জনপ্রতিনিধি: সংসদ কার্যকর হবে সাংসদদের কাজের মাধ্যমে

palo_logo

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ০৪-১২-২০০৯

সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র…।’ গণতন্ত্র মানে প্রশাসনের সকল স্তরে জনপ্রতিনিধিদের শাসন। অর্থাত্ সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মূলত নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে, যাঁরা একদল প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। তেমনিভাবে প্রশাসনের অন্যান্য স্তরে—যেমন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ছোট-বড় শহরে—নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন কায়েম করে তাঁদের অধীনে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে ‘স্থানীয় শাসন’ পরিচালিত হবে (অনুচ্ছেদ ৫৯)।

সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘জাতীয় সংসদ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইনপ্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে…।’ আইন প্রণয়ন মানে শুধু আইন পাস, বাতিল বা আইন পরিবর্তন-পরিবর্ধন করাই নয়। সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে বিতর্ক অনুষ্ঠানও বোঝায়। তবে নেতানেত্রীর বন্দনা বা প্রতিপক্ষের নিন্দা-কুত্সা জাতীয় সংসদে স্থান পাওয়ার মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

জাতীয় সংসদের আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সংসদে পাস করা আইনগুলো যথাযথ ও পরিপূর্ণভাবে এবং সম্পূর্ণ সততা ও কৃচ্ছ্রতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা। অর্থাত্ সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা তথা দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। সংসদের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সরকারের আয়-ব্যয়, বাজেট ও বিদেশি চুক্তি অনুমোদন করা।

এসব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে আমাদের সংসদ সদস্যদের নিবিষ্টতার ওপরই সংসদের কার্যকারিতা মূলত নির্ভর করে। কিন্তু কতটুকু সময় তাঁরা এসব কাজে ব্যয় করেন? সংসদীয় দায়িত্ব পালনে না হলে, কোন কাজে তাঁরা তাঁদের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন?

আমাদের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে যাঁদের কিছু একান্ত সময় ব্যয় করার সুযোগ হয়েছে, তাঁরা জানেন সংসদ সদস্যদের কী কাজে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। গত এপ্রিল মাসের শেষ দিকে একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে—একজন সৎ ও নিবেদিত জনপ্রতিনিধি বলে যাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি—ঘণ্টাখানেক সময় কাটানোর সুযোগ হয়। এ সামান্য সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্যদের কার্যক্রম সম্পর্কে আমি কিছু দুর্লভ অভিজ্ঞতা অর্জন করি: কী বিচিত্র ধরনের কাজ তাঁদের করতে হয়; কত অযৌক্তিক ধরনের অনুরোধ তাঁদের কাছে আসে।

আমরা যে ঘণ্টাখানেক সময় একত্রে কাটিয়েছি সে সময় তাঁর মোবাইল ফোনটি প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে বাজতে থাকে। তিনি আমার প্রতি যথার্থ ভদ্রতা প্রদর্শন করেই কয়েকটি ফোনের উত্তর দেন। পাশে বসা ছিলাম বলে সংসদ সদস্যের কথাগুলো না শুনে আমার উপায় ছিল না।

প্রথম কলটি ছিল দুটো মৃতদেহ সম্পর্কে। যানবাহন দুর্ঘটনায় সম্ভবত তাঁর নির্বাচনী এলাকার দুজন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে। মৃতের আত্মীয় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককে বলে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মানবিক কারণে লাশ দুটি ছাড় করার ব্যবস্থা করে দেন। এরপর লাশের আপনজনের প্রশ্ন—কীভাবে তাদের গ্রামের বাড়িতে লাশ নেওয়া হবে? কে তা করবে? কে খরচ বহন করবে? একতরফা কথোপকথন শুনে আমার কাছে মনে হয়েছে যে মৃতের পরিজনেরা আশা করেছিল যে সংসদ সদস্য তাঁর নিজ খরচে লাশ দুটো তাদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।

আরেকটি কল ছিল কোনো একজনের বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ সংক্রান্ত। এক ব্যক্তির, সম্ভবত প্রভাবশালী ব্যক্তির, বিদ্যুতের দুটি সংযোগ ছিল। একটি ছিল তাঁর বাড়িতে, অন্যটি সেচকাজের জন্য মাঠে। দুটি সংযোগই ছিল অবৈধ। সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তা অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগে সংসদ সদস্যের পরামর্শ নেন এবং তিনি কৃষি উত্পাদন যাতে ব্যাহত না হয় তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফসলের মাঠের সংযোগটি অব্যাহত রেখে বাড়ির সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করার পরামর্শ দেন। টেলিফোনের আলাপ থেকে বোঝা গেল, এতে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক অসন্তুষ্ট হয়েছেন। সাংসদ প্রভাবশালী ব্যক্তিটির কাছে ব্যাখ্যা করলেন তিনি কী করেছেন, কেন করেছেন এবং এতে তাঁকে ভুল বোঝার কোনো অবকাশ নেই। প্রসঙ্গত, এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অতি উত্সাহ লক্ষণীয়!

অন্য একটি কল আসে থানায় দায়ের করা একটি মামলা সম্পর্কে। সম্ভবত থানা মামলাটি নেয়নি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী সাংসদকে এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে অনুরোধ করেন, তাতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া বা না নেওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব, এ ব্যাপারে তাঁর কিছুই করার নেই। এরপর তাঁকে বলতে শুনি, তিনি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে সরাসরি আদালতে যাওয়ার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো দিকেই পরামর্শ দেবেন না, কারণ তিনি এ ব্যাপারে দায়িত্ব নেবেন না। বেশ কয়েকটি ফোন আসে তদবিরের অনুরোধে। একটি ছিল শিক্ষাবিভাগে নিয়োগ, বদলি বা পদোন্নতিসম্পর্কিত। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে এ ব্যাপারে বলবেন বলে কলারকে আশ্বাস দেন।

এসব ফোনালাপের সময় আমি লক্ষ করেছি, সাংসদ ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র। গণমাধ্যমের সুবাদে তাঁর কিছু সহকর্মীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও হুমকিমূলক আচরণের কথা আমরা শুনলেও, তাঁর আচরণ ছিল অত্যন্ত শালীন। আমাদের আলাপকালেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তবে আমার দেখে ভালো লেগেছে যে তিনি যথাসম্ভব অন্যায় অনুরোধ থেকে কিংবা অনুরোধকারীকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। আমরা জানি না তাঁর অন্য সহকর্মীরা এ ধরনের অন্যায় আবদারের মুখে কী করছেন, তবে গণমাধ্যমে তাঁর সহকর্মীদের কারও কারও সম্পর্কে বিরূপ প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে।

আমাদের বৈঠকটি হয় এপ্রিল মাসে, এখন নিশ্চয়ই অন্যায় অনুরোধের ধরন বদলেছে, সংখ্যাও বেড়েছে এবং এগুলো রক্ষা করার জন্য চাপও তীব্র হয়েছে। জানি না সেই শ্রদ্ধেয় সাংসদ এগুলো কীভাবে সামলাচ্ছেন। তবে তাঁর সহকর্মীদের অনেকেই যে এগুলো যথাযথভাবে ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে প্রতিহত করতে পারছেন না তা গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে সুস্পষ্ট।

এটি সুস্পষ্ট যে আমাদের সাংসদরা ‘কনস্টিটুয়েন্সি সার্ভিস’ বা তাঁদের ভোটারদের সেবা দিতে অনেক সময় ব্যয় করছেন, ফলে তাঁদের পক্ষে সংসদীয় কার্যক্রমে সর্বশক্তি নিয়োগ করা সম্ভবপর হয় না। তাঁদের পক্ষ থেকে অবশ্য যুক্তি দেওয়া হয় যে ভোটারদের ব্যাপক চাহিদা পূরণ করতেই তাঁরা তা করেন। কিন্তু কয়েক মাস আগে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৮০ শতাংশ ভোটারই বিপদে-আপদে তাদের স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের কাছে যায়। সাংসদদের শরণাপন্ন হয় মাত্র তিন শতাংশ । অর্থাত্ নির্বাচকদের চাহিদা মেটাতেই সাংসদরা এ কাজে অনেক সময় ব্যয় করেন, এ দাবি অতিরঞ্জিত। এ ছাড়া সাংসদরা অনেক ক্ষেত্রে বাছবিচার না করেই সব অনুরোধে সাড়া দেন বলে আরও চাহিদার সৃষ্টি হয়। তাই এসব অনেকটা স্ব-সৃষ্ট চাহিদা। তদবিরের এ সংস্কৃতির কারণে আমাদের দেশে রাজনীতিক ও জনগণের মধ্যে এক ধরনের পেট্রোন-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অর্থাত্ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তদবির না হলে নাগরিকেরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য সেবাও অনেক সময় পায় না। এ ধরনের ব্যবস্থা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং গণতান্ত্রিক শাসনকে কার্যকর করার ব্যাপারেও সহায়ক নয়। এর মাধ্যমে সময় ও সম্পদেরও অপব্যবহার হয়।

সাংসদদের সংসদীয় কার্যক্রমে সর্বশক্তি নিয়োগ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো তাঁদের স্থানীয় উন্নয়নকাজে যুক্ত হওয়া। বহু দিন থেকেই বাংলাদেশে সাংসদরা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত ছিলেন এবং তার ফলাফল ইতিবাচক ছিল না। কিন্তু বর্তমান সরকার আইন করে তাঁদের এ দায়িত্ব দিয়েছে এবং উপজেলা পরিষদ এখন অনেকটা তাঁদের কর্তৃত্বেই পরিচালিত হওয়ার কথা। এ অসাংবিধানিক দায়িত্ব শুধু উপজেলাতে একটি দ্বন্দ্বাত্বক পরিস্থিতিরই সৃষ্টি করেনি, এর ফলে সংসদ সদস্যরা পুরোপুরিভাবে তাঁদের সংসদীয় দায়িত্বেও মনোনিবেশ করতে পারছেন না। ফলে উপজেলার সঙ্গে সঙ্গে সংসদও অকার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

আরেকটি কারণেও সাংসদরা সংসদীয় দায়িত্ব থেকে দূরে থাকছেন। নবম জাতীয় সংসদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ব্যবসায়ী এবং অনেকে তাঁদের সংসদীয় পদকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িক সুবিধাও নিচ্ছেন, ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব উপেক্ষা করেই। অনেকে আবার ব্যবসায়ীর খাতায় নতুন করে নাম লেখাচ্ছেন। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সাংসদসহ সরকারের উচ্চপদস্থদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার এবং তা প্রকাশ করার কথা থাকলেও এখনো তা করা হয়নি। এমনকি তাঁদের জন্য একটি আচরণবিধিও প্রণয়ন করা হয়নি, যদিও প্রতিবেশী ভারতসহ অনেক দেশেই এমন বিধি রয়েছে। ফলে কিছু কিছু সাংসদ ইতিমধ্যে সংসদীয় দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে স্বার্থের দ্বন্দ্ব উপেক্ষা করেই নিজস্ব ব্যবসায় বেশি সময় ব্যয় করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেও লিপ্ত হচ্ছেন। অনেকের সময়ই হয় না সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে। এ কারণে সংসদে মাঝেমধ্যে কোরাম-সংকটও দেখা দিচ্ছে। উল্লেখ্য যে সরকারের সঙ্গে যাঁরা ব্যবসায়িক সম্পর্কে লিপ্ত তাঁরা, সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতাই হারিয়ে ফেলেন।

সংসদীয় দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত হলেও, আমাদের সাংসদদের পক্ষে তাতে পুরোপুরি মনোযোগী হওয়া সম্ভব হয় না। নির্বাচকদের সমস্যা সমাধান ও তাদের পক্ষে তদবির করা ছাড়াও, তাঁরা স্থানীয় উন্নয়ন এবং অনেকে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন। ফলে সংসদের কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা কি তা চাই? আমরা কি চাই না সংসদ সদস্যরা তাঁদের মূল দায়িত্বে নিবিষ্ট থাকুন? সংসদীয় কার্যক্রমে তাঁরা সম্পূর্ণরূপে মনোযোগী না হলে, সংসদ কার্য়কর হবে না। আর সংসদ কার্যকর না হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও কার্যকর হওয়ার আশা করা যায় না। এর ভবিষ্যত্ পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। আমাদের নেতারা কি তা নিয়ে চিন্তিত? এ ছাড়া অনেক সরকারি কর্মকর্তা যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে সংসদ সদস্যদের দ্বারস্থ হচ্ছেন, এটাও শঙ্কার উদ্রেক না করে পারে না।

ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

সূত্র: প্রথম আলো, ৪ ডিসেম্বর ২০০৯

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s