আইনপ্রণেতারা আইন ভঙ্গকারী হতে পারেন না

jugantor_logo

ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র
সংসদ সদস্যরা যদি স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হয়ে যান তাহলে তারাই নির্বাহী কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে গেলেন। এতে তাদের নজরদারিত্বের ভূমিকা তারা যথাযথ পালন করতে পারবেন না। এটি আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী হবে।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার ব্যাপারে অনেকদিন থেকেই দেশে ব্যাপক জনমত বিরাজ করছে এবং সে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে আওয়ামী লীগ ‘দিন বদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে : ‘ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন করে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদকে শক্তিশালী করা হবে। জেলা পরিষদকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন-শৃংখলা ও সব ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন সদরকে স্থানীয় উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু, পরিকল্পিত পল্লী জনপদ এবং উপজেলা সদর ও বর্ধিষ্ণু শিল্প কেন্দ্রগুলোকে শহর-উপশহর হিসেবে গড়ে তোলা হবে।’

এছাড়াও দিন বদলের সনদে অন্তর্ভুক্ত ২০২১ সালের জন্য প্রণীত রূপকল্পে ‘রাজনৈতিক কাঠামো, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও গণঅংশায়ন’ শিরোনামে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে : ‘স্থানীয় সরকারকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনৈতিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন সাধন করা হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে স্থানীয় সরকার। এ উদ্দেশ্যে জেলা ও উপজেলার স্থানীয় সরকারকে স্বনির্ভর ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে।’ অর্থাৎ ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণতকরণ এবং এগুলোতে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দুর্ভাগ্যবশত গত কয়েক মাসে বাস্তবে ঘটেছে ঠিক তার বিপরীত।

গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত অধ্যাদেশগুলোর কোনটিই, যেগুলোতে অনেক বলিষ্ঠ ও যুগোপযোগী বিধান ছিল, নবনির্বাচিত সরকার অনুমোদন করেনি। বরং গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত ১৯৯৮ সালের উপজেলা পরিষদ আইনকে কিছু সংশোধন করে পুনঃপ্রবর্তন করা হয়েছে। সংশোধিত এ আইনের অনেকগুলো গুরুতর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

উপজেলা আইনটির একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা হল, এতে সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে এবং পরিষদের জন্য উপদেষ্টাদের পরামর্শ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ বিধানটি আমাদের সংবিধানের সঙ্গে চরমভাবে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ গত জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী ব্যক্তিরা আইন অনুযায়ী উপজেলা পরিষদ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন, সংসদ সদস্যরা এজন্য নির্বাচিত হননি।

গত ডিসেম্বর মাসে জাতীয় সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন, সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘আইন প্রণয়নের-ক্ষমতা’ প্রয়োগের জন্য। আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধীনে সাধারণত নতুন আইন প্রণয়ন, বিদ্যমান আইনের সংশোধন ও রহিতকরণ, নীতিনির্ধারণী বিষয়ে সংসদে বিতর্ক অনুষ্ঠান, সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, বাজেট ও সরকারের অন্যান্য আর্থিক সিদ্ধান্ত অনুমোদন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা আইন প্রণয়ন ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত নয়।

আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সে ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ অর্থাৎ সংবিধানে যাদের জনগণের পক্ষে যে দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, তাদের সে দায়িত্বই পালন করতে হবে। তাই জাতীয় সংসদের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, স্থানীয় সরকার পরিচালনা করলে তা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সুস্পষ্ট লঙঘন হবে, দুর্ভাগ্যবশত যা আমাদের আইনপ্রণেতাদের আইন ভঙ্গকারীতে পরিণত করতে বাধ্য।

নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রণীত উপজেলা পরিষদ আইন আরেকভাবেও আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে লঙঘন করেছে। অন্যান্য আধুনিক রাষ্ট্রের মতো আমাদের সরকার ব্যবস্থাও তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত- আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। এ বিভাগগুলো প্রত্যেকেই স্বাধীন, যদিও এগুলো পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। কোন বিভাগের সঙ্গে জড়িত কেউই অন্য বিভাগের কার্যক্রমে লিপ্ত হতে পারেন না। স্থানীয় সরকার আমাদের সংবিধানের ‘চতুর্থ ভাগে’ অন্তর্ভুক্ত নির্বাহী বিভাগের অংশ। তাই আইন সভার সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলে আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যকার বিভাজন আর থাকবে না, যা হবে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। উল্লেখ্য, সংসদ সদস্যদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণও একই দোষে দুষ্ট।

আরেক দিক থেকেও আমাদের সংসদ সদস্যরা আইনভঙ্গকারীতে পরিণত হয়েছেন বলে আমাদের ধারণা। প্রত্যক্ষভাবে যা করা যায় না, তা আইন করে পরোক্ষভাবে করলে সে আইনকে ‘কালারেবল লেজিসলেশন’ (পড়ষড়ঁৎধনষব ষবমরংষধঃরড়হ) বা রঙিন আইন বলা হয়। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা উপজেলা পরিষদ পরিচালনা করতে পারেন না, তাই সম্প্রতি সংশোধিত উপজেলা আইনটি নিঃসন্দেহে একটি রঙিন আইন।

উপজেলা পরিষদ আইনটি বৈষম্যমূলক এবং সেদিক থেকেও এটি সংবিধানেরপরিপন্থী। আইনে শুধু একক আঞ্চলিক এলাকা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদেরই উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে অর্থাৎ সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত ৪৫ জন নারী সদস্যকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। আইনের এ বিধান সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদের লঙঘন। সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদাভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না’, যা মৌলিক অধিকার বলে স্বীকৃত।

আমাদের সংসদ সদস্যদের অনেককে অবশ্য বলতে শোনা যায়, সার্বভৌম সংসদ সবকিছুর ঊধের্ব- সংসদ যে কোন আইন প্রণয়ন করতে পারে, এমনকি সংবিধানও সংশোধন করতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত, এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। যুক্তরাজ্যের মতো দেশের জন্য, যেখানে লিখিত সংবিধান নেই এবং যেখানে হাউস অব লর্ডস একটি ‘কোর্ট অব রেকর্ডস’ (court of records) বা নথি সংরক্ষণকারী আদালতের ভূমিকা পালন করে, এ ধারণা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে লিখিত সংবিধান রয়েছে, তাই আমাদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। আমাদের দেশে কোন বিভাগই অন্য বিভাগের অধস্তন নয়। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের একটি রায় [এআইআর(১৯৬৫)এসসি ৭৪৫] প্রণিধানযোগ্য: ‘4 it is necessary to remember that though our Legislatures have plenary powers, they function within the limits prescribed by the material and relevant provisions of the Constitution. In a democratic country governed by a writen Constitution, it is the Constitution which is supreme and sovereign. Therefore, there can be no doubt that the sovereignty which can be claimed by the Parliament in England, cannot be claimed by any Legislature in India in the literal absolute sense.(‘এটি মনে রাখা প্রয়োজন, যদিও সংসদের অগাধ ক্ষমতা রয়েছে, তবুও সংসদকে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের বিধানের আওতার মধ্যে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। লিখিত সংবিধানের আওতায় পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধানই মুখ্য ও সার্বভৌম। তাই এতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয় যে, ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট যে সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারে, ভারতে কোন সংসদই আক্ষরিক ও নিরঙ্কুশ অর্থে তা দাবি করতে পারে না।’)

উপজেলা পরিষদ আইনটি শুধু সংবিধানেরই লঙঘন নয়, এটি উচ্চ আদালতের বিদ্যমান রায়ের সঙ্গেও অসঙ্গতিপূর্ণ। গত জোট সরকারের আমলে জেলা মন্ত্রীর বিধান করার পর তৎকালীন সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এ বিধানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এবং এটিএম ফজলে রাববীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জেলা মন্ত্রীর বিধান সংবিধানপরিপন্থী বলে রায় প্রদান করে বলেন : ‘মন্ত্রী, হুইপ এবং অন্যান্য কর্মকর্তা, যাদের কথাই উপরিউক্ত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের কাউকেই উল্লিখিত কোন জেলার জন্য নিয়োগ প্রদান করা যায় না। সংশ্লিষ্ট বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে পুরো দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দায়িত্ব ব্যতীত জেলাগুলোতে তাদের অন্য কোন দায়-দায়িত্ব নেই। একইভাবে সংসদ সদস্যদেরও জেলা বা অন্যান্য প্রশাসনিক একাংশে উন্নয়ন বা আইন-শৃঙখলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা বা দায়িত্ব নেই। অতএব মামলার বাদী, যিনি একজন সংসদ সদস্য, পিরোজপুর জেলা সম্পর্কে তার কোন দায়-দায়িত্ব নেই।’ [আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বনাম বাংলাদেশ ১৬বিএলটি (এইচসিডি) ২০০৮] অর্থাৎ সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ধারিত স্থানীয় উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক সেবা প্রদান জনশৃঙখলা রক্ষা ও সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যপরিচালনা বিষয়ে সংসদ সদস্যদের কোন দায়িত্ব ও ভূমিকা পালন বেআইনি।

পরিশেষে এটি সুস্পষ্ট, সংশোধিত উপজেলা আইনটি আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে এটি উচ্চ আদালতের বিদ্যমান রায়ের সঙ্গেও অসঙ্গতিপূর্ণ। ফলে আমাদের আইনপ্রণেতারা আইনভঙ্গকারীতে পরিণত হয়েছেন বলে আমাদের আশংকা, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কোনভাবেই সহায়ক নয়। এছাড়াও এর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে একটি চরম দ্বন্দ্ব্তাক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যে পরিস্থিতি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে চরমভাবে ব্যাহত করবে। আমরা আশা করি, এ গুরুতর সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। আরও আশা করি, সংসদ সদস্যরা সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবেন, যা সম্পর্কে গুজব শোনা যাচ্ছে এবং যা হবে আবারও আইনের লঙঘন।

উপজেলা নির্বাচন পুরনো অধ্যাদেশের অধীনে হওয়া সত্ত্বেও সরকার প্রথম অধিবেশনে মূলত ১৯৯৮ সালের উপজেলা পরিষদ আইনকে কিছু সংশোধন করে পুনঃপ্রবর্তন করেছে। এ আইনের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একটা সীমাবদ্ধতা হল, এ আইনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে এবং উপজেলা পরিষদের জন্য উপদেষ্টাদের পরামর্শ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ আইনে যদিও উপজেলা চেয়ারম্যানরা জনগণের সরাসরি নির্বাচনে প্রধান নির্বাহী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন কিন্তু নির্বাহী ক্ষমতা কাকে দেয়া হবে সেটা আইনে অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। ফলে এখানে একটা খেলা খেলার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় অন্তত চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি করা হবে। অর্থাৎ আইনপ্রণেতাদের নির্বাহী দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে।

গত ২০ জুন দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হবে। এসব আমাদের ভাবিয়ে তোলে, শংকিত করে। কারণ এর অধিকাংশ কার্যক্রমই সংবিধানের পরিপন্থী। এখানে নৈতিকতার প্রশ্নও জড়িত এবং সবচেয়ে গুরুতর হল এই কার্যক্রমগুলোর মাধ্যমে আমাদের আইন প্রণেতারা আইনভঙ্গকারীতে পরিণত হচ্ছেন কিনা সে ব্যাপারে বিরাট প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। যে আইন করা হয়, তা যদি সংবিধান লঙঘন করে করা হয় এবং আইনপ্রণেতারা যদি আইনভঙ্গকারীতে পরিণত হন, তাহলে রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এটা কোনভাবেই বলা যায় না। এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে ভবিষ্যতে আমরা একটা সংকটময় পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হতে পারি।

সংবিধান সবার ওপরে এবং যে কোন আইন করতে হলে সংবিধানের পরিধির মধ্যে থেকেই করতে হবে। এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই করতে হবে। এমনকি সংবিধান সংশোধন করারও এখতিয়ার আছে আমাদের সংসদ সদস্যদের। কিন্তু এটা সংবিধানের বিধান অনুযায়ী হতে হবে। কারণ সংবিধানে বলা আছে কিভাবে সংশোধন করতে হবে। তাই সাংসদরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন না। আমাদের দেশের মতো দেশে যেখানে লিখিত সংবিধান আছে, সেখানে সংবিধানের আলোকেই করতে হবে এবং এ ব্যাপারে ভারতের সুপ্রিমকোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের একটা পরিষ্কার রায় আছে। ওই রায়ে বলা আছে, সংবিধান সবার ওপরে। সংবিধান সার্বভৌম এবং সব কার্যক্রম করতে হবে এই সংবিধানের আলোকে। তাই সংসদ সদস্যরা যা ইচ্ছা তা করবেন, এটা হতে পারে না। সংবিধান লঙঘন করে তারা কোন আইন পাস করতে পারেন না। তাই আমি মনে করি, এটা সংবিধানের লঙঘন। শুধু তাই নয়, এ ব্যাপারে আদালতের রায় ইতিমধ্যে দেয়াই আছে, যে সংসদ সদস্যদের জেলা-উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসনিক একাংশে, প্রশাসনিক স্তরে সেখানে তাদের কোন দায়-দায়িত্ব নেই।

২০০৬ সালে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর একটি রায় দিয়েছেন। ওই রায়ের প্রেক্ষাপট হল যখন জেলা মন্ত্রী বিধান করা হয় গত বিএনপি সরকারের আমলে, তখন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জেলা মন্ত্রী যে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে করা হয়েছে সে প্রজ্ঞাপনটা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দাখিল করেন। এ রিটের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি এবিএম ফজলে কবীর- তারা রায় দেন, ‘মন্ত্রী, হুইপ এবং অন্যান্য কর্মকর্তা যাদের কথাই উপরিউক্ত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে তাদের কাউকেই উল্লিখিত কোন জেলার জন্য নিয়োগ প্রদান করা যায় না। সংশ্লিষ্ট বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে পুরো দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দায়িত্ব ব্যতীত জেলাগুলোতে তাদের কোন দায়িত্ব নেই। একইভাবে সংসদ সদস্যেরও জেলা অন্যান্য প্রশাসনিক একাংশে উন্নয়ন আইন-শৃংখলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোন দায়িত্ব নেই। অতএব মামলার বাদী যিনি একজন সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পিরোজপুর জেলা সম্পর্কে কোন দায়-দায়িত্ব নেই। এটি আদালতের সুস্পষ্ট রায়। শুধু তাই নয়, ২০ জুনের দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের বিষয়টিও সংবিধানের লঙঘন। কারণ সংবিধানে পরিষ্কারভাবে বলা আছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন এটি স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব।

শুধু তাই নয়, আধুনিক রাষ্ট্রের তিনটি শাখা বিচার বিভাগ, প্রশাসন এবং আইনসভা এদের কেউ কারও ওপর খবরদারি করতে পারে না। পার্লামেন্টারি স্টান্ডিং কমিটি নজরদায়িত্ব রাখে রাতে কেউ অন্যায় করতে না পারে। আরেক অর্থেও এটি সংবিধানের লঙঘন। কারণ আমাদের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, সংসদ সদস্যদের কি কাজ। সংবিধানের বলা ৬৫(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে- ‘জাতীয় সংসদ’ নামে বাংলাদেশে একটি সংসদ থাকবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলীসাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত হইবে।

আইন প্রণয়ন বলতে বোঝায় আইন পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন এবং নতুন আইন পাস করা একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণী বিষয়ে বিতর্ক করা। তৃতীয়ত, সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। চতুর্থত, বাজেট পাস ইত্যাদি আর্থিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। এসব সংসদ সদস্যের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত কাজ। এবং তাদের একটি অন্যতম দায়িত্ব হল নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারি করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এখন সংসদ সদস্যরা যদি স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হয়ে যান তাহলে তারাই নির্বাহী কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে গেলেন। এতে তাদের নজরদারিত্বের ভূমিকা তারা যথাযথ পালন করতে পারবেন না। এটি আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী হবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ

তথ্য সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ৪ জুলাই ২০০৯

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s