতন্ত্রে ‘ট্রেজারি বেঞ্চ’ বা সরকারি দল ও বিরোধী দল নিয়েই সরকার। তাই বিরোধী দলের সহায়তা, দায়িত্বশীলতা ও গঠনমূলক সমালোচনা সরকারের সফলতার জন্য অপরিহার্য। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ । গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব চাটুকারি ভূমিকার পরিবর্তে সরকারের অগ্রাধিকার নির্ণয়ে সহায়তা করা এবং সরকার ও সরকার বিরোধীদের ভুল-ক্রটি ধরিয়ে দেয়া।

গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের করণীয়গুলোকে দু’ভাবে বিভাজন করা যায় – স্বল্প-থেকে-মধ্যমেয়াদি করণীয় ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয়। এ বিভাজন দুরূহ এবং অনেকটা মনগড়া, কারণ দীর্ঘমেয়াদি করণীয়গুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। স্বল্পমেয়াদি বা আশু করণীয় কাজগুলো প্রথম ১০০ দিনের কর্মসূচি হিসেবে অগ্রাধিকার পেতে পারে।

স্বল্প-থেকে-মধ্যমেয়াদী করণীয়

নির্বাচন প্রাক্কালে দিন বদলের অঙ্গীকার হিসাবে প্রকাশিত নির্বাচনী ইশ্‌তেহার জাতির সাথে আওয়ামী লীগের একটা অলিখিত চুক্তি, যা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজন একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন। আভ্যন্তরীণ বিষয় ছাড়াও বহির্র্বিশ্ব সম্পর্কিত কার্যক্রমগুলো সম্পর্কেও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। কর্মপরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, (যেমন, ১০০ দিন, ছয় মাস, এক বছর ইত্যাদি) টার্গেট ও মাইলস্টোন নির্ধারণ করা। এর ফলে সরকারের পক্ষে এগুলো অর্জনের ক্ষেত্রে নিবিষ্ট থাকা এবং কার্যক্রমের ফলপ্রসূতা নিরূপণ করা সম্ভব হবে। এ ধরনের টার্গেট ও মাইনস্টোন নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যানেজমেন্ট টুল বা ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার হতে পারে।

আইন-শৃঙখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের অন্যতম আশু করণীয়। এ লক্ষ্যে আইন ও বিধি-বিধানের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সন্ত্রাসী ও আইন-শৃঙখলার প্রতি হুমকি এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে, তারা যে দলেরই হোক না কেন, যথাযথ আইনসম্মত ব্যবস্থা ত্বরিত গতিতে নিতে হবে। এ ব্যাপারে আপন-পর বিবেচনায় কোনোরূপ শিথিলতা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দিতে পারে। প্রসঙ্গত, অতীতের ন্যায় প্রত্যাহার করার পরিবর্তে সকল মামলা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত হলেও, বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষপত্তি করা আবশ্যক।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সরকারের ঘোষিত গুরুত্বপূণর্ণ অগ্রাধিকার। এ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অধিক উৎপাদন, সরবরাহ বৃদ্ধি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা উৎসাহিতকরণ। এ লক্ষ্যে আশু করণীয় হতে পারে বাজার পরিস্থিতির দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখা এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তুসামগ্রীর, প্রয়োজনে আমদানীর মাধ্যমে, সরবরাহ বৃদ্ধি করা। ভবিষ্যতে অবশ্য টিসিবি’র (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) মত প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে হবে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যান্ডেট। তাই এ কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য জাতিসংঘের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে বলে অনেকে মনে করেন। আরও প্রয়োজন হবে যথাযথ তথ্য ও উপাত্ত একত্রীকরণ। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পদক্ষেপ দ্রুততার সাথে গ্রহণ করতে হবে।

আওয়ামী লীগ দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে চলমান রাখার অঙ্গীকার জনগণকে দিয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের মন্ত্রীসভা থেকে দূরে রেখে এ অঙ্গীকারের প্রতি সরকার তার আন্তরিকতা প্রদর্শন করেছে। সরকারের অনমনীয়তা প্রদর্শনের জন্য এখন যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা আছে কিংবা যাদের সম্পর্কে দুর্নীতির প্রমাণ আছে তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আরও নিশ্চিত করতে হবে, কোনোভাবেই যেন দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের ‘রাজনীতিকরণ’ না হয়। একইসাথে দুর্নীতির কারণ নিরূপণ করে তা দূরীভূতকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়াও ঘুষের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা (যেমন, ফাইল ব্যবস্থাপনার ৰেত্রে) গ্রহণ করতে হবে। ঘুষ-দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের লক্ষ্যে প্রতি মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় ন্যায়পাল নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে হলে সংসদকে কার্যকর করার কোন বিকল্প নেই। এটি একটি দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া হলেও এ সম্পর্কে কিছু আশু করণীয় রয়েছে। আমরা আনন্দিত যে, সরকার বিরোধী দলকে ডিপুটি স্পিকার পদ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। আমরা আশা করি যে, বিরোধী দলের সাথে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে যথাযথ ব্যক্তিকে এ দায়িত্ব প্রদান করা হবে। সংসদের দায়িত্ব হলো বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠান, আইন প্রণয়ন ও পার্লামেন্টে স্ট্যান্ডিং কমিটির মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ। সংসদে গঠনমূলক বিতর্ক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্পিকারের ভূমিকা, বিশেষত তার নিরপেক্ষতা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ । তাই একজন প্রজ্ঞাশীল ব্যক্তিকে স্পিকারের ও ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব দিতে হবে এবং তাদের দল থেকে পদত্যাগ করা বাঞ্ছনীয় হবে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের নিবিষ্ট রাখার লক্ষ্যে সংসদ পদকে একটি সার্বক্ষণিক কার্যক্রমে পরিণত করতে হবে এবং এ ব্যাপারে তাদেরকে যথাযথ সাচিবিক ও বিশেষজ্ঞ সহযোগিতাও দিতে হবে।

পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলো দ্রুততার সাথে গঠন করতে হবে এবং গুরুত্বপূণৃ কমিটির, বিশেষত ‘পাবলিক একাউন্টস্‌ কমিটি’র সভাপতির পদ বিরোধী দলের একজন সদস্যকে দিতে হবে। একইসাথে মাননীয় সংসদ সদস্যদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন এবং একটি পার্লামেন্টারী ‘এথিকস্‌ কমিটি’ গঠনের মাধ্যমে এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আচরণবিধির অংশ হিসেবে প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে বিস্তারিত সম্পদ ও দায়-দেনার হিসাব প্রকাশ এবং প্রতি বছর এগুলো আপডেট করতে হবে। মন্ত্রীপরিষদের অন্যান্য সদস্যদের জন্য একই বিধান করতে হবে।

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার শ্লোগানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রতি অগ্রাধিকার প্রদানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এ খাতের বিস্তারের মাধ্যমে আমাদের তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একইসাথে তথ্যপ্রযুক্তি হতে পারে সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জনকল্যাণে জারি করা সবগুলো অধ্যাদেশকে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই প্রাথমিকভাবে অনুমোদনের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। তবে পরবর্তীকালে এগুলোকে যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে সংশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। (চলবে)

[লেখক: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক]
তথ্য সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ১৫ জানুয়ারি ২০০৯

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s