“সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তি: স্বরূপ ও ব্যাপকতা” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত

roundtable-28th-mayআমাদের সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির বিধান রয়েছে। সাংবিধানিক বিধানানুযায়ী সংসদ আইনের দ্বারা এগুলো সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করার কথা। কিন্তু এ বিষয়ে অদ্যাবধি কোনো আইন প্রণীত হয় নি। এদিকে বিষয়টি সম্প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত দুদকের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের ও সাবেক স্পীকার জনাব জমির উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে সংসদের বিশেষ অধিকার ক্ষুন্ন করার অভিযোগ উত্থাপনের প্রেক্ষিতে। আর এমনি এক প্রেক্ষাপটে বিষয়টির ওপর আলোচনার সূত্রপাত করার উদ্দেশ্যে গত ২৮ মে, ২০০৯ সকাল ১০:৩০টায় এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তি: স্বরূপ ও ব্যাপকতা’ শীর্ষক অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। আজকের আলোচনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুভার একটি বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, নবম সংসদে এসে সংসদ ও সংসদ সদস্যের বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তি নিয়ে আমরা কথা বলছি, এটা গণতন্ত্রের দিকে একটা বিরাট অগ্রগতি। তিনি সংসদের কমিটি গঠন ও কমিটির সক্রিয়তার কথা তুলে ধরে বলেন এটা নিঃসন্দেহে একটা ইতিবাচক দিক। এ সময় তিনি পার্লামেন্টারী এথিক্স কমিটি ও পার্লামেন্টারী ওয়াচ বডি গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পার্লামেন্টের ডিটেইলস্ প্রসিডিংস্ বের হতে অনেক সময় লাগে এটা দ্রুত ও পত্রিকায় প্রকাশ হওয়া দরকার। এছাড়া সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদের বাইরে বিভিন্ন ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে একটি আচরণবিধি থাকা জরুরি বলেও তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এএসএম শাহাজাহান-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল আলোচনায় মাননীয় ডেপুটি স্পীকার অবঃ কর্ণেল শওকত আলী নিজের কথা তুলে ধরে বলেন, আমি পঞ্চমবারের মতো সংসদে এসেছি। আমার বিশেষ অধিকার কী তা আমি এখনো জানি না। আমি জানি না এজন্য যে, আমি মনে করি না যে আমার কোনো বিশেষ অধিকার থাকা উচিত। তিনি বলেন, আমি পার্লামেন্টে দায়িত্ব পালন করি এটাই আমার বিশেষ অধিকার। ক্ষমতা প্রসঙ্গে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ক্ষমতা আমাদেরকে বারবার দুর্নীতিগ্রস্থ করেছে। সংসদ সদস্যরা মোটেই আইনের উর্দ্ধে নয় উল্লেখ করে তিনি সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমাদেরকে আরো সতর্ক হওয়া উচিত, আমরা নিজেরাই নিজেদের ওপর সেলফ ইমপোজ করতে পারলে ভালো হয়। এছাড়া প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে চলার জন্যও তিনি সংসদ সদস্যদের আহ্বান জানান।

সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা এবং দায়মুক্তি কি, কেন, এ সম্পর্কিত সাংবিধানিক বিধান, বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ও আদালতের সিদ্ধান্তসমূহ বিশ্লেষণ করে মূল প্রবন্ধে ‘সুজন’ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদীয় কার্যক্রম যথাযথ ও পরিপূর্ণভাবে পরিচালনার জন্য সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তির বিধান অপরিহার্য। এগুলোর কিছু ব্যক্তি সংসদ সদস্যের বেলায়, কিছু পুরো সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রাজকীয় রোষ ও হুমকির মুখে বৃটিশ পার্লামেন্ট যাতে নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে সে উদ্দেশ্যেই এগুলোর উৎপত্তি। এগুলোর মাধ্যমে সংসদ তার কার্যপদ্ধতিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যে কোনো সংসদীয় কমিটি কি যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে তলব করতে পারে? – সংসদীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটি ও দুদকের বিরোধের ক্ষেত্রে এ প্রশ্ন উত্থাপন করে তিনি বলেন, এটি এখতিয়ারের প্রশ্ন। তিনি বলেন, আইনগতভাবে এখতিয়ার থাকলে কমিটি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তলব করতে পারে। তিনি যুক্তি উপস্থাপন করে আরো বলেন, দুদকের এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কার্যক্রম তদন্ত করা সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির কার্যপরিধির অন্তর্ভুক্ত নয় এবং এটি আইনের লঙ্ঘন। এছাড়া আমাদের সাম্প্রতিক ইস্যুসমূহ বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, আমাদের সাবেক স্পীকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত চলছে। তাঁর কিংবা যে কোনো সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অসদাচারণের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংসদের কর্তব্য হবে সংসদীয় অধিকার ক্ষুন্ন করার অভিযোগে তাঁদের সংসদ থেকে বহিস্কার করা। তা না হলে পুরো সংসদের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থাশীলতা নষ্ট হবে। তিনি আরো বলেন, অসদাচারণের অভিযোগে সংসদীয় বিশেষ অধিকার ক্ষুন্ন করার দায়ে সংসদ সদস্যকে বহিস্কার, কারারুদ্ধ করা তথা তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ তাঁদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এ হাতিয়ারের সঠিক ব্যবহারের জন্য বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তির বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট হওয়া আবশ্যক। আমরা আশা করি যে, সাংবিধানিক আকাক্সক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমাদের বর্তমান সংসদ জরুরিভিত্তিতে এ বিষয়ে একটি আইন প্রণয়ন করবে। এর মাধ্যমে যে সকল সংসদ সদস্য তাঁদের বিশৃঙ্খল, অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পুরো সংসদের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করবে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে। একইসাথে সংসদ সদস্যদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করাও জরুরি। তিনি বলেন, পাঁচ বছর পর পর ভোটারদের সম্মুখিন হওয়ার মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের দায়বদ্ধতা যথাযথভাবে নিশ্চিত হয় না, কারণ এ প্রক্রিয়ায় অপরাধ করে দণ্ড এড়ানো যায়। তাই সংসদ সদস্যদের ‘রিকল’ বা প্রত্যাহার করার বিধানও আইনে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক, যা পৃথিবীর অনেক দেশেই রয়েছে।

জনাব শহিদুজ্জামান সরকার এমপি বলেন, কোনো সংসদ সদস্যই প্রচলিত আইনের উর্দ্ধে নয়। তাকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে কথা বলার ক্ষেত্রে, কিন্তু সেই দায়মুক্তিটাও এবস্যুলুট নয়। তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সংসদ সদস্যদের সংসদ সদস্য হিসেবে কাজ করার দায়মুক্তি কিছুটা অব্যশ্যই দিতে হবে। এ সময় তিনি সার্বভৌম সংসদের নিজস্ব সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার নিশ্চয়ই রয়েছে বলেও মত দেন। এছাড়া তিনি বলেন, এই বিষয়গুলো সম্পূর্ণই রাজনৈতিক বিষয়। তাই পার্লামেন্টারী পার্টির বৈঠকে প্রত্যেকের আচার-আচরণ সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত। নতুন সংসদ সদস্য যারা তাদের কাছে এ পেপারটি ভালো কাজে দেবে বলে উল্লেখ করেন মাননীয় সংসদ সদস্য সানজিদা খানম এমপি। তিনি বলেন, সংসদ সার্বভৌম, তাই এই সার্বভৌম সংসদে তার সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো রকমের অভিযোগ আসলে তার ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকারও সংসদেরই। কোনো কমিশনকে দিয়ে এটা করানো ঠিক হবে না। পার্লামেন্ট কমিটি দুদকের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করা কোনক্রমেই উচিত হবে না বলে মন্তব্য করেন বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব এনাম আহমেদ চৌধুরী। রাজনীতিবিদ জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দু’টো ঘটনা আমাদের সামনে আছে। এ দিক থেকে আলোচনার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া পার্টির মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, সত্য প্রমাণিত হলে সংসদ সদস্যদের শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ অধিকার ও ক্ষমতার ক্ষেত্রে সংসদের দলগুলোর মধ্যে কোনো বিভাজন চোখে পড়ে না বলে অভিমত প্রকাশ করেন ড. শওকত আরা হোসেন। তিনি বলেন, তখন তারা এক হয়ে যান। এর পরিবর্তন করতে হবে। বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বিষয়টিকে শুধু আলোচনার বিষয় না বলে আন্দোলন গড়ে তোলার ও সিদ্ধান্তের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, যারা সংসদ সদস্য তারাও মানুষ তাই তাঁরাও যদি সত্যিকারভাবেই অন্যায় করে থাকেন তাহলে অবশ্যই তাদের দায়মুক্তি থাকা উচিত নয়। গণতন্ত্রের মূল চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কিছুই মেনে নেয়া ঠিক হবে না উল্লেখ করে এ সময় তিনি আরো বলেন, পৃথিবীর গণতান্ত্রিক বিভিন্ন দেশের ভালো উদাহরণ এক্ষেত্রে আমাদের গ্রহণ করা উচিত। সামগ্রিকভাবে আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধটাই কেমন যেন শিথিল হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ ও সংসদ সদস্যদের নৈতিকতা চর্চার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, যে কোনো দায়মুক্তি করতে গেলে আগে দেখতে হবে অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে কি না। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করার মতো পূর্ণ ক্ষমতা সবদিক থেকে থাকা দরকার আবার অনৈতিক বা অন্যায় কাজের জন্যও ব্যবস্থা থাকা উচিত। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জনাব ম. হামিদ বলেন, সংসদ সদস্যদের জন্য একটা আচরণ-বিধি প্রণীত হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন এগিয়ে আসতে পারে। আলোচ্য বিষয়ে সংসদের পক্ষ থেকে একটা উদ্যোগ নেয়া উচিত যাতে এ ব্যাপারে জনগণকে সজাগ এবং অবহিত করা যায় বলে মত দেন সাংবাদিক ও কলামিস্ট জনাব জগলুল আহমেদ চৌধুরী। প্রফেসর সৈয়দ মুনীর খসরু বলেন, সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে সংসদের বাইরে এক আচরণ ভেতরে আরেক এটা তো হতে পারে না।

গোলটেবিল আলোচনায় উত্থাপিত সংসদ ও সাংসদদের বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তির বিষয়ে বর্তমান সংসদে জরুরিভিত্তিতে একটি আইন প্রণয়ন ও সাংসদদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করার বিষয়ের সাথে উপস্থিত সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেন। বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর হিরু, অধ্যক্ষ আলহাজ্জ্ব আব্দুল কাদির, জনাব তারিক রহমান, প্রফেসর হান্নানা বেগম, জনাব রেহানা সিদ্দিকী, জনাব ফাতেমা রশিদ হাসান, প্রফেসর কামাল আতাউর রহমান প্রমুখ। উল্লেখ্য যে, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সরকারের মতে [বিশেষ রেফারেন্স অনুচ্ছেদ ১৪৩, এআইআর (১৯৬৫) এসসি ৭৪৫] নিজস্ব আভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংসদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে বিশেষ অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো ব্যক্তিকে সংসদের অধিকার ক্ষুন্ন বা অবমাননার দায়ে শাস্তি দেয়ার অধিকারকে ক্ষমতা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সংসদে যে কোনো কিছু  বলার জন্য কোনো সাংসদ দায়ী না হবার অধিকারই দায়মুক্তি।

মূল প্রবন্ধ ডাউনলোড করুন।

Advertisements