জাতীয় সংসদ কি কার্যকর?

ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র
নবম জাতীয় সংসদের মেয়াদ প্রায় এক বছর পূর্ণ হতে চললো। বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে অনেকের মনেই গুরুতর জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন করছেন – সংসদ কি তার দায়িত্ব যথাযথ এবং পরিপূর্ণভাবে পালন করছে? গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার ব্যাপারে যথার্থ অবদান রাখছে? নাগরিকের মনে প্রশ্ন সৃষ্টির অন্যতম কারণ হলো প্রথম অধিবেশনের পর থেকে চার দলীয় জোটের ক্রমাগত সংসদ অধিবেশন বর্জন।

আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে হলে সংসদের কার্যকারিতার কোনো বিকল্প নেই। অনেকের স্মৃতিতে এটি এখনও অম্লান যে, গত ২২ জানুয়ারি, ২০০৭ তারিখে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত হওয়ার মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভেঙ্গে পড়েছিল। এর একটি অন্যতম কারণ ছিল আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের প্রতি চরম অসহযোগিতা এবং গত তিনটি সংসদেই বিরোধী দলের দীর্ঘমেয়াদি সংসদ অধিবেশন বর্জন। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র নেতৃত্বে প্রণীত নববইয়ের তিনদলীয় জোটের রূপরেখায় একটি কার্যকর জাতীয় সংসদ গঠন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। বলা বাহুল্য, এ অঙ্গীকার ভঙ্গ করেই সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি সৃষ্টি করা হয়, যার মাসুল পরবর্তীতে পুরো জাতিকেই গুণতে হয়েছে।

গত ১১ জানুয়ারি, ২০০৭ তারিখে রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মদের নেতৃত্বে গঠিত চরম পক্ষপাতদুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পদত্যাগের পর এবং সেনা সমর্থিত আরেকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (অন্তবর্তীকালীন সরকার বলাই সম্ভবত বেশি যুক্তিযুক্ত) অধীনে পরবর্তী দু’বছরের দুঃখজনক ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে অনেকের মনেই প্রত্যাশা ছিল যে, অতীতের বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের ঐতিহ্য হয়তো ভাঙ্গা হবে। ভবিষ্যতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার বিরাজমান অসহযোগিতার অবসান ঘটবে। উভয় দলই সংসদকে কার্যকর করার ব্যাপারে আন্তরিকতা প্রদর্শন করবে। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা আরও দায়িত্বশীল হবেন।

সংসদের কার্যকারিতা নিরূপণের জন্য এর দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। আমাদের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে ‘প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত’ করা হয়েছে। মোটা দাগে চারটি কার্যক্রম আইন প্রণয়ন ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। প্রথমত, আইন পাশ করা, আইনের পরিবর্তন-পরিবর্ধন এবং প্রয়োজনে এগুলো বাতিল করা। দ্বিতীয়ত, সংসদের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠান করা, যাতে জনস্বার্থে যথার্থ আইন ও নীতি প্রণীত হয়। তৃতীয়ত, সরকারের আয়-ব্যয়ের সিদ্ধান্ত ও বাজেট অনুমোদন করা। চতুর্থত, সংসদীয় কমিটিগুলোর মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সংসদের কার্যকারিতা মূল্যায়নের লক্ষ্যে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

আইন পাশ ও সংশোধন করার বিষয়ে আসা যাক। সংসদ অধিবেশনে বসে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোরামের প্রয়োজন হয়। সংসদের তিন-চতুর্থাংশ সদস্যের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত মহাজোট সরকারের পক্ষে চার দলীয় জোট সদস্যদের অনুপস্থিতিতেও সংসদে কোরাম নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই বিএনপি ও তার সহযোগী রাজনৈতিক দলসমূহের সদস্যরা অনুপস্থিত থাকলেও, সংসদ তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। তাই নিতান্ত টেকনিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে বিরোধী দলের বয়কটের মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হয় নি। তবে, আমাদের জাতীয় সংসদের সরাসরি আসন থেকে নির্বাচিত তিন’শ জন এবং সংরক্ষিত আসনের অপর ৪৫ জন সংসদ সদস্য বাংলাদেশের প্রায় ১৬ কোটি ২২ লক্ষ নাগরিকের সংসদে প্রতিনিধিত্ব এবং তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করার কথা। কিন্তু বিএনপি ও তার সহযোগীদের ক্রমাগত বর্জনের ফলে দেশের একটি বিরাট সংখ্যক নাগরিক সংসদে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়াও বর্জনকারীদের বাদ দিয়েও অনেক সরকারি দলের সদস্যও অনেক সময় সংসদে অনপুস্থিত ছিলেন। ফলে অনেক সময় সংসদ অধিবেশন শুরু হতে বিলম্ব হয়েছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোরাম সঙ্কটও সৃষ্টি হয়েছে। উপরন্তু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, আইনের মানও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, স্থানীয় সরকার আইনসমূহে স্থানীয় সরকার সর্বজনস্বীকৃত বৈশিষ্ট্যগুলো প্রতিফলিত হয়নি।

চার দলীয় জোটের সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণে নীতি-নির্ধারণী ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে বিতর্ক অনুষ্ঠানের কার্যক্রম অবশ্যই ব্যাহত হয়েছে। সংসদে অনুপস্থিত সংসদ সদস্যদের প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা থেকে জাতি বঞ্চিত হচ্ছে। তবে সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেয়াই যথেষ্ট নয়, সংসদের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে বক্তব্যের মান থেকে। প্রদত্ত বক্তব্য ও আলোচনা যদি মূলত নেতা-নেত্রীদের বন্দনা, বিরোধীদেরকে কটাক্ষ এবং নিজ নির্বাচনী এলাকার কিছু দাবি-দাওয়া উত্থাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সকলের উপস্থিতি সত্ত্বেও সংসদকে কার্যকর বলা দুরূহ। সংসদ সদস্যদের নিবিষ্টতা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আরও গুরুত্বপূর্ণ সংসদকে ব্যবহার করে, যেখানে নাগরিদের কথা বলার অধিকার নেই, তাদের চরিত্র হনন করা থেকে বিরত থাকা।

এছাড়াও সকলের উপস্থিতি এবং তাঁদের বক্তব্য প্রদানের সুযোগ থাকলেও, যদি সরকারি দলের বিরোধীতা এবং মাননীয় স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকারের নিরপেক্ষহীনতার কারণে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে সংসদে আলোচনা না হয়, তাহলেও সংসদের কার্যকারিতা নিশ্চিত হয় না। ক্ষমতাসীনদের অর্বাচীনতার কারণে অতীতের সংসদগুলোকে অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সম্পর্কে আলোচনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। বর্তমানেও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একই ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করা হচ্ছে। তবে টিপাইমুখ বাঁধ ইস্যু, দ্রব্যমূল্য, আইন-শৃঙখলা পরিস্থিতি ইত্যাদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা সংসদে অর্থবহ আলোচনা হতে দেখিনি।

সরকারের আয়-ব্যয় ও বাজেট অনুমোদন অবশ্য সরকারি দলের বিরাট সংখ্যক সদস্যদের দিয়েই সম্ভব। কিন্তু এক্ষেত্রেও সংসদে বিরোধী দলের অনুপস্থিতির কারণে আর্থিক ক্ষেত্রে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কার্যক্রম পরিপূর্ণভাবে সম্পাদিত হয় না। তাই এ মানদণ্ডের আলোকেও সংসদকে কার্যকর বলা যৌক্তিক নয়।
সংসদের প্রাণ তার কমিটিগুলো। এগুলোর মাধ্যমেই সংসদে পাশ করা আইন ও সিদ্ধান্তগুলো যথাযথ ও পরিপূর্ণভাবে এবং যথার্থ কৃচ্ছতার সাথে বাস্তবায়িত হলো কি-না তা নিশ্চিত হয়। নিশ্চিত হয় সরকারের আন্তরিকতা, দক্ষতা ও জনকল্যাণমুখিতা।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘মন্ত্রীসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন’। মন্ত্রীসভা প্রজাতন্ত্রের নির্বাহি দায়িত্ব পালন করে থাকে। আর মন্ত্রীসভার মাননীয় সদস্যদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে সংসদীয় কমিটিগুলো। সংসদে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমেও সরকারের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এ কাজগুলোতে বিরোধী দলের সদস্যরাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। তাঁরাই সাধারণত কমিটির বৈঠকে তীর্যক প্রশ্ন উত্থাপন করেন এবং সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে রাখেন।

নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সংসদীয় কমিটিগুলো গঠন করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবেগ ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা দ্বারা পরিচালিত হলেও এবং কিছুটা বাড়াবাড়ির অভিযোগ থাকলেও, সংসদীয় কমিটিগুলো যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি সক্রিয়। এটিও অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। সরকারি দলের সদস্যরাও সরকারের কার্যক্রম নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করছেন। তবুও বিরোধী দলের সদস্যদের ক্রমাগত অনুপস্থিতি সংসদের কার্যকারিতাকে নিঃসন্দেহে ব্যাহত করছে। সংসদে অনেক জোরালো প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে না। কারণ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা, যদিও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তার ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কতিপয় সুনির্দিষ্ট বিষয় ছাড়া সংসদ সদস্যদের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার দেয়া’র অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। উল্লেখ্য, সংসদ অধিবেশন বর্জন করলেও প্রথম দিকে বিরোধী দলের সদস্যরা কমিটির সভাগুলোতে অংশগ্রহণ করতো, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাও বন্ধ হয়ে যাবে বলে শোনা যায়। ফলে সংসদীয় কার্যক্রমের ফলপ্রসূতারও গুরুতরভাবে হানি হবে।

প্রসঙ্গত, সংসদীয় কমিটিগুলো নিয়মিত বসলেই এবং সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যগণ উপস্থিত থাকলেই এগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত হয় না। এটি বহুলাংশে নির্ভর করে সংসদ সদস্যদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও আগ্রহের ওপর। সর্বোপরি কমিটির কাজে নিবিষ্টতা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সংসদের কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে সংসদে কারা নির্বাচিত হয়ে এসেছেন তাঁদের ব্যাকগ্রাউন্ড তথা সততা, যোগ্যতা ও নিষ্ঠার ওপর। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের তথ্য প্রকাশ এবং ভোটারদের তথ্যের ভিত্তিতে জেনে-শুনে-বুঝে ভোটাধিকার প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যবশত বর্তমান সংসদ একটি তথ্য অধিকার আইন পাশ করলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রণীত অধ্যাদেশগুলোতে অন্তর্ভুক্ত স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের তথ্য প্রদানের বিধান রহিত করা হয়। সংসদের এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কীভাবে জনস্বার্থ সমুন্নত হল তা আমাদের বোধগম্য নয়। বরং এর মাধ্যমে নাগরিকের মৌলিক অধিকারই – আদালতের মতে ভোটারদের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার তাদের বাক স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত, কারণ ভোটের মাধ্যমে তারা সে স্বাধীনতা গ্রয়োগ করে – অধিকারই হরণ করা হয়েছে।

সংসদের কার্যকারিতা নিরূপণের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হওয়া উচিত সংসদ সদস্যগণ জনকল্যাণে তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন কি-না। তাঁরা যদি তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ এ পদ ও পদবি ব্যবহার করে ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থ চরিতার্থ করেন, তাহলে সংসদকে কার্যকর বলা যাবে না। বর্তমান সংসদের কিছু কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অনাকাঙিক্ষত ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সুবিধা আদায়ের অভিযোগের কথা ইতোমধ্যেই শোনা যাচ্ছে। কারো কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে সরকারের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার। উল্লেখ্য, সরকারের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক সংসদ সদস্য পদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অযোগ্যতা। অর্থাৎ কোনো সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারাবেন। নিজেদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি ক্রয়ের সুযোগ, সমতাবোধ বিসর্জন দিয়ে আবাসিক এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্লট বরাদ্দের সুবিধা ইত্যাদি – ক্ষেত্রে দল-মত নির্বিশেষে নবম সংসদের সদস্যদের মধ্যেও কোন দ্বিমত আছে বলে মনে হয় না। নিঃসন্দেহে এ সকল বৈষম্যমূলক সুযোগ-সুবিধা জনস্বার্থ পরিপস্থি। এছাড়াও এসকল ক্ষেত্রে তাঁরা দায়িত্ব পালনে তাঁদের ‘ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত’ না হওয়ার শপথ ভঙ্গ করার অভিযোগ উঠতে পারে।

সংসদ সদস্যগণ যদি তাঁদের সংবিধান নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে অন্য কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখেন তাহলেও সংসদকে কার্যকর বলা যায় না। দুর্ভাগ্যবশত সংসদীয় দায়িত্ব অবহেলা করে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের সংসদ সদস্যগণ স্থানীয় উন্নয়ন কাজে নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখছেন। ফলে একদিকে যেমন সংবিধান লঙিঘত হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাও অকার্যকর হচ্ছে। সংসদ সদস্যগণের স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত হওয়া এবং অনেক এখতিয়ার বহির্ভূত কাজে হস্তক্ষেপ করাও সংসদকে কার্যকর করার পথে বড় বাধা। কর্মী-সমর্থকদের পক্ষে তদবির এবং তাদের অনুরোধ রক্ষার্থেও সংসদ সদস্যগণ অনেক সময় ব্যয় করেন, যার ফলেও তাঁরা তাঁদের দায়িত্বে নিবিষ্ট হতে পারেন না।

উপরন্তু, একজন সংসদ সদস্য যদি সকল সংসদ সদস্যদের জন্য একটি আচরণবিধি তৈরির, যাতে তাঁদের স্বার্থের দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়, প্রস্তাব উত্থাপন করলেও, এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ অদ্যাবধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। উল্লেখ্য, সম্প্রতি ভারতীয় লোকসভা তার সদস্যদের জন্য এমন একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করেছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সংসদ সদস্যদের সততা, নৈতিকতা ও জনকল্যাণে নিষ্ঠা সম্পর্কে জনমনে সন্দেহ অব্যাহত থাকলে তারা সংসদের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ভবিষ্যতে প্রশ্ন তুলবে।

সংসদ সদস্যদের নিজেদের দায়বদ্ধতাও সংসদকে কার্যকর করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। স্মরণ করা প্রয়োজন যে, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে তাদের দিনবদলের সনদে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতিবছর জনসমক্ষে প্রকাশ করা’র অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। সরকার গঠনের পর আমাদের অর্থমন্ত্রী এ সকল তথ্য সংগ্রহের এবং এগুলো জনসম্মুখে প্রকাশের ঘোষণা দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সরকারের এক বছর পূর্ণ হওয়ার পরও অদ্যাবধি এগুলো প্রকাশিত হয়নি।

সংসদ সদস্যদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অসদাচারণের অভিযোগ উঠলে তাঁর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। একটি সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে তদন্তের ভিত্তিতে আমাদের সাবেক স্পীকার ব্যারিষ্টার জমিরউদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে বলে সংসদের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিককালে দাবি করা হয়। তবুও সংসদ তাঁর সদস্যপদ বাতিল করা থেকে বিরত থাকে। (উল্লেখ্য, প্রতিবেশি ভারতে ২০০৫ সালে একযোগে ১১ জন লোকসভা ও রাজ্যসভার সদস্যকে অসদাচরণের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত, এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আমাদের মাননীয় স্পীকার দাবি করেন যে, এ ধরনের শাস্তি প্রদান হবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত কঠোর। বর্তমান স্পীকারের এ বক্তব্য অনেককেই হতাশ করেছে। কারণ সংসদের এ সিদ্ধান্তে আমাদের দেশে বিরাজমান ‘কালচার অব ইম্পিউনিটি’ বা অন্যায় করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিরই আরেকবার প্রতিফলন ঘটেছে। এর মাধ্যমে আরো প্রমাণিত হলো যে, দলমত নির্বিশেষে সংসদ সদস্যগণ নিজেরা দায়বদ্ধতার উধের্ব। আরেকটি খারাপ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হল!

উপরিউক্ত পর্যালোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, আমাদের বর্তমান সংসদকে কার্যকর বলা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। বিরোধী দলের ক্রমাগত সংসদ বর্জন এর জন্য প্রধানত দায়ী। আরো দায়ী সংসদ পুরোপুরি জনস্বার্থে কাজ করছে কি-না সে ব্যাপারে জনমনে ব্যাপক সন্দেহ। অনেকের ধারণা অতীতের মতো বর্তমান জাতীয় সংসদও মূলত একটি কোটিপতিদের ক্লাব এবং এর সদস্যদের অনেকেই তাঁদের পদবি ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ ও কোটারি স্বার্থ চরিতার্থ করছেন। স্বচ্ছতার চর্চার মাধ্যমে জনমনে দীর্ঘদিনের পুজ্ঞীভূত এমন সন্দেহ তাঁরা দূর করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আরো ব্যর্থ হয়েছেন তাঁদের নিজেদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে।

উল্লেখ্য, তাদের দাবি মতো প্রথম কাতারে পর্যাপ্ত সংখ্যক আসন না দেয়ার ফলে চার দলীয় জোটের পক্ষ থেকে সংসদ অধিবেশন বর্জন শুরু হয়। তাদের এ যুক্তিটি ছিল সম্পূর্ণ অনাকাঙিক্ষত ও অগ্রহণযোগ্য। সরকারি দলের পক্ষ থেকে এমনকি শারীরিকভাবে বাধা প্রদান করলেও, তাঁদের উচিত এ বাধা অতিক্রম করে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য সচেষ্ট হওয়া। কারণ বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যগণ তাঁদের নির্বাচনী এলাকার জনগণের সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন এ অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই ভোট নিয়েছেন। তাই কোনো অজুহাতেই সংসদে না যাওয়া তাঁদের সাংবিধানিক দায়িত্বের বরখেলাপ এবং এটি আমাদের পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জিম্মি করার সমতূল্য। এছাড়াও সংসদে না গিয়ে বেতন-ভাতা গ্রহণ ও বিদেশ ভ্রমণ সম্পূর্ণ অনৈতিক, এমন কি সংসদ সদস্য হিসেবে নিজেদের পরিচয় প্রদানও অন্যায়। উল্লেখ্য, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রকাশিত নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করে: ‘ইস্যুভিত্তিক ওয়াকআউট ছাড়া কোন দল বা জোট সংসদের সেশন বা বৈঠক বর্জন করতে পারবে না। কোনো সংসদ সদস্য সংসদের অনুমোদন ছাড়া ৩০ দিনের অধিক অনুপস্থিত থাকলে তার সদস্যপদ শূন্য হবে।’

এক্ষেত্রে অবশ্য সরকারি দলেরও দায়িত্ব রয়েছে – তারা আরও নমনীয় হতে পারতো। বিরোধী দলকে সংখ্যা দিয়ে গণ্য করা হবে না, এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারত। কার্যকর করতে পারত বিরোধী দলকে ডিপুটি স্পীকারের পদ প্রদানের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্ব-প্রণোদিত অঙ্গীকার। তাই সংসদকে কার্যকর করতে সরকারি দলও তাদের আন্তরিকতা পুরোপুরি প্রদর্শন করেছে কি-না সে ব্যাপারেও অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে।

সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করার বিরোধী দলের সাম্প্রতিক দাবি অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত, যদিও তাদের ‘হিডেন এজেন্ডা’ বা সংসদ বর্জনের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্ক নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। আশা করি, সরকার নিজেদের আন্তরিকতা প্রদর্শন করতে এগিয়ে আসবে এবং শ্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে সংসদকে সকল জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ বিন্দুতে পরিণত করবে। মনে রাখা প্রয়োজন যে, ‘টিরানি অফ দি মেজরিটি’ বা সংখ্যাগরিষ্ঠের জুলুমবাজি গণতন্ত্রের বড় শক্র। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বাধা। বিরোধী দলও তাদের ক্রমাগত সংসদ বর্জনের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে আরো গভীরভাবে ভেবে দেখবে এবং সংসদে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। উভয় পক্ষেরই শুভ বুদ্ধির উদয় হোক, তাদের কাছে নাগরিক হিসেবে আমাদের এমনই প্রত্যাশা। আমাদের আরও প্রত্যাশা যে, সংসদ সদস্যগণও তাঁদের নিজেদের স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতাবোধ প্রদর্শনের কার্যকর উদ্যোগ নেবেন এবং স্পীকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব দেবেন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুজন- সুশাসনের জন্য নাগরিক

সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, জানুয়ারি ৪, ২০১০

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s