সুশাসন: নেতৃত্ব আর কর্তৃত্ব এক নয়

samakal_logo

বদিউল আলম মজুমদার

আমাদের দেশে প্রায়ই নেতৃত্বের শূন্যতা ও ব্যর্থতা নিয়ে অভিযোগ শোনা যায়। সম্প্রতি আমার অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সুযোগ হয়। সেখানেও আমি একই প্রশ্নের মুখোমুখি হই। ফলে নেতৃত্ব নিয়ে আমার কিছুটা ভাবনা-চিন্তা করার সুযোগ ঘটে। আমার সামনে প্রশ্নের উদ্রেক হয় : নেতা কে? নেতৃত্ব আসলে কী? নেতৃত্ব মানে কি কর্তৃত্ব প্রয়োগ? নেতৃত্ব প্রদর্শন আর দাফতরিক ক্ষমতা ব্যবহার কি এক? নেতা হয়ে কি কেউ জন্মায়?

আমি মনে করি, নেতা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি এমন কিছু ঘটান যা সাধারণভাবে ঘটার কথা নয়। বস্তুত যা স্বাভাবিকভাবে ঘটবে, তার জন্য নেতার প্রয়োজন হয় না_ যে কোনো ব্যক্তিই তা করতে পারেন। সত্যিকারের নেতা অনন্য, অসাধারণ, অতুলনীয়, অভাবনীয় কিছু সৃষ্টি করেন। নেতা বড় কাজ করেন। অর্থাৎ ‘ইনক্রিমেন্টাল চেঞ্জে’র বা ক্ষুদ্র পরিবর্তনের জন্য নয়, উল্লল্ফম্ফনের জন্য নেতৃত্বের প্রয়োজন পড়ে। তাই নেতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘আনরিজনেবলনেস’ বা দুঃসাহসিকতা।

বাস্তববাদিতা নেতার গুণাবলির অংশ নয়, যদিও নেতা বাস্তবকে উপেক্ষা করেন না। নেতা বরং নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেন। নেতা সাধারণত অসম্ভবকে সম্ভব করেন। তবে ‘পর্বত’ নাড়ানো নেতার লক্ষ্য হলেও, পর্বতের পাদদেশের নুড়িপাথর সরানোর মধ্য দিয়ে সে কাজ অনেক সময় শুরু করতে হয়। নেতা তা করতে দ্বিধা করেন না। তবে তিনি সর্বাবস্থায়ই লক্ষ্যে অটল ও অবিচল থাকেন।

জর্জ বার্নার্ড শ’ বলেছেন, ‘রিজনেবল’ বা বাস্তববাদী মানুষেরা পৃথিবীর সঙ্গে নিজেদের খাপখাইয়ে নেন, দুঃসাহসী মানুষ পৃথিবীকে পরিবর্তন করেন আর পৃথিবীর সব অগ্রগতিই দুঃসাহসী মানুষের ওপর নির্ভর করে। তাই সত্যিকারের নেতা শুধু সাহসীই নন, তিনি দুঃসাহসীও। বস্তুত পৃথিবীর ইতিহাস অনেক দুঃসাহসী মানুষেরই ইতিহাস, যারা বাক্সবন্দি বা প্রথাগত চিন্তার বাইরে আসতে পেরেছেন। সব সমস্যাকে ভিন্নভাবে বা নতুন করে দেখতে পেরেছেন। আর দুঃসাহসিকতাই নেতাকে অসাধারণ করে।

নেতা আত্মবিশ্বাসী। নেতা কোনো বাধা মানতে নারাজ। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, নেতা সেই ব্যক্তি : ‘প্রবল অটল বিশ্বাস যার/নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে,/যৌবন যার জীবনের ঢেউ/ কলতরঙ্গে হাসে,/মরা মৃত্তিকা করে প্রাণায়িত/ শষ্য কুসুমে ফলে।/ কোন বাধা তার রোধে নাকো পথ/ কেবলি সম্মুখে চলে।’

নেতৃত্ব ‘অথরিটি’ বা কর্তৃত্বের বিষয় নয়। হুকুম দেওয়ার ক্ষমতা আর নেতৃত্ব এক কথা নয়। ভোট কিংবা অন্যান্য অনিয়মতান্ত্রিকভাবে অথরিটি অর্জিত হলেই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। নেতৃত্ব দাফতরিক ক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের প্রতি অবশ্যই মানুষের সমর্থন থাকে। থাকে তাদের প্রতি অনেকের আনুগত্য। তাদের কর্তৃত্ব প্রদর্শনের বা হুকুম দেওয়ার অধিকার থাকে এবং জনগণ সাধারণত সে হুকুম তালিমও করে। কিন্তু তাই বলে তাদের সত্যিকারের নেতার মতো অসাধারণ কিছু অর্জনের গুণাবলি থাকবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। দাফতরিক ক্ষমতা বলে তারা অভূতপূর্ব কিছু করবেন তাও সর্বদা আশা করা যায় না।

উদাহরণ হিসেবে মহাত্মা গান্ধীর কথা ধরা যাক। মহাত্মা গান্ধীর কোনো আনুষ্ঠানিক, দাফতরিক ক্ষমতা ছিল না। তিনি কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান ছিলেন না। তার অধীনে কোনো বিরাট সেনাবাহিনীও ছিল না। কাউকে হুকুম দেওয়ার আইনানুগ অধিকার তার ছিল না। তবু প্রলয় ঘটানোর মতো ‘ক্ষমতা’র অধিকারী তিনি ছিলেন। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল তাকে ‘ন্যাংটা ফকির’ বলে আখ্যায়িত করলেও গান্ধী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মসনদ_ যে সাম্রাজ্যে এককালে সূর্য অস্ত যেত না_ কাঁপিয়ে দিতে পেরেছিলেন।

নেতার ক্ষমতার উৎস তার নৈতিক অবস্থান_ নৈতিকতার প্রতি তার অনমনীয়তা। এমন অনমনীয়তার কারণেই তিনি জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন অর্জন করেছিলেন। নৈতিকতার প্রতি আপসহীনতার কারণে জনগণ নেতার ওপর আস্থা রাখতে পারে, তার কথার ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই দাফতরিক ক্ষমতা না থাকলেও সত্যিকারের নেতা অতুলনীয় নৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন। গান্ধীর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল।

নেতা অভিনেতা-অভিনেত্রী নন। এ কথা কারও অজানা নয় যে, অভিনেতা-অভিনেত্রী মূল চরিত্র নন_ তারা পোশাক-আশাক পরে মঞ্চে নির্ধারিত চরিত্রের অভিনয় করেন মাত্র। অন্যরা তাকে সাজিয়ে মঞ্চে পাঠান এবং মঞ্চ থেকে প্রস্থানের পর মূল চরিত্রের সঙ্গে তার সম্পর্কের ইতি ঘটে। তাই নেতার সাজে সাজলেও অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সত্যিকারের নেতা নন। নেতার গুণাবলি তাদের ব্যক্তিজীবনে প্রতিফলিত হয় না। অর্থাৎ কথার সঙ্গে তাদের কাজের মিল থাকে না।

নেতা হয়ে কেউ জন্মান না। নেতৃত্ব উত্তরাধিকারের বিষয় নয়। নেতৃত্ব জোর করেও অর্জন করা যায় না। গান্ধী ‘মহাত্মা’ হয়ে জন্মগ্রহণ করেননি। তিনি জোর করে কিংবা উত্তরাধিকারবলে নেতা হননি। গান্ধী করম চাঁদ গান্ধী হিসেবে জন্ম নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে মহাত্মা_ মহান আত্মার অধিকারী_ হিসেবে তিনি আখ্যায়িত হয়েছিলেন। জনগণ তাকে এ আখ্যা দিয়েছিলেন। তার দাফতরিক ক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবে নয়; বরং তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে। আর এ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাই নেতার বড় প্রাপ্তি।

নেতা ‘ভিশন’ বা প্রত্যাশা দ্বারা পরিচালিত হন। প্রত্যাশার ভিত্তিতেই তিনি মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধ সৃষ্টি করেন। ‘শেয়ারড ভিশন’ বা সম্মিলিত প্রত্যাশা সৃষ্টির মাধ্যমেই তা অর্জিত হয়। সম্মিলিত প্রত্যাশা ম্যাজিকের মতো কাজ করে। কারণ এক ব্যক্তির প্রত্যাশা শুধুই প্রত্যাশা; কিন্তু বহু ব্যক্তি যখন একই প্রত্যাশা ধারণ ও লালন করে এবং তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, তখন নতুন বাস্তবতার সূচনা ঘটে। কারণ প্রতিশ্রুতির শক্তিবলে মানুষ যে কোনো বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে উঠতে পারে।

নেতা ‘ফলোয়ার’ বা অনুসারী খোঁজেন না, তিনি সহযোগী সৃষ্টি করেন। নেতা পুতুল তৈরি করেন না বা মোসাহেব দ্বারা নিজেকে পরিবেষ্টিত করেন না। নেতা অন্যের নেতৃত্ব ক্ষমতায়িত করেন_ অসংখ্য নেতা সৃষ্টি করেন। নেতা দাফতরিক ক্ষমতার অধিকারী হলেও তিনি সে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন না। কারণ নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দুর্যোগেরই পূর্বলক্ষণ। নেতৃত্ব এক ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ হলে সে ব্যক্তির সব সীমাবদ্ধতা ও পছন্দ-অপছন্দ, যা সবক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ নয়, কাজে প্রতিফলিত হয়। এছাড়াও ক্ষমতা কুক্ষিগত হলে স্বৈরতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে, যা মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। ইতিহাসে তার ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে।

নেতা অনুপ্রেরণার উৎস। নেতা বকোয়াজ নন; বরং তিনি একজন নিবেদিত শ্রোতা। তিনি সহযোগীদের প্রাণের স্পন্দন অনুভব করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট। তিনি অন্যের, বিশেষত বিরুদ্ধ মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
সহস্র ফুল ছাড়া যেমন বাগান হয় না, অগণিত ব্যক্তির নেতৃত্ব ছাড়াও কোনো বড় কাজ শুরু ও শেষ হয় না। যত বেশি ব্যক্তি একই প্রত্যাশা লালন করবে এবং তা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেবে তথা উদ্যোগী ভূমিকা নেবে, ততই বড় কাজ হবে এবং কাজের বিস্তৃতি ঘটবে। কারণ সে ব্যক্তিই নেতা, যিনি প্রথম এগিয়ে আসেন, ঝুঁকি নেন এবং ‘ক্যাটালিস্ট’ বা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেন। এভাবে কাজের সফলতা অর্জন ও ব্যাপ্তি ঘটানোতেই নেতার সফলতা। অর্থাৎ যত বেশি ব্যক্তি নেতার অনুপ্রেরণায় তার প্রত্যাশিত কাজে যুক্ত হবে, তত বড় ও বেশি সফলতা অর্জিত হবে। আর এ সফলতার কৃতিত্ব নেতা নিজে নেন না, তিনি অন্যকে দেন। অভিজ্ঞতায় বলে, অন্যকে কৃতিত্ব দিলে যে কোনো দুরূহ কাজই সহজে করা যায়।

নেতা শুধু কাজের আহ্বান জানিয়েই বা ‘করতে হবে’ বলেই ক্ষান্ত হন না। তিনি কাজ নিশ্চিত করেন। তিনি কাজের অসফলতাকে ব্যর্থতা বলে মনে করেন না। কারণ তিনি অসফলতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। আর সে শিক্ষাই অর্জন। সে শিক্ষাকে পাথেয় করেই তিনি সামনে এগোন। তাই অসফলতা আর ব্যর্থতা এক কথা নয়। আর অসফলতার জন্য নেতা ‘বেল্গম গেমে’ লিপ্ত হন না এবং অন্যের ওপর দোষ চাপান না বা অজুহাতও দাঁড় করান না_ তিনি নিজে অসফলতার দায়িত্ব নেন। তবে সফলতা নিশ্চিত করাই নেতার কাজ, দোষ দেওয়া বা অজুহাত তৈরি নয়। তাই দোষ চাপালে এবং অজুহাত সৃষ্টি করলেই ধরে নিতে হবে নেতা ব্যর্থ। কারণ ক্ষুদ্রত্ব দিয়ে নেতৃত্ব হয় না।

উল্লেখ্য, কাজ যেখানকার, নেতৃত্বও সেখানকার। কারণ প্রায় সব সমস্যাই স্থানীয় এবং এগুলোর সমাধানও স্থানীয়। অর্থাৎ সমস্যা যেখানে, সমাধানও সেখানেই। ফলে আমদানি বা ভাড়া করা নেতৃত্ব দিয়ে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যায় না। কারণ যে কোনো সমস্যা সমাধান করতে গেলেই নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়, নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়। তাই নেতাকে কাজে লেগে থাকতে হয়, ভাড়া করা মানুষ দিয়ে যা সম্ভব নয়। আর এভাবেই, একটির পর একটি সমস্যা সমাধানের মাধ্যমেই, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয় এবং সমাজ এগিয়ে যায়। তাই স্থানীয় সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। এজন্যই, সমাজের অগ্রগতির জন্যই, সর্বস্তরে এবং সর্বক্ষেত্রে একঝাঁক নেতৃত্বের বিকাশ আবশ্যক।

নেতা ‘স্ট্র্যাটেজিক’ বা কৌশলগত কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে এক ফোঁড় দিলে দশ ফোঁড়ের কাজ হয়। নেতা সেভাবেই কাজ করেন এবং ‘হাই লিভারেজ অ্যাকশন’ গ্রহণ করেন। স্বল্পব্যয়ে বিরাট কর্মযজ্ঞ সম্পাদনই হাই লিভারেজ অ্যাকশন। তাই নেতা যা সামনে আসে তাতেই মনোনিবেশ করেন না, তিনি ভেবেচিন্তে পরিকল্পিতভাবে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন।

নেতা অন্যের আত্মশক্তি বিকাশের এবং তা কাজে লাগানোর প্রচেষ্টায় নিবেদিত। কারণ আত্মশক্তি হলো প্রত্যেকের নিজের ভেতরকার ধন বা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুঁজি, যার বিকাশ ঘটলে আর্থিক পুঁজির অভাব সহজেই মেটানো সম্ভব। সৃজনশীলতা, ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ইত্যাদি যার অন্যতম উপাদান। আত্মশক্তিতে বলীয়ান ব্যক্তি অদম্য ও অপ্রতিরোধ্য। তাই আত্মশক্তিতে বলীয়ান ব্যক্তিরাই নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম। অর্থাৎ নেতা মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণাবলি বা অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বিকাশের পথ উন্মুক্ত করেন।

নেতা হয়ে যেমন কেউ জন্মান না, তেমনিভাবে নেতা আকাশ থেকেও পড়েন না। কোনো ধরনের সালসা খেয়েও নেতা হওয়া যায় না। নেতা নিজে হয়ে ওঠেন। নিজেকে রূপান্তরের মাধ্যমে। নিজের রূপান্তর ঘটাতে পারলেই নেতা অন্যের রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হন। নেতা সত্যিকারার্থেই পরিবর্তনের রূপকার।
– ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক
সুজন_সুশাসনের জন্য নাগরিক

সূত্র: সমকাল, ৬ মে ২০১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s