“সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার আলোকে প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যনীতি” শীর্ষক সুজন’র গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত

Photo of Roundtable-30.12.09

গত ৩০ ডিসেম্বর, ২০০৯ সকাল ১১:০০টায় ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিকে’র উদ্যোগে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার আলোকে প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যনীতি’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় সভাপতিত্ব ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘সুজন’ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ।

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক আহমদ বলেন, আমরা অনেকসময়ই স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে যথার্থ ধারণা পোষণ করি না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আলমা-আটা ঘোষণার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা শারীরিক অবস্থার দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করে যখন স্বাস্থ্যসেবার কথা বলি তখন মানসিক এবং সামাজিক দিকটি যথেষ্ট বিবেচনা পায় না। অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবার কতগুলো ধারা আছে যেগুলোকে ঢ়ৎড়সড়ঃরাব, ঢ়ৎবাবহঃরাব, পঁৎধঃরাব ধহফ ৎবযধনরষরঃধঃরাব খাত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্তর হিসেবে এগুলোকে ঢ়ৎরসধৎু, ংবপড়হফধৎু এবং ঃবৎঃরধৎু বলে বিভাজন করা যায়। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা মূলত পঁৎধঃরাব দিকটিতেই দৃষ্টি দেয় এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঢ়ৎবাবহঃরাব প্রচেষ্টাও চলে। সে কারণে আমাদের স্বাস্থ্যনীতি যথাযথভাবে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে একটি যড়ষরংঃরপ অবস্থান গ্রহণ করে কি-না, সে সম্পর্কে প্রশ্ন থেকে যায়! তদুপরি আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় এলোপেথিক চিকিৎসার প্রাধান্য লক্ষ্যণীয়। যেটি তথ্য হিসেবে কেবলমাত্র ১৬ ভাগ অসুস্থ ব্যক্তি গ্রহণ করে থাকে। এখানে ঃৎধফরঃরড়হধষ চিকিৎসা পদ্ধতি বা বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতির যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কি-না সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ। সবার জন্য স্বাস্থ্য-এ বিষয়টি ১৯৭৮ সাল থেকে উচ্চারিত হলেও এজন্য যে জাতীয় স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, অবকাঠামো, প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন সেটি লক্ষ্য করা যায় না। ফলে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী অর্থাৎ হতদরিদ্র, দরিদ্র ও দারিদ্র্যের হুমকিগ্রস্থ মানুষের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা অনুপস্থিত। এখানে স্মরণীয় যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনার জন্য যে বিভাগটি আছে তার সাথে স্বাস্থ্য বিভাগের যথেষ্ট সমন্বয় ঘটে না। এছাড়াও স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহীতাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। অন্যদিকে ঔষধ উৎপাদনকারী দেশী-বিদেশী সংস্থার বিভিন্ন প্রভাব স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তীব্রভাবে পরিলক্ষিত হয় বলেও তিনি এ সময় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, একটি নীতির বাস্তবায়নে যে চারটি দিক বিবেচ্য রহভড়ৎসধঃরড়হ, ঃবপযহড়ষড়মু, যঁসধহ ধমবহঃ ধহফ ড়ৎমধহরুধঃরড়হ। এই চারটি বিষয়ই ঢ়ৎরসধৎু, ংবপড়হফধৎু ধহফ ঃবৎঃরধৎু ক্ষেত্রে যথাযথভাবে বিবেচনা নিতে হবে। ঢ়ৎরসধৎু চিকিৎসায় যথার্থ সাফল্য ংবপড়হফধৎু ও ঃবৎঃরধৎু লেভেলে চিকিৎসা সেবার প্রয়োজনীয়তা সীমিত করে আনে। এ কারণে একটি সমন্বিত, কার্যকর এবং বহুখাত সমর্থিত স্বাস্থ্যসেবা দানের প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রয়োজন আছে। যেহেতু স্বাস্থ্যসেবা একটি বহুধা বিভক্ত কর্মের ওপরে নির্ভরশীল সেইজন্য এ খাতের স্বার্থকতার জন্য পারস্পরিক সহায়তা ও সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। সুশাসনের জন্য এই বিভিন্ন দিকটি আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন। স্মরণ রাখতে হবে সেই উক্তি যে, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষেরাই সুস্থ মনের অধিকারী হন এবং সার্বিক উৎপাদন ও উন্নয়নে অবদান রাখেন। আমাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য আমাদের ধারণা আলমা-আটা ঘোষণার যে দশটি ধারায় কিঞ্চিতধিক দুই পৃষ্ঠায় যে কথাগুলো উল্লেখিত হয়েছে তার বাংলাদেশি প্রেক্ষিত রচনাই আমাদের একটি সুষ্ঠু স্বাস্থ্যনীতি দিতে পারে। যেটি সবার জন্য স্বাস্থ্য, দরিদ্রের জন্য স্বাস্থ্য, অসহায়ের জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

জাতীয় অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম বলেন, একসময় আমাদের দেশে ঔষধ নীতি প্রশংসিত হয়েছিল কিন্তু আমাদের দেশে ঔষধ নীতিটা ভেস্তে গেছে। বিকল্প চিকিৎসা ও গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আমাদের এখানে বিকল্প চিকিৎসার একটা জায়গা আছে। তিনি বলেন, সব চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সমন্বিত করতে হবে। সততা এবং আন্তরিকতা না থাকলে কখনোই ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে না। ডাক্তারদের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এর পরিবর্তন প্রয়োজন এবং ডাক্তারদের ফিস্ নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। এজন্য তিনি একটি ফিক্সেশন কমিটি গঠন করাসহ এসেনশিয়াল ড্রাগ লিস্ট ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ভিজিলেন্স টিম গঠনের ব্যাপারেও পরামর্শ দেন।

সেবাগ্রহীতা বা পাবলিক সাইড এবং অন্যদিকে গভমেন্ট সাইড এই দু’টো সাইডের মধ্যে গ্যাপ যত কমবে ততই মঙ্গল উল্লেখ করে আইসিডিডিআরবি’র সিনিয়র সাইনটিস্ট ড. এসকে রয় বলেন, পঁৎধঃরাব খাতে খরচ বাড়িয়ে লাভ নেই বরং ঢ়ৎবাবহঃরড়হ-এ টাকা খরচ করলে পঁৎধঃরাব খাতে খরচ কমে যাবে। তিনি বলেন, সম্পূর্ণভাবে আমাদের ঢ়ৎবাবহঃরাব হেলথ ও পুষ্টি ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে, যাতে ইনফেকশন ডিজিজগুলো না হয়। এছাড়া তিনি প্রত্যেক ইউনিয়নে তথ্য বোর্ড স্থাপন, সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহে সরকারি জনবলের মান ও দক্ষতা বাড়ানো, তাদের কর্মে নিবিষ্টতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা, বছরে অন্তত একবার রিপোর্ট প্রকাশ করা, ১ জন ডাক্তারের বিপরীতে তিন জন নার্স পদ্ধতি চালু করা, স্বাস্থ্যের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এবং সাবেক আইজিপি ও সুজনে’র নির্বাহি সদস্য জনাব এএসএম শাহজাহান বলেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুচিকিৎসার জন্য একটি সুষ্ঠু স্বাস্থ্যনীতি বহুলাংশে সহায়ক হবে। কিন্তু পলিটিসাইজেশন থাকলে কোনো অবস্থাতেই স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর হতে পারবে না। তাই এক্ষেত্রে ডিপলিটিসাইজেশন করাটা জরুরি।

বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, স্বাস্থ্য নীতি, শিক্ষা নীতি এইসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাজনীতি বহির্ভুত কোনো বিষয় নয়। সরকারের দিনবদলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দিনবদলের সাথে সুশাসন ও উন্নয়ন জড়িত। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই স্বাস্থ্যের বিষয়টি এক্ষেত্রে অতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে আধমরা মানুষ দিয়ে উন্নয়ন হবে না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যে ধরনের অরাজকতা চলছে তার জন্য সকলে মিলে দাবি তোলারও আহ্বান জানান তিনি। কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুজ জাহের বলেন, পলিটিসাইজেশন অব ডক্টরস। এটা আমাদের দেশে সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক, এটা বন্ধ করতে হবে। কোনো হাসপাতালে রোগী মারা গেলে যদি অবহেলায় বা অপচিকিৎসা কারণে মারা যায় তাহলে তা দেখার জন্য একটা আন্তর্জাতিক নীতিমালা আছে, কিন্তু আমাদের দেশে তার প্রয়োগ নেই। এ ব্যাপারে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা হওয়া ও শাস্তির ব্যবস্থা রাখা দরকার। আদ্দ্বীন মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ জনাব আবু আহমেদ আশরাফ আলী বলেন, বাংলাদেশে চিকিৎসার যে সকল প্রসিডিউর হয় যারা এফোর্ড করতে পারেন তারা এখানেই করালে এডভান্স প্রযুক্তির ক্ষেত্র উন্নত হয়ে উঠতে পারে। আমাদের সাধারণ চিকিৎসা ও একইসাথে এনভান্স চিকিৎসার দিকেও সমান গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

একটা ভালো কিছু করার জন্য নীতি, ভালো প্রতিষ্ঠান, ভালো মানুষ এবং ভালো আচরণ প্রয়োজন উল্লেখ করে ‘সুজন’ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা যদি ভালো আচরণ না করি তাহলে অন্য বিষয়গুলো থাকলেও সেগুলো ধ্বংস হবে। এ সময় তিনি কয়েকটি অপচিকিৎসা ও অবহেলাজনিত মৃত্যুর চাক্ষুস উদাহরণ তুলে ধরেন। জনগণের কাছে এ ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আরো অনেক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, যারা এই পেশায় আছেন বা এর সাথে সংশ্লিষ্ট তাদেরকেই এ বিষয়গুলি নিয়ে সোচ্চার হতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে নাম ও পদবীর যথেচ্ছা ব্যবহারের চর্চার পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

দেশের প্রতিটি বিভাগে ড্রাগ এডিমিনিস্ট্রেশনের শাখা প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে বিশিষ্ট রাজনীতিক জনাব সরদার আমজাদ হোসেন বলেন, সর্বত্র আজ হারবাল ট্রিটমেন্ট জেগে উঠেছে এর জন্যও সেপারেট ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন করা দরকার। দরিদ্রদের নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে চালু করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ১০ পার্সেন্ট রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রয়োগিক দিকটি বিবেচনায় নিয়ে আসা জরুরি। একটি স্বাস্থ্যনীতি আসলেই আমাদের খুব দরকার উল্লেখ করে নিপোর্ট-এর উপপরিচালক ডাঃ আবদুল ওহাব হাওলাদার ইউনিয়ন থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত একটি জবাবদিহি প্যানেল প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানান।

সরকারী রাজেন্দ্র কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক কামাল আতাউর রহমান স্থানীয় পর্যায়ে তথা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডাক্তারদের উপস্থিতি, ডাক্তারদের ফি, টেস্ট, সরকারি হাসপাতালে ঔষধ না থাকাসহ নানা ধরনের সমস্যার চিত্র তুলে ধরে বলেন, স্বাস্থ্যনীতিতে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের জন্য একটি নৈতিক শিক্ষার পাঠ সন্নিবেশিত হওয়া আব্যশক। তিনি বলেন, তাহলে তাদের জন্য সমাজের বা রাষ্ট্রের কত টাকা খরচ হচ্ছে তা তারা অনুধাবণ করতে পারতেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জনাব ম. হামিদ বলেন, স্বাস্থ্যের নৃতত্ত্ব এবং সমাজতত্ব স্বাস্থ্যনীতির অংশ কারণ এটা টোট্যাল লাইফ সাইক্যালের জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া তিনি হাইজিনের শিক্ষাটা প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে রাখা প্রয়োজন বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন। হোমিও চিকিৎসক ও সাইন্স ল্যাবরেটরির প্রতিনিধি মিস সুরাইয়া বলেন, হোমিও চিকিৎসাকে টিকিয়ে রাখতে হলে, এটি আসলেও বিজ্ঞানসম্মত কি-না এবং এটা চিকিৎসার মধ্যে পড়ে কি-না এজন্য প্রচার-প্রচারণা চালানোর ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট-এর প্রতিনিধি জনাব নাজমুল করিম সবুজ বলেন, স্বাস্থ্যনীতি কারা তৈরি করছেন সেটি জনগণ জানে না, কারণ নীতিতে কোনো তালিকা সন্নিবেশিত হয় নি। এছাড়া সাধারণ জনগণের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে নীতিটি প্রণীত হয় নি বিধায় জনগণের অনেক সমস্যা সেখানে অনুপস্থিত – তাই নীতির প্রসেসেই এখনো সমস্যা রয়ে গেছে, যা দূর করা প্রয়োজন। ডিএফআইডি’র সিঁড়ি প্রকল্পের প্রতিনিধি জনাব সানজান হক বলেন, অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত তাই সবার আগে তাদের দিকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

Advertisements