প্রস্তাবিত ‘উপজেলা আইন’ বিষয়ে সুজনে’র সংবাদ সম্মেলন

নবনির্বাচিত সরকার গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রণীত ‘স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) অধ্যাদেশ, ২০০৮’ অনুমোদন না করে একটি নতুন আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকার ১৯৯৮ সালের ‘উপজেলা পরিষদ আইনে’ দু’টি ভাইস চেয়ারম্যান পদের বিধান যুক্ত করে তা পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে। ১৯৯৮ সালের আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫-এর অধীন একক আঞ্চলিক এলাকা হইতে নির্বাচিত সংসদ সদস্য পরিষদের উপদেষ্টা হইবেন এবং পরিষদ উপদেষ্টার পরামর্শ গ্রহণ করিবে।’ অর্থাৎ আইনের এই বিধানটি কার্যকর হলে উপজেলা পরিষদ সংসদ সদস্যদের কর্তৃত্বে পরিচালিত হবে। সংশ্লি¬ষ্ট সংসদীয় কমিটি উপজেলা পরিষদে সাংসদদের কর্তৃত্ব বহাল রেখে ইতোমধ্যেই তাদের সুপারিশ পেশ করেছে। শোনা যায়, কমিটি স্থানীয় সরকারের অন্যান্য স্তরেও সংসদ সদস্যদের যুক্ত করার পক্ষে মতামত প্রদান করেছে। এ ধরনের একটি পরিস্থিতিতে গত ৩১ মার্চ, ২০০৯ বিকাল ৩টায় ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে প্রস্তাবিত ‘উপজেলা আইন’ বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে ‘সুজন’ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ-এর সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় সুজনে’র পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন ‘সুজন’ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। এ সময় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে সংসদ সদস্যদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এ উদ্যোগে ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিকে’র পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

আমরা চাই একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৃণমূল থেকে গঠিত হোক। আমরা এমপিতন্ত্র চাই না, আমরা চাই জনগণতন্ত্র। আর জনগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে উল্লেখ করে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, আইনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের স্থানীয় সরকারের কর্তৃত্ব দেয়া হলে এটা কেবল সংবিধান বিরোধীই হবে না। একইসাথে এটি হবে সুপ্রিম কোর্টের দেয়া নির্দেশনা, বিধান ও রায়েরও পরিপস্থি। সরকারি দল ও বিরোধী দলের নির্বাচনী ইশতেহারের কথা তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, ইশতেহারে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে সুতরাং নতুন আইনের মাধ্যমে যেন সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ না হয় সেটাই আমাদের কাম্য।

লিখিত বক্তব্যে ড. বদিউল আলম মজুমদার মাননীয় সংসদ সদস্যদেরকে উপজেলা পর্যায়ে যুক্ত না করার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে মাননীয় সংসদ সদস্যদের ‘আইনপ্রণয়ন-ক্ষমতা’ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও মন্ত্রীপরিষদ সংসদের কাছে দায়বদ্ধ (অনুচ্ছেদ ৫৫) এবং সাংসদদের রয়েছে সরকারের আর্থিক সিদ্ধান্ত অনুমোদনের (অনুচ্ছেদ ৮০) ক্ষমতা। আমাদের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, স্থানীয় উন্নয়ন ও স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের। এছাড়া তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে, জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক এবং সংবিধান যাঁদেরকে জনগণের পক্ষে যে দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা প্রদান করেছে, তাঁরা সে সকল দায়িত্বই পালন করবেন। তাই মাননীয় সংসদ সদস্যগণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্তৃত্ব গ্রহণ করলে এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্ত হলে তা হবে সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি আরো বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্যদেরকে উপদেষ্টা করে উপজেলা পরিষদের ওপর তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হলে তা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গেও অসঙ্গতিপূর্ণ হবে। কারণ এ ব্যবস্থায় সাংসদের কর্তৃত্ব থাকবে, কিন্তু দায়বদ্ধতা থাকবে না। এছাড়াও সাংসদদের স্থানীয় পর্যায়ে অনুপস্থিতির কারণে স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়বে।

তত্ত্বাধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, আগেকার অর্ডিনেন্স বাতিল করে নতুন করে কেন এটা করা হচ্ছে তা পরিষ্কার নয়। তিনি বলেন, এটা করা হলে তা হবে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হবে। তাই আইনটি পুনর্বিবেচনার জন্য সকলকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এএসএম শাহাজাহান উপস্থাপিত বক্তব্যের সাথে একমত প্রকাশ করে যা হতে যাচ্ছে সেটিকে একটি ‘ভেজাল লোকাল গভমেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, এর মাধ্যমে স্বার্থক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে দিন বদলের অঙ্গিকার বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে। এছাড়া তিনি জনগণের প্রোটেনশিয়ালিটির ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে জনগণকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জবাবদিহিতা হলো গণতন্ত্রের মূল কথা। কারো অথরিটি থাকবে কিন্তু রেসপনসিবিলিটি থাকবে না। তাহলে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে কীভাবে? ওপর থেকে নিচে ক্ষমতার প্রবাহ চলবে না উল্লেখ করে তত্ত্বাধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব সুলতানা কামাল বলেন, স্থানীয় সরকারকে যথেষ্ট শক্তিশালী করা না হলে আমরা গণতন্ত্রের বিপরীত অবস্থায় চলে যাব। এক্ষেত্রে তিনি নাগরিক সমাজের সচেতনতা, দায়িত্ব ও কর্তব্যের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে বলেন, জনগণের দায়িত্ব রয়েছে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে সংসদে গেছেন তারা নীতি-বিরোধী, অঙ্গিকারের বিরুদ্ধে ও সংবিধানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন কি-না তা দেখা।

অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্যদেরকে উপজেলা পর্যায়ে যুক্ত করার একটি বড় জটিলতা হলো যে, উপজেলার সংখ্যা ৪৮১টি হলেও মাননীয় সংসদ সদস্যদের সংখ্যা মাত্র ৩০০। এছাড়াও কিছু উপজেলায় একাধিক সাংসদ রয়েছেন। উপরন্তু, এক্ষেত্রে সংরক্ষিত আসনের নারী সাংসদদের ভূমিকা কী হবে? কারণ তাদের কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা নেই। এছাড়া তিনি বলেন, এভাবে প্রগ্রেসিভ ল যদি বাতিল হয়ে যায় তাহলে পার্লামেন্টের প্রতি মানুষ কতটুকু আস্থা থাকবে এটা নিয়ে আমাদের সন্দেহ হয়। আর এটা করা হলে সারা দেশের লোকাল লেভেলে দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ একটা অবস্থা সৃষ্টি হবে। কলামিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ কেন্দ্রীয় সরকারের এই নতুন আইন প্রণয়নের সমালোচনা করে বলেন, জনগণের সাথে আলোচনা করে মতামতের ভিত্তিতেই এটা হওয়া প্রয়োজন। যাতে দেশে এমপিতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হয়। স্থানীয় সরকারকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, স্থানীয় সরকারকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করার বা ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারকে শক্তিশালী করতে চাইলে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে।
মূল প্রবন্ধ ডাউনলোড করুন

Advertisements