বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তি: কী এবং কেন?

t_logo

ড. বদিউল আলম মজুমদার:

সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার এবং দায়মুক্তির ধারণার উৎপত্তি যুক্তরাজ্যে। শোনা যায়, এককালে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সের গ্যালারিতে গোয়েন্দারা বসে থাকত এবং কারা রাজার বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছে তা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করত। সমালোচনাকারীরা অনেকসময় হুমকি, এমনকি মারধরের শিকার হতেন। সার্বভৌম সংসদ রাজকীয় হুমকির মুখেও স্বাধীন ও কার্যকরভাবে যেন কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সংসদীয় বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির ধারণার উৎপত্তি। আমাদের জানামতে এর প্রথম প্রয়োগ হয় ১৫৫৪ সালে।

সংসদীয় বিশেষ অধিকার এবং দায়মুক্তির পুরনো ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন এরেসকাইন মে (Erskine May, Treatise on the Law, Privileges, Proceedings and Usage of Parliament, 23rd ed.): “Parliamentary privilege is the sum of the peculiar rights enjoyed by each House collectively … and by member of each House individually, without which they could not discharge their functions, and which exceeded those possessed by other bodies or individuals. Thus privilege, though part of the law of the land, is to a certain extent an exemption from the general law.” (‘সংসদের বিশেষ অধিকার হলো কতগুলো স্বতন্ত্র অধিকারের সমষ্টি যা প্রত্যেক সংসদ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে এবং সংসদের উভয় কক্ষই উপভোগ করে। এগুলো অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভোগ করা অধিকারের চেয়ে অতিরিক্ত অধিকার এবং এগুলো ছাড়া সংসদ ও সংসদ সদস্যগণ তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম। তাই যদিও বিশেষ অধিকার রাষ্ট্রীয় আইনের অংশ, তবুও এগুলোর মাধ্যমে অনেকটা সাধারণ আইনের আওতা থেকে তাঁদেরকে রেহাই প্রদান করা হয়।’) আমাদের দেশে অবশ্য উচ্চকক্ষ নেই, তাই উচ্চ কক্ষের কথা আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এ সকল স্বতন্ত্র অধিকারগুলোকে দু’ভাবে বিভাজন করা যায় – যেগুলো এককভাবে সংসদ সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য এবং যেগুলো পুরো সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এগুলোকেও আরো সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়। যেমন: ব্যক্তি সংসদ সদস্যদের বেলায় প্রযোজ্য বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির ক্ষেত্রগুলো হলো: (ক) বাক স্বাধীনতা, (খ) দেওয়ানি মামলায় গ্রেফতার থেকে অব্যাহতি, (গ) জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি, এবং (ঘ) সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হওয়া থেকে অব্যাহতি। এগুলো মূলত দায়মুক্তি সম্পর্কিত অধিকার এবং এগুলোর ফলে ব্যক্তি সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী-বিধি’র ১৭২-১৭৬ ধারায় এ সকল বিষয় সম্পর্কিত বিধান রয়েছে।

পুরো সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অধিকার ও ক্ষমতাগুলো হলো: (ক) শৃঙখলা নিশ্চিত করার অধিকার। কোনো ব্যক্তিকে বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন করার বা সংসদ অবমাননার জন্য শাস্তি প্রদান, যার মধ্যে দুর্নীতি, অপকর্ম ও অসদাচারণের জন্য সংসদ সদস্যদের বহিষ্কার এ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। সংসদের এ ধরনের অধিকারকে শাস্তিমূলক ক্ষমতা বলা হয়। (খ) সংসদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ব্যবস্থাপনা বা কার্যপদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত ক্ষমতা। (গ) সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষমতা। (ঘ) তদন্ত করার, সাক্ষী এবং রেকর্ডপত্র তলব করার ক্ষমতা। আমাদের জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী-বিধি’র ২০১-২০৩ ধারায় এ সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। (ঙ) সাক্ষীদের শপথ প্রদানের ক্ষমতা। আমাদের কার্যপ্রণালী-বিধি’র ২০৪-২০৫ ধারা এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক। (চ) মানহানিকর বিষয়ক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এমন কাগজপত্র প্রকাশ করার ক্ষমতা।

বিষয়টি সম্পর্কে আরো সুস্পষ্ট ধারণা অর্জনের লক্ষ্যে বিশেষ অধিকার (privileges), ক্ষমতা (powers) এবং দায়মুক্তির (immunities) মধ্যে বিভাজন করা আবশ্যক, যদিও অনেকসময় তা করা হয় না। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সরকারের মতে: [“… the right of the House to have absolute control of its internal proceedings may be considered as its privilege, its right to punish one for contempt may be more properly described as its power, while the right that no member shall be liable for anything said in the House may be really an immunity.” [বিশেষ রেফারেন্স অনুচ্ছেদ ১৪৩, এআইআর (১৯৬৫) এসসি ৭৪৫] (‘নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংসদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে বিশেষ অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো ব্যক্তিকে সংসদের অধিকার ক্ষুণ্ন বা অবমাননার দায়ে শাস্তি দেয়ার অধিকারকে ক্ষমতা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সংসদে যেকোনো কিছু বলার জন্য কোনো সংসদ সদস্য দায়ী না হবার অধিকারই দায়মুক্তি।’)

বিশেষ অধিকারকে আরো দু’ভাগে বিভাজন করা যায়: সংসদের গঠন (composition) সম্পর্কিত অধিকার এবং নিজস্ব কার্যক্রম বিনা বাধায় স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার অধিকার। সংসদের গঠন বিষয়ক অধিকার বলতে কারা সংসদ সদস্য হতে পারবেন বা কাদেরকে সদস্য হওয়া থেকে বিরত রাখা যায়, অর্থাৎ সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা সম্পর্কিত ক্ষমতাকে বুঝায়। তবে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতা লিখিত সংবিধান এবং আইনে অন্তর্ভুক্ত থাকার ফলে এটি সংসদের বিশেষ অধিকারের মধ্যে পড়ে না। উল্লেখ্য্য, আমাদের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধিত) আইন ২০০৯-এর ১২ ধারায় সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতা সম্পর্কিত বিধান অন্তর্ভুক্ত।

পক্ষান্তরে, নিজস্ব কার্যক্রম ও কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সংসদের বিশেষ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনায় অসহযোগিতা বা বাধা প্রদান করলে যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংসদের অধিকার ক্ষুন্ন বা সংসদ অবমাননার (contempt) অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার সংসদের রয়েছে। এ অধিকারের আওতায় অসদাচারণের ও সংসদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করার অভিযোগে সংসদ নিজ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের, এমনকি তাঁদেরকে সংসদ থেকে বহিষ্কারের এখতিয়ারও রাখে, যদিও এ ব্যাপারে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে।

অন্যভাবে বলতে গেলে, সংসদের শাস্তিমূলক ক্ষমতা দু’ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সংসদ অবমাননার দায়ে বাইরের ব্যক্তিদের শাস্তি দেয়ার এখতিয়ার সংসদের রয়েছে। বাইরের ব্যক্তিদেরকে শাস্তি দেয়া যায় যদি তাঁরা সংসদীয় কিংবা সংসদীয় কমিটির কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেন। পক্ষান্তরে সংসদ নিজ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে, যদি তাঁরা কোনোরূপ অসদাচারণে লিপ্ত হন, যা সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। উচ্ছৃঙখল, ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং দুর্নীতিমূলক কার্যক্রমে লিপ্ত হওয়ার কারণে, যা পুরো প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাহানি করে, সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বহু নজির অন্যদেশে রয়েছে। অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের অনাকাঙিক্ষত ও অপরাধী কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁদেরকে দায়বদ্ধ করে শাস্তির ব্যবস্থা করা সংসদীয় বিশেষ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।

লেখক: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক

ই-মেইল: badiulm@gmail.com

[‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে গত ২৮ মে ২০০৯ তারিখে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল আলোচনায় উত্থাপিত ও পরবর্তীতে সামান্য সংশোধিত এই নিবন্ধটি ধারাবাহিকভাবে আমাদের সময়ে প্রকাশিত হচ্ছে। আগামীতে পড়-ন ‘সংসদের কার্যধারার বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না’]

তথ্য সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়, ৯ জুন ২০০৯

Advertisements

One response to “বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তি: কী এবং কেন?

  1. DEAR SIR

    eta valo lagbe jodi

    jonogoner adhikar nia sangbihan je anuchched ta kotha bole ta bodhoi bohal na rakhai valo

    karon amra grass level govt. supported members oppression became very untranslatable for us

    for example (may be you socked)
    my father-in-law and mother-in-law (sirajul islam Fattik & sheuli begum, shibgonj chapainawabgonj)are disturbing and trying to abduct everything what my father has saved for me and trying and forcing for separation of our family. is it humanity?

    but we cannot say anything because they have political and power minister’s (present 2013) support and they earned much black money and policesation is their…..
    we have nothing to do except pray to allah

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s