সংসদ সদস্যকে বহিষ্কারের দৃষ্টান্ত আমাদের দেশে নেই

t_logo

ড. বদিউল আলম মজুমদার
আমাদের জাতীয় সংসদের সামনে বর্তমানে সংসদের বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত দুটি বিষয় রয়েছে। প্রথমটি হলো সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ। অভিযোগ তদন্তের জন্য মাননীয় স্পিকার ইতোমধ্যে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি এবং একাধিক সাব-কমিটি গঠন করেছেন। এরইমধ্যে একটি সাব-কমিটি ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতির কারণে নৈতিক স্খলনের অপরাধের অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদ থেকে তাঁর বহিষ্কারের সুপারিশ করেছেন বলে সংবাদপত্রে রিপোর্ট বেরিয়েছে। সংবাদপত্রের রিপোর্ট থেকে আরো জানা যায়, সংসদীয় বিশেষ কমিটির সামনে ১০ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তাঁর প্রতি সমন জারি করা হয়েছে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো সংসদীয় ‘সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি’ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মধ্যে কমিটির এখতিয়ার সম্পর্কিত একটি বিরোধ। কয়েক মাস আগে ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীরের সভাপতিত্বে গঠিত উপরোক্ত কমিটি দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যান লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধূরী, অপর দু’জন কমিশনার ও সাবেক সচিবকে কমিশনের গত দু’বছরের কার্যক্রম সম্পর্কিত দলিলপত্রসহ ১২ এপ্রিল কমিটির সামনে তলব করে। সংশিস্নষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাঁদেরকে তলব করা আইনসঙ্গত হয়নি বলে দাবি করে কমিটির সামনে উপস্থিত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। কমিটি তাঁদেরকে কারণ দর্শাও নোটিস জারি করে ২ জুনের মধ্যে জবাব প্রেরণের জন্য বলে। জবাব সন্তোষজনক না হলে কমিটি তাঁদের বিরুদ্ধে সংসদ অবমাননার অভিযোগ এনে জেল জরিমানার হুমকিও প্রদান করে।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। তদন্ত শেষে কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পুরো সংসদকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা আশা করি যে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সম্পর্কে কমিটি ও সংসদ সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা আরো আশা করি যে, সংশিস্নষ্টরা সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করবেন যেন কোনোরূপ খারাপ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি না হয়।

এ প্রসঙ্গে যে প্রশ্নটি নাগরিকদের জন্য প্রাসঙ্গিক, তা হলো- অসদাচারণের দায়ে একজন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কারের ক্ষমতা কি আমাদের জাতীয় সংসদের আছে? বাংলাদেশ সংবিধানে কোনো সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করার কোনো বিধান নেই। এ ব্যাপারে কোনো দৃষ্টান্তও আমাদের দেশে নেই। সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা থাকলেও, সংসদীয় বিশেষ অধিকার বিষয়ে কোনো আইনও আমাদের জাতীয় সংসদ অদ্যাবধি প্রণয়ন করেনি। তবে সাবেক এটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম তাঁর Constitutional Law of Bangladesh বইতে লিখেছেন: ‘‘Privileges will have no meaning at all unless Parliament is conceded the power to take action against the breach of privilege. Thus the question is not one of existence but of the extent of the power.’(‘বিশেষ অধিকারের বিষয়টি অর্থহীন, যদি তা ক্ষন্নু করার কারণে সংসদের ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতার স্বীকৃতি না দেয়া হয়। তাই ক্ষমতা আছে-কি-নেই তা প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হলো কতটুকু আছে।’) সুস্পষ্ট আইন ও অতীতের দৃষ্টান্ত নেই বলে, এক্ষেত্রে অন্য দেশের কনভেনশন বা প্রচলিত প্রথা অনুসরণ করা আমাদের জন্য প্রয়োজন হবে- পৃথিবীর অনেক দেশেই সংসদ সদস্যদের বহিষ্কারের দৃষ্টান্ত রয়েছে। আরো রয়েছে, সংসদ সদস্য নন, এমন ব্যক্তিদেরকে শুধুমাত্র সংসদের বা সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধা প্রদানের কারণে শাস্তি প্রদানের উদাহরণ।

লক্ষ্যণীয়, যেকোনো বিষয়ে স্বাধীনভাবে সংসদে কথা বলার জন্য আমাদের সংসদ সদস্যদেরকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। আরো দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে, স্বাধীনভাবে রিপোর্ট ও কার্যধারা প্রকাশের ক্ষেত্রে। কিন্তু সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যগণ তাঁদের দলের বিরুদ্ধে সংসদে অবস্থান নিতে পারেন না। বস্তুত এ অনুচ্ছেদের কারণে মন্ত্রিপরিষদ সংসদের কাছে দায়বদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে, সাংসদ সদস্যরাই দায়বদ্ধ হয়ে পড়েছেন দলীয় নেতা-নেত্রীদের কাছে। অর্থাৎ সংবিধানের ৭৬ ও ৭৮ অনুচ্ছেদ সংসদকে নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা প্রদান করলেও, ৭০ অনুচ্ছেদ সে ক্ষমতা অনেকাংশে কেড়ে নিয়েছে। তাই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধন আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। সংশোধনের ক্ষেত্রে অবশ্য স্মরণ রাখতে হবে এ অনুচ্ছেদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির দুঃখজনক প্রেক্ষাপট।

সংসদের বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত আমাদের সাংবিধানিক বিধানের সঙ্গে কানাডার বিধানের অনেকটা মিল রয়েছে। কানাডিয়ান সংবিধানে আইনের মাধ্যমে সংসদীয় বিশেষ অধিকার নির্ধারণের কথা বলা রয়েছে। আরো বলা রয়েছে, আইন করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিশেষ অধিকারের বেশি ক্ষমতা কানাডিয়ান সংসদ সদস্যদেরকে প্রদান করা যাবে না। অর্থাৎ কানাডিয়ান সংবিধানে বলা নেই যে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিশেষ অধিকার, আইন প্রণয়নের র্প্‌বূ পর্যন্ত, কানাডিয়ান সংসদ সদস্যরা ভোগ করবেন। তেমনিভাবে আমাদের সংবিধানেও এমন কোনো বিধান নেই। তাই কানাডিয়ান প্রতিনিধি পরিষদ যদি শাস্তি প্রদানের অধিকারকে অন্তর্নিহিত ক্ষমতা গণ্য করে তাদের সদস্যদেরকে বহিষ্কার করতে পারে, তাহলে প্রচলিত প্রথা অনুসরণ করে, আমাদের জাতীয় সংসদের পক্ষেও তা করা সম্ভব।

এ প্রসঙ্গে টমাস এম কুলি’র A Treatise on the Constitutional Limitations গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে: ‘Each House has t the power to punish members for disorderly behavior and other contempts of its authority, and also to expel a member for any cause which seems to the body to render it unfit that he continues to occupy one of its seats. This power is sometimes conferred by the constitution, but it exists whether expressly conferred or not It is a necessary and incidental power, to enable the house to perform its high functions and is necessary to the safety of the State. It is a power of protection.’(‘প্রত্যেক কক্ষেরই তাদের নিজস্ব সদস্যদেরকে বিশৃঙখল আচরণ এবং অন্য ধরনের অবমাননার জন্য শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তাদের যেকোনো সদস্যকে বহিষ্কারের ক্ষমতা রয়েছে, যদি তারা মনে করে যে, কোনো কারণে সংশিস্নষ্ট ব্যক্তি সংসদে সদস্যপদ রাখার উপযোগী নন। এই ক্ষমতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবিধানের মাধ্যমে প্রদান করা হয়ে থাকে। তবে সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা না থাকলেও, এ ক্ষমতা বিদ্যমান। সংসদের মহৎ দায়িত্ব পালনের এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এটি প্রয়োজনীয় এবং আনুষঙ্গিক ক্ষমতা। এটি একটি রক্ষাকবচমূলক ক্ষমতা।’)

এক্ষেত্রে সর্বজনস্বীকৃত বিশেষজ্ঞ এরেসকাইন মে’র উক্তি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য: distinctive mark of a privilege is its ancilliary character. The privileges of Parliament are rights which are ‘absolutely necessary for the due execution of its powers’. They are enjoyed by inidvidual Members, because the House cannot perform its functions without unimpeded use of the services of its Members; and by its House for the protection of its Members and the vindication of its own authority and dignity.’ (‘বিশেষ অধিকারের বৈশিষ্ট্য হলো এর সহায়ক চরিত্র। সংসদের বিশেষ অধিকার হলো সে সকল ক্ষমতা, যা তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য নিরঙ্কুশভাবে অপরিহার্য। এগুলো ব্যক্তি সংসদ সদস্যরা উপভোগ করেন, কারণ সংসদ সদস্যদের বাধাহীন অবদান ছাড়া সংসদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। সংসদ সদস্যদের দায়মুক্তি এবং সংসদের ক্ষমতা ও সম্মানবোধ রক্ষার জন্যও সংসদের বিশেষ অধিকার অপরিহার্য।’) অর্থাৎ সুস্পষ্ট বিধান থাকুক বা না-থাকুক, অসদাচারণের দায়ে কোনো সদস্যকে বহিষ্কার করা সংসদের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা। এর মূল উদ্দেশ্য সংসদের মর্যাদা রক্ষা এবং এর প্রতি জনগণের আস্থা নিশ্চিত করা, যেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।

সংসদীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটি ও দুদকের বিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো- যেকোনো সংসদীয় কমিটি কি যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে তলব করতে পারে? এটি এখতিয়ারের প্রশ্ন। আইনগতভাবে এখতিয়ার থাকলে কমিটি অবশ্যই সংশিস্নষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তলব করতে পারে।

একথা সত্য যে, দুদক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, তাই এটি সম্পর্কে সংবিধানে কিছু বলা নেই। সম্ভবত আমাদের সংবিধান প্রণেতাদের ধারণার মধ্যেই আসেনি যে, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে কেনা আমাদের এই বাংলাদেশ একদিন পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত জাতির অমর্যাদা ও গ্লানি অর্জন করবে। তাই তাঁরা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় একটি দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করেননি। তবে এটি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটির এখতিয়ার বহির্ভুত।

কার্যপ্রণালী-বিধি ২৩৮ ধারার অধীনে ‘চতুর্থ তফসিলে লিপিবদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যাবলি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য’ সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সৃষ্টি। ‘চতুর্থ তফসিলে লিপিবদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের রিপোর্ট ও হিসাব পরীক্ষা করা’ কমিটির কাজের অন্তর্ভুক্ত। আরো অন্তর্ভুক্ত ‘চতুর্থ তফসিলে লিপিবদ্ধ সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যাপারে সরকারী হিসাব কমিটি এবং অনুমিত হিসাব কমিটিতে ন্যস্ত ঐসব কাজ করা, ঃ এবং যেসব কাজ সময়ে সময়ে স্পীকার কমিটিতে প্রেরণ করিবেন, তাহা করা’। তবে ‘যে বিশেষ আইন বলে কোন বিশেষ সরকারী প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়, সেই আইন বলে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানের বিবেচ্য বিষয়সমূহ’ কমিটির তদন্তের এখতিয়ার বহির্ভূত। উলেস্নখ্য, কার্যপ্রণালী-বিধি’র সংশিস্নষ্ট বিধানগুলো পড়ে মনে হয় যে, সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সৃষ্টি হয়েছে মূলত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে।

অবশ্যই সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সুনির্দিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদন্ত করার এবং সাক্ষী তলব করার এখতিয়ার রয়েছে। তবে কার্যপ্রণালী-বিধি’র চতুর্থ তফসিলে উলিস্নখিত কমিটির এখতিয়ারাধীন ২৩টি ‘আইন/রাষ্ট্রপতির আদেশ দ্বারা স্থাপিত সরকারী প্রতিষ্ঠানে’র মধ্যে দুদক অন্তর্ভুক্ত নয়। এমনকি চতুর্থ তফসিলের ২৫ নম্বরে উলিস্নখিত ‘এই বিধিসমূহ পাশের পর গঠিত অন্যান্য কর্পোরেশন/প্রতিষ্ঠান’ কমিটির আওতাভুক্ত করার বিধানও দুদকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়- দুদককে কমিটির এখতিয়ার থেকে বাইরে রাখা হয়েছে। কারণ দুদক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০৪ সালে আর কার্যপ্রণালী-বিধি’র সংশোধনের সর্বশেষ তারিখ ১১ জানুয়ারি, ২০০৭। অর্থাৎ দুদকের কার্যক্রম সংসদীয় স্থায়ী সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির এখতিয়ারের অন্তর্ভুক্ত নয়।

বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সম্পাদিত আইন-শব্দকোষ অনুযায়ী, দণ্ডবিধির ৪১ ধারা অনুসারে, ‘বিশেষ আইন হইতেছে বিশেষ বিষয়ের প্রতি প্রযোজ্য আইন।’ যেমন, রেলওয়ে আইন, আয়কর আইন ইত্যাদি। উপরোক্ত সংজ্ঞার আলোকে ‘দুর্নীতি এবং দুর্নীতিমূলক কার্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুর্নীতি এবং অন্যান্য সুনির্দিষ্ট অপরাধের অনুসন্ধান এবং তদন্ত পরিচালনার জন্য একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা’র (আইনের মুখবন্ধ থেকে উদ্ধৃত) লক্ষ্যে প্রণীত দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-ও ‘বিশেষ সরকারী প্রতিষ্ঠান স্থাপনে’র লক্ষ্যে একটি বিশেষ আইন বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। উপরন্তু, দুদকের তদন্ত ‘সরকারী হিসাব কমিটি এবং অনুমিত হিসাব কমিটিতে ন্যস্ত’ বা স্পিকার কর্তৃক কমিটিতে প্রেরিত বিষয় বলেও আমরা শুনিনি। এসব বিবেচনায়ও দুদকের এবং এর সঙ্গে সংশিস্নষ্ট ব্যক্তিদের কার্যক্রম তদন্ত করা কমিটির কার্যপরিধির অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তা করা হবে আইনের লঙঘন।

আরেকটি কারণেও দুদকের বিষয়ে কমিটির হস্তক্ষেপ বেআইনি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান না হলেও, দুদক আইনের মাধ্যমে সৃষ্ট প্রতিষ্ঠান। দুদকের আইনের মুখবন্ধে এটিকে ‘দেশে দুর্নীতি এবং দুর্নীতিমূলক কার্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুর্নীতি এবং অন্যান্য সুনির্দিষ্ট অপরাধের অনুসন্ধান এবং তদন্ত পরিচালনার জন্য একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধানকল্পে প্রণীত আইন’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই কমিশন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন হইবে।’ আইনের ২৪ ধারা অনুযায়ী, ‘এই আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে, কমিশনারগণ এই আইনের অধীন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।’ কমিশন যেন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মতো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে সে লক্ষ্যে আইনের ১০(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সুপ্রীম কোর্টের একজন বিচারক যেরূপ কারণ ও পদ্ধতিতে অপসারিত হইতে পারেন, সেইরূপ কারণ ও পদ্ধতি ব্যতীত কোন কমিশনারকে অপসারণ করা যাইবে না।’

আইনের উপরোক্ত বিধানাবলি দুদককে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জাতীয় সংসদের প্রত্যয়েরই প্রতিফলন। যে প্রেক্ষাপটে তা করা হয়েছে, তাও আজ বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। বহুদিন থেকেই আমাদের দেশে দুর্নীতি ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে এবং এটি এখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। ক্ষমতাধররা ক্ষমতার অপব্যবহার বা আইনের অপপ্রয়োগ করে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা পছন্দের ব্যক্তিদেরকে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দিলে বা ব্যক্তিগতভাবে নিলে দুর্নীতির সৃষ্টি হয়। ক্ষমতার, বিশেষত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমেই আমাদের সমাজে দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে। দুর্নীতির ‘রাজনীতিকরণ’ এবং রাজনীতির ‘দুর্নীতিকীকরণে’র ফলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়ই দুর্নীতি আমাদের দেশে সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতি আর দুর্নীতি আজ বহুলাংশে সমার্থক হয়ে গিয়েছে. ফলে অতীতের দুর্নীতি দমনের প্রচেষ্টা অনেকের কাছে ‘রাজনীতি দমনে’র প্রচেষ্টা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। আর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করেই অতীতে দুর্নীতিরোধের সকল প্রচেষ্টা অকার্যকর করা হয়েছে। অনেকের ধারণা, এ ধরনের অপচেষ্টা রোধের লক্ষ্যেই জনদাবির প্রেক্ষিতে সংসদ দুদককে স্বাধীন করেছে এবং তাদের অপসারণের বিরুদ্ধে কঠোর বিধান করে দুদকের কমিশনারদেরকে নির্ভয়ে ও বিনাদ্বিধায় কাজ করার ক্ষমতা দিয়েছে, যদিও বিগত চারদলীয় সরকার কমিশনকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে রেখেছিল। বস্তুত, বর্তমানে দুর্নীতি যে সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী রূপলাভ করেছে তা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যেই সংসদ দুদককে স্বাধীন করেছে। সংসদীয় সরকারি প্রতিষ্ঠিত কমিটির দুদক সম্পর্কিত বর্তমান কার্যক্রম এ লক্ষ্যকেই ভণ্ডুল করে দিতে পারে।

নিঃসন্দেহে দুদক একটি সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন ইত্যাদিও সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংবিধান এগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দিয়েছে এবং এগুলোর কাজে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কোনো সংসদীয় কমিটির নেই। আর সংসদে পাস করা আইন দুদককে স্বাধীনতা দিয়েছে- দুদক নিজে এ স্বাধীনতা ঘোষণা করেনি। কারণ দুদক ও সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের মতো ‘ইনিস্টিটিউশানাস অব একাউন্টিবিলিটি’ বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস’ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এগুলোর সৃষ্টি। তাই কার্যপ্রণালী-বিধি’র ২৩৮ ধারা ও চতুর্থ তফসিলের কথা বাদ দিলেও, আইনের মাধ্যমে স্বীকৃত স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনে হস্তক্ষেপ করার এখতিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির নেই। যেমন নেই বাংলাদেশ ব্যাংকে। এছাড়া আইনে দুদকের জবাবদিহিতার বিধানও রাখা হয়েছে। আইনে দুদকের পক্ষ থেকে বাৎসরিকভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদন পেশ করার এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে উপস্থাপনের ব্যবস্থা করার বিধান রাখা হয়েছে। তবে দুদকের জবাবদিহিতার পদ্ধতিগত বিষয়টি অবশ্যই আবার বিবেচনা করা যেতে পারে।

সংসদীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি ও দুদকের মধ্যেকার বিরোধের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতা ও নৈতিকতার প্রশ্নও জড়িত। কমিটির চেয়ারম্যান দুদকের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত একজন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি। নৈতিক, এমনকি আইনগত দিক থেকেও তিনি দুদকের বিরুদ্ধে বিচারকের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না- প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসার মতে, দুদকের বিরুদ্ধে তিনি একাধারে জজ, প্রসিকিউটর ও জুরির আসনে বসেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরো সন্দেহের উদ্রেক করে, কারণ কার্যপ্রণালী-বিধি’র চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত ২৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য না করে তিনি তফসিলের তালিকা বহির্ভূত দুদকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। উলেস্নখ্য, তফসিলে অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশ বিমানসহ অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের সাম্প্রতিক রায় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। রাজা রাম পাল ও অন্য দশজন সংসদ সদস্যের পার্লামেন্ট কর্তৃক বহিষ্কারাদেশ বহাল রাখার রায়ে আদালত বলেন: The procedure adopted by the two Houses of Parliament cannot be held to be suffering from any illegality, irrationality, unconstitutionality, violation of rules of natural justice or perversity.’ (‘সংসদের দুই কক্ষ যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছে তা আইন-লঙঘনতা, অযৌক্তিকতা, অসাংবিধানিকতা, স্বাভাবিক ন্যায়বিচারহীনতা বা বিকৃতির দোষে দুষ্ট নয়।’) অর্থাৎ সংসদ এবং সংসদীয় কমিটির বিশেষ অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধান এবং আইন সমুন্নত রাখার পাশাপাশি যৌক্তিকতা, ন্যায়বিচার ও বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীরের সভাপতিত্বে পরিচালিত সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটির দুদক সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত ‘নেচারাল জাস্টিস’ বা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী, কারণ কমিটির সভাপতি তাঁর সংসদীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিশোধ নিচ্ছেন এমন ধারণা সৃষ্টি হওয়া অমূলক নয়। এছাড়াও লেজলি স্টিফেন্সের উদ্ধৃতি দিয়ে ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ মামলার [১৫ বিএলটি (এইচসিডি) (২০০৭)] রায়ে বাংলাদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির বলেন যে, সংসদের ক্ষমতা সীমাহীন নয়- সংসদ যা-ইচ্ছা-তা করতে পারে না। অযৌক্তিক ও নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ডেও সংসদ জড়িত হতে পারে না।

লেখক: সম্পাদক, সুজন – সুশাসনের জন্য নাগরিক

ই-মেইল: badiulm@gmail.com

[‘সুজন – সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে গত ২৮ মে ২০০৯ তারিখে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল আলোচনায় উত্থাপিত ও পরবর্তীতে সামান্য সংশোধিত এই নিবন্ধটি ধারাবাহিকভাবে আমাদের সময়ে প্রকাশিত হচ্ছে। আগামীতে পড়-ন এর শেষ খণ্ড ‘সংসদ সদস্যরাও দায়বদ্ধতার ঊধের্ব থাকতে পারেন না’]

তথ্য সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়, ১৫ জুন ২০০৯

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s