‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ও সংসদের মেয়াদ’ শীর্ষক সুজনে’র গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত

Roundtable-SHUJAN-039.jpg- গত ৭ জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ও সংসদের মেয়াদ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ‘সুজন’ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। সুজনে’র সহ-সভাপতি জনাব এম হাফিজউদ্দিন খানের সঞ্চালনায় এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও জাতিসংঘে কর্মরত প্রফেসর নজরুল ইসলাম।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে প্রফেসর নজরুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার প্রায় চল্লিশ বছর পর বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখনও অস্থিতিশীল। সংসদ বহুলাংশে অকার্যকর। এ পরিস্থিতির অবসান হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র স্থিতিশীল করার মানসে, সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে চার বছরে হ্রাস ও বর্তমান ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের একক বিজয়’-র স্থলে ‘আনুপাতিক হারে’ আসন বণ্টনের পদ্ধতির প্রবর্তন করার প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি এর পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তিসমূহ তুলে ধরে বলেন, এই দাবির বিষয়ে কোনো মতভেদ হওয়ার সুযোগ নেই। এসব ব্যবস্থা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত উপযোগী হবে। সামগ্রীক বিচারে সরকারের মেয়াদ হ্রাস বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য কল্যাণকর। এই সরকার পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছে তাই মেয়াদ হ্রাসের এই প্রস্তাব বর্তমান সরকারের জন্য প্রযোজ্য নয় বলেও এ সময় তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সরকার ও বিরোধী দল উভয়ে সম্মত হলে আগামী নির্বাচনের আগেই মেয়াদ হ্রাস সম্বলিত সাংবিধানিক সংশোধনী পাশ করা যেতে পারে, যাতে পরবর্তী সরকার চার বছর মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হতে পারে।

সরকারের মেয়াদ চার বছর হওয়া উচিত কি-না এ নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের প্রশ্ন তুলে ধরে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, সাধারণভাবে তাঁর প্রশ্নটি নিয়ে তেমন আলোচনা হচ্ছে না। এটি নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা হওয়া উচিত। সুজনে’র এখন পর্যন্ত এ দু’টি বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট অবস্থান নেই কিন্তু বিষয় দু’টো গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, আনুপাতিক হারে আসন বণ্টনের বিষয়টি নিয়ে প্রথম যখন ড. কামাল হোসেন প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন সে সময়েও বিষয়টি নিয়ে তেমন আলোচনা হয় নি। দেশব্যপী এটা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, সংবিধানের নানান বিষয় আছে তার মধ্যে অনেক বৈপরিত্য আছে, নানান প্রশ্ন আছে যেগুলো বিবেচনা করে সংবিধান পরিবর্তন ও পরিমার্জন করা উচিত। তিনি বলেন, এটা কেবল ৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাবার বিষয় নয়। সংবিধানের সার্বিক সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হলে একটা ‘কনস্টিটিউশনাল কমিশন’ গঠন করা দরকার বলেও এ সময় তিনি পরামর্শ দেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কমিশনের আলোচনা জনসমক্ষে করে তারপরে সংসদে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানের পার্লামেন্ট কি ইনক্লুসিভ? জনগণের ক্ষমতায়ন কি বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতিতে নিশ্চিত হচ্ছে ইত্যাদি প্রশ্ন উত্থাপন করে তিনি আরো বলেন, জনগণের ক্ষমতায়ন আমাদের সব ব্যবস্থার মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া আবশ্যক। এ সময় তিনি বর্তমান সিস্টেমকে ব্রিটিশ সরকারের একটি ইমপোজ সিস্টেম বলেও মত দেন। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে এ সময় তিনি আরো বলেন, এটার জন্য কোন ব্যবস্থা কার্যকর হবে সেটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে, প্রয়োজনে সংসদেও আলোচনা হওয়া উচিত।

জনাব এম হাফিজউদ্দিন খান চার বছর মেয়াদ এবং আনুপাতিক হারে আসন বণ্টনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, এগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। সময়ের সাথে সাথে অনেককিছুরই পরিবর্তন হয়েছে, তাই শুধু ৭২ এর সংবিধানে ফিরে গেলেই সবকিছুর সমাধান হবে না। তিনি বলেন, এ বিষয়গুলো জোরে সোরে বলা দরকার। ১৯৪৭ সাল থেকেই গণতন্ত্রের সুস্থ ধারা আমাদের দেশে গড়ে উঠতে পারে নি, এর প্রধান কারণ হলো আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব উল্লেখ করে গবেষক ও লেখক ড. গোলাম মুরশিদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্বকরণ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হলে আমাদের দেশে জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনেকটাই প্রতিফলিত হবে। অনেক অবাঞ্ছিত দলের প্রতিনিধিও আমরা দেখতে পাব, কিন্তু সেটাই তো গণতন্ত্র। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসারে তাদের মতের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা উচিত। আমাদের দেশে গণতন্ত্র নেই, আছে দলীয় শাসন উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, যে দেশে হাকিম নড়লে পরেই হুকুম নড়ে, সে দেশে সরকারের মেয়াদ একটু দীর্ঘ হওয়াই উচিত। যদিও চার বছর মেয়াদের পক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছে। প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমাদের দেশে অনেক সংস্কারের চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু আমরা গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে পারছি না। তিনি বলেন, সংসদের মেয়াদ হ্রাস এটা একটা অবাস্তব জিনিস হতে পারে। কারণ বর্তমানে যারা আছে তারা রাজী হবে না এবং যারা ক্ষমতায় নেই তারা হয়তো-বা চাইবেন। তিনি বলেন, বাস্তব এবং আকাক্সিক্ষত অবস্থা বিবেচনা করে মনে হয় পাঁচ বছর ঠিকই আছে। আনুপাতিক হারে আসন বণ্টনের ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা বিশেষ সুবিবেচনার দাবি রাখে। দু’টো দলই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করবেন বলেও এ সময় তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।

প্রস্তাবনা দু’টিকে এ মুহূর্তের মূখ্য আলোচনার কোনো এজেন্ডা নয় হিসেবে অভিহিত করে রাজনীতিবিদ জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এগুলো কেবল থিউরিটিক্যাল প্রপোজ্যাল হিসেবেই বিবেচনার দাবি রাখে কিন্তু প্রাকটিক্যালি অনেক সমস্যা আছে। এগুলোকে ভালোভাবে  বাস্তবায়ন করা গেলে আমরা একটা মানসম্মত সংসদ পাবো এ কথা সত্যি এটা স্বীকার করে তিনি আপাতত এগুলোকে  চিন্তার পর্যায়ে রাখার ব্যাপারেই মত দেন। এ প্রসঙ্গে তিনি রাজনৈতিক দলের কালচারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়নের ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র থাকবে না এটা একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি না উল্লেখ করে বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ জনাব জয়নাল আবেদীন ফারুক বলেন, সংসদের মেয়াদ কমিয়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। সংসদের মেয়াদ কমানো উচিত না। আমাদের দরকার গণতন্ত্রের প্রতি সততা ও বিশ্বাস।

সকল পর্যায়ে মানসিকতার বদলের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, শুধু এক সিস্টেম থেকে আরেক সিস্টেমে গিয়ে বা সংবিধান সংশোধন করে খুব একটা লাভ হবে না। তিনি বলেন, আমরা যা কিছুই করি না কেন সবকিছুতে সংবিধানের মূল সুর জনগণের ক্ষমতায়ন ও দায়বদ্ধতার দিকে কতটুকু দৃষ্টি দেয়া হচ্ছে তা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য দলকে সম্পূর্ণ প্রাধান্য দেয়া হলে এটা কলা গাছে ভোট দেবার চাইতেও বিপদজ্জনক হয়ে যেতে পারে এবং ওয়ান ওয়ে কনস্টিটিউয়েন্সি কনসেপ্ট বাংলাদেশের জন্য উপেযোগী হবে না বলেও এ সময় তিনি মত দেন। ‘সুজন’ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমাদের সবচেয়ে ঝুঁকি হলো নেতা-নেত্রীদের একনায়কতন্ত্র এবং দলগুলোর সিণ্ডিকেটসূলভ আচরণ Ñ এগুলোর সংস্কার আবশ্যক, দলের মধ্যেই সংস্কার জরুরি। তিনি বলেন, এটা না হলে কোনো ব্যবস্থাই কার্যকারিতা পাবে না। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের অনেক ঝুঁকি আছে কিন্তু এটা নিয়ে গভীরভাবে আমাদেরকে ভাবতে হবে বলেও এ সময় তিনি মন্তব্য করেন। বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যেই গণতন্ত্রকে সুসংহত করা সম্ভব, হঠাৎ করেই অন্য ব্যবস্থা আনা ঠিক হবে না উল্লেখ করে গবেষক ও কলামিস্ট জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, যে সকল ত্র“টিগুলো আছে সেগুলো দূর করার জন্য সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি বাংলাদেশের জন্য উপযোগী পদ্ধতি হতে পারে, তাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন দলের পক্ষ থেকে রাজনীতিবিদ জনাব রুহিন হোসেন প্রিন্স এ বক্তব্য উত্থাপন করে বলেন, প্রকৃত গণতন্ত্রের স্বাদ পেতে হলে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদসমূহকে আগে বিকেন্দ্রিভূত জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, এগুলোকে আগে স্বশাসিতরূপে নিয়ে আসতে হবে। তাহলেই সংসদকে আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরে এ সময় তিনি আরো বলেন, এ পদ্ধতিতে অবশ্যই প্রত্যাহারে ব্যবস্থা থাকতে হবে, আর এটা কঠিন মনে হলে প্রথমে ১৫০ আসন করে ধীরে ধীরে একটা চর্চায় নিয়ে আসা যেতে পারে। ৩০০ আসন পূর্ণ করা অসম্ভব নয় বলেও এ সময় তিনি মত প্রকাশ করেন।

গোলটেবিল আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন, জনাব কামরুল হাসান খান প্রফেসর কামাল আতাউর রহমান, জনাব শাহাজাহান ভূঁইয়া প্রমুখ। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জনাব ম. হামিদ, জনাব সেলিমা মসির, জনাব আব্দুল হকসহ আরো অনেকেই এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

Advertisements