সংসদীয় বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তি : আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

t_logo

ড. বদিউল আলম মজুমদার:
সংসদ সদস্যদের দায়মুক্তির বিধানগুলো পৃথিবীর সব দেশেই সচরাচর বিদ্যমান। কিন্তু বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন করার কারণে শাস্তি প্রদানের, বিশেষত বহিষ্কারের নজির অনেকটা সীমিত। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেনে অনেককেই শাস্তি প্রদান করা হয়েছে, যদিও বিংশ শতাব্দীতে মাত্র তিনটি ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। যতটুকু জানা যায়, ১৬৬৭ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত মোট ৬০ জন সদস্যকে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে বিভিন্ন কারণে বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্য অনেক দেশেও বহিষ্কারের ক্ষমতা ব্যবহৃত হয়। অনেক দেশের সংবিধানেও সংসদকে এ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।

৩.১ যুক্তরাষ্ট্রের আইন
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে বহিষ্কারের ক্ষমতার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদের পঞ্চম ধারার (২) উপ-ধারায় বলা হয়েছে: ‘
ÔEach House may determine the rules of its proceedings, punish its members for disorderly behavior, and, with the concurrence of two-thirds, expel a member.’ (‘সংসদের প্রত্যেক কক্ষই তার কার্যপ্রণালী-বিধি নির্ধারণ, বিশৃঙখল আচরণের জন্য নিজ সদস্যদেরকে শাস্তি প্রদান, এবং দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতিতে কোনো সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করতে পারবে।’) যুক্তরাষ্ট্রের আদালতও কংগ্রেস ও সিনেটের এ অধিকারের প্রতি সমর্থন প্রদান করেছে। আদালতের মতে, সংসদের সিদ্ধান্তই বহিষ্কারের কারণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত। ১৭৯৭ সালে উইলিয়াম ব্লাউন্ট নামে এক সিনেট সদস্যকে সিনেটর হিসেবে কর্মকাণ্ডের বাইরে অসদাচরণের দায়ে বহিষ্কারের রায়ে আদালত বলেন: expulsion power ‘extends to all cases where the offence is such as in the judgment of the Senate is inconsistent with the trust and duty of a member.’(বহিষ্কারের ক্ষমতা ‘সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য যেখানে অভিযুক্তের অপরাধ সিনেটের বিবেচনায় একজন সদস্যের প্রতি আস্থা ও তাঁর কর্তব্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।’)৩.২ অস্ট্রেলিয়ান আইন
অস্ট্রেলিয়ার সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে সংসদের উভয় কক্ষকে সংসদের এবং সংসদীয় কমিটিগুলোর ক্ষমতা, বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি নির্ধারণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তবে তা নির্ধারণের আগে কমনওয়েলথ সৃষ্টির সময়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, তার সদস্যগণ ও কমিটিসমূহের এ সম্পর্কিত অধিকার অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে পার্লামেন্টারি প্রিভিলেজ অ্যাক্ট, ১৯৮৭ (ধারা ৮)-এর মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের বহিষ্কারের ক্ষমতা রহিত করা হয়।

১৯৮৭ সালে ক্ষমতাটি রহিত করার আগে অস্ট্রেলিয়ায় সংসদ সদস্যদের বহিষ্কারের নজির রয়েছে। যেমন, ১৯২০ সালে হিউ মাহোন নামের একজন সদস্যকে আয়ারল্যান্ডে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নগ্ন আক্রমণ করার কারণে প্রতিনিধি পরিষদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

৩.৩ কানাডিয়ান আইন
কানাডার সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদে সংসদের উভয় কক্ষকে আইনের মাধ্যমে বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তি নির্ধারণের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তবে এগুলো ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এবং সেখানকার সদস্যদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তির বেশি হবে না। স্পিকার বনাম কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন মামলার রায়ে [(১৯৯৩) ১ এসসিআর ৩১৯] সুপ্রিম কোর্ট সংসদের বিশেষ অধিকারের বিষয়টিকে ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’
(doctrine of necessity) বা প্রয়োজনীয়তার আলোকে দেখেন। অর্থাৎ সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ অধিকার প্রয়োজনীয় বলেই ধরে নেয়া হয়। এ ছাড়াও আদালত কানাডিয়ান আইন প্রণেতাগণ আইনসভা হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতাকে তাদের অন্তর্নিহিত বিশেষ অধিকার (inherent privilege) বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

নববইয়ের মাঝামাঝি সময়ে নিউ ব্রান্সউইক অঙ্গরাজ্যের পরিষদ একজন প্রতিনিধিকে ১৬ বছরের এক অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে ভোটদানে প্ররোচিত করার অভিযোগে পরিষদ থেকে বহিষ্কার এবং একইসঙ্গে তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অযোগ্য ঘোষণা করে। কানাডিয়ান সুপ্রিম কোর্ট ফ্রেড হার্ভি বনাম এটর্নি জেনারেল অব নিউ ব্রান্সউইক মামলার রায়ে [(১৯৯৬) ২ এসসিআর ৮৭৬] প্রতিনিধি পরিষদের সিদ্ধান্ত বহাল রেখে রায় দেন যে: ‘ÔIf democracies are to survive, they must insist upon the integrity of those who seek and hold public office. They cannot tolerate corrupt practices within the legislature. Nor can they tolerate electoral fraud. If they do, two consequences are apt to result. First, the functioning of the legislature may be impaired. Second, public confidence in the legislature and the government may be undermined. No democracy can afford either.’(‘গণতন্ত্র যদি টিকে থাকতে হয়, তাহলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সততার ব্যাপারে অনমনীয় হতে হবে। সংসদের ভেতরে দুর্নীতিমূলক আচরণ সহ্য করা যাবে না। নির্বাচনী প্রতারণায়ও তা সহ্য করা যাবে না। যদি তা করা হয়, তাহলে দু’টি পরিণতি ঘটবে। প্রথমত, সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হবে। দ্বিতীয়ত, জনগণ সংসদ এবং সরকারের ওপর আস্থা হারাবে। এ দুটোর কোনোটাই গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলকর নয়।’)

৩.৪ ব্রিটিশ আইন
যুক্তরাজ্যে লিখিত সংবিধান নেই। তাই সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তি ব্রিটিশ সাংবিধানিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যুক্তরাজ্যে বিরাজমান আইন ও ঐতিহ্যে সংসদ সদস্যদের বহিষ্কার এবং তাদের অযোগ্যতার বিষয়টির মধ্যে বিভাজন সুস্পষ্ট হয়েছে। কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনে ‘আনফিট’ বা অনুপযুক্ত (অযোগ্য নয়) হয়ে পড়লে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তাঁকে বহিষ্কার করতে পারে- অনুপযুক্ত হওয়ার কারণ তাঁর অসদাচারণ, যা তাঁকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে অযোগ্য নাও করতে পারে। তাই তাঁকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করার এখতিয়ার পার্লামেন্টের নেই। ফলে একজন বহিষ্কৃত সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেন, যা ঘটেছিল ১৭৬৯ সালে জন উইলক্স-এর ক্ষেত্রে।

ব্রিটিশ জুরিসপ্রুডেন্সে আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত অধিকার এবং ‘রিজুলিউশান’ বা প্রস্তাব আকারে গৃহীত বিশেষ অধিকারের মধ্যে বিভাজন করা হয়। প্রস্তাব আকারে গৃহীত অধিকারের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ আদালত ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বা প্রয়োজনীয়তার মানদণ্ড উদ্ভাবন করে। এর মাধ্যমে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার দিকটি দেখা হয় না, বরং দেখা হয় শাস্তিমূলক পদক্ষেপটি না নেয়া হলে সংসদের মর্যাদা (dignity), সততা (integrity) ও কার্যকারিতা (efficiency) ব্যাহত হবে কি না। তাই যুক্তরাজ্যে অনুশোচনা ও ক্ষমা প্রার্থনা সত্ত্বেও অতীতে বহু সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ওই দেশে সংসদের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিচারিক পর্যালোচনার (judicial review) পরিধিও সীমিত।

৩.৫ ভারতীয় আইন ও অভিজ্ঞতা
ভারতীয় সংবিধানিক বিধানও অস্ট্রেলিয়ার মতো। ভারতীয় সংবিধানের ১০৫ ও ১২২ অনুচ্ছেদে লোকসভা ও রাজ্যসভা এবং তাদের সদস্যদের ক্ষমতা, বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি সম্পর্কিত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংবিধানে এ সকল অধিকার আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত করার কথা বলা আছে। তবে আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত ‘যা অদ্যাবধিও হয়নি’ ভারতের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এবং পার্লামেন্ট সদস্যদের ভোগ করা ক্ষমতা ও অধিকারগুলো প্রযোজ্য হবে। ১৯৭৮ সালের ভারতীয় সংবিধানের ৪৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে একই অধিকার অব্যাহত রাখা হয়েছে। ভারতীয় প্রাদেশিক পরিষদসমূহের জন্যও একই অধিকার ও ক্ষমতা প্রযোজ্য (অনুচ্ছেদ ১৯৪ ও ২১২)।

প্রতিবেশী ভারতে সংসদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন করার কারণে বহুবার বিভিন্ন ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। লোকসভা, রাজ্যসভা ও প্রাদেশিক পরিষদ থেকে অসদাচারণের অভিযোগে অনেক সদস্যদের বহিষ্কার করা হয়েছে। প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৫১ সালে সংসদীয় সদস্যপদকে অপব্যবহারের অভিযোগে এইচ জি মুডগাল নামে এক লোকসভার সদস্যকে বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে। একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির তদন্তের ভিত্তিতে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কার প্রস্তাবটি লোকসভায় উত্থাপনকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু বলেন: ‘ÔApart from that, even if the Constitution had made no reference to this, this House as a sovereign Parliament must have inherently the right to deal with its own problems as it chooses and I cannot imagine anybody doubting that fact.’ (‘এছাড়াও, সংবিধানে বলা না থাকলেও সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই সংসদের নিজের ইচ্ছামতো তার নিজস্ব সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা রয়েছে। আমি কল্পনাও করতে পারি না, কেউ এ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করবে।’)

পরবর্তীকালে ১৫ নভেম্বর ১৯৭৬ সালে সুব্রমণিয়ম সোয়ামিকে রাজ্যসভা থেকে বহিষ্কার করা হয়। মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ ইত্যাদি প্রদেশের প্রাদেশিক পরিষদ থেকেও বেশ কয়েকজন সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়।

১৯৭৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর ভারতীয় লোকসভা থেকে মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা প্রদান, হুমকি প্রদান, নাজেহাল করার এবং মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগে বহিষ্কার ও কারাগারে প্রেরণ করা হয়। একইসঙ্গে আর কে দাওয়ান ও ডি সেন নামে আরো দু’জন লোকসভা সদস্যকেও বহিষ্কৃত করা হয়। সংসদ নেতা মুরারজী দেশাই লোকসভায় প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। পরবর্তীকালে, ৭ মে ১৯৮১ সালে, লোকসভার ‘রিজুলিউশন’ বা প্রস্তাবের মাধ্যমে অবশ্য মিসেস গান্ধী ও তাঁর দুই সহকর্মীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

ভারতীয় সংসদ থেকে বহিষ্কারের সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে ২৩ ডিসেম্বর ২০০৫ তারিখে, যখন ১১ জন সংসদ সদস্যকে অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন উত্থাপনের এবং স্থানীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়। তাদের দশজন ছিলেন লোকসভার এবং একজন রাজ্যসভার সদস্য। এদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন বিজেপির, তিনজন বিএসপির, একজন কংগ্রেসের এবং একজন আরজেডির সদস্য। পরবর্তীকালে ২১ অক্টোবর, ২০০৮ তারিখে বাবুভাই কাতারা নামে আরেকজন লোকসভার বিজেপির সদস্যকে তাঁর স্ত্রী ও ছেলের পাসপোর্ট ব্যবহার করে অন্য দু’জনকে বিদেশে পাচার করার অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়।

লেখক: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক

ই-মেইল: badiulm@gmail.com

[‘সুজন – সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে গত ২৮ মে ২০০৯ তারিখে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল আলোচনায় উত্থাপিত ও পরবর্তীতে সামান্য সংশোধিত এই নিবন্ধটি ধারাবাহিকভাবে আমাদের সময়ে প্রকাশিত হচ্ছে। আগামীতে পড়-ন ‘সদস্যদের বহিষ্কারে সংসদের এখতিয়ার এবং আদালতের সিদ্ধান্ত’]
তথ্য সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়, ১১ জুন ২০০৯

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s