কার্যকর ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় করণীয়

উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে সাংসদদের কোনো বিরোধ থাকা উচিত নয়। তাঁদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তা না হলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে যাবে। গত ২ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিকর আয়োজনে ‘কার্যকর ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, আমরা একটি প্রাণবন্ত, স্বনির্ভর ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা চাই। আর এর যাত্রা শুরু হয়েছে উপজেলা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। আইনে চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যানের ক্ষমতা পরিষদকে দেয়া আছে, সুতরাং পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে এটিকে কার্যকর করে তুলতে হবে। তিনি লোকাল লেভেল প্ল্যানিং-এর ওপর গুরুত্বারোপ করে আরো বলেন, এই চর্চাটি পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন।

মূল প্রবন্ধে ড. বদিউল আলম মজুমদার স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব, সাংবিধানিক ভিত্তি ও বর্তমান বাস্তবতার নানা দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচি হাতে নিতে হবে, যাতে আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত, এমপিদের খবরদারিমুক্ত ও প্রয়োজনীয় দায়িত্ব ও সম্পদ প্রাপ্ত স্বায়ত্ত্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। এ লক্ষ্যে এডিপি’র একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (যেমন: এক-তৃতীয়াংশ) স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, জেলা পরিষদের বিদ্যমান আইনের সংশোধন করে দ্রুততার সাথে নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিয়ন পরিষদ, ঢাকা সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোয় স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। এছাড়া মূল প্রবন্ধে ‘ওয়ার্ড সভাকে’ কার্যকর করা, অডিট ব্যবস্থাকে কার্যকর ও দুর্নীতিমুক্ত করা, সংরক্ষণ পদ্ধতি বাতিল করে রোটেশন পদ্ধতিতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে স্থানীয় সরকারের সকল স্তরে নারীর ‘অন্তর্ভুক্তি’ নিশ্চিত করাসহ আরো অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

জনাব এনাম আহমেদ চৌধুরী একটি ‘কোড অব কনডাক্ট’ বা আচরণবিধি প্রণয়ন করার প্রস্তাব উত্থাপন করে বলেন, যে যার ভূমিকা যদি ঠিকমতো পালন করেন, তাহলে সেখানে সংঘাতের সম্ভাবনা থাকবে না। স্থানীয় সরকার কমিশনের সদস্য জনাব হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থায়ন, এজন্য থোক বরাদ্দের পরিবর্তে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদাভাবে বাজেট করা যায় কি না এ দিকটি ভেবে দেখা যেতে পারে। জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ উপস্থিত চেয়ারম্যান ও ভাইস-চেয়ারম্যানদের উদ্দেশ্যে বলেন, স্থানীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশের দিকে নজর দিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন, ছাত্রীদের উত্যক্ত, নারী নির্যাতন – এসবের দায় নিতে হবে উপজেলা চেয়ারম্যানদের।

উপজেলা চেয়ারম্যানদের মধ্যে সুনামগঞ্জ জগন্নাথপুরের জনাব আতাউর রহমান বলেন, কোনো ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া যেন আমাদেরকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। নতুন প্রজন্মকে উপজেলা পরিষদের গুরুত্ব তুলে ধরার আহ্বান জানান পাবনা চাটমোহরের জনাব একেএম সামসুদ্দিন। সিরাজগঞ্জ রায়গঞ্জের জনাব এবিএম আব্দুস সাত্তার বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্যদের হস্তক্ষেপ যেন কোনো অবস্থাতেই শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিন্যাসের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি না করে। যদি তা করা হয় তাহলে প্রতিরোধ গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তিনি। নাটোর গুরুদাসপুরের জনাব সরকার এমদাদুল হক সংবিধানের কথা উল্লেখ করে বলেন, যার যার কাজ তারই সেটা করা উচিত। ময়মনসিংহ হালুয়াঘাটের জনাব আলী আজগর বলেন, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হলে আর্থিকভাবেও একে শক্তিশালী করে তুলতে হবে। চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ডের জনাব আব্দুল্লাহ আল বাকের ভূঁইয়া বলেন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণের ক্ষেত্রে সংবিধান যাতে কোনোভাবেই লঙ্ঘিত না হয়, সেজন্য সকলকে সজাগ থাকতে হবে। মানিকগঞ্জ ঘিওরের জনাব আফজাল হোসেন খান বলেন, উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তার সাথে চেয়ারম্যানদের দায়িত্বের যে বিভাজন হয়েছে সেটার সংশোধন দরকার। কুমিল্লা লাকসামের মজির আহমদ বলেন, আমলা বা এমপি’রা উপজেলা পরিষদের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ করলে উপজেলা উন্নয়ন ব্যাহত হবে ও সার্বিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হবে। উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী করতে হলে অবশ্যই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের মাধ্যমেই তা করতে হবে উল্লেখ করে সিরাজগঞ্জ উল্লাপাড়ার জনাব মোহাম্মদ জাহেদুল হক বলেন, সাংসদদের সাথে উপজেলা চেয়ারম্যানদের কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব আমরা চাই না। প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের অপসারণ করার বিধানের সমালোচনা করেন শেরপুর নালিতাবাড়ীর জনাব বদিউজ্জামান বাদশা। পটুয়াখালী দুমকির জনাব হারুন অর রশীদ বলেন, এমপি এবং চেয়ারম্যানদের কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া উপজেলা চেয়ারম্যানদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন, কুমিল্লা চান্দিনার জনাব মোঃ নাজমুল আহসান মজমুদার, ফরিদপুর আলফাডাঙ্গার জনাব খান বেলায়েত হোসেন, কুড়িগ্রাম উলিপুরের জনাব কফিল উদ্দিন প্রমুখ।

উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যানদের মধ্যে কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামের জনাব রাশেদা আক্তার বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সুফল যেন সত্যিকারার্থে সাধারণ জনগণ পেতে পারে এজন্য আমাদের কাজ করে যেতে হবে। আর নারীরা অধঃস্তন অবস্থা থেকে যে জায়গায় অধিষ্ঠিত হয়েছে তাতে তাদেরকে ছোট করে দেখার আজ কোনো অবকাশ নেই। নারী-পুরুষ উভয়ে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে গাইবান্ধা পলাশবাড়ীর আনজুমান আরা বেগম বলেন, নারীরা যেন কোনোভাবেই অবহেলিত না হন। এছাড়া ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন চান্দিনার জনাব সাফিয়া আক্তার, মাগুরা মুহম্মদপুরের জনাব স্বপ্না রাণী বিশ্বাস, কুমিল্লা চান্দিনার জনাব মোসলেহ উদ্দিন, মৌলভীবাজার কলমগঞ্জের জনাব খন্দকার মোহাম্মদ হোসেন প্রমুখ।

অন্যান্যের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন, সাবেক সংসদ সদস্য জনাব মোস্তাফিজুর রহমান, জনাব কেএম নুরুল হুদা, বাংলাদেশ চেয়ারম্যান সমিতির সভাপতি ও নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব এনায়েত হোসেন মন্টু, জনাব মতিউর রহমান তপন প্রমুখ। এছাড়া গোলটেবিল আলোচনায় আরো উপস্থিত ছিলেন জনাব এম হাফিজউদ্দিন খান, ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, প্রফেসর কামাল আতাউর রহমান, জনাব সেলিমা মসির, প্রফেসর হাফিজুর রহমান কার্জন প্রমুখ। এছাড়া গোলটেবিল বৈঠকে উত্থাপিত সুপারিশসমূহের সাথে উপস্থিত সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেন।

মূল প্রবন্ধ ডাউনলোড করুন

Advertisements