“স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে” ‘সুজনে’র সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত

Photo of Press Conferenceআমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগতমানে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০০৫ সালে একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করে। রায়ে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের শিক্ষা, সম্পদ, দায়-দেনার বিবরণ, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি তথ্য হলফনামা আকারে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সংগ্রহ করে তা ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে জনৈক আবু সাফার নামে একটি স্বার্থান্বেষী মহল আপিল দায়ের করে, বহু নাটকীয় ঘটনার পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যা অগ্রাহ্য করেন। পরবর্তীতে জারি করা স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত সবগুলো অধ্যাদেশে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রের সাথে তথ্য প্রদানের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এর ভিত্তিতে ৪ আগস্ট, ২০০৮ তারিখে ৪টি সিটি কর্পোরেশন ও ৯টি পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২২ জানুয়ারি, ২০০৯ তারিখে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীগণকে একই ধরনের তথ্য প্রদান করতে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নবম জাতীয় সংসদ কর্তৃক পাশকৃত সকল আইন থেকেই এ বাধ্যবাধকতা রহিত করা হয়, যদিও আজ এটি একটি জনদাবি। অর্থাৎ যে অধিকার ভোটারগণ পূর্বে ভোগ করেছিল এবং যার পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে, সে অধিকার তাদের থেকে হরণ করা হয়। এমনি প্রেক্ষাপটে গত ২৩ নভেম্বর ২০০৯ দুপুর ১২:৩০টায় ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিকে’র আয়োজনে রিপোর্টার্স ইউনিটির হল রুমে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

‘সুজন’ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত “স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে” আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, ‘সুজন’ সহ-সভাপতি জনাব এম হাফিজউদ্দিন খান, সুজনে’র নির্বাহি সদস্য জনাব এএসএম শাহাজাহান এবং ‘সুজন’-সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

জনগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে এবং অপরাধ প্রবণতা, যেটা আমাদের বর্তমান সমাজে দেখা দিয়েছে সেটা থেকে মুক্ত হতে হলে, এদেশ থেকে দুর্নীতি নির্মুল করতে হলে ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে তথ্য জানার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার কোনো বিকল্প নেই। যারা মন্ত্রী ও সাংসদ হলেন তাদের সম্পদ-আয়-ব্যায় ইত্যাদি তথ্য প্রদান এবং সেটার মূল্যায়ন করা হবে এবং জনগণকে জানানো হবে প্রধানমন্ত্রীর এ কথার উদ্ধৃতি তুলে ধরে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, যারা জনপ্রতিনিধি হবেন তাদের সম্পর্কে আমাদেরকে জানতে হবে। কিন্তু এতগুলো এফিডেভিট কীভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে – এ ধরনের চিন্তুা থেকে এটা তুলে দেয়া হলো – যা অত্যন্ত দুঃখজনক, যেখানে প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল এই আটটি তথ্যই যথেষ্ট কি-না! তিনি বলেন, আমরা যদি সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিদের ক্ষমতায় আনতে চাই তাহলে তথ্য প্রাপ্তির অধিকারকে অস্বীকার করা হলে তা গণতন্ত্রকেই আরো দুর্বল করবে। এছাড়া যখন আমি আইনের মাধ্যমে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে স্বীকার করে নিয়েছি। সেখানে যারা জনপ্রতিনিধি হবেন তাদের সম্পর্কে তথ্য দেবার ও জানার অধিকারকে রহিত করা কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত নয়। সুতরাং যে ধারাটি আইনে ছিল সেটি আবারো যাতে পুনঃসন্নিবেশিত হয় তার জন্য তিনি জোরালো দাবি জানান। আগামী বছরের মার্চ থেকে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে যে সকল নির্বাচন হবার কথা তার পূর্বেই আইন পরিবর্তন করে এটাকে কার্যকর করা না হলে সুজনে’র পক্ষ থেকে আইনের আশ্রয় নেয়া হবে বলেও এ সময় তিনি ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল যারা মনোনয়ন দেবেন তাদের জন্যও এই তথ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য আমাদের পেতে হবে, আর তথ্যের ভিত্তিতেই নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে। স্থানীয় সরকারের বেলায় এটা বাদ দিলে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি অংশ দুর্বল হবে এবং এর মাধ্যমে গণতন্ত্র ফলপ্রসূ হবে না বলেও তিনি অভিমত প্রকাশ করেন। এক্ষেত্রে তিনি মিডিয়াকেও তৎপর হবার আহ্বান জানান। নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে তথ্য প্রদান প্রসঙ্গে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা একটা আইনি দিক। উপজেলায় অনেক সরকারি কর্মকর্তা আছে, আইনজীবী আছে। তারাই নোটারি পাবলিকের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। আইনে এ বিধান করে দেয়া যেতে পারে। সুতরাং এতে কোনো ধরনের হয়রানির সৃষ্টি হবে না।

এটা তথ্য অধিকার আইনের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা উল্লেখ করেন জনাব এম হাফিজউদ্দিন খান। জটিলতা এড়ানোর জন্য প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড অফিসারদের প্রত্যয়নে হলফনামা আকারে তথ্য প্রদানের বিধান করা যেতে পারে বলেও এ সময় তিনি অভিমত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আইনে এ ধরনের পরিবর্তন আনা হলে হয়রানি সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে না।

আট ধরনের তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতাকে তুলে দেবার পেছনে কারণ কি এটা বোধগম্য নয়, গণতন্ত্রে বেক গিয়ার দেবার কোনো স্কোপ নেই – উল্লেখ করে জনাব এএসএম শাহাজাহান বলেন, তথ্য জানার মাধ্যমে যে সুফল জনগণ পেয়েছে, গণতন্ত্র পেয়েছে সেখান থেকে পেছনে আসার সময় নেই। অন্ধকারের দিকে যাবার জন্য আমাদের দিনবদল নয় উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, আলোকিত গণতন্ত্রের প্রয়োজনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা ও তা জনগণকে জানানো জরুরি। মসজিদের ইমাম, যিনি নেতৃত্ব দেন তার সম্পর্কে সকলেরই জানার যেমন অধিকার রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধি, তিনি যে পর্যায়েই আসুক না কেন, তার সম্পর্কেও জানার অধিকার সকলেরই রয়েছে। আমাদের বড় অভাব স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চিহ্নিত করে এ সময় তিনি আরো বলেন, প্রতিযোগিতা মানে আমাকে দেখাতে হবে আমি ভালো, তাই তথ্য লুকিয়ে রেখে এটা কখনোই সম্ভবপর নয়।

তথ্য প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে একটি নাগরিক অধিকার। এটি ‘মালিকে’র সত্য জানার অধিকার, কারণ রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। অনেকের  মতে, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার – তাদের বাক বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে ‘সুজন’ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ২০০৩ সালে প্রদত্ত একটি ঐতিহাসিক রায়ে বলেন: ‘গণতন্ত্র যাতে গুণ্ডাতন্ত্র এবং উপহাস বা প্রহসনে পরিণত না হয় তা নিশ্চিত করতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ভোটারদের তথ্য প্রাপ্তি জরুরি। বিভ্রান্তিমূলক তথ্য, ভুল তথ্য, তথ্যের অনুপস্থিতি – এ সবই নাগরিকের অসচেতনতার জন্য দায়ী। আর এর ফলে গণতন্ত্র গুণ্ডাতন্ত্র ও প্রহসনে পরিণত হতে বাধ্য।’ [পিইউসিএল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (২০০৩) ৪ এসসিসি] কারণ তথ্য হলো গণতন্ত্রের জীবনীশক্তি। আমরা মনে করি যে, আমাদের রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করার স্বার্থে আমাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদেরও তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা উচিৎ, যাতে ভোটারগণ জেনে-শুনে-বুঝে সজ্জনের পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগতমানে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে, যা আজ অতি জরুরি। সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণের জন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের স্বাক্ষর সমন্বয়ে খুব দ্রুতই একটি চিঠি মাননীয় নির্বাচন কমিশনারের নিকট হস্তান্তর করা হবে বলেও এ সময় তিনি জানান। তিনি বলেন, আমরা মনে করি যে, কমিশনের এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। কারণ আলতাফ হোসেন চৌধুরী বনাম আবুল কাশেম মামলার রায়ে [৪৫ডিএলআর(এডি)(১৯৯৩)] বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেন যে, ‘‘তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ’ করার বিধানের অর্থ হলো যে, শুধুমাত্র সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের আইনগত বিধি-বিধানের সাথে সংযোজন করার এখতিয়ার রয়েছে।’ জনস্বার্থ বিবেচনা করে এ ব্যাপারে মাননীয় সংসদ সদস্যদেরকেও এগিয়ে আসার জন্য আমরা সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাই। এক্ষেত্রে সরকারও তার করণীয় করবে বলে আমরা আশা করি। রাজনৈতিক দলগুলোরও এ ব্যাপারে দায়িত্ব রয়েছে। একইসাথে সকল সচেতন নাগরিককে বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

Advertisements