“বাংলাদেশের শিক্ষানীতির বিবেচনা” শীর্ষক সুজনে’র গোলটেবিল আলোচনা

Roundtable-SHUJAN 09922
গত ৩ নভেম্বর, ২০০৯ সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে “বাংলাদেশের শিক্ষানীতির বিবেচনা” শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষাবিদ ও গবেষক জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদের সঞ্চালনায় এতে মূল প্রবন্ধ উত্থাপন করেন ‘সুজন’ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ।

শিক্ষাই আমাদের পরিবর্তন এনে দিতে পারে, এর থেকে জরুরি আর কিছু নাই। শিক্ষাখাতে সমন্বয় ও সুব্যবস্থাপনার একটি জরুরি তাগিদ সবাই অনুভব করছেন। শিক্ষা নিয়ে বহুকাল ধরে বহু সময় আমরা কাটিয়েছি, বহু কথা হয়েছে, কালক্ষেপনের সময় আর নেই, এখন বাস্তবায়নে যেতে হবে। এর জন্য কিছু বিবেচনা আমরা তুলে ধরব উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে ‘সুজন’ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, শিক্ষানীতি বিবেচনার জন্য সংবিধানের ৮, ১১, ১৪, ১৫ ও ১৭ অনুচ্ছদসমূহ প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, শিক্ষা কমিটি আগামী দিনের বিবেচনায় কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে তাদের প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছেন। আমরা শিক্ষার প্রায় সর্বক্ষেত্রেই গত চল্লিশ বছরে বিভিন্ন পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি, যেগুলো পরামর্শক এবং আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে। এই রিপোর্ট অনেকগুলো বিষয় নিয়ে সুচিন্তিত অভিমত তুলে ধরেছেন এবং আমরা যে পাঁচটি কমিটি/কমিশনের রিপোর্ট এর সাথে বিবেচনা করেছি তাতে অনেকগুলো বিষয়ে ঐক্যমত্য পরিদৃষ্ট হয়েছে। যেহেতু ১৯৭৪ থেকে ২০০৯ এই মতামতগুলি নানা সময়ে নানাভাবে উত্থাপিত হয়েছে, সেহেতু ঐক্যমত্যের অবস্থান থেকেই আমাদের এই রিপোর্টটি বিবেচিত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, তিন ধারার শিক্ষাকে সমন্বিত করার প্রচেষ্টা এই প্রথম নয়। কিন্তু এবারই প্রথম একটি বিস্তৃত প্রস্তাবনা এ বিষয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। তবুও অনেক বিষয়ে হয়তো বিবেচিত হয় নি। বাস্তবায়নের মাধ্যমে যে সমস্যাগুলো বিবেচনার দাবি রাখবে সে বিষয়গুলো আমাদের সহমতের মাধ্যমে বিবেচনা ও সিদ্ধান্তে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। একবিংশ শতকের যে স্ফূরিত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ক্রমান্বয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে সক্ষমতা অর্জন সম্ভব হবে না বলেও এ সময় তিনি মন্তব্য করেন। এছাড়া ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি নিয়ে অযথা হট্টগোল চলছে, যা কাম্য নয়। এত কথার পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে তবে শিক্ষাগত দিক থেকে পূর্ণাঙ্গভাবেই বর্তমান রিপোর্টে বিষয়টি সন্নিবেশন করা হয়েছে বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন। শিক্ষকের মর্যাদা সিভিল সার্ভেন্টের সাথে ইক্যুভেলেন্ট দয়া করে করবেন না এই আহ্বান রেখে তিনি বলেন, এটাতে তাদের অবমাননা হবে।

আলোচনায় প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে বর্তমান রিপোর্টটি অসম্পূর্ণ এবং এজন্য বিস্তৃত পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে বলে মূল প্রবন্ধে অভিমত ব্যাক্ত করা হয়। তিন ধারার বিভিন্ন প্রকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে বিভিন্নতা ও মানসিক বিভাজন আছে প্রাক প্রাথমিক প্রতিষ্ঠানে এটির উত্তরণ ঘটানো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে দুতাবাস আশ্রিত বিদ্যালয়ের বাইরে যারা শিক্ষাক্রম পরিচালনা করছেন তাদের সহায়তায় আমাদের জাতীয় জি.সি পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন বলে মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়। এমন প্রচেষ্টা মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে নেয়া সম্ভব কি-না সেটাও বিবেচনা করা দরকার বলে জানানো হয়। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কৌশল সম্পর্কে সাম্প্রতিক শিক্ষানীতিতে বিবেচনা অতি সীমিত এবং এই রিপোর্টে বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক বাধাসমূহ বিদূরণের তেমন কোনো আলোচনা অথবা সুপারিশ চোখে পড়ে না, এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষার কার্যক্রমে শরীরচর্চা ও সংস্কৃতিচর্চা অন্যান্য শিক্ষাক্রমের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টির দিকে রিপোর্ট প্রণেতারা যথার্থ মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে আরো জানানো হয়, প্রাথমিক শিক্ষাকে জীবনমুখি, কর্মমুখি করে তোলার বিষয়টি পাঠক্রমে কীভাবে সংযোজিত হবে সেটি বিস্তৃতভাবে আলোচিত হওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে মধ্যাহ্ণ আহারের বিষয়টি বিবেচিত হয়েছে সেখানে এর উপযোগ যতটা চিহ্নিত হয়েছে এর সমস্যা ততটা আলোচিত হয়নি। এজন্য স্কুল ব্যবস্থাপনাকে ভিন্নভাবে ঢেলে সাজাবার প্রয়োজন আছে; আমাদের প্রাথমিক স্কুলেও কম্পিউটার শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে। কিন্তু কম্পিউটার শিক্ষাদানের যোগ্য শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় কম্পিউটার ব্যবস্থা করা সম্ভব কি না সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম শ্রেণীতে সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষার আবশ্যিক বিষয়াবলী এক হলেও অতিরিক্ত বিষয় মাদ্রাসার ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার চাইতে চারগুণ। ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণীতে এই অতিরিক্ত বিষয় সাধারণ শিক্ষার চাইতে মাদ্রাসা শিক্ষায় তিনগুণ বেশি। এগুলো শিক্ষাক্রম, শিক্ষাঘণ্টা এবং মূল্যায়ন পরীক্ষার জন্য যে জটিলতার সৃষ্টি করবে তার সমাধান বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন বলেও মূল প্রবন্ধে গুরুত্ব সহকারে উত্থাপিত হয়। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উচ্চমানের নিরীক্ষাধর্মী ও গবেষণাভিত্তিক ইন্সটিউট অব এডুকেশন ও থানাভিত্তিক এডুকেশন রিসোর্স সেন্টার গড়ে তোলা, স্তর বিভাজন কী পাঁচ যোগ তিন হবে না চার যোগ চার হবে সেটা বিবেচনা করা, উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড গঠন, কারিগরি শিক্ষাকে মূল ধারার শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন না রাখা, প্রাথমিকভাবে ইউনিয়ন পর্যায়ে কেন্দ্রিয় পাঠাগার, বিজ্ঞান শিক্ষার উপকরণ এবং বিভিন্ন জ্ঞানের শিশুতোষ বইয়ের সংগ্রহ রাখা এবং এগুলো ব্যবহারের জন্য ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে ইউনিয়নের সকল স্কুলকে সুযোগ প্রদান, বর্তমানে কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত আঞ্চলিক পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা নিয়ে পুনর্বিবেচনা করার বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

মাধ্যমিক শিক্ষালয়ে এখন উচ্চ মাধ্যমিক সমন্বিত হবে। একই শিক্ষালয়ে এ দু’টি স্তরের একীভূতকরণ প্রাথমিক শিক্ষায় তিনটি নতুন শ্রেণীর সংযোজনের মতই সমস্যার সম্মুখিন হতে পারে উল্লেখ করে গোলটেবিল আলোচনা থেকে বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীর জন্য সমাজবিজ্ঞান সাধারণ বিজ্ঞানের মতই আবশ্যিক হওয়া, মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাসকে শিক্ষাক্রমে সমন্বিত করা, মহাবিদ্যালয়ে মুক্ত নৈর্ব্যাচনিক ও পূর্ণ ঐচ্ছিক বিষয়গুলোর গুরুত্ব হিসেবে তালিকাভুক্ত করা, ডিপ্লোমা ও ডিগ্রীধারীদের ভেতরে বর্তমানে যে অনাকাক্সিক্ষত বিভাজন এবং ডিপ্লোমাধারীদের অনেকক্ষেত্রে অপাংক্তেয় মনে করার প্রচেষ্টা সেটা দূরীভূত করা, কারিগরি শিক্ষার ব্যাপারে ও ঐচ্ছিক খাতের পঞ্চাশটি বিষয়ের যে তালিকা সেটিকে গ্র“পভিত্তিক ভাগ করা, শিক্ষায় অংশগ্রহণ যেহেতু বাড়ছে সে কারণে প্রতিটি জেলায় একটি মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য আঞ্চলিক শিক্ষা বোর্ড স্থাপন ও কার্যকর করা এবং এই বোর্ডের কাছে পরিদর্শনের ক্ষমতা প্রদান, ডিপ্লোমা স্তরে প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও পেশাগত শিক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করা, প্রয়োজনে দুই বছর শেষ করে এসোসিয়েট ডিগ্রী দেবার ব্যবস্থা রাখা, মাদ্রাসা শিক্ষার আবশ্যিক বিষয় সম্পর্কে পুনর্বিবেচনা করার সুপারিশ উত্থাপন করা হয়।

প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষক শিক্ষণের বিষয়টি অত্যন্ত নাজুক। শিক্ষক শিক্ষণের বিষয়টি প্রায়োগিকভাবে দেখা প্রয়োজন। এজন্য শিক্ষক শিক্ষণ প্রসঙ্গে বিভিন্ন সুপারিশ রাখা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো: সরকারিভাবে প্রতিটি উপজেলায় ক্রমান্বয়ে মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষণ ও পুনর্শিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি জেলায় মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য সরকারিভাবে এরকম প্রতিষ্ঠান রাখা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক নির্বাচনে শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের দক্ষতা ও গবেষণার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান বিবেচনায় রাখা, মাদ্রাসা শিক্ষার শিক্ষকদের জন্য শিক্ষক শিক্ষণ ব্যবস্থা রাখা, শিক্ষক শিক্ষণ এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিকেন্দ্রিভূত করা প্রভৃতি।

বেসরকারি খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবির্ভাব উচ্চ শিক্ষায় একটি ব্যয়বহুল অবস্থান সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শৃঙ্খলার অভাব মানসম্পন্ন শিক্ষাকে সময়সাপেক্ষ এবং অনেকখানি শিক্ষার্থীর স্বীয় উদ্যোগ নির্ভর করে তুলেছে উল্লেখ করে গোলটেবিল আলোচনা থেকে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে উচ্চ শিক্ষা কমিশনে রূপান্তরের প্রস্তাবনা বিবেচনা করা, উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দক্ষতা এবং উচ্চমান সম্পন্ন করে তোলা, শিক্ষক ছাত্র অনুপাত একটি সীমার মধ্যে রাখা, মেধার বিবেচনায় উচ্চ শিক্ষার প্রবেশদ্বার খুলে দেয়া, উচ্চ শিক্ষার অর্থায়নের ব্যাপারে ভারসাম্যতা সৃষ্টি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনডাউমেন্ট ফান্ড সৃষ্টিতে কর সুবিধার ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন সুপারিশ উত্থাপন করা হয়।

শহরের কিছু মানুষের জন্য এই শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে বলেই আমার মনে হয় উল্লেখ করে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী জনাব শেখ শহিদুল ইসলাম বলেন, নতুন শিক্ষানীতি এটা বাস্তবায়নযোগ্য নয়, কারণ এটা বাস্তবায়নের যোগ্য যে সম্পদের সমাহার তা আমরা ঘটাতে পারব কি-না তা বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এজন্য তিনি বর্তমান নীতি আরো বাস্তববাদী হয়ে রিভাইজ করা প্রয়োজন বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। শিক্ষানীতি সম্পর্কে সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে একটি আলোচনার আয়োজন করা হবে খুব শ্রীঘ্রই, সেখানে আজকের আলোচিত বিষয়গুলি উত্থাপন করার সুযোগ ঘটবে আমার উল্লেখ করে শিক্ষা বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য শ্রী বীরেন শিকদার এমপি বলেন, আজকে আমরা জীবনমুখি এবং কর্মমুখি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। তাই শুধুমাত্র মিলাদ পড়ানো, কোরআন শেখানো বা এ ধরনের কাজের জন্য একটি আলাদা ব্যবস্থা চালু রাখা যুক্তিযুক্ত নয়। এ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন। জীবনমুখি, কর্মমুখি ও বাস্তবমুখি চিন্তার সুযোগ এখানে অবশ্যই আনতে হবে তাই এ প্রতিষ্ঠানসমূহের চরিত্রগুলির পরিবর্তন আনা জরুরি। আর তা না করতে পারলে সেটা জাতির জন্য কোনোভাবেই ভালো হবে না। তিনি আরো বলেন, আমাদের সমাজে বেক বেঞ্চার যারা তারাই আজকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যে ফার্স্ট বেঞ্চার সে তার অধীনে কেরানীর চাকরি করছেন – এটা কী আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ক্রুটি নয়? এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে।

চার মাসে কোনো শিক্ষানীতি হয় না, একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য আরো সময়ের প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, যারা শিক্ষা কমিটিতে কাজ করেছেন তারা কমিট করেছেন অনেক কিছুই যার মধ্যে বক্তব্য ও সুপারিশে অনেক পরস্পরবিরোধী বিষয় রয়ে গেছে। এছাড়া শিক্ষা নীতিতে অনেকগুলো গুরুতর বানান সমস্যা ও ব্যাকরণগত বিভ্রাটও তুলে ধরেন তিনি। ধর্ম শিক্ষা নিয়ে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর যে উল্লম্ফন তা একেবারেই যৌক্তিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসলাম ও ধর্ম শিক্ষা কী করে হবে তা নিয়ে গভীরতর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মানোন্নয়নে ৭৩ এর অধ্যাদেশকে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এখানে শিক্ষানীতি নেই, এখানে আছে সম্যক প্ল্যান স্ট্রাটিজি উল্লেখ করে নামকরণ প্রসঙ্গে নায়েমের প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. মোঃ আনোয়ারুল হক বলেন, নামকরণে বাংলাদেশ অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. কাজী সালেহ আহমেদ বলেন, শিক্ষক নিয়োগ করার পর ট্রেনিং এর ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন, শিক্ষকদের জন্য ভালো বেতন কাঠামো এবং বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্ব যথাযথভাবে এই নীতিতে আসা প্রয়োজন। শিক্ষার মানের বিশেষত গ্রামীণ শিক্ষার মানের ওপর গুরুত্বারোপ করে ‘সুজন’ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজমুদার বলেন, এই ক্ষেত্রে আমরা দেশের সাধারণ মানুষদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। এর ফলে দেশের সাধারণ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। স্থানীয়ভাবে দায়বদ্ধতা নেই এবং শিক্ষকদের আমরা সব আমলা বানিয়ে ফেলেছি এই দু’টি বড় সমস্যাকে চিহ্নিত করে তিনি আরো বলেন, আমাদের বিকেন্দ্রিকায়নের ব্যাপারে পরিকল্পনা করতে হবে। এজন্য পাঁচশালা পরিকল্পনা করা প্রয়োজন বলেও এ সময় তিনি মন্তব্য করেন।

দার্শনিক এবং কার্যপরিকল্পনা – শিক্ষার এ দু’টো দিকের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে কলামিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, শিক্ষা একটা ধারাবাহিক বিষয়। খাপছাড়াভাবে এটা করলে চলবে না। ঔপনিবেশিক আমল, পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশ আমল সেই ধারবাহিকতা বিবেচনায় রেখেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগপোযোগী করে তুলতে হবে। ব্যানবেইস-এর প্রাক্তন পরিচালক জনাব শফিউল আলম বলেন, আমরা চাই এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়িত হোক, কিন্তু আমরা প্রগতিশীল শিক্ষা চাই। কোন ক্লাসে কোন ভাষা শেখানো দরকার সে বিষয়ে একটা পরিকল্পনা থাকা দরকার। এছাড়া শিক্ষক তৈরির পরিকল্পনা, পাঠ্যবই প্রণয়নে বৈষম্য দূরীকরণ করাও জরুরি বলে এ সময় তিনি মন্তব্য করেন। স্থায়ী শিক্ষা কমিশন এ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলেও এ সময় তিনি অভিমত দেন। শিক্ষার মান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক জনাব আবদুর রশীদ বলেন, প্রাইমারী বর্তমানে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত আছে এটাকে উন্নীত করা দরকার।

এত বছর ধরে আমরা কোনো পলিসি বিশেষত এডুকেশন পলিসি করতে পারি নি, এটা খুবই দুঃখজনক উল্লেখ করে রাজনীতিক মাহমুদুর রহমান মান্না আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, এখন যারা আছেন তারা করবেন এবং এমন কিছু করুন যাতে সবচাইতে ভালোটা হয়। এজন্য তিনি সমালোচনা শোনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, তাহলেই এটাকে একটা ‘রিচ’ জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। ইশতেহারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার পরিধি বাড়ানো এটা একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত, এটা এইম বা রূপকল্প Ñ কিন্তু এর বাস্তবায়নের মেকানিজম নিয়ে ভাবতে হবে। মাদ্রাসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটা কুপমণ্ডুকতার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে মাদ্রাসা। তাই সেন্টিমেন্টের কারণে যদি এই ব্যবস্থা রাখতেই হয় তাহলে তাকে আধুনিক ও প্রাক্টিক্যাল করতে হবে। বর্তমান শিক্ষানীতিতে সামগ্রিকভাবে যা কিছু দেয়া হয়েছে সেটা গ্রহণ করে সামনে এগুনো প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা উন্নয়ন ইন্সটিটিউটের উপদেষ্টা ড. মনজুর আহমদ। তিনি বিকেন্দ্রায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে আরো বলেন, এটিকে বাস্তবায়নের জন্য প্রধান পদক্ষেপ হতে পারে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি।

শিক্ষার জন্য মুক্তিযুদ্ধের ন্যায় একটি শিক্ষাযুদ্ধ বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে মন্তব্য করে শিক্ষাবার্তার সম্পাদক জনাব এ.এন. রাশেদা বলেন, প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি পরীক্ষা একেবারেই বন্ধ করা উচিত। আজকে গরিব-ধনী বিবেচনায় স্কুল করার পরিবর্তে এলাকার ভিত্তিতে স্কুল করতে হবে ও সেগুলোর মান উন্নত করতে হবে এবং একইসাথে পেশার উন্নতি সাধন করতে হবে। চক, ডাস্টার, ব্ল্যাক বোর্ড এর পরিবর্তে সাদা বোর্ড ও মার্কার ব্যবহার কার স্বার্থে? এ প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এটি করা হলে তা দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করে দেবে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের রকস্ প্রকল্পের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ জনাব আ.ন.স হাবিবুর রহমান বলেন, সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় তৃতীয় শ্রেণীর আগে ইংরেজী রাখা উচিত নয়। ইডেন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হান্নানা বেগম বলেন, নারী-পুরুষ বৈষম্য কমিয়ে আনতে নারীর জন্য আলাদা অধ্যায় না করে বৈষম্য কমানোর কৌশল শিরোণামে চ্যাপ্টার রাখা যেতে পারে। এছাড়া লেখকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি অভিমত দেন। রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর গুরুত্বারোপ করে রাজনীতিবিদ জনাব রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আমাদের দেশটা প্রাধান্য পেয়েছে এটা আমাদের সাম্প্রতিক শিক্ষানীতির ভূমিকা পড়ে মনে হয় নি। ব্যবসায়ি জনাব আবদুল হক বলেন, এই আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়া শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন করা দুরূহ হবে। গোলটেবিল আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন প্রফেসর কামাল আতাউর রহমান, জনাব মাহমুদা আকতার প্রমুখ। আলোচনা মূল প্রবন্ধে উত্থাপিত বিষয়সমূহের সাথে উপস্থিত সকলেই ঐক্যমত্য পোষণ করেন।

মূল প্রবন্ধ ডাউনলোড করুন

Advertisements