সুশাসন: আজ জাতীয় ঐক্য জরুরি

samakal_logo

বদিউল আলম মজুমদার

ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, বৈষম্যহীন একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সৃষ্টি করা আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার। এ লক্ষ্যেই ১৯৭১ সালে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন এবং অনেকে প্রাণও দিয়েছেন। আমাদের সংবিধানেও এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী : ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’

প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম তথা পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উত্তরণের লক্ষ্যে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ অর্থাৎ গণতন্ত্রের ভিত গভীরে প্রোথিত করার উদ্দেশ্যে ‘স্থানীয় শাসন’ পরিচালনা করার মতো একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলাও আমাদের সুস্পষ্ট সাংবিধানিক অঙ্গীকার। আর একটি শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সম্পদ, ক্ষমতা ও দায়দায়িত্বের বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে অপরিহার্য এবং বিকেন্দ্রীকরণ না হলে তৃণমূলের জনগোষ্ঠীর জন্য একটি দারিদ্র্যমুক্ত, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করাও অসম্ভব। উল্লেখ্য, সব বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান এবং জনগণের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি সাধনের অঙ্গীকারও আমাদের সংবিধানে করা হয়েছে (অনুচ্ছেদ ১৫ ও ১৯)।

গণতন্ত্র হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নাগরিকদের পক্ষে এবং স্বার্থে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। এ ব্যবস্থায় নাগরিকদের সম্মতির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আরও প্রতিষ্ঠিত হয় তাদের কতগুলো অধিকার, যার মধ্যে সমতা, সমসুযোগ ও ন্যায়পরায়ণতার অধিকার অন্যতম। নাগরিকের সম্মতির শাসনের সঙ্গে অধিকার অর্জিত হলেই উদারনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই নাগরিকের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যও একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অপরিহার্য।

এটি সুস্পষ্ট যে, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে হলে সর্বস্তরে নির্বাচন অপরিহার্য। বস্তুত নির্বাচন দ্বারা গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের সূচনা হয়। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ‘ক্ষমতা’ হস্তান্তর করে। অন্যভাবে বলতে গেলে, নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরকার গঠন করে জনগণের স্বার্থে শাসনকার্য পরিচালনা করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।

কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ক্ষমতার অপপ্রয়োগের মাধ্যমে অতিসহজেই নাগরিকের অধিকার হরণ করতে পারেন। কিংবা ক্ষমতা জনকল্যাণের পরিবর্তে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করতে পারেন। ক্ষমতা কুক্ষিগত করা একটি প্রায় সর্বজনীন মানবিক দুর্বলতা, তাই ক্ষমতার এমন অপব্যবহার হওয়াই স্বাভাবিক। এ কারণে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য ক্ষমতার ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ’ সৃষ্টি করা আবশ্যক। শাসকদের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা বা দায়বদ্ধতা সৃষ্টির মাধ্যমেই এ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

বহু শতাব্দীর অভিজ্ঞতার আলোকে ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘ক্ষমতার বিভাজন নীতি’র (principles of separation of powers) উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ নীতি অনুসরণের ফলে সরকারের তিনটি অপরিহার্য অর্গান বা অঙ্গের_ প্রশাসন, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে এক ধরনের ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস’ বা ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। যেসব রাষ্ট্রে এ ভারসাম্য যত বেশি কার্যকর, সেসব দেশে নাগরিকদের অধিকার তত বেশি সমুন্নত থাকে। গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা তত বেশি কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভারসাম্য সৃষ্টি করে ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজন একটি যথার্থ আইনি কাঠামো। আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য আরও প্রয়োজন কতগুলো প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানগুলো হতে পারে সরকারি কিংবা বেসরকারি। একটি যুগোপযোগী আইনি কাঠামো এবং একগুচ্ছ শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় (consolidate) হয় এবং তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ (institutionalise) লাভ করে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কতগুলো থাকে সংবিধান সৃষ্ট বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। আর কতগুলো থাকে সংসদ কর্তৃক আইন দ্বারা সৃষ্ট প্রতিষ্ঠান। আমাদের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো : জাতীয় সংসদ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং ন্যায়পাল। সংসদের আইন দ্বারা সৃষ্টি অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো : দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশন। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার ওপরই আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত ও গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগে দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আরও দুটি প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি হলো রাজনৈতিক দল, অন্যটি সুশীল বা নাগরিক সমাজ। রাজনৈতিক দল সৃষ্টি হয় কোনো সুনর্িিদষ্ট আদর্শ বা কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। সে আদর্শ বা কর্মসূচিকে সামনে রেখেই রাজনৈতিক দল নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে এবং তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নির্বাচনে প্রার্থী দেয়। তাই নির্বাচনী ইশতেহার ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার এবং দলের টিকিট নিয়ে নির্বাচিত হয়ে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তাদের ওপর সে অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায় বর্তায়। আর সরকার সে দায়িত্ব যথাযথ ও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করল কি-না তা দেখার দায়িত্ব ক্ষমতাসীন দলের। এমনিভাবে গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল অতিগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে, যার উদাহরণ আমরা বর্তমানে দেখতে পাই প্রতিবেশী ভারতে।

সচেতন ও সংগঠিত নাগরিক সমাজও সরকারি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ রোধ করে গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অতি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। সরকারেরই একমাত্র আইনগতভাবে বলপ্রয়োগের ক্ষমতা (coercive) এবং সামর্থ্যের (যেমন_ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে) অধিকারী। বলপ্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহার করে যাতে সরকার নাগরিকের অধিকার অন্যায়ভাবে হরণ করতে না পারে তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নাগরিক সমাজের সোচ্চার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত নাগরিকের ন্যায় ও সত্যের পক্ষে সোচ্চার এবং প্রতিবাদী ভূমিকা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপরও চাপ সৃষ্টি এবং সেগুলোকে কার্যকর হতে সহায়তা করে। অর্থাৎ সিভিল সোসাইটির ভূমিকা হলো সরকার (এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর) আচরণকে সিভিল বা ভদ্রোচিত অর্থাৎ জনকল্যাণমুখী রাখা। তাই যে দেশে নাগরিক সমাজ যত বেশি সক্রিয়, সোচ্চার, প্রতিবাদী ও সংগঠিত সে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তত বেশি কার্যকর। এ ক্ষেত্রেও ভারতের উদাহরণ প্রাসঙ্গিক।

গণতন্ত্রকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান হলো স্থানীয় সরকার, যা জনগণের দোরগোড়ার সরকার_ এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসন পরিপূর্ণতা লাভ করে। এছাড়াও শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতা, সম্পদ ও দায়দায়িত্বের বিকেন্দ্রীকরণের ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা ও কার্যপরিধি এবং সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ সঙ্কুচিত হয়। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সম্পদের অপচয়ের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। কারণ অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, সম্পদ, ক্ষমতা ও দায়দায়িত্ব যত বেশি জনগণের দোরগোড়ার সরকারের কাছে পৌছে, তত বেশি তাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তা জনগণের অধিক কল্যাণে আসে। তাই একটি বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচির আলোকে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদিকে যেমন সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত এবং গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা অর্জনের পথ সুপ্রশস্ত হয়, একইসঙ্গে জনগণের জন্য একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ভবিষ্যৎ সৃষ্টির পথও সুগম হয়।

নির্বাচনের ভিত্তিতে সরকারের প্রাপ্ত ক্ষমতার ওপর কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার লক্ষ্যে যে আইনি কাঠামো প্রয়োজন, তা আমাদের দেশে বহুলাংশে অনুপস্থিত। আমাদের আইন ও বিধিবিধানগুলো অনেক ক্ষেত্রেই মান্ধাতা আমলের এবং এগুলো যুগোপযোগী নয়। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা ঔপনিবেশিক শাসকদের সে সময়কার প্রেক্ষাপটে প্রণীত আইন এখনও ব্যবহার করছি। যুগের পরিবর্তন এবং প্রেক্ষাপট বদল হওয়া সত্ত্বেও আমরা অনেক ক্ষেত্রেই নতুন আইন প্রণয়ন বা আইনের যথার্থ পরিবর্তন-পরিবর্ধন করতে ব্যর্থ হয়েছি।

গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও আমাদের দেশে কার্যকর নয়। বস্তুত স্বাধীনতা-পরবর্তী ৩৮ বছরে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানই কার্যকারিতা হারিয়েছে এবং দিন দিন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। যেমন_ একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বর্জনের সংস্কৃতি এবং সংসদ সদস্যদের অনেকের দায়বদ্ধতাহীন আচরণের ফলে আমাদের জাতীয় সংসদ এখনও একটি ‘স্বাধীন’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে পারছে না। সর্বোপরি সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর ওপর এককভাবে ন্যস্ত হওয়ার [অনুচ্ছেদ ৫৫(২)] এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে মন্ত্রিসভা যৌথভাবে জাতীয় সংসদের কাছে দায়বদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে বাস্তবে সংসদ সদস্যদেরই প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহিতা করতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছানুসারেই তাদের চলতে হয়।

বিশেষত গত দু’দশকের নগ্ন দলীয়করণের কারণে উচ্চ আদালতে যে ‘প্রলয়’ ঘটে গেছে, তা আমাদের বিচার বিভাগকেও বহুলাংশে অকার্যকর করে ফেলেছে। অনেক বিচারকেরই দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতা আজ দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। বস্তুত বিচার বিভাগ আজ চরমভাবে জনগণের আস্থাহীনতায় ভুগছে এবং গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। আমাদের সংবিধানে ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান (অনুচ্ছেদ ৭৭) থাকলেও, স্বাধীনতার ৩৮ বছর পরও আজ পর্যন্ত সে নিয়োগ প্রদান করা হয়নি।

সত্যিকারের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অপরিহার্য। আর এ লক্ষ্যে সংবিধানে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন সৃষ্টির বিধান রাখা হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের নির্বাচন কমিশন বারবার দলীয়করণের শিকার হয়েছে এবং তা করা হয়েছে পাতানো নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে। পাতানো নির্বাচন রোধের লক্ষ্যে একটি অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ১৯৯৬ সালে আমাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু গত সরকারের আমলে এ ব্যবস্থাকেও নগ্নভাবে ম্যানিপুলেট করা হয়েছে। আমাদের অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও দলীয়করণের থাবা এড়াতে পারেনি।

মোটামুটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা বারবার হলেও যথাযথ আইনি কাঠামোর অভাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে স্বাধীনতার ৩৮ বছর পরও আমাদের দেশে গণতন্ত্রের ভিত একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারেনি এবং তা সুদৃঢ় হয়নি। একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকার কাঠামোর অনুপস্থিতিতে গণতান্ত্রিক উত্তরণ পরিপূর্ণতা লাভ করেনি এবং এর শিকড়ও গভীরে যায়নি। তাই সামান্য ঝড়-ঝাপটাতেই আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বারবার ভেঙে পড়েছে, যা শেষবারের মতো ঘটেছে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। দুর্ভাগ্যবশত নগ্ন দলবাজি ও ফায়দাবাজির চর্চা এবং বিভিন্ন সময় সরকারের অসহিষ্ণু আচরণের কারণে নাগরিক সমাজও দলীয়ভাবে অনেকদিন থেকেই বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং গণতান্ত্রিক শাসনকে সুদৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করাতে যথাযথ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর ও সুদৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে তাই একটি যথার্থ আইনি কাঠামো ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা বর্তমানে অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হলেই একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তবে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে আরও প্রয়োজন হবে আমাদের উন্নয়ন কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, যাতে জনগণের নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যের বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্রীয় সব সম্পদ ও সুযোগে তাদের বিশেষত নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তাদের প্রতি সব বঞ্চনার অবসান ঘটে। আর এসব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন একটি বলিষ্ঠ সংস্কার কর্মসূচি এবং একটি ব্যতিক্রমী উন্নয়ন কৌশল। এমন একটি কর্মসূচি এবং কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতিকে সামনের দিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আজ জাতীয় ঐক্য অতি জরুরি।
-ড. বদিউল আলম মজুমদার : সাধারণ সম্পাদক, সুজন- সুশাসনের জন্য নাগরিক

সূত্র: সমকাল, ৩ মার্চ, ২০১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s