স্থানীয়সরকার: উপজেলা পরিষদ আইন, সংবিধান ও আদালতের রায়

palo_logo

বদিউল আলম মজুমদার
গত ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদ উপজেলা পরিষদ (রহিত আইন পুনঃপ্রচলন ও সংশোধন) আইন, ২০০৯ পাস করে। আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী, ‘সংবিধানের অনুচ্ছেদের ৬৫-এর অধীন একক আঞ্চলিক এলাকা হইতে নির্বাচিত সংসদ সদস্য পরিষদের উপদেষ্টা হইবেন এবং পরিষদ উপদেষ্টার পরামর্শ গ্রহণ করিবে।’ এ ছাড়া আইনে যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রেও সাংসদদের অবহিত করার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। আরও বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা সরকারের সঙ্গে যেকোনো যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংসদকে অবহিত করার। উপরনতু পরিষদের নির্বাহী ক্ষমতা কার ওপর ন্যস্ত তা নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে, যা নিয়ে নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে।

অনেক সচেতন নাগরিকই উপজেলা পরিষদের ওপর সাংসদদের এমন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিধানের ফলে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। কিনতু সংসদের পক্ষে দাবি করা হয় যে সার্বভৌম সংসদের যেকোনো আইন করার ক্ষমতা রয়েছে। তাই তাঁরা তাঁদের সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি এবং সংবিধানও লঙ্ঘন করেননি।

নিঃসন্দেহে সংসদ একটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানটির অগাধ ক্ষমতা রয়েছে। কিনতু এই ক্ষমতা সীমাহীন নয়, ক্ষমতার সীমানা নির্ধারিত হয়েছে সংবিধানের মাধ্যমে। সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ তাই সংবিধান যাকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, সে সীমাবদ্ধতার বাইরে তাঁরা যেতে পারেন না। এ কথা সার্বভৌম সংসদের বেলায়ও সত্য, কারণ সংসদও সংবিধান কর্তৃক সৃষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান।

প্রসঙ্গত, যুক্তরাজ্যের মতো দেশেও, যেখানে লিখিত সংবিধান নেই, পার্লামেন্ট ইচ্ছেমতো সবকিছু করতে পারে না। তারাও অনেক সীমাবদ্ধতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। লেজলি স্টিফেনসের মতে, ‘পার্লামন্টের ক্ষমতার ওপর ভেতর-বাহির উভয় দিক থেকেই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভেতর থেকে সীমাবদ্ধ, কারণ আইনসভা সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং যা কিছু সমাজ তৈরি করে তারই সৃষ্টি। বাইরে থেকে সীমাবদ্ধ, কারণ আইন প্রয়োগের ক্ষমতা নির্ভর করে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতার ওপর, যার পরিধিও সীমাবদ্ধ। আইনসভা যদি সব নীল চোখসম্পন্ন শিশুকে খুন করার আইন করে, নীল চোখসম্পন্ন শিশুদের বাঁচিয়ে রাখা হবে বেআইনি। কিনতু আইনসভার সদস্যদের, উন্নাদে পরিণত হবে, এ ধরনের আইন করার জন্য এবং প্রজাদেরও এমন আইন মেনে চলার জন্য চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিতে হবে।’ [ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ ১৫ বিএলটি(এইচসিডি)(২০০৭) মামলার রায় থেকে উদ্ধৃত]। তাই দায়িত্বশীলতা, নৈতিকতা, ন্যায়নীতিবোধ, সামাজিক মূল্যবোধ ও প্রেক্ষাপট, বিদ্যমান আইনি বিধিবিধান, জনকল্যাণ ইত্যাদি মানদণ্ডের আলোকে সংসদ ও সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যপরিধির সীমাবদ্ধতা নিরূপিত হয়। উল্লেখ্য, সংসদীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটি ও দুদকের মধ্যকার বর্তমান বিরোধ এসব মানদণ্ডের আলোকেই মীমাংসিত হতে হবে।

আমাদের লিখিত সংবিধানে সংসদ ও স্থানীয় সরকারের কার্যপরিধি নির্ধারণ করা আছে। সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে সংসদকে ‘আইন প্রণয়নের-ক্ষমতা’ প্রদান করা হয়েছে। আইন প্রণয়ন বলতে সাধারণত আইন তৈরি, আইন পরিবর্তন-পরিবর্ধন, নীতি নির্ধারণ বিষয়ে বিতর্ক, বাজেট অনুমোদন, সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা ইত্যাদি বোঝায়। পক্ষান্তরে, ৫৯ অনুচ্ছেদ, যা সংবিধানের ‘চতুর্থ ভাগের’ অধীনে ‘নির্বাহী বিভাগ’-এর অন্তর্ভুক্ত, স্থানীয় সরকারের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর−জাতীয় সংসদের জন্য নির্বাচিতদের ওপর নয়−‘স্থানীয় শাসনের’ ভার প্রদান করা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, ‘প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীদের কার্য’ পরিচালনা, ‘জনশৃঙ্খলা রক্ষা’, ‘পাবলিক সার্ভিস (জনকল্যাণমূলক সেবা প্রদান) ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন’ স্থানীয় শাসনের অন্তর্ভুক্ত। তাই জাতীয় সংসদের জন্য নির্বাচিত সাংসদদের স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত হলে তা হবে তাঁদের এখতিয়ারবহির্ভূত এবং সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এমনকি সার্বভৌম সংসদে আইন পাস করেও তাঁরা সে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন না। কারণ কুদরত-ই-এলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ মামলার [৪৪ ডিএলআর(এডি)১৯৯২] রায়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘সংসদ স্থানীয় সরকারের ব্যাপারে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদকে উপেক্ষা করতে পারেন না (?Parliament is not free to legislate on local government ignoring Article 59 an 60.?)|

সাংসদদের স্থানীয় উন্নয়নকাজে যুক্ত হওয়া যে সংবিধানের পরিপন্থী, তা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বনাম বাংলাদেশ মামলার [১৬বিএলটি (এইচসিডি)(২০০৮)] রায়ে বাংলাদেশ হাইকোর্ট ইতিমধ্যে সুস্পষ্ট করেছেন। পরিপত্রের মাধ্যমে জেলা মন্ত্রী পদ সৃষ্টি করে জেলা পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়ার ফলে সাংসদ হিসেবে তিনি তাঁর জেলা পিরোজপুরে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না বলে অভিযোগ এনে জনাব মঞ্জু ২০০৩ সালে একটি রিট দায়ের করেন। ২০০৬ সালে প্রদত্ত রায়ে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর সুস্পষ্টভাবে বলেন: ‘মন্ত্রী, হুইপ এবং অন্যান্য কর্মকর্তা, যাঁদের কথাই উপরিউক্ত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের কাউকেই উল্লিখিত কোনো জেলার জন্য নিয়োগ প্রদান করা যায় না। সংশ্লিষ্ট বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে পুরো দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দায়িত্ব ব্যতীত জেলাগুলোতে তাঁদের অন্য কোনো দায়দায়িত্ব নেই।

একইভাবে সংসদ সদস্যদেরও জেলা বা অন্যান্য প্রশাসনিক একাংশে উন্নয়ন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা ও দায়িত্ব নেই। অতএব মামলার বাদী, যিনি একজন সংসদ সদস্য, পিরোজপুর জেলা সম্পর্কে তাঁর কোনো দায়দায়িত্ব নেই।’)। অর্থাৎ সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য নির্ধারিত স্থানীয় উন্নয়ন, জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ে সাংসদদের কোনো দায়দায়িত্ব ও ভূমিকা পালন বেআইনি।

এ ছাড়া উপজেলা পরিষদ আইনটি একটি ‘রঙিন’ বা বিকৃত আইন (colourable legislation), যা প্রত্যক্ষভাবে করা যায় না, আইন করে পরোক্ষভাবে তা করলে সে আইনকে ‘রঙিন আইন’ বলা হয়। মাননীয় সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত, তাঁদের দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলে নিঃসন্দেহে সেসব প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় সরকার বলা যাবে না। তাই যে আইনের মাধ্যমে উপদেষ্টা বানিয়ে উপদেষ্টার পরামর্শ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে সাংসদদের পরোক্ষভাবে উপজেলার কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়েছে, সে আইন রঙিন আইন না হয়ে পারে না। প্রসঙ্গত, কুদরত-ই-এলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ে সরকারি কর্মকর্তা কিংবা তাঁদের প্রতিনিধিদের দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবে বলেছেন, ‘যদি সরকারি কর্মকর্তা কিংবা তাঁদের তল্পিবহ (henchmen) দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রচেষ্টা চালানো হয়, তাহলে সেগুলোকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বলা যাবে না।’ মাননীয় সংসদ সদস্য এবং তাদের প্রতিনিধিদের কর্তৃত্বে পরিচালিত উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রেও নিঃসন্দেহে একই যুক্তি প্রযোজ্য। এ ছাড়া ‘নির্বাহী বিভাগের’ অন্তর্ভুক্ত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হলে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের সাংসদদের অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও ব্যাহত হবে।

উপজেলা পরিষদ আইনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি হলো যে এটি বৈষম্যমূলক। আইনের ২৫ ধারায় শুধু একক আঞ্চলিক এলাকা থেকে নির্বাচিত ৩০০ সংসদ সদস্যকেই উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে। ফলে সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত বাকি ৪৫ জন নারী সাংসদ এ ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হবেন। এ ধরনের বৈষম্য শুধু আমাদের সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গেই অসংগতিপূর্ণ নয়, এটি নারীর প্রতি অসমতা সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের মানবাধিকারকেও ক্ষুণ্ন করেছে।

উপজেলা পরিষদ আইনটি গণতান্ত্রিক চেতনাবোধের সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ নয়। আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের জন্য প্রয়োজন জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন। জাতীয় পর্যায়ের জন্য নির্বাচিত সাংসদেরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব করলে স্থানীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক শাসন গড়ে উঠবে না। এ ছাড়া বর্তমান আইনে সাংসদদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কিনতু তাঁদের দায়বদ্ধতার কোনো বিধান রাখা হয়নি। দায়বদ্ধতাহীন কর্তৃত্ব স্বৈরতন্ত্রের প্রতিফলন, গণতন্ত্রের নয়।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে পাস করা উপজেলা পরিষদ আইনটির ক্ষেত্রে সাংসদেরা তাঁদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। জাতীয় সংসদের সদস্য হয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা তাঁদের সাংবিধানিক দায়িত্বের পরিধিবহির্ভূত। তাঁরা আইনের মাধ্যমে নিজেদের উপদেষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং পরিষদের পক্ষ থেকে উপদেষ্টার পরামর্শ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে পরোক্ষভাবে এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাঁদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছেন। এ ধরনের প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে সংবিধানের লঙ্ঘন। অর্থাৎ আমাদের আইনপ্রণেতারা আইনভঙ্গকারীতে পরিণত হয়েছেন। অতীতের আদালতের রায়ের মাধ্যমে এ সম্পর্কে সব দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান হওয়া উচিত। তাই সংসদ সদস্যদের নিজেদের স্বার্থে পাস করা আইনটি জনস্বার্থ-পরিপন্থী একটি রঙিন আইন। আমরা আশা করি, আইনের শাসন এবং স্থানীয় পর্যায়ে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সরকার এটি দ্রুততার সঙ্গে সংশোধনের উদ্যোগ নেবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন−সুশাসনের জন্য নাগরিক।

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, ১৭ এপ্রিল ২০০৯

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s