“স্থানীয় সরকারের বর্তমান হালচাল” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

গত ০৬ মে, ২০০৯ সকাল ১০টায় ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিকে’র উদ্যোগে এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ-এর সহযোগিতায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে “স্থানীয় সরকারের বর্তমান হালচাল” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এএসএম শাহাজাহানের সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘সুজন’ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। সভাপতির বক্তব্যে জনাব এএসএম শাহাজাহান বলেন, আমরা চাই আইনের শাসন আর আইনের শাসন মানে আইনের দ্বারা শাসন নয়। এই আইনের শাসনের মাধ্যমেই আমাদের বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে এবং এই স্বপ্নের অন্যতম একটি হল স্বশাসিত ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

সংবিধানকে পদদলিত করে, আদালতের রায় উপেক্ষা করে এবং জনস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সাংসদদের অন্যায় আবদার রক্ষার জন্য যে উপজেলা আইন পাশ করা হয়, তা ভবিষ্যতে একটি অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। যার পরিণতি শুধু ক্ষমতাসীন দলকেই নয়, সম্ভবত পুরো জাতিকেই ভবিষ্যতে গুণতে হবে উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বর্তমানে একটি হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে। নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৯৯৮ সালের উপজেলা পরিষদ আইন সংশোধন করে উপজেলা পরিষদের ওপর মাননীয় সংসদ সদস্যদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বহুমুখী হস্তক্ষেপের কারণে ইউনিয়ন পরিষদও বর্তমানে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সাংসদগণ এখন পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে তাঁদের খবরদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুস্পষ্ট সাংবিধানিক অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও, পুরো ব্যবস্থাই আজ প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অনুমোদিত উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮ এর সমালোচনা করে বৈঠকে এ আইনের গুরুতর সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরা হয়। এ আইনটি গণতান্ত্রিক চেতনাবোধ ও ক্ষমতার বিভাজন নীতি’র পরিপন্থি। একইসাথে এটি চরমভাবে বৈষম্যমূলক এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দারিদ্র্য দূরীকরণ: কিছু চিন্তা ভাবনা গ্রন্থে উল্লেখিত স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত অনেকগুলো বলিষ্ঠ ধ্যান-ধারণার সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বৈঠকে তাই এ আইনকে ‘রঙিন’ বা বিকৃত আইন হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়।

উপজেলা আইনের মাধ্যমে বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে উল্লেখ করে জনাব এনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, এটা এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, সাংসদরা তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার খাতিরে হলেও উপজেলা আইনকে গণতন্ত্রের জন্য অনুকূল করে তুলতে হবে। এই আলোচনাকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন এই আইন এক অর্থে ভালো, যা পেয়েছি তা গ্রহণ করব আগে। তারপর তাকে পরিশীলিত করার জন্য অগ্রসর হতে হবে। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদকে মেরে ফেলা যাবে না। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। জনাব শেখ শহিদুল ইসলাম বলেন, ক্ষমতা তৃণমূলে যেতেই হবে। সেই তৃণমূলে যাওয়ার জন্য আজকে ১৯ বছর পর উপজেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটা নিয়েই শুরু করতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে এবং একে ক্ষমতায়িত করতে হবে। সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, এখন যে অবস্থা দাঁড়িয়ে গেছে সেটা খুবই অপ্রত্যাশিত ছিল। একটা গণতান্ত্রিক সরকার কতগুলো অগণতান্ত্রিক কাজ করছে, যা কাম্য নয়। জনাব আবদুল কাইয়ুম সাম্প্রতিক জারি করা পরিপত্রের কথা উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান অবস্থায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে একটি ব্যক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হচ্ছে, যা একটি বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করবে এবং যার মাধ্যমে জনগণের স্বাধীন অংশগ্রহণের সুযোগ বাধাগ্রস্থ হবে। নির্বাচনের পর ক্ষমতা কেড়ে নেবার বিধান জনগণের সাথে প্রতারণার সামিল বলে উল্লেখ করে জনাব আসিফ নজরুল বলেন, বর্তমান সরকারের আমলের যতগুলো খারাপ কাজ করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো এই আইন।

মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, জেলা পরিষদ গঠন হলেই উপজেলা পরিষদ শক্তিশালী হবে। উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থার পাশাপাশি জেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার জন্যও আন্দোলন হওয়া উচিত। মাননীয় সংসদ সদস্য সানজিদা খানম বলেন, জনগণের প্রত্যাশা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের ওপরও রয়েছে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের অঙ্গিকার ছাড়া আপনারা নির্বাচিত হতে পারতেন না এটা প্রথমেই স্বীকার করতে হবে। সবচাইতে বেশি প্রয়োজন হলো সমন্বয়। মুখোমুখি না গিয়ে সকলের সাথে সমন্বয় করে সামগ্রিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

‘বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান ফোরামে’র আহ্বায়ক জনাব মহিবুর রহমান জাতিগতভাবে আমাদের অগ্রগতির স্বার্থে পাশকৃত উপজেলা আইন সংশোধনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সকলের মতামততের ভিত্তিতে উপজেলা আইনের সীমাবদ্ধতা ও করণীয় দিকগুলো তুলে ধরার সুপারিশ করেন ‘বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ এসোসিয়েশন’ এর আহ্বায়ক জনাব হারুনর রশিদ হাওলাদার। ‘বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান ফোরামে’র সদস্য সচিব জনাব জিয়াউল হক সরকার বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, উপজেলা আইনের মাধ্যমে তাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকা থেকেই অনেক কিছু বণ্টনের মাধ্যমে যে অরাজকতার সৃষ্টি হচ্ছে তা আমাদের ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। ‘বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ এসোসিয়েশন’-এর সদস্য-সচিব জনাব বদিউজ্জামান বাদশা বলেন, আসলে আমাদের হাত-পা বেঁধে আমাদেরকে সাঁতার দিতে বলা হচ্ছে। আমরা এমপিদের ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশীপ চাই, খবরদারি চাই না। ‘স্বশাসিত ইউনিয়ন পরিষদ এডভোকেসি গ্র“পে’র সভাপতি চেয়ারম্যান জনাব আবুল হোসেন খান বলেন, বর্তমান সরকারের দিন বদলের অঙ্গিকারকে বাংলাদেশের আপামর জনগণ অভিনন্দন জানিয়েছিল। কিন্তু সরকারের কার্যকলাপে তারা হতাশ। স্থানীয় সরকারের সব কটি টায়ারকে শক্তিশালী করে তাদেরকে দায়িত্ব ও সম্পদ প্রদানের আহ্বান জানান। ‘স্বশাসিত ইউনিয়ন পরিষদ এডভোকেসি গ্র“পে’র সাধারণ সম্পাদক চেয়ারম্যান জনাব মতিউর রহমান তপন বলেন, উপজেলা বা ইউনিয়নকে হত্যা করে দিন বদলের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা কখনই সম্ভব নয়।

এছাড়া আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মুহম্মদ জাহাঙ্গীর, রুহিন হোসেন প্রিন্স, ড. মেহের-ই-খোদা, উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব সুধীন সরকার, হুমায়ুন কবির হিরু, সৈয়দ মনির খসরু প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধ ডাউনলোড করুন।

Advertisements