“রাজনৈতিক দলের সংস্কার: আমরা কোথায়?” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত

photo-of-roundtableগত ১৬ আগস্ট, ২০০৯ সকাল ১০:৩০টায় ‘রাজনৈতিক দলের সংস্কার: আমরা কোথায়?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’ আয়োজিত এ গোলটেবিল আলোচনাটি সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন ‘সুজন’-সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই, তাই অধিক গণতন্ত্রই গণতন্ত্রের বিকল্প। গণতন্ত্রের চর্চাটা যেন নিরলস থাকে, এটা শুধু দলের ভেতরে নয় নাগরিক সমাজের ভেতরেও প্রয়োজন রয়েছে Ñ উলে¬খ করে সভাপতির Ÿক্তব্যে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, রাজনৈতিক দলের ভেতরে যে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন তা আগামী কাউন্সিলের পূর্বেই হতে হবে। তিনি বলেন, এরমধ্যে একটি বৃহৎ দল বিএনপি তার গঠনতন্ত্র জমা দেননি, সুতরাং তাদের ওখানে কী পরিবর্তন আসবে তা আমরা জানি না। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে তারা যে কথা দিয়েছিল সে কথা রাখার প্রয়োজন ছিল। এছাড়া তারা কাউন্সিলের জন্য ছয় মাসের সময়সীমা নিয়েছে, এই ছয় মাসের কী প্রয়োজন তারও তেমন কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। লিখিত থাকলেই কি সেগুলো পালিত হবে? এ প্রশ্ন উত্থাপন করে তিনি আরো ক্ষলেন, তিন বছরের একটা বাজেট দেওয়া ও তার আয়-ব্যায়ের দিকটা নিয়ে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়েছে বলে আমরা জানি না। ফিন্যান্সিয়াল একাউন্টিবিলিটি অব দ্যা পলিটিক্যাল পার্টি এটা হয়েছে বলে আমরা চোখে দেখতে পারছি না। এ প্রসঙ্গে প্রতি তিন মাস অন্তর রাজনৈতিক দলগলোর আয়-ব্যায়ের হিসাব ওয়েবসাইটে দেয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে আবারও আরপি সংশোধনীর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সংশোধনীতে জনগণের পক্ষ থেকে আমাদের ইমপুট দেবার সুযোগ অবশ্যই থাকতে হবে। এছাড়া গণতান্ত্রিক অবস্থায় থাকতে চাইলে দলগুলোর পলিটিক্যাল এডুকেশন সিস্টেমে যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি অভিমত দেন।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যে কোনো দেশের প্রধান গণতান্ত্রিক শক্তি হলো সে দেশের রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দল প্রাইভেট ক্লাব নয়, তাই রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমের ব্যাপারে জনগণের মাথা ঘামানোর অধিকার রয়েছে। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অধ্যাদেশে’র মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য, কতগুলো শর্তসাপেক্ষে, নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিবন্ধিত হওয়া বাধ্যতামূলক করা হলেও, নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাশ করা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধিত) আইনে’র দ্বারা শর্তগুলো চরমভাবে শিথিল করা হয়। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলো নিবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো – দলে গণতন্ত্রের চর্চা, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিলুপ্তি, দলের তৃণমূলের কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন চূড়ান্তকরণ – অমান্য করলেও কমিশন দলের নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে না। অর্থাৎ আমাদের নির্বাচিত সরকার নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতাহীন কাগুজে বাঘে পরিণত করেছে। নিঃসন্দেহে এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের সংস্কার উদ্যোগ দারুণভাবে বাধাগ্রস্থ হলো। এছাড়াও আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশন ছিল নিয়ম মানার আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। তিনি বলেন, দল দু’টো নিয়ম মেনেছে -ছয় মাসের মধ্যে দলের সংশোধিত ও অনুমোদিত গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে Ñ কিন্তু নিয়মগুলো, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘মনে’ নিতে পারে নি। তারা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধিত) আইনে’র অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ও চেতনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। তারা অতীতের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে নি। অতীতে যেমনিভাবে হয়েছে, এবারকার কাউন্সিলও অনেকটা তেমনিভাবেই হয়েছে। আবারো দলে গণতন্ত্রায়নের এবং অঙ্গ সংগঠন নিয়ে সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক দলের সংস্কারের বিষয়ে আমরা বেশি দূর এগুতে পারি নি, বরং অনেকটা পিছিয়েই গিয়েছি। তাই জাতি গণতান্ত্রিক চর্চায় আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো। একইসাথে শেখ হাসিনাও বঞ্চিত হলেন একটি অনন্য ‘লিগেসি’ বা উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার সুযোগ থেকে, যা তাকে জাতির ইতিহাসে অবিস্মরণীয় করে রাখতো।

সংস্কার বলতে আমরা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, নৈতিকতা, মত প্রদানে স্বাধীনতা ও তৃণমূলের অংশগ্রহণকে বুঝি উলে¬খ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এএসএম শাহাজাহান বলেন, আমি সবকিছু বদলাতে রাজি আছি, কিন্তু নিজেকে বদলাবো না – তাহলে কিছুই হবে না। ক্ষমতার বাইরে থাকলে যে কথা বলা হয়, ক্ষমতায় আসলে সেই কথার মূল্যায়ন হয় না এরও পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন। রাজনৈতিক দলের যাত্রাপথে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ‘সুজন’ কাজ করছে বলেও এ সময় তিনি মন্তব্য করেন। মাননীয় সংসদ সদস্য মোঃ শহীদুজ্জামান সরকার বলেন, রাজনৈতিক সংস্কারের ব্যাপারে যে অর্জন একেবারেই নেই তা নয়। জাতির জন্য দেশের জন্য ইতিবাচক সংস্কার প্রক্রিয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগও চিন্তা করে। তাই সংস্কারের ক্ষেত্রে দলের কাছে এদেশের বিজ্ঞজনেরা যা প্রত্যাশা করেন তা অর্জন করার ক্ষেত্রে সময়ের প্রয়োজন রয়েছে। সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য সরদার আমজাদ হোসেন বলেন, রাজনৈতিক দলের সংস্কার পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও হচ্ছে। কিন্তু সংস্কারে ভয় আছে। কারণ সংস্কারের আগে একটা চলমান অবস্থা থাকে। এর সাথে একটা গোষ্ঠী থাকে যে গোষ্ঠী আতঙ্কিত হয়। ‘কমিটিমেন্ট, ডিটারমিনেশন ও ইচ্ছা এগুলোই সবথেকে বড় কথা। আমরা যারা রাজনৈতিক দল করি আমাদের আসলেও সংস্কার করার ইচ্ছাটা আছে কি-না?’ এ প্রশ্ন উত্থাপন করে রাজনীতিবিদ জনাব আ.স.ম আব্দুর রব বলেন, সুজনে’র এ প্রচেষ্টা মনোস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে জনগণের মাঝে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো যদি সংস্কার না করে তাহলে কিন্তু এর ফল ভালো হবে না।

প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব এনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, সংস্কার ভেতর থেকে আসতে হবে। সংস্কারের ব্যাপারে কথা হয়েছে কিন্তু আমরা বেশিদূর এগুতে পারিনি। জনগণ সংস্কার চান তাই এই পথ অবলম্বন করলে রাজনৈতিক দলগুলো অধিকতর জনপ্রিয় হবে এটা তাদেরকে বুঝতে হবে। সাবেক সচিব জনাব আবুল কালাম আজাদ বলেন, সংস্কার প্রশ্নে প্রধান দলের নেতা-নেত্রীদের মন-মানসিকতার প্রয়োজন এক্ষেত্রে সবচেয়ে আগে দরকার। চিত্রনায়ক জনাব ইলিয়াছ কাঞ্চন বলেন, আমাদের অর্জন হাতের অস্ত্র ‘না’ ভোট সেটিও আমরা হারিয়ে ফেলেছি। এর জন্য আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘সুজন’ তার ভূমিকার ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে, এতে আমরা আশান্বিত। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশে সকল সময়ে সংস্কারের প্রশ্নে সোচ্চার ও স্বতন্ত্র একটা নাগরিক ধারা গড়ে উঠছে। বাধ্য না হলে বা অন্তরের বিশুদ্ধতা না থাকলে কেউ জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে চায় না উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, দলে নতুনের জয়গান এটা ভালো, কিন্তু কী প্রক্রিয়ায় তারা সেখানে আসলেন, সেটা ভেবে দেখা জরুরি, কারণ সেটা তো গণতন্ত্র হতে পারে না। জনাব রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সংস্কারের প্রশ্ন শুধু নেতৃত্বের নয়, এক্ষেত্রে দলের সকলকে এবং সকল মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে মিডিয়ারও সচেতন ভূমিকা তিনি বিশেষভাবে প্রত্যাশা করেন।

আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটির প্রফেসর কামাল আতাউর রহমান, ‘সুজন’ মুন্সিগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি ড. হাফিজ আহমেদ, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ ‘সুজন’ উপজেলা কমিটির সম্পাদক অধ্যাপক তাপস দে, ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক হান্নানা বেগম প্রমুখ। অন্যান্যের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন সিডা-পিএসইউ-এর সুশাসন উপদেষ্টা জনাব ফাতেমা রশিদ হাসান, বাংলাদেশ নাগরিক সমাজের সাধারণ সম্পাদক ড. পিটার হালদার প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধ ডাউনলোড করুন।

Advertisements