গণতন্ত্র: সংসদকে কার্যকর করতে হলে

বদিউল আলম মজুমদার
সংসদ বা আইনসভা সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল ধারক বা কেন্দ্রবিন্দু। বস্তুত, সংসদ যতটুকু কার্যকর, গণতন্ত্র ততটুকুই ফলপ্রসূ। আমাদের অষ্টম জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে ব্যাপক অসন্তষ্টি রয়েছে। বিগত সংসদের অকার্যকারিতা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শুধু দুর্বলই করেনি, বরং খাদে ফেলে দিয়েছিল। তাই বর্তমান সংসদকে অবশ্যই কার্যকর করতে হবে−এর কোনো বিকল্প নেই। একটি কার্যকর সংসদের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক। এসব বৈশিষ্ট্য তার গঠনপ্রসূত ও আচরণসম্পর্কিত। বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

নিবিষ্টতা: আধুনিক রাষ্ট্র তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে−নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগ। এসব বিভাগ স্বাধীন এবং তারা পরস্পরের ওপর নজরদারিত্ব রাখে, যাতে কোনো বিভাগের বাড়াবাড়ির জন্য নাগরিকের অধিকার খর্ব না হয়। নজরদারিত্বের ভূমিকা যাতে খর্ব না হয়, সে জন্য তারা একে অপরের কাজে জড়িত হয় না। জাতীয় সংসদ আমাদের আইনসভা। আমাদের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নীতিনির্ধারণী বিতর্ক অনুষ্ঠান, আইন প্রণয়ন ও সংশোধন এবং নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ মূলত আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। এসব কাজে নিবিষ্ট থাকলেই সংসদ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে মাননীয় সংসদ সদস্যরা যদি স্থানীয় উন্নয়নকাজে যুক্ত হয়ে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেন, তাহলে একদিকে যেমন সংবিধান লঙ্ঘিত হবে, একই সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আঁতাত অথবা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে এবং মাননীয় সংসদ সদস্যদের অতীতের ন্যায় অনেক অন্যায় ও অনৈতিক কাজে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। তাই নিশ্চিত করতে হবে, জাতীয় সংসদের সদস্যরা যেন স্থানীয় নেতৃত্বের ‘কক্ষপথে’ প্রবেশ করে সংঘর্ষে লিপ্ত না হয়।

প্রতিনিধিত্বশীলতা: সংসদে সমাজের সব স্তর ও ক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে, যাতে করে এতে জাতীয় ও লিঙ্গীয় বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হয়। এতে প্রান্তিক ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকা আবশ্যক। সমাজের সব শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংসদের একটি অনন্য দায়িত্ব হলো বিতর্ক ও সমঝোতার মাধ্যমে বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরোধপূর্ণ স্বার্থ ও প্রত্যাশার সমন্বয় সাধন। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের অষ্টম সংসদে যেমন ব্যবসায়ীদের আধিক্য ছিল, বর্তমান সংসদেরও সে বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। বস্তুত, আমাদের সংসদ বহুলাংশে কোটিপতিদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে, যা সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল সংসদীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। নিশ্চিত করতে হবে, তাঁরা যেন তাঁদের পদমর্যাদা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধি না করতে পারেন।

গুণগত মান: কারা সদস্য হলেন তার ওপরও বহুলাংশে নির্ভর করে সংসদ কতটুকু কার্যকর। যদি বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়, তাহলে সংসদকে কার্যকর ও জনকল্যাণমুখী করা দুরূহ হতে বাধ্য। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতাও কার্যকর সংসদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সৌভাগ্যবশত, আমাদের নবম জাতীয় সংসদে প্রায় ৮০ শতাংশ স্মাতক ও স্মাতকোত্তর ডিগ্রির অধিকারী। কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি সংসদে নির্বাচিত হলেও, অনেক দুর্নামের ভাগিদার নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পারেননি। সবচেয়ে আশার কথা, আমাদের সংসদ সদস্যদের একটি বিরাট অংশ নতুন এবং তাঁদের অনেকের ব্যাকগ্রাউন্ডও পরিচ্ছন্ন। তাঁদের নিবেদিত প্রচেষ্টা নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন সংসদ কার্যকর হবে, একই সঙ্গে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একঝাঁক নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায়িত হবেন। তবে তাঁদের জন্য জরুরিভিত্তিতে প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে। এর ফলে সংসদের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে।

স্বচ্ছতা: সংসদের কার্যকলাপ জাতির কাছে উন্নুক্ত হতে হবে। সংসদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যেতে পারে এর কার্যক্রমসম্পর্কিত তথ্যাদি গণমাধ্যমের সহায়তায় ব্যাপকভাবে প্রচারের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে সংসদ অন্য সব প্রতিষ্ঠানের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। এ লক্ষ্যে স্থায়ী কমিটির সভাসহ সব সংসদীয় কার্যক্রম সব গণমাধ্যমের জন্য উন্নুক্ত করতে হবে।

অভিগম্যতা: সংসদীয় কার্যক্রমের অভিগম্যতা (accessibility) কার্যকর সংসদ গঠনের একটি অন্যতম পূর্বশর্ত। তাই বিবেচনাধীন আইনের খসড়া নিরীক্ষণ করতে সংসদকে জনগণের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রকাশ্য শুনানীর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্বার্থসংশ্লিষ্ট গ্রুপের মধ্যে উন্নুক্ত আলোচনার সুযোগ করে দিতে হবে। এ ছাড়া সংসদকে স্বচ্ছতার সীমারেখার মাঝে লবিং কার্যক্রম সীমিত রাখার জন্য আইনি বিধান করতে হবে।

জবাবদিহিতা: সাংসদদের অবশ্যই এর কার্যক্রমের জন্য নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে জবাবদিহি থাকতে হবে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হবে তাদের কার্যক্রম মনিটরিং এবং এ সম্পর্কে যথাযথ রিপোর্টিং। এ লক্ষ্যে সংসদীয় এথিক্স কমিটি গঠন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের জন্য সিটিজেনস মনিটরিংয়ের আয়োজন করা যেতে পারে। অবশ্যই তাঁদের জন্য কঠোর নৈতিক মান ও কার্যকর আচরণবিধি মানার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। ভিন্নমুখী স্বার্থের সংঘাত এড়াতে সংসদ সদস্যদের তাঁদের নিজস্ব স্বার্থ, আয় ও সম্পদসংক্রান্ত তথ্য সম্পর্কে নিয়মিতভাবে সবাইকে অবহিত করতে হবে। অবশ্য নতুন সরকার ইতিমধ্যে এ ধরনের একটি ঘোষণা দিয়েছে।

স্বাধীনতা: সংসদের সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য যেসব পদ্ধতি ও সম্পদের প্রয়োজন, তার জোগান দিতে হবে। নিজস্ব বাজেট ও কমিটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এর অন্তর্ভুক্ত। আমলাদের বাইরে সংসদের নিজস্ব ও দলনিরপেক্ষ কর্মচারী-কর্মকর্তা থাকা আবশ্যক। স্বাধীন গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সক্ষমতাও জরুরি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ফলপ্রসূ করার জন্য সংসদ যাতে ‘রাবার স্ট্যাম্পিং বডি’ না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

ফলপ্রসূতা: ফলপ্রসূতা অর্জনের জন্য সংসদীয় কার্যক্রমকে যথাযথভাবে ও প্রথামাফিক পরিচালনা এবং সাংসদদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসন বিভাগের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে যথাযথ পদ্ধতি থাকতে হবে এবং এর জন্য পর্যাপ্ত ক্ষমতা ও সম্পদের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নে ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে খোলামেলা বিতর্কের সুযোগ থাকতে হবে, যার জন্য অবশ্য সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের, একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানসিকতা পরিবর্তনের প্রয়োজন। বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদনে এবং অনুমোদিত বাজেট নিরীক্ষণে সংসদের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। সংসদ ভবন কিংবা সাংসদদের জন্য নির্দিষ্ট আবাসনে অফিস, স্টাফ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাঁরা যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে সংসদ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন। এ ছাড়া উত্তেজনাময় ও সংঘাতপূর্ণ সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে সংসদকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হবে। উপরনতু, সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদে নিয়োগ ও আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহ সংসদ দ্বারা অনুমোদিত হওয়ার বিধান এবং তা প্রয়োগ করা আবশ্যক।

কার্যপদ্ধতি: কার্যকর সংসদের জন্য যথাযথ কার্যপদ্ধতি আবশ্যক। অনেকের মতে, আমাদের জাতীয় সংসদের জন্য প্রযোজ্য কার্যপদ্ধতি যুগোপযোগী নয় এবং এগুলোর সংস্কার জরুরি। বিশেষত সাংসদদের অধিকার সংজ্ঞায়িতকরণ পুনর্মূল্যায়ন হওয়া আবশ্যক। দায়িত্ব পালনের সময় ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে তাঁদের বিশেষ সুবিধা প্রদানের যৌক্তিকতা নেই। যৌক্তিকতা নেই তাঁদের ট্যাক্স ফ্রি গাড়িসহ অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানেরও। নাগরিকদের একটি বিরাট অংশ তিনবেলা পেট পুরে খেতে পায় না। অন্যদিকে আমাদের সাংসদদের অধিকাংশই বিত্তশালী। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও স্থানীয় সরকারে জোরালো ভূমিকার ব্যাপারে সাংসদদের নিজেদের মধ্যে মতৈক্য থাকলেও জনগণ বিষয়টিকে নেতিবাচক মনে করে।

নেতৃত্ব: স্পিকার হলেন সংসদের অভিভাবক। সুতরাং স্পিকারের দায়িত্ব সংসদের গণতান্ত্রিক চরিত্র যাতে বাস্তবে বজায় থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখা। স্পিকারের প্রাত্যহিক কর্তব্যের মধ্যে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত তা হলো, সংসদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করা, এর কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচার বজায় রাখা, সংসদীয় নজরদারি নিশ্চিত করা, সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংসদের প্রতিনিধিত্ব করা এবং এর প্রশাসনিক কার্যক্রম দেখাশোনা করা। তাঁকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, এমন সংসদীয় পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে সংসদ একটি মুক্ত, স্বাধীন বিতর্ক ও আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে নিয়োজিত করা এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী ও আইনসভার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও তাঁর দায়িত্ব। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরাজমান অসহনশীল এবং পরস্পরের প্রতি বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের কারণে আমাদের স্পিকারের সমঝোতা সৃষ্টিকারীর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য স্পিকারের নিরপেক্ষতা অবশ্যই প্রশ্নাতীত হতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত অতীতে আমাদের অনেক স্পিকার নগ্নভাবে পক্ষপাতিত্ব করেছেন এবং সংসদকে অচল করার ব্যাপারে ন্যক্কারজনক ভূমিকা রেখেছেন।

পরিশেষে, সংসদীয় গণতন্ত্রের কেন্দ্রস্থল জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করতে হলে ট্রেজারি বেঞ্চের ভূমিকা সর্বাধিক হলেও, বিরোধী দলের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা আশা করেছিলাম যে গত দুই বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিক্ষা নেব এবং নবম জাতীয় সংসদকে কার্যকর করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাই সদিচ্ছা প্রদর্শন করবেন। কিনতু আসন বণটনের তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমাদের সাবেক স্পিকারের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা, বিরোধী দলের অনাকাঙ্ক্ষিত সংসদ বর্জন এবং সরকারি দলের অনুদার আচরণ অনেক নাগরিককেই ইতিমধ্যে হতাশ করেছে। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট সবাই দায়িত্বশীল আচরণ করবেন এবং অতীতের অসহযোগিতার সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে উঠে জরুরি ভিত্তিতে নবম জাতীয় সংসদকে সত্যিকারভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেবেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে এটা জাতির প্রাপ্য।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন−সুশাসনের জন্য নাগরিক।
তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৯

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s