সুশাসন: নেতা বদলে যায়, নেতা বদলে দেয়

palo_logo

বদিউল আলম মজুমদার
কয়েক দিন আগে তৃণমূলের প্রায় ৭০ জন বলিষ্ঠ নারীর সঙ্গে আমার কিছু সময় ব্যয় করার সুযোগ হয়। তাঁরা আশপাশের জেলা থেকে এসেছিলেন ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট’ আয়োজিত ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ বিষয়ক তিন দিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিতে। তাঁরা ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্কে’র সঙ্গে জড়িত। তাঁদের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল নেতৃত্ব নিয়ে।

ঘণটা দেড়েকের তুমুল আলাপ-আলোচনা থেকে যা বেরিয়ে আসে তা হলো: রাজনীতি থেকে শুরু করে সমাজকর্ম পর্যন্ত যেকোনো কার্যক্রম সফল করতে হলে নেতৃত্ব অপরিহার্য। বস্তুত নেতৃত্ব সাফল্যের চাবিকাঠি। সফল রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধান হয়, যা জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ব্যবসা ক্ষেত্রে নেতৃত্বের সফলতা সম্পদ সৃষ্টিতে সহায়তা করে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তেমনিভাবে সমাজসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সফল নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে মানবকল্যাণ সাধিত হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে, সমাজের প্রতি ক্ষেত্রে নেতৃত্বের বিকাশ ও সফলতা উন্নততর সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।

আলাপ-আলোচনা থেকে আরও বেরিয়ে আসে−নেতৃত্ব মানে কর্তৃত্ব প্রদর্শন নয়। নেতা অনুঘটক, যে ঘটায়। যা আপনা থেকে বা স্বাভাবিকভাবে ঘটবে না, তা ঘটায়। নেতার মানসিকতা: ‘আমরা যদি না জাগি মা/ কেমনে সকাল হবে?/ তোমার ছেলে (তোমার মেয়ে) উঠলে মাগো/ রাত পোহাবে তবে। ’

নেতা যা বলেন, তা করেন। তিনি লেগে থাকেন। তিনি আত্মশক্তিতে বলীয়ান। তিনি মানুষকে জাগিয়ে তোলেন, সংগঠিত করেন এবং সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান করেন। নেতা এগিয়ে আসেন, দায়িত্ব নেন ও ঝুঁকি গ্রহণ করেন। তিনি ব্লেম-গেমে লিপ্ত হন না বা অন্যকে দোষারোপ করেন না। নেতা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিরুৎসাহিত হন না, কিংবা পালিয়ে যান না। তিনি ইতিবাচক, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন নেতিবাচক পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সৃষ্টি হয় না। তিনি সৃজনশীল এবং গণ্ডির বাইরে থেকে ভাবেন। তিনি দুঃসাহসী। নেতা অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

নেতা চেঞ্জ এজেন্ট বা পরিবর্তনের রূপকার। নেতা অন্যের নেতৃত্ব ক্ষমতায়িত করেন এবং অসংখ্য নেতা সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। নেতা মনে করেন, তাঁর অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে যত বেশি ব্যক্তি অবদান রাখার জন্য এগিয়ে আসবে, তত বড় সফলতা অর্জিত হবে। তাই নেতা নিজে বাহবা না নিয়ে অন্যকে স্বীকৃতি দেন এবং অন্যের অবদান রাখার জন্য সুযোগ ও সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করেন।

নেতার সততা ও নিষ্ঠা প্রশ্নাতীত। নৈতিক অবস্থানে নেতা অটল। আত্মবিশ্বাস, অনমনীয়তা ও লক্ষ্যে নিবিষ্টতা তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নেতা প্রত্যাশার ফেরিওয়ালা ও প্রত্যাশা অর্জনে দৃঢ়চিত্ত। নেতার শক্তির মূল উৎস নৈতিক অধিকার, বাহুবল নয়। রাষ্ট্রীয় বা দাপ্তরিক ক্ষমতাও নয়। তবে নৈতিক অধিকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা যুক্ত হলে সোনায় সোহাগা। এতে অনেক বড় কিছু করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

আলোচনার একপর্যায়ে প্রশ্ন আসে, তাহলে নেতা কে? এ পর্যায়ে নেতা চিহ্নিত করার একটি ক্ষুদ্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয় এবং দেশ-বিদেশের অনেক ব্যক্তির নাম উল্লিখিত হয়। উল্লিখিত ব্যক্তিগুলোর মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী, জিয়াউর রহমান প্রমুখের নাম আসে। স্থানীয়, ব্যাপকভাবে পরিচিত নন, এমন কিছু নামও আসে। সিদ্ধান্ত হয়, একজন নেতার−মহাত্মা গান্ধীর−চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করার।

অংশগ্রহণকারীদের চিহ্নিত গান্ধীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: ভোগবিলাসহীন জীবনযাপন, নীতিবোধ, সততা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, অহিংসা, সাহসিকতা, দৃঢ়তা, চিন্তাশীলতা, অন্যকে প্রণোদিত করার ক্ষমতা ইত্যাদি।

এরপর প্রশ্ন আসে, গান্ধী কি মহাত্মা গান্ধী হয়ে জন্নেছিলেন? নাকি তিনি তা অর্জন করেছিলেন? অর্থাৎ জন্নলগ্নেই কি তাঁর মধ্যে সে সব গুণ ছিল, যা তাঁকে পরবর্তী সময়ে স্নরণীয়-বরণীয় করেছে? নাকি তিনি তা হয়ে উঠেছিলেন?

এ পর্যায়ে গান্ধীর জীবনী নিয়ে একটি বিস্তৃত আলোচনার সূত্রপাত হয়। আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসে যে অন্য দশজনের মতো গান্ধীর প্রথম জীবনও দোষে-গুণে ভরা ছিল। সাধারণ মানুষের মতো গান্ধীর মধ্যেও অনেকগুলো মানবিক সীমাবদ্ধতা ছিল। মানুষের সহজাত কামনা-বাসনা যার অন্তর্ভুক্ত। লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের ভাষার ‘ল্যাংটা ফকির’ যৌবনে ‘সুটেড-বুটেড’ কেতাদুরস্ত একজন সাহেব ছিলেন। রেলের প্রথম শ্রেণীর কামরায় তিনি ভ্রমণ করতেন।

ছাত্রজীবনে তিনি অতি মেধাবী ছাত্রও ছিলেন না। এমনকি আইনজীবী হিসেবেও তিনি ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেননি। গান্ধীর নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ‘আই হ্যাড নট অ্যানি হাই রিগার্ড ফর মাই অ্যাবিলিটি।’ অর্থাৎ ‘আমার নিজের সামর্থে্যর প্রতি আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম না।’ তিনি মিশুকও ছিলেন না। বস্তুত তিনি একজন অত্যন্ত লাজুক ব্যক্তি ছিলেন।

গান্ধীর আত্মজীবনী এন অটোবায়োগ্রাফি অর দি স্টোরি অব মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ পড়লে তাঁর প্রথম জীবনের চারিত্রিক দুর্বলতা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। যেমন বাল্যকালে তিনি ধূমপানের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। ধূমপায়ী চাচার সিগারেটের ‘স্টামস’ বা পেছনের ফেলে দেওয়া অংশ কুড়িয়ে টানার মধ্য দিয়ে তাঁর এবং তাঁর এক নিকটাত্মীয়ের ধূমপানের সূচনা ঘটে। ধূমপানের অভ্যাসের কারণে তিনি বাড়ির চাকরের বাজার করার পয়সা থেকে চুরি করা পর্যন্ত শুরু করেন। ১২-১৩ বছর বয়সে এ চুরির সূচনা ঘটে। এ অভ্যাস টিকিয়ে রাখার জন্য পরবর্তী সময়ে ১৫ বছর বয়সে আপন বড় ভাইয়ের একটি সোনার বালাও তিনি চুরি করেন। লক্ষণীয় যে ধূমপান বা কোনো ধরনের আসক্তি যে একজন ব্যক্তিকে বিপথগামী করতে পারে গান্ধীর কৈশোরের অভিজ্ঞতা তাঁর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

পরিণত বয়সে একজন কঠোর নিরামিষভোজী হলেও, বাল্যকালে গান্ধী মাংস খাওয়া নিয়েও ‘এক্সপেরিমেন্ট’ করেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, মাংস খেলে তিনি ‘ডেয়ারিং’ বা দুঃসাহসী হবেন। ব্রিটিশদের মতো শক্তিশালী হয়ে উঠবেন এবং তাদের শক্তি দিয়ে পরাভূত করতে পারবেন, যদিও অহিংসাই পরবর্তী জীবনে তাঁর জন্য পরম ধর্মে পরিণত হয়। বিভিন্ন কর্মে বয়োজ্যেষ্ঠদের বিধি-নিষেধের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি আত্মহত্যারও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এমনকি এ লক্ষ্যে এক পর্যায়ে ধুতরার বীজও খেয়েছিলেন।

কৈশোরকালে তাঁর সাধারণত্বের আরেকটি প্রমাণ মেলে তাঁর আত্মস্বীকৃত যৌন কামনার প্রতি দাসত্ব থেকে। ১৩ বছর বয়সে গান্ধীর সঙ্গে আরও কমবয়স্ক কাস্তুরবাইয়ের বিয়ে হয়। কাস্তুরবাই নিরক্ষর ছিলেন এবং গান্ধী তাঁকে লেখাপড়া শেখাতে চেয়েছিলেন। কিনতু তাঁর নিজের ভাষায়, ‘লাস্টফুল লাভ লেফট মি নো টাইম’, অর্থাৎ ‘লালসামূলক ভালোবাসার কারণে আমার সে সময় হয়ে ওঠেনি।’

কৈশোরের এ আচরণ সম্পর্কে তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে বিনা দ্বিধায় অনুশোচনা করেছেন। তিনি অনুশোচনা করেছেন যে স্ত্রীর প্রতি কামনাতাড়িত আকর্ষণের জন্য তিনি মৃত্যুকালে পিতার শয্যাপাশে অনুপস্থিত ছিলেন। যার জন্য তিনি ছিলেন ভীষণ লজ্জিত। তিনি লিখেছেন, ‘ইফ অ্যানিম্যাল পেশান হ্যাড নট ব্লাইন্ডেড মি, আই শুড হ্যাভ বিন স্পেয়ারড দি টরচার অব সেপারেশন ফ্রম মাই ফাদার ডিউরিং হিজ লাস্ট মোমেন্টস।’ অর্থাৎ ‘যদি নীচ প্রাণীসুলভ তীব্র আবেগ আমাকে অন্ধ করে না দিত, তাহলে আমার পিতার অন্তিম সময়ে তাঁর পাশে না থাকার কঠিন মানসিক যন্ত্রণা থেকে আমি রেহাই পেতাম।’

যে গান্ধীর ভয়ে এক সময় পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নড়ে উঠেছিল, সে গান্ধী কৈশোরে একজন অত্যন্ত ভীতু ব্যক্তি ছিলেন। তিনি দ্বিধাহীনভাবে লিখেছেন: ‘আই ওয়াজ এ কাওয়ার্ড। আই ইউজড টু বি হান্টেড বাই দি ফিয়ার অব থিভস, গোস্টস অ্যান্ড সারপেন্টস। আই ডিড নট ডেয়ার ট্যু স্টিয়ার আউট অব ডোরস এট নাইট। ডার্কনেস ওয়াজ এ টেরর টু মি … আই কুড নট দেয়ারফোর বিয়ার টু স্লিপ উইদাউট এ লাইট ইন দি রুম … হাউ কুড আই ডিসক্লোজ মাই ফিয়ারস টু মাই ওয়াইফ … আই নিউ দ্যাট শি হ্যাড মোর কারেজ দ্যান আই অ্যান্ড আই ফেল্ট অ্যাশেমড অব মাইসেলফ।’ অর্থাৎ ‘আমি একজন কাপুরুষ ছিলাম। আমি চোর, ভূত ও সাপের ভয়ে তাড়িত হতাম। আমি রাতের বেলা বাইরে যেতে সাহস পেতাম না। অন্ধকার আমার জন্য বড় আতঙ্কের কারণ ছিল … তাই আমি ঘরে বাতি জ্বালিয়ে না রেখে ঘুমাতে পারতাম না …. আমি কী করে আমার স্ত্রীর কাছে আমার ভয়ের কথা প্রকাশ করব … আমি জানতাম যে আমার থেকে তার সাহস বেশি ছিল এবং আমি আমার নিজের জন্য লজ্জিত ছিলাম।’

বলা বাহুল্য যে, এককালের এ সাধারণ মানুষটিই পরবর্তী জীবনে অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন। যার জন্য তিনি অগণিত মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেছেন। তিনি সম্রাট ছিলেন না, রাষ্ট্রপ্রধানও ছিলেন না। তাঁর অনুগত কোনো বিশাল সেনাবাহিনীও ছিল না। তবুও আততায়ীর গুলিতে তাঁর অপমৃত্যুতে সারা পৃথিবীতে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল।

বস্তুত এককালের এ সাধারণ মানুষটির জন্য অসাধারণ কাজ করা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। তা সম্ভব হয়েছিল সত্যের অনুসন্ধানের মাধ্যমে নিজেকে রূপান্তর করার ফলে। তিনি সমাজ বদলাতে পেরেছিলেন, কারণ তিনি নিজেকে বদলিয়েছিলেন।

আলাপ-আলোচনার শেষ দিকে প্রশ্ন ওঠে−সবাই কি তাহলে নেতা হতে পারে? প্রায় সমস্বরে উত্তর আসে, নিশ্চয়ই, গান্ধী যদি পারে, অন্যরাও নয় কেন, অন্যরাও পারবে। অংশগ্রহণকারীরা আরও বলেন, নেতৃত্ব উত্তরাধিকারের বিষয় নয়, চাপিয়ে দেওয়ারও বিষয় নয়। নেতার গুণাবলি নিয়ে কেউ জন্নান না। নেতা হয়ে ওঠেন।

তাই কেউ যদি নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনতে তথা নিজেকে রূপান্তর করতে সচেষ্ট হন, তাহলে তিনি তাঁর নিজ ক্ষেত্রে নেতা হতে পারবেন। এভাবে প্রতি ক্ষেত্রে অসংখ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি হলে, সে নেতারাই বদলে দেবেন সমাজকে। তাই, নেতা বদলে যায়−নেতা বদলে দেয়। সমাজের সব ক্ষেত্রে এ ধরনের একঝাঁক নেতৃত্ব, যাঁরা স্বেচ্ছাব্রতী উজ্জীবক বলে পরিচিত, সৃষ্টির কাজে আমি ব্যক্তিগতভাবে নিবেদিত। এরই মধ্যে সমাজের সকল স্তরের লক্ষাধিক উজ্জীবক সৃষ্টি হয়েছে, যারা নিজেকে জয় করে এবং অন্যকে যুক্ত করে সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে অনেক ছোট-বড় কাজ করেছেন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট−বাংলাদেশ।
তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, ৩ জুন ২০০৯

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s