স্থানীয় সরকারের বর্তমান অবস্থায় করণীয়

jugantor_logo

ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র
প্রয়োজন হলফনামার মাধ্যমে তাদের আয়-ব্যয়, সম্পদ, দায়-দেনা, অপরাধ ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশের বিধান। তাহলেই জনগণ জেনে-শুনে-বুঝে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। ফলে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিদের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

একটি কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান’ করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং এটি মেনে চলা সবার জন্যই বাধ্যতামূলক। তাই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার দাবি করুণা-ভিক্ষার সমতুল্য নয়। এটি কারও দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয়ও নয়।

প্রশাসনের সব স্তরে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা তথা ‘লোকাল ডেমোক্রেসি’ বা স্থানীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং এ ব্যবস্থাকে গতিশীল ও শক্তিশালী করার বিষয়ে সারাদেশে ব্যাপক জনমতও বিরাজ করছে। জনমতের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও নির্বাচনের প্রাক্কালে তাদের ‘দিন বদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। নবম জাতীয় সংসদ ইতিমধ্যে জেলা পরিষদ ছাড়া সব স্থানীয় সরকার স্তরের আইন প্রণয়ন করেছে। এছাড়াও সরকারের প্রায় এক বছর মেয়াদ পূর্ণ হতে চলেছে। এমতাবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন : কার্যকর ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার গড়ে তোলার ব্যাপারে আমরা কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি? এ লক্ষ্যে আমাদের ভবিষ্যতে করণীয়ইবা কী?

নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনেই উপজেলা আইন পাস হয়েছে। সংসদের সাম্প্রতিক অধিবেশনে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ আইন অনুমোদন লাভ করে। অর্থাৎ জেলা পরিষদ ছাড়া অন্য সব স্থানীয় সরকার আইন বর্তমান সংসদ অনুমোদন করেছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে অর্জনটি অর্থবহ কিনা তা নির্ভর করবে আইনগুলো স্থানীয় সরকারের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা। একই সঙ্গে এগুলো পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সম্মিলিতভাবে এগুলো একটি যুগোপযোগী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে কিনা।

কার্যকর ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য থাকে। বৈশিষ্ট্যগুলো হল : (১) এসব প্রতিষ্ঠান শুধু স্থানীয় সরকারের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্তৃত্বে পরিচালিত হতে হবে; (২) এগুলোতে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে; (৩) এসব প্রতিষ্ঠানে নারীসহ সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ‘অন্তর্ভুক্তিকরণে’র বিধান থাকতে হবে; (৪) এগুলো স্বায়ত্তশাসিত বা ‘সেলফ গভর্নিং’ হতে হবে; (৫) এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা, দায়-দায়িত্ব ও সম্পদ দিতে হবে; (৬) প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হতে হবে; (৭) প্রত্যেকটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরস্পরের নিয়ন্ত্রণমুক্ত ও স্বাধীন হতে হবে; (৮) এগুলোতে একক কর্তৃত্বের পরিবর্তে পরিষদের সদস্যদের যৌথ নেতৃত্বের সুযোগ থাকতে হবে ইত্যাদি। এসব বৈশিষ্ট্য কি আইনে প্রতিফলিত হয়েছে?

আইনের বিধানানুযায়ী সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য আইনানুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও, উপজেলা পরিষদের ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম ঘটেছে। উপজেলা আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫-এর অধীন এবং আঞ্চলিক এলাকা হইতে নির্বাচিত সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য পরিষদের উপদেষ্টা হইবেন এবং পরিষদ উপদেষ্টার পরামর্শ গ্রহণ করিবেন।’ এছাড়াও আইনের মাধ্যমে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের অনুমতি ছাড়া এমনকি বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ উপজেলা পরিষদ মাননীয় সংসদ সদস্যদের- যারা জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে ‘আইন-প্রণয়নে’র (সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ) লক্ষ্যে নির্বাচিত হয়েছেন- কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাই উপজেলা পরিষদকে সত্যিকারার্থেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বলা যায় না। এছাড়াও সংবিধানে জেলাকে ‘প্রশাসনিক একাংশ’ ঘোষণা করলেও, স্বাধীন বাংলাদেশে অদ্যাবধি এ স্তরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ সংবিধানের লঙঘন সত্ত্বেও কখনও জেলা পরিষদ গঠন করা হয়নি।

সংবিধানের ৯ অনুচ্ছেদে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে কৃষক, শ্রমিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। তবে পিছিয়ে পড়া অন্যান্য জনগোষ্ঠীর জন্য না থাকলেও, প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানেই নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান সংরক্ষণ পদ্ধতি নারীকে ক্ষমতা কাঠামোর বাইরেই রাখে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণ অনেকটা প্রতীকী।

ইউনিয়ন পরিষদ আইনে বছরে দু’বার ‘ওয়ার্ডসভা’ অনুষ্ঠানের বিধান রাখা হয়েছে- ওয়ার্ডের সব ভোটারকে নিয়ে ওয়ার্ডসভা গঠিত। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার চর্চা, স্থানীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, সামাজিক আন্দোলন পরিচালনা এবং সুস্পষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে সরকারি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে উপকারভোগী চিহ্নিত হওয়ার কথা। তাই ইউনিয়ন পরিষদ আইনে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ তথা ‘ডিরেক্ট ডেমোক্রেসি’ বা সরাসরি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও জনগণের ক্ষমতায়নের বিধান রয়েছে, যদিও এ লক্ষ্যে বছরে দুটি ওয়ার্ডসভাই যথেষ্ট নয়। অন্য কোন আইনে অবশ্য এ ধরনের জনঅংশগ্রহণের বলিষ্ঠ বিধান নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য চারটি f-এর সংস্থান আবশ্যক। এগুলো হল : Functions (দায়-দায়িত্ব), Finances (সম্পদ), Freedom (স্বাধীনতা) ও Functionaries (জনবল)। অর্থাৎ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য প্রমুখের নিয়ন্ত্রণ ও খবরদারিমুক্ত হতে হবে। একই সঙ্গে ‘স্থানীয় শাসন’ পরিচালনার লক্ষ্যে এগুলোর প্রয়োজনীয় সম্পদ ও দায়-দায়িত্ব থাকতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত উপজেলা পরিষদের ওপর মাননীয় সংসদ সদস্যদের আইনের মাধ্যমে সরাসরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হলেও ইউনিয়ন পরিষদও তাদের হস্তক্ষেপমুক্ত নয়। একই সঙ্গে এ দুটি প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ করে থাকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও। এছাড়াও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা, বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে অনেক সময় অন্যায়ভাবে অনাস্থা ও বরখাস্তের শিকার হন। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় আগের তুলনায় সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণের পরিমাণ কিছুটা কমলেও, তাদের মাথার ওপর বসে আছে এক পরম শক্তিমান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তাই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্তমানে কোনভাবেই স্বশাসিত বলা যায় না।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমিত দায়-দায়িত্বের একটি বড় কারণ হল আমাদের কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থা। বস্তুত বিকেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে আমাদের শাসন প্রক্রিয়া ক্রমাগতভাবে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ সম্পদও কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, যার ক্ষুদ্র অংশই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রদান করা হয়, যদিও এসব সম্পদের মালিক জনগণ। এছাড়াও আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা স্থানীয়ভাবে অর্থ সংগ্রহ করে তহবিল গঠনের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নন।

অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনবল অত্যন্ত সীমিত, যদিও ইউনিয়ন পরিষদে জনবল নেই বললেই চলে। তবে প্রত্যেকটি স্থানীয় সরকার আইনের তফসিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো হস্তান্তরযোগ্য জনবলের একটি তালিকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা হস্তান্তরের জন্য সরকারি আদেশের প্রয়োজন হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত সরকার এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেননি, যা কোনভাবেই কাঙিক্ষত নয়।

সরকারি কর্মকর্তাদের খবরদারিত্ব, বিভিন্ন ধরনের রিপোর্ট প্রদান ও অডিটের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার বিধান রাখা হলেও অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার কোন সরাসরি বিধান নেই। একমাত্র ইউনিয়ন পরিষদ তার ব্যতিক্রম। ওয়ার্ডসভার মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার বিধান রাখা হয়েছে।

সংজ্ঞাগতভাবেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের নিয়ন্ত্রণমুক্ত ও স্বাধীন। তাই এগুলোতে দ্বৈত-প্রতিনিধিত্ব রাখা অনাকাঙিক্ষত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও এসব প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত নারী সদস্যদের উপজেলা পরিষদের সদস্য করার বিধান রাখা হয়েছে, যার ফলে উপজেলা চেয়ারম্যানদের ইউনিয়ন পরিষদের ওপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাস্তবে কিছু কিছু এলাকায় এমন প্রচেষ্টা পরিলক্ষিতও হচ্ছে। অধিক সমন্বয়ের যুক্তিতে এ বিধান করা হলেও তার ফলাফল হয়েছে উল্টো।

স্থানীয় সরকার আইনগুলোর একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল, এগুলোর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে অনেকটা প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা হয়েছে, যদিও কেন্দ্রীয়ভাবে আমাদের দেশে পার্লামেন্টারি পদ্ধতি প্রচলিত। এর মাধ্যমে এগুলো মূলত মেয়র বা চেয়ারম্যানসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। কাউন্সিলর ও সদস্যদের ভূমিকা এতে অত্যন্ত সীমিত, সংরক্ষিত আসনের নারীদের ভূমিকা আরও গৌণ।

অনেকগুলো আইনে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতিফলনের অনুপস্থিতি ছাড়াও আইনগুলোতে ব্যাপক অসামঞ্জস্যতাও রয়েছে। প্রথম অসামঞ্জস্যতাটি পরিলক্ষিত হয় আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যাবলী চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে। যেমন- ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ৪৭ ধারা অনুযায়ী পরিষদের কার্যাবলী চিহ্নিত করা হয়েছে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের আলোকে। যদিও সংবিধানের ‘প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীদের কার্যে’র পরিবর্তে আইনে ‘প্রশাসন ও সংস্থাপন বিষয়াদি’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছড়াও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে এমপিদের কর্তৃত্ব রাখা না হলেও উপজেলা পরিষদের ক্ষেত্রে তা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসামঞ্জস্যতা রয়েছে ভাইস চেয়ারম্যানের পদের ক্ষেত্রে। উপজেলা আইনে ভাইস চেয়ারম্যান পদের বিধান থাকলেও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ভাইস চেয়ারম্যান বা ডেপুটি মেয়র পদের কোনো বিধান নেই। এছাড়াও আইনগুলোতে প্রতিনিধিদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা, দায়বদ্ধতা, অনাস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা রয়েছে।

উল্লিখিত বিশ্লেষণ থেকে এটি সুস্পষ্ট, স্থানীয় সরকারের সবগুলো আইনই ত্রুটিপূর্ণ। উপজেলা আইন সর্বাধিক ত্রুটিপূর্ণ। এ ত্রুটিগুলো দূর করতে হবে। একই সঙ্গে দূরীভূত করতে হবে আইনের অসামঞ্জস্যতাগুলো। আইনগুলোর সীমাবদ্ধতা দূরীকরণের লক্ষ্যে সরকারকে এখনই জরুরিভিত্তিতে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমত, সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদ থেকে বিযুক্ত করে তাদের সংসদকেন্দ্রিক কার্যক্রমে নিবিষ্ট করতে হবে। তবে সংসদ সদস্যদের বাদ দিলেই পরিষদ কার্যকর হয়ে যাবে না- এর জন্য আরও অনেকগুলো পরিবর্তন প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, জেলা পরিষদের আইনটি সংশোধন ও যুগোপযোগী করে জেলা পরিষদ নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। তৃতীয়ত, আইনগুলোর তফসিলে বর্ণিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় বাজেটের বিধানসহ সংশ্লিষ্ট পরিষদে জরুরি ভিত্তিতে হস্তান্তর করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারের জনবলের সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানের লক্ষ্যে ‘লোকাল গভর্নমেন্ট ক্যাডার’ প্রতিষ্ঠার কথাও ভাবা যেতে পারে। চতুর্থত, একটি বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিক ক্ষমতা, দায়-দায়িত্ব ও সম্পদ হস্তান্তর করতে হবে। দূরীভূত করতে হবে সরকারের হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ। পঞ্চমত, সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নারী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ কার্যকর এবং অর্থবহ করতে হবে। ষষ্ঠত, ইউনিয়ন পর্যায়ে ওয়ার্ড সভা গঠনের যে যুগান্তকারী বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তা কার্যকর করাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, যাতে জনগণের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়ে তাদের ক্ষমতায়িত করার এ সুযোগ হাতছাড়া না হয়।

জরুরি ভিত্তিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিতে হবে আইনগুলোকে সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও এগুলোতে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে। সামঞ্জস্যতা আনতে হবে : আইনের উদ্দেশ্য, গঠন, যোগ্যতা-অযোগ্যতা, জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা, অর্থবহ নারী প্রতিনিধিত্ব, অনাস্থা, তথ্য প্রদানের বিধান ইত্যাদির ক্ষেত্রে। এ লক্ষ্যে সমন্বিত আইন বা ‘আমব্রেলা অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। কমিশনের লক্ষ্য হবে আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচিকে বেগবান ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সব শাস্তিমূলক উদ্যোগ নিষপন্ন করা। আরও উদ্যোগ নিতে হবে স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দক্ষতা বৃদ্ধির। বিশেষ করে তাদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি ও তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি প্রয়োজন স্থানীয় সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হলে এগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের গুণগত মানেও পরিবর্তন আনতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন হলফনামার মাধ্যমে তাদের আয়-ব্যয়, সম্পদ, দায়-দেনা, অপরাধ ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশের বিধান। তাহলেই জনগণ জেনে-শুনে-বুঝে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। ফলে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিদের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রশাসনের সব স্তরে জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর শাসন কায়েম করে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার এবং স্থানীয় নেতৃত্ব ক্ষমতায়নের মাধ্যমে ‘কৃষি ও পল্লী জীবনে গতিশীলতা’ আনয়নের লক্ষ্যে আশা করি সরকার উপরোক্ত প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে, যাতে সারাদেশে একটি স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ ও গতিশীল স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’

সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ৫ ডিসেম্বর, ২০০৯

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s