দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ, বর্তমান বাস্তবতা ও নাগরিক উদ্বেগ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত

দুর্নীতি আজ আমাদের সমাজে একটি সর্বগ্রাসী ও সর্বব্যাপী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্র্নীতি সমাজের সাধারণ মানুষদেরকে বঞ্চিত করছে – বস্তুত সমাজের উচুঁতলার মানুষদের ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি ক্ষুধার্ত ও দরিদ্র মানুষের পেটে লাথি মারার সমতূল্য। এ সমস্যা আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকেও ব্যাহত করছে। এ ধরনের একটি পরিস্থিতিতে সরকারের বর্তমান দুর্নীতি দমন কার্যক্রম পর্যালোচনা করা এবং এ ব্যাপারে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে গত ৬ এপ্রিল, ২০১০ ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। “দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ, বর্তমান বাস্তবতা ও নাগরিক উদ্বেগ”- শীর্ষক এই গোলটেবিল আলোচনাটির আয়োজন করে সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক।

দুর্নীতি হঠা করে আসেনি এটা দীর্ঘদিনের সমস্যা। তাই এটা হঠাৎ করেই এক বা দুই দিনে পরিবর্তন করে ফেলা সম্ভব হবে না, তবে গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব। আর এজন্য সকলকে সম্মিলিত প্রায়াস চালাতে হবে। এক্ষেত্রে দুদক অগ্রগামি ভূমিকা পালন করতে পারে উল্লেখ করে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুদকের মাননীয় চেয়ারম্যান জনাব গোলাম রহমান বলেন, দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার ব্যাপারে পলিটিক্যাল উইল রয়েছে, কিন্তু তা কার্যকরী করার মনোবৃত্তি নেই। কার্যকরী করার মনোবৃত্তি নিয়ে আসতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এজন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা, সঠিক ও কার্যকরী আইন এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা নিরসন করা আজ অত্যন্ত জরুরি। বিচারকগণের সহযোগিতা প্রার্থনা করে তিনি বলেন, দুদক মামলা করছে জনগণের পক্ষে। তাই যদি দ্রুত বিচারের রায় হয় তাহলে জনগণ সুবিচার পাবে। প্রধান দুই দলপ্রধানের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, আমার ধারণা দুর্নীতি নির্মুল করার ক্ষেত্রে তাদের সদিচ্ছার কোনো অভাব নেই। কিন্তু তারপরও তারা পারছেন না। কারণ এটা নির্ভর করছে রাজনৈতিক ধারার ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার ওপর। তিনি সংসদীয় কমিটির কথা তুলে ধরে বলেন, কমিটি তাদের ফাইন্ডিংগুলো দুদকে পাঠাচ্ছে এবং দুদক নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে তদন্ত করে সেগুলোর ওপর কাজ করছে। ফলে সংসদীয় কমিটির কাজ লোক দেখানো -এটা আমি মনে করি না। প্রধানমন্ত্রীর মামলা প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, দোষী কী নির্দোষ তা প্রমাণের জন্য তিনি বিচারিক আদালতে গিয়েছেন, তিনি হাইকোর্টের প্রতি আস্থা রাখছেন, ফলে তিনি যে দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রভাবিত করছেন না এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার যে অঙ্গীকার রয়েছে এটা তারই প্রমাণ। আইসিটির ব্যবহার ও ই-গর্ভানেন্স প্রতিষ্ঠা করলে দুর্নীতি অনেকটাই কমে যাবে বলেও এ সময় তিনি মন্তব্য করেন। এছাড়া জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া কোনো দুর্নীতি দমন প্রয়াস সফল হবে না উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

আমরা একটা দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চাই উল্লেখ করে সভাপতির বক্তব্যে ‘সুজন’ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নিজের প্রতিশ্র“তি আছে বলে আমরা মনে করি কিন্তু আমরা তাও দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হতে পারছি না-এজন্যই আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা এই অবস্থায় কেন পৌঁছালাম, কী করে পৌঁছালাম -নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই এই অবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখা প্রয়োজন। দুর্নীতির যে অবস্থান এটা আমাদের সমাজের অবক্ষয়েরই প্রকাশ উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, কেবলমাত্র আইন করে দুর্নীতির থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সক্রিয়তারও প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া তিনি রিফর্ম অফ পলিটিক্যাল প্রসেস এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, দুর্নীতি নির্মুলে এগুলো অত্যন্ত প্রয়োজন। এছাড়া তিনি অঙ্গীকার অনুসারে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীসহ ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী, প্রধান বিচারপতির খরচের বিবরণী পত্রিকায় প্রকাশের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপনের আহ্বান জানান। এমপিসহ যাঁরা সাংবিধানিক পদে আছেন তাঁদেরকেও একইসাথে এই প্রক্রিয়ায় সামিল হবার কথাও বলেন তিনি।

দুর্নীতি নির্মুলের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি: যথাযথ আইনী কাঠামো, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, এবং সামাজিক প্রতিরোধ। আর এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গিকার উল্লেখ করে ড. বদিউল আলম মজুমদার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় বলেন, মহাজোট সরকার দুর্নীতি দমনের সুস্পষ্ট অঙ্গীকারের ভিত্তিতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও, এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ অদ্যাবধি গ্রহণ করে নি। কোনো দুর্নীতিবাজকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, এমনকি কোনোরকমের শাস্তিপ্রদানের পদক্ষেপ নেয়নি। বরং এ সংক্রান্ত সরকারের সকল কার্যক্রম বিপরীত ইঙ্গিতই বহন করে। সরকার দুদকের আইন পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল ও অকার্যকর করার পাঁয়তারায় লিপ্ত। সংসদের পক্ষ থেকেও দুর্নীতি দূরীকরণে কোনো বলিষ্ঠ ও ফলপ্রসূ উদ্যোগ দেখা যায় না। বরং বাস্তবে তার উল্টো ঘটছে। উচ্চ আদালতের আচরণেও অনেকেই উদ্বিগ্ন, যদিও হাবিবুর রহমান মোল্লার মামলায় আপিল বিভাগের রায়ে আমরা কিছুটা আশান্বিত হয়েছি। তিনি বলেন, সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় যে, ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে ফায়দাতন্ত্রের চর্চার ফলে দুর্নীতির ধরণই এখন বদলে যাচ্ছে। ক্ষমতাধররা এখন আর কন্ট্রাক্ট এর একটি অংশ উৎকোচ হিসেবে নিয়েই সন্তুষ্ট নন, তাঁরা পুরো কার্যক্রমকেই তাদের কর্মী, সমর্থক ও আপনজনদের মধ্যে ফায়দা প্রদানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে বদ্ধপরিকর। ফলে অনেক কার্যক্রমই যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না, যা আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। একইসাথে ফায়দাতন্ত্রের অংশ হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজি, দখলদারিত্ব ইত্যাদি   বিস্তারলাভ করছে। এই সকল গর্হিত কাজের পরিণাম সম্পর্কে নাগরিক হিসেবে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। কারণ ফায়দাপ্রাপ্তির লোভে এবং ক্ষমতাসীন দলকে ছাতা হিসেবে ব্যবহারের সুযোগের ফলে অনেক অবাঞ্ছিত ব্যক্তিরাই সরকারি দলে এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোতে ভিড় জমাবে এবং সীমিত পরিমাণের ফায়দার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। যেহেতু ফায়দার পরিমাণ সীমিত, তাই এই প্রতিযোগিতা তীব্র হবে, এমনকি সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। যা আমরা ইতিমধ্যেই লক্ষ করছি। পরিণতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটতে পারে এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। নাগরিক হিসেবে আমরা ভীষণ উদ্বিগ্ন। এ উদ্বিগ্নতা দূরীকরণের লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগের সাথে সাথে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য নাগরিক সমাজের প্রতিও তিনি আহ্বান জানান।

কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্যগণকে সাংবিধানিক পদে পরিণত করা, সংসদীয় কমিটি বিশেষত পাবলিক একাউন্স কমিটিকে কার্যকর করা এবং তথ্য কমিশনের কার্যক্রম মাঠ পর্যায়ে বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, দুর্নীতির বিস্তার কমে নাই। হয়তো বড়ো কোনো লুটপাটের ঘটনা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকাশ পায়নি। কিন্তু সার্বিকভাবে দেশে এখনো দুর্নীতি কমেনি। তিনি বলেন, এর প্রধান কারণ দুর্নীতি দমন কমিশনের স্থরিবতা। এ স্থবিরতা দূর করতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক কলামিস্ট ও গবেষক জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে, তা না হলে যত যোগ্য লোকই আসুক না কেন কমিশনে তিনি কিছুই করতে পারবেন না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাট জনমত রয়েছে বলেও এ সময় তিনি মন্তব্য করেন। দুর্নীতির মামলা হলো এমপি’র বিরুদ্ধে কিন্তু সেই মামলা সরকার পরিবর্তন হবার সাথে সাথেই আবার প্রত্যাহার হয়ে যায় কেন? একটা দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রাইমিনিস্টার যদি দুর্নীতি করে তাহলে তাদের কি বিচার হবে না? Ñ এ সকল প্রশ্ন উত্থাপন করে জনাব আসম আব্দুর রব ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার ধারণা তুলে ধরেন। দুর্নীতি নির্মুলের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি জাতীয় ঐক্যমত্যে আসা উচিত বলেও এ সময় তিনি মন্তব্য করেন। ঢাকা শহরে আমার একবিন্দু জমি নেই, যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে তাহলে আমি সংসদ সদস্য পদ প্রত্যাহার করব Ñ এই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে জনাব আশরাফ আলী এমপি বলেন, ঢাকা শহরে কার কতগুলো বাড়ি তা খুঁজে দেখলেই বেরিয়ে যাবে কে কত বেশি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব এনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, দুর্নীতি যে যেখানে পারে সেখান থেকেই করে যাচ্ছে ফলে দুর্নীতি একটা জাতীয় স্বভাবে পরিণত হয়েছে। এর পরিবর্তনে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিশ্র“তি ও আন্তরিকতার প্রয়োজন।

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান জনাব খালেদা আক্তার চৌধুরী বলেন, দুর্নীতি আমরা চোখে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু হাতে দায়িত্ব নেই তাই কিছু করতে পারছি না। আশা করি সরকার এ ব্যাপারে দ্রুতই কিছু করবেন। ‘সুজন’ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ও সমন্বয়কারী জনাব দিলীপ সরকার-এর লিখিত প্রবন্ধের সাথে একমত পোষণ করে গোলটেবিল আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের অধ্যাপক জনাব মোস্তফা চৌধুরী, ফর ইউ ফর এভারের নির্বাহি পরিচালক জনাব রেহানা সিদ্দিকী, ব্যারিস্টার সারোয়ার, প্রফেসর কামাল আতাউর রহমান, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান জনাব রাশেদা আখতার, ব্যবসায়ী জনাব আব্দুল হামিদ, লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান জনাব নুরুন্নবী চৌধুরী, চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান কামরুন্নাহার ভুঁইয়া, অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল হাই প্রমুখ। এছাড়া অন্যান্যের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এএসএম শাহাজাহান।

আলোচনায় বক্তারা আরো বলেন, বর্তমানে উচ্চ আদালতে দুর্নীতির মামলার একটি গুরুতর জট সৃষ্টি হয়েছে। মূলত দু’টি মামলার কারণে এ জটের সৃষ্টি। এগুলো হলো সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর এবং হাবিবুর রহমান মোল্লার দায়ের করা মামলা। দুর্নীতির মামলা নিয়ে হাইকোর্টের কার্যক্রম দেখে অনেকের মনেই দুর্নীতি দমনের কার্যক্রমে উচ্চ আদালতের সহযোগিতার বিষয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তবে হাবিবুর রহমান মোল্লার মামলায় আপীল বিভাগের ৪ এপ্রিল, ২০১০ তারিখের রায়ে আমরা আশাবাদী হয়ে উঠেছি। বিজ্ঞ বিচারকগণ হাবিবুর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি বৈধ বলে রায় দেন। এর ফলে যান্ত্রিক যুক্তির কারণে দুর্নীতির মামলা বাতিলের পথ রুদ্ধ হলো এবং আমরা আশা করি যে, জটে আটকে পড়া মামলাগুলো আবার সচল হবে।

Advertisements