গণতন্ত্র: সংসদীয় কমিটি স্বাধীনভাবে কাজ করুক

samakal_logo

বদিউল আলম মজুমদার

গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, সংসদীয় কমিটির কর্মকাণ্ডে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ (আমাদের সময়, ১৪ মার্চ, ২০১০)। মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন, মন্ত্রীদের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোসহ সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার কারণে প্রধানমন্ত্রী একাধিক সংসদীয় কমিটির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছেন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির ওপর। উপরোক্ত রিপোর্ট থেকে আরও জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের সঙ্গে বসবেন এবং তাদের দিকনির্দেশনা দেবেন। উল্লেখ্য, সপ্তম সংসদের পরিবেশ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত কমিটির পক্ষ থেকে তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার পর সব সংসদীয় কমিটির সভাপতিকে নিয়ে এমনই একটি সভা করেছিলেন তিনি।

সংবাদপত্রের উপরোক্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির এক সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কারের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। কমিটি-মন্ত্রী দ্বন্দ্বের বিষয়টি নিয়ে কমিটির সভাপতির সঙ্গে আলাপ করেও প্রধানমন্ত্রী সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি পুরো সংসদীয় কমিটির সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠকে বসবেন বলে সভাপতিকে জানিয়েছেন। সরকার ও দলীয় প্রধান হিসেবে নিঃসন্দেহে যে কোনো সংসদ সদস্য বা সংসদীয় কমিটির সঙ্গে বৈঠক করার এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে, তবে সংসদকে সত্যিকারার্থে কার্যকর করতে হলে সংসদীয় কমিটিগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কারোর পক্ষেই কমিটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা যুক্তিযুক্ত হবে না। কারণ তাহলে সংসদ কার্যকর হবে না।

মোটা দাগে চারটি কাজ জাতীয় সংসদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। প্রথমত, আইন প্রণয়ন করা। দ্বিতীয়ত, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠান। তৃতীয়ত, সরকারের আয়-ব্যয় ও বাজেট অনুমোদন। চতুর্থত, সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এ কাজগুলো যথাযথভাবে সম্পাদন করলেই সংসদকে কার্যকর বলা যায়। সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের উপস্থিতিতে তুমুল বিতর্ক হলে সংসদ প্রাণবন্ত ও বিনোদনমূলক হতে পারে, কিন্তু কার্যকর হবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ প্রাণবন্ত ও কার্যকর হওয়া এক কথা নয়।

দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের জাতীয় সংসদ ঐতিহাসিকভাবেই তার দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করেনি। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমাদের সংসদ বহুলাংশে রাবার-স্ট্যাম্পিং বডি হিসেবেই কাজ করে। গঠনমূলক ও প্রজ্ঞাশীল বিতর্কের পরিবর্তে আমাদের সংসদ সদস্যরা নেতা-নেত্রীদের গুণগান এবং পরস্পরকে গালাগাল করতেই সম্ভবত বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে আলোচনা হয় না বললেই চলে। উদাহরণস্বরূপ, গত দুই দশকে ১০ হাজার মুলতবি প্রস্তাবের মধ্যে মাত্র চারটি, তাও ১৯৯১-৯৬ সালের পঞ্চম সংসদে আলোচিত হয়েছিল। বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার জীবনের ওপর হামলা, বিডিআর বিদ্রোহ ইত্যাদি অতি জরুরি বিষয় নিয়েও আমাদের সংসদে আলোচনা হয়নি (প্রথম আলো, ১৯ মার্চ, ২০১০)।

সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে অতীতের কোনো সংসদই তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেনি, যদিও এটি সংসদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অতীতে স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলোও যথাসময়ে গঠিত হয়নি, এমনকি মন্ত্রীদের কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল, যা কমিটির প্রয়োজনীয়তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। এবারই প্রথমবারের মতো নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনে ৪৯টি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়, যার জন্য বর্তমান সরকার প্রশংসার দাবি রাখে। তবে অনেকগুলো সংসদীয় কমিটি তাদের ‘ওভার সাইট’ বা নিরীক্ষণের ভূমিকা পালনে প্রথম দিকে সচেষ্ট থাকলেও বর্তমানে তারা কিছুটা কোণঠাসা। আবার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে অনেকগুলো কমিটির বিরুদ্ধে গুরুতর প্রশ্নেরও উদ্রেক হয়েছে। এছাড়াও সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে পারে এমন বিষয় নিয়েও কমিটিগুলোর মাথাব্যথা নেই। যেমন_ ছাত্ররাজনীতির নামে শিক্ষাঙ্গনে বর্তমানে যে নৈরাজ্য বিরাজ করছে সে সম্পর্কে সরকারের দায়বদ্ধতা দাবি করার কোনো উদ্যোগই সংশ্লিষ্ট কমিটির পক্ষ থেকে পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

শুধু সংসদই নয়, পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার জন্যও সংসদীয় কমিটিগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর ক্ষমতা অর্পণ করেন। এ ক্ষমতা যাতে অযাচিতভাবে ব্যবহার করে তারা নাগরিকের অধিকার হরণ কিংবা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে না পারেন, সেজন্য ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক। আর এ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় একটি যথার্থ ও যুগোপযোগী আইনি কাঠামো এবং কতগুলো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জাতীয় সংসদ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সংসদীয় কমিটিগুলোর মাধ্যমেই সংসদ এ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতার ওপরই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা বহুলাংশে নির্ভরশীল।

আমাদের সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘মন্ত্রীসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন।’ অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদের সব সদস্য সাংবিধানিকভাবে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। আর সংসদীয় কমিটির মাধ্যমেই এ দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয়। তাই প্রধানমন্ত্রী কিংবা অন্য কারও পক্ষেই সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হবে সংবিধানের উপরোক্ত বিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার জন্যও সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যকারিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে দুর্নীতি একটি সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী সমস্যা। এ সমস্যা আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। এছাড়াও দুর্নীতির মাধ্যমে সমাজের প্রভাবশালীরা উপকৃত এবং সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই দুর্নীতি নির্মূল করা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অতি জরুরি। সংসদীয় কমিটিগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কর্মতৎপরতা প্রদর্শন করলেই দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব। তাই কমিটিগুলোকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।

কয়েকটি কমিটির সদস্যপদ নিয়ে ইতিমধ্যে কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৮৮(২) উপবিধি অনুযায়ী, ‘এমন কোনো সদস্য কমিটিতে নিযুক্ত হইবেন না, যাহার ব্যক্তিগত, আর্থিক ও প্রত্যক্ষ স্বার্থ কমিটিতে বিবেচিত হইতে পারে এমন বিষয়ের সহিত সংশ্লিষ্ট আছে।’ এ ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘এই উপবিধিতে সদস্যের স্বার্থ বলিতে প্রত্যক্ষ, ব্যক্তিগত বা আর্থিক স্বার্থ বুঝাইবে এবং এমন কোনো ব্যক্তি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হইবেন না, যাঁহার অন্তর্ভুক্তিতে আপত্তি রহিয়াছে এবং যাঁহার অন্তর্ভুক্তি সাধারণভাবে জনস্বার্থের অনুকূলে নয়, অথবা কোনো শ্রেণীবিশেষ অথবা উহার অংশের পরিপন্থী অথবা রাষ্ট্রীয় নীতি অনুযায়ী যাঁহার অন্তর্ভুক্তিতে আপত্তি রহিয়াছে।’ গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, কয়েকটি কমিটির সদস্যের বিরুদ্ধে স্বার্থের দ্বন্দ্বের অভিযোগ উঠেছে। আমরা আনন্দিত হতাম যদি আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখতেন।

এছাড়াও আমাদের কিছু সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৮ জন সংসদ সদস্য মিথ্যা হলফনামা দিয়ে রাজউক থেকে উত্তরায় প্লট নিয়েছেন, যদিও মিথ্যা হলফনামা দেওয়ার কারণে পরবর্তী সময়ে তাদের প্লট বরাদ্দ বাতিল হয়েছে বলে আমরা শুনেছি। মিথ্যা বলা নৈতিক স্খলনজনিত গুরুতর অপরাধ। হলফনামার মাধ্যমে মিথ্যা বলা দণ্ডনীয় অপরাধ। অনেকে মনে করেন, যারা মিথ্যা হলফনামা দিয়েছেন, তারা জনপ্রতিনিধি হওয়ার এবং মহান জাতীয় সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন। কারণ তারা আইনপ্রণেতা হয়ে আইন ভঙ্গ করেছেন। তাই আমরা আরও আনন্দিত হতাম সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে।

পরিশেষে, আমাদের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পথে একটি পর্বতপ্রমাণ বাধা। বস্তুত এ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদেরই প্রধানমন্ত্রীর কাছে দায়বদ্ধ করে ফেলেছে, যদিও সংসদীয় গণতন্ত্রে তার উল্টো হওয়ার কথা। তাই সংসদীয় কমিটিগুলোর পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করার পথে একটি বিরাট প্রতিবন্ধকতা এরই মধ্যে বিরাজমান। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কমিটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার যে কোনো চেষ্টা কমিটিগুলোকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে ফেলবে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশের পথে একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। কমিটিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেবেন বলে আশা করি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক
সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক

সূত্র: সমকাল, ২৫ মার্চ, ২০১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s