রাজনীতি: সংসদীয় কমিটি বনাম সাবেক স্পিকার

palo_logo

বদিউল আলম মজুমদার
নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, সাবেক ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী ও সরকারি দলের সাবেক চিফ হুইপ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের লক্ষ্যে একটি সংসদীয় বিশেষ তদন্ত কমিটি ও একাধিক সাব-কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তের শেষ পর্যায়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কমিটি তাঁদের গত ২৭ জুন তলব করে, কিনতু তিনজনই তা উপেক্ষা করেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিটি বর্তমান অধিবেশন শেষ হওয়ার আগেই তিনজনের বিরুদ্ধে সংসদীয় বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ এনে স্পিকারের মাধ্যমে সংসদে প্রতিবেদন পেশ করবে। এ ব্যাপারে সংসদের কী ক্ষমতা রয়েছে? সংসদীয় বিশেষ অধিকার বলতেই বা কী বুঝায়?

সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার এবং দায়মুক্তির (parliamentary privileges and immunities) ধারণার উৎপত্তি যুক্তরাজ্যে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট রাজকীয় হুমকির মুখেও স্বাধীন ও কার্যকরভাবে যেন কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এর উৎপত্তি। এর সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন এরেসকাইন মে (Treatise on the Law, Privileges, Proceedings and Usage of Parliament, 23rd ed.): ‘সংসদের বিশেষ অধিকার হলো কতগুলো স্বতন্ত্র অধিকারের সমষ্টি, যা প্রত্যেক সংসদ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে এবং সংসদের উভয় কক্ষই উপভোগ করে। এগুলো অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভোগ করা অধিকারের চেয়ে অতিরিক্ত অধিকার এবং এগুলো ছাড়া সংসদ ও সংসদ সদস্যগণ তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম। তাই যদিও বিশেষ অধিকার রাষ্ট্রীয় আইনের অংশ, তবুও এগুলোর মাধ্যমে অনেকটা সাধারণ আইনের আওতা থেকে তাঁদের রেহাই প্রদান করা হয়।’ আমাদের দেশে অবশ্য উচ্চকক্ষ নেই, তাই উচ্চকক্ষের কথা আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

এই স্বতন্ত্র অধিকারগুলোকে দুই ভাগে বিভাজন করা যায়, যেগুলো এককভাবে ‘সংসদ সদস্যদের’ জন্য প্রযোজ্য এবং যেগুলো ‘পুরো সংসদের’ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ব্যক্তি সংসদ সদস্যের বেলায় প্রযোজ্য বিশেষ অধিকারগুলো মূলত দায়মুক্তি সম্পর্কিত এবং এগুলোর ফলে ব্যক্তি সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। (প্রথম আলো, ১২ জুন ২০০৯) বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী-বিধির ১৭২-১৭৬ ধারায় এসব বিষয় সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। পুরো সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অধিকার ও ক্ষমতাগুলো সম্পর্কে আমাদের কার্যপ্রণালী-বিধির ২০৪-২০৫ ধারা প্রযোজ্য।

বিষয়টি সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট ধারণা অর্জনের লক্ষ্যে বিশেষ অধিকার (privileges), ক্ষমতা (powers) এবং দায়মুক্তির (immunities) মধ্যে বিভাজন করা আবশ্যক, যদিও অনেক সময় তা করা হয় না। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কে সরকারের মতে, ‘নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংসদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে বিশেষ অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো ব্যক্তিকে সংসদের অধিকার ক্ষুণ্ন বা অবমাননার দায়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকারকে ক্ষমতা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সংসদে যেকোনো কিছু বলার জন্য কোনো সংসদ সদস্য দায়ী না হওয়ার অধিকারই দায়মুক্তি।’ [বিশেষ রেফারেন্স অনুচ্ছেদ ১৪৩, এআইআর (১৯৬৫) এসসি ৭৪৫]

বিশেষ অধিকারকে আরও দুই ভাগে বিভাজন করা যায়: সংসদের গঠন (composition) সম্পর্কিত অধিকার এবং নিজস্ব কার্যক্রম বিনা বাধায় স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার অধিকার। সংসদের গঠনবিষয়ক অধিকার বলতে কারা সংসদ সদস্য হতে পারবেন বা কাদের সদস্য হওয়া থেকে বিরত রাখা যায়, অর্থাৎ সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা সম্পর্কিত ক্ষমতাকে বুঝায়। তবে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতা লিখিত সংবিধান এবং আইনে অন্তর্ভুক্ত থাকার ফলে এটি সংসদের বিশেষ অধিকারের মধ্যে পড়ে না। উল্লেখ্য, আমাদের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধিত) আইন ২০০৯-এর ১২ ধারায় সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতা সম্পর্কিত বিধান অন্তর্ভুক্ত।

পক্ষান্তরে, নিজস্ব কার্যক্রম ও কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সংসদের বিশেষ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনায় অসহযোগিতা বা বাধা প্রদান করলে যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংসদের অধিকার ক্ষুণ্ন বা সংসদ অবমাননার (contempt) অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংসদের রয়েছে। এ অধিকারের আওতায় উচ্ছৃঙ্খলতা, দুর্নীতি ও অসদাচরণের কারণে সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে সংসদ নিজ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার, এমনকি তাঁদের সংসদ থেকে বহিষ্কারের এখতিয়ারও রাখে। অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপরাধী কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁদের দায়বদ্ধ করে শাস্তির ব্যবস্থা করা সংসদীয় বিশেষ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।

আমাদের সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির বিধান রয়েছে। সাংবিধানিক বিধানানুযায়ী সংসদ আইনের দ্বারা এগুলো সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করার কথা। কিনতু এ বিষয়ে অদ্যাবধি কোনো আইন প্রণীত হয়নি। আইন প্রণীত না হলে কি সংসদের পক্ষে এ অধিকার প্রয়োগ করা সম্ভব?

ভারতীয় সংবিধানেও আইন প্রণয়ন করে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি নির্ধারণ করার বিধান রয়েছে, কিনতু সে দেশেও এ পর্যন্ত তা করা হয়নি। তবুও ভারতীয় সংসদ তাদের অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ১৯৫১ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ ১৭ জন সদস্যকে বহিষ্কার করেছে, যদিও মিসেস গান্ধী ও অন্য দুই সহকর্মীর বহিষ্কারাদেশ পরবর্তী লোকসভায় প্রত্যাহার করা হয় (বিভিন্ন প্রাদেশিক পরিষদ থেকেও অনেককে বহিষ্কার করা হয়)। ২০০৫ সালে একই সঙ্গে ১১ জন সদস্যকে ভারতীয় লোকসভা ও রাজ্যসভা থেকে দুর্নীতির অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০০৮ সালে বাবুভাই কাতারা নামের লোকসভার বিজেপির একজন সদস্যকে তাঁর স্ত্রী ও ছেলের পাসপোর্ট ব্যবহার করে অন্য দুজনকে বিদেশে পাচার করার অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়। প্রসঙ্গত, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে এ পর্যন্ত ৬০ জন সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, আমাদের সঙ্গে ভারতীয় সাংবিধানিক বিধানের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। মূল ভারতীয় সংবিধানে বলা হয়েছে, আইন প্রণয়ন করে বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত ভারতের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এবং পার্লামেন্টের সদস্যদের ভোগ করা ক্ষমতা ও অধিকারগুলো প্রযোজ্য হবে। ১৯৭৮ সালের সংবিধানের ৪৪তম সংশোধনীর মাধ্যমেও একই অধিকার অব্যাহত রাখা হয়েছে। আমাদের সংবিধানে এমন কোনো বিধান নেই।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা না থাকলেও নিজেদের কার্যপ্রণালী স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সংসদের অন্তর্নিহিত অধিকার। এ ক্ষেত্রে টমাস কুলির (A Treatise on the Constitutional Limitations, 1972) মতামত বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য: ‘প্রত্যেক কক্ষেরই তাদের নিজস্ব সদস্যদের বিশৃঙ্খল আচরণ এবং অন্য ধরনের অবমাননার জন্য শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তাদের যেকোনো সদস্যকে বহিষ্কারের ক্ষমতা রয়েছে, যদি তারা মনে করে, কোনো কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংসদে সদস্যপদ রাখার উপযোগী নন। এ ক্ষমতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবিধানের মাধ্যমে প্রদান করা হয়ে থাকে। তবে সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা না থাকলেও এ ক্ষমতা বিদ্যমান। সংসদের মহৎ দায়িত্ব পালনের এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এটি প্রয়োজনীয় এবং আনুষঙ্গিক ক্ষমতা। এটি একটি রক্ষাকবচমূলক ক্ষমতা।’

এ ক্ষেত্রে সর্বজনস্বীকৃত বিশেষজ্ঞ এরেসকাইন মের বক্তব্য হলো: ‘বিশেষ অধিকারের বৈশিষ্ট্য হলো এর সহায়ক চরিত্র। সংসদের বিশেষ অধিকার হলো সেসব ক্ষমতা, যা তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য নিরঙ্কুশভাবে অপরিহার্য। এগুলো ব্যক্তি সংসদ সদস্যরা উপভোগ করেন, কারণ সংসদ সদস্যদের বাধাহীন অবদান ছাড়া সংসদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। সংসদ সদস্যদের দায়মুক্তি এবং সংসদের ক্ষমতা ও সম্মানবোধ রক্ষার জন্যও সংসদের বিশেষ অধিকার অপরিহার্য।’ অর্থাৎ সুস্পষ্ট বিধান থাকুক বা না থাকুক, অসদাচরণের দায়ে কোনো সদস্যকে বহিষ্কার করা সংসদের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা। এর মূল উদ্দেশ্য সংসদের মর্যাদা রক্ষা এবং এর প্রতি জনগণের আস্থা নিশ্চিত করা, যাতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমাদের সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুুদুল ইসলাম তাঁর Constitutional Law of Bangladesh (2nd ed.) বইয়ে লিখেছেন: ‘বিশেষ অধিকারের বিষয়টি অর্থহীন, যদি তা ক্ষুণ্ন করার কারণে সংসদের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতার স্বীকৃতি না দেওয়া হয়। তাই ক্ষমতা আছে কি নেই তা প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হলো কতটুকু আছে।’ সুস্পষ্ট আইন ও অতীতের দৃষ্টান্ত নেই বলে এ ক্ষেত্রে অন্য দেশের কনভেনশন বা প্রচলিত প্রথা অনুসরণ করা আমাদের জন্য প্রয়োজন হবে−পৃথিবীর অনেক দেশেই সংসদ সদস্যদের বহিষ্কারের দৃষ্টান্ত রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কানাডীয় আদালত সংসদের বিশেষ অধিকারের বিষয়টিকে ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ (doctrine of necessity) বা প্রয়োজনীয়তার আলোকে দেখেন।

২০০৫ সালে ১১ জন ভারতীয় সংসদ সদস্যকে বহিষ্কারের পর রাজা রামপাল নামের একজন লোকসভার সদস্য আদালতে তা চ্যালেঞ্জ করেন। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ দুটি বিষয় খতিয়ে দেখেন−সংসদের কি নিজ সদস্যদের বহিষ্কারের ক্ষমতা রয়েছে? আদালত কি সংসদের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে পারে? রাজা রামপাল বনাম স্পিকার ও অন্যান্য [(২০০৭)৩এসসিসি] মামলার রায়ে (৪-১) সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে প্রধান বিচারপতি সাবারওয়াল বলেন:‘সংসদীয় ক্ষমতা এবং বিশেষ অধিকার প্রয়োগের উপযোগিতা ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সংসদীয় কর্তৃপক্ষের। এটি আদালতের বিষয় নয়।’) অর্থাৎ ভারতীয় পার্লামেন্টের তার সদস্যদের বহিষ্কারের ক্ষমতা রয়েছে। তবে দ্বিমত পোষণকারী বিচারক রাভিনড্রানের মতে, যদি সংবিধানপ্রণেতারা সংসদকে বহিষ্কারের ক্ষমতা দিতে চাইতেন, তাহলে তা সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হতো।

সংসদের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করার আদালতের এখতিয়ার প্রসঙ্গে রায়ে বলা হয়, সংসদীয় কার্যক্রমের নিরঙ্কুশ দায়মুক্তির দাবির কোনো ভিত্তি নেই। তবে আদালতের পর্যালোচনার এখতিয়ার শুধু সীমিত ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বিশেষত, মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন, ‘নেচারাল জাস্টিস’ বা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সংগতিহীনতা, ‘ইররেশনালিটি’ বা অযৌক্তিকতা, ‘পারভারসিটি’ বা বিকৃতি কিংবা গুরুতর বেআইনি বা সংবিধানপরিপন্থী সংসদীয় কার্যক্রম সম্পর্কে পর্যালোচনা করার এখতিয়ার আদালতের রয়েছে। এসব ক্ষেত্র ছাড়া আদালত সংসদের গৃহীত পদ্ধতি সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলবে না। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২২ ও ২১২ অনুযায়ী, কার্যপ্রণালীতে অনিয়মের অভিযোগেও আদালতের দারস্থ হওয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া আদালত তথ্য ও দলিলপত্রের সত্যতা এবং পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না বা সংসদের বিবেচনার ওপর নিজস্ব মতামত চাপিয়ে দেবে না। যদি সিদ্ধান্তের সমর্থনে অন্তত কিছু সাক্ষ্য প্রমাণ থাকে, তাহলে আদালত সংসদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না। অর্থাৎ, আদালতের দৃষ্টিতে বহিষ্কারাদেশ প্রদানের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য-প্রমাণের কড়াকড়িও অনেকটা শিথিল। উপরনতু ‘প্রপোরশনালিটি’ বা লঘু অপরাধের জন্য গুরুদণ্ড দেওয়ার অভিযোগেও আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার অবকাশ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রায়ের মাধ্যমে সংসদের ক্ষমতা ও বিচার বিভাগের এখতিয়ার বিষয়ে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি হয়েছে।

সংসদের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য-প্রমাণের কড়াকড়ি প্রসঙ্গে ওয়েসটেল ডাব্লিউ উইলোভি তাঁর Constitutional Law of the United States (2nd ed) গ্রন্থে বলেন: ‘কোনো সদস্যের কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হতে পারেন, এমন অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর অপরাধ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা নেই, কারণ কংগ্রেস ফৌজদারি আদালত হিসেবে দায়িত্ব পালন করে না। এ ক্ষেত্রে ‘রুলস অব এভিডেন্স’ বা সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রচলিত বিধি-বিধান অনুসরণেরও বাধ্যবাধকতা নেই।

উপরিউক্ত পর্যালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মনে করি, সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের দুর্নীতি ও অসদাচরণের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার, এমনকি তাঁকে সংসদ থেকে বহিষ্কারের এখতিয়ার আমাদের জাতীয় সংসদের রয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন, সংসদ সদস্যরা অতি মর্যাদাবান ও দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত। তাঁদেরই সততা ও নৈতিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং নিজ আচরণের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে। তাই সরল বিশ্বাসে ও জনস্বার্থে তাঁদের কৃত কার্যক্রমের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির বিধান প্রযোজ্য, কিনতু তাঁদের উচ্ছৃঙ্খল ও অপরাধী কর্মকাণ্ডের বেলায় নয়, যে কর্মকাণ্ড পুরো সংসদকেই হেয় প্রতিপন্ন করে। তাই শুধু সাবেক স্পিকারের ক্ষেত্রেই নয়, যেসব সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও আসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এমন কি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আচরণ সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে কি না তা পর্যালোচনা করাও সংসদের দায়িত্ব। তা না হলে পুরো সংসদের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থাশীলতা নষ্ট হবে। তাই আমাদের স্পিকারকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। তবে তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে কারও বিরুদ্ধেই ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ অন্যায়, অনৈতিক ও নিন্দনীয়।

প্রসঙ্গত, আমরা মনে করি, সাবেক ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী ও সাবেক প্রধান হুইপ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত সংসদের অতি উৎসাহের নিদর্শন−তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার সংসদের নেই। তাঁরা বর্তমানে সংসদ সদস্য নন−এক অর্থে তাঁরা সাধারণ নাগরিক এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করার এখতিয়ার দুদকের। একইভাবে সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে প্রেরণই যুক্তিযুক্ত।

আমরা মনে করি, সংসদের একটি মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত সরকারের এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সংসদে প্রণীত আইনগুলো যাতে স্বচ্ছতা, সততা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয় তা নিশ্চিত করা। সংসদকে কার্যকর করার জন্য সংসদীয় কমিটিগুলোকে তাদের মূল দায়িত্বে নিবিষ্ট হওয়া আবশ্যক।

পরিশেষে, সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, কিনতু তাঁরা নিজেরাও দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন করার দায়ে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এই দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এ হাতিয়ারের সঠিক ব্যবহারের জন্য বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তির বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট হওয়া আবশ্যক। আমরা আশা করি, সাংবিধানিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমাদের বর্তমান সংসদ জরুরি ভিত্তিতে এ বিষয়ে একটি আইন প্রণয়ন করবে। এতে যেসব সংসদ সদস্য তাঁদের বিশৃঙ্খল, অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পুরো সংসদের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে, যা সংসদকে কার্যকর করার জন্য অপরিহার্য। প্রসঙ্গত, পাঁচ বছর পর পর ভোটারদের সম্মুখীন হওয়ার মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের দায়বদ্ধতা যথাযথভাবে নিশ্চিত হয় না, কারণ এ প্রক্রিয়ায় অপরাধ করে দণ্ড এড়ানো যায়। তাই সংসদ সদস্যদের ‘রিকল’ বা প্রত্যাহার করার বিধানও আইনে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক, যা পৃথিবীর অনেক দেশেই রয়েছে।

আমাদের অতি সম্মানিত মাননীয় সংসদ সদস্যদের সব কর্মকাণ্ড সব ধরনের সন্দেহ ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখার লক্ষ্যে তাঁদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করাও আজ জরুরি−ভারতীয় লোকসভার একটি বিশেষ কমিটি সম্প্রতি এমন একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করেছে। আচরণবিধিতে অবশ্যই তাঁদের ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে, এমন বিষয়গুলো ঘোষণা করার বিধান থাকতে হবে। আর এ আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগের লক্ষ্যে একটি সংসদীয় ‘এথিকস কমিটি’ গঠনও আবশ্যক। একই সঙ্গে প্রয়োজন ‘প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতিবছর জনসমক্ষে প্রকাশ’ করার উদ্যোগ গ্রহণ, যা আওয়ামী লীগের ‘দিনবদলের সনদে’র সুস্পষ্ট অঙ্গীকার। উল্লেখ্য, আমাদের সংবিধান প্রণয়নের পর ‘কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বিলি’তে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে এথিকসের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন−সুশাসনের জন্য নাগরিক।

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, ৩ জুলাই ২০০৯

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s