স্থানীয় সরকার: সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় র্শীর্ষক সুজনে’র গোলটেবিল আলোচনা

স্থানীয় সরকার এবং স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা নিয়ে এ মুহূর্তে বাংলাদেশে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার অন্ত নেই। বেশিরভাগ আলোচনায় একটি বিষয় ঘুরে-ফিরে আসে তা হচ্ছে “স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী” করতে হবে। প্রশ্ন জাগে স্থানীয় সরকার কি শক্তিহীন? স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার শক্তির সত্যিকারের ক্ষেত্রগুলোকে আড়াল করে আমরা তার দুর্বলতার স্থানগুলোকে বেশি করে তুলে ধরে থাকি। তাতে করে তাদের শক্তির প্রকাশ ও বিকাশ আরও বেশি বাধাগ্রস্থ হয়। আজ সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর আয়োজনে ‘স্থানীয় সরকার: সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয়’ র্শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এ ধরনের অভিমতই প্রকাশ করেন বক্তারা।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুজনে’র কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহি সদস্য ড. তোফায়েল আহমেদের অনুপস্থিতিতে তাঁর লিখিত মূল প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন ‘সুজন’ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। মূল প্রবন্ধে স্থানীয় সরকার নেতৃবৃন্দের শক্তির বিশেষ কয়েকটি দিক তুলে ধরে বলা হয় – স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিরোধ নিষ্পত্তি, অপরাধ দমন, অপরাধ প্রতিরোধ, সামাজিক সংহতি-সম্প্রীতি বজায় রাখতে অর্ধ লক্ষাধিক নেতৃবৃন্দ ব্যক্তিগতভাবে যে অবদান রাখেন তার কোনো মূল্যায়ন কোথাও হয় নি। সত্যিকারের মূল্যায়ন হলে বোঝা যেত একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা তারা পালন করে আসছেন। কোনোরকম পুলিশী ও আইনি সহায়তা ছাড়া তারা এ অসাধ্য সাধন করেছেন বলেও প্রবন্ধে অভিমত ব্যক্ত করা হয়। অধ্যাপক আহমদ প্রবন্ধে আরো বলেন, জাতীয় সরকার জাতীয় ক্রিয়াকাণ্ড ভুলে ক্রমশ স্থানীয় সরকারের অধিক্ষেত্রের মধ্যে আগ্রাসন চালাচ্ছে। ‘জাতীয় সরকার’ বেশি মাত্রায় ও পরিমাণে ‘স্থানীয়’তে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। তাতে বাড়ছে দ্বন্দ্ব, বাড়ছে সংঘাত। তাই যারা আমরা স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণের স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত করছি, তাদের একুট ভাবতে বলব ‘দুর্বলতা রোগ’ স্থানীয় সরকারের নয়, এটি জাতীয় সরকারেরই রোগ; স্থানীয় পর্যায়ে তার বিস্তার ঘটেছে মাত্র। তাই জাতীয় সরকারের রোগ আগে সারিয়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। তাহলে স্থানীয় সরকারের রোগ স্বাভাবিক নিয়মেই সেরে যাবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। উপজেলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সময়টি উপজেলা পরিষদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত অর্থ বছরে পরিষদের কোনো বাজেট হয়নি। কেন হয়নি সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নেয়া উচিৎ। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, জেলা ও উপজেলা এই তিন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া উচিৎ। আবার আগামী অর্থ বছরে উপজেলা পরিষদের পরিকল্পনা ও বাজেট সম্পর্কে এখনও কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। তা যদি না হয় তাহলে আরো একটি বছর অপচয়ের হিসাবে যুক্ত হবে। নির্বাচন প্রসঙ্গ উল্লেখ মূল প্রবন্ধে আরো বলা হয়, দুই বছরের বেশি সময়ের মেয়াদ উত্তীর্ণ ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, ৪,৫০০ ইউনিয়ন পরিষদ ও ৩০০ পৌরসভা আধা কার্যকর। তারা এখন কাজ করার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে তাই অচলাবস্থা চলছে। মেয়াদ উত্তীর্ণ পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ সম্পর্কেও একই অবস্থা। কিন্তু পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে নানারকম প্রকল্প রচনা ও সম্পদ প্রবাহ সমানে চলছে। এরকম একটি অর্ন্তবর্তী সময়ে নির্বাচনকে অনিশ্চিত রেখে অর্থ সম্পদ বরাদ্দ করলে সেখানে সে অর্থ সম্পদের সঠিক ব্যবহার হয় না এবং সত্যিকার অর্থে হচ্ছেও না। তাই তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, এ সময়ের অপচয় অনিয়মের দায়ভার কে গ্রহণ করবে?

৩০০ সদস্যের ক্ষমতায়নই আমাদেরকে গণতন্ত্র দেবে না, আমাদের দেশে গণতন্ত্র সুসংহত করতে হলে তৃণমূলের সকল পর্যায়ের প্রতিনিধিদের অবশ্যই ক্ষমতায়িত করতে হবে উল্লেখ করে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, বর্তমানে স্থানীয় সরকারে একটা কাঠামো দাঁড়ালেও এটা কার্যকর নয়। এছাড়া এই কাঠামোর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বিরাজিত। তিনি বলেন, এক ঘরে দুই পীর কখনোই হয় না। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতার ভাগাভাগি করতে গিয়ে সেই কাজটিই হচ্ছে। লোডশেডিং এর থেকে আজ পাওয়ার শেডিং আমাদের জন্য বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। দায়বদ্ধতা, দায়িত্ব বড় কথা না ক্ষমতা বড় কথা এ নিয়ে আমাদের আজ ভাবা জরুরি উল্লেখ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অনুষ্ঠানের সঞ্চালক জনাব এএসএম শাহাজাহান বলেন, স্থানীয় সরকারে সম্ভাবনা অনেক আছে, যদি আমরা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি।

সংবিধানের ৯, ১১, ৫৯ এবং ৬০ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এমপিতন্ত্র আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমরা আমাদের সংবিধানকে পদদলিত করেছি এবং আদালতের নির্দেশও অমান্য করছি। উপজেলা নিয়েও যা হচ্ছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এখন প্রায় ভেঙ্গে পড়েছে, তৃণমূল পর্যায়ে বর্তমানে একটি চরম দ্বন্দ্বাত্মক পরিস্থিতি বিরাজ করছে উল্লেখ করে তিনি সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদ থেকে বিযুক্ত করে তাদের সংসদকেন্দ্রিক কার্যক্রমে নিবিষ্ট করা; জেলা পরিষদের আইনটি সংশোধন ও যুগোপযোগী করে জেলা পরিষদ নির্বাচনের আয়োজন করা; একটি বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিক ক্ষমতা, দায়-দায়িত্ব ও সম্পদ হস্তান্তর করা এবং সরকারের হস্তক্ষেপ দূরীভূত ও নিয়ন্ত্রণ করা; আইনগুলোকে সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও এগুলোতে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত আইন বা ‘আমব্রেলা অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করার দাবি উত্থাপন করেন। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ আইনে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন সংযোজিত হয়েছে, যেটি ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ আইনে বছরে দু’বার ‘ওয়ার্ডসভা’ অনুষ্ঠানের বিধান রাখা হয়েছে – ওয়ার্ডের সব ভোটারকে নিয়ে ওয়ার্ডসভা গঠিত। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার চর্চা, স্থানীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, সামাজিক আন্দোলন পরিচালনা এবং সুস্পষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে সরকারি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে উপকারভোগী চিহ্নিত হওয়ার কথা। ফলে ‘ডিরেক্ট ডেমোক্রেসি’ বা সরাসরি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

নির্বাচিত গণতান্ত্রিক প্রতিনিধির ওপর আমলারা কীভাবে মাতব্বরি করে এটা আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না। এজন্য জরুরিভিত্তিতে সকলে সম্মিলিতভাবে একটি সুপারিশ প্রণয়ন করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে অভিমত ব্যক্ত করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠিত না হলে গণতন্ত্র অর্থবহ হবে না। আওয়ামী লীগ নেতা জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, মূল কথা হলো যতখানি সম্ভব স্থানীয় সরকারের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে যাতে তারা কাজ করতে পারে। কেবলমাত্র সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়ন করবেন আর স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্থানীয় সমস্যার সমাধানে অবদান রাখবেন এভাবে সমস্যার সমাধান হবে না। ফলে এক ধরনের পাওয়ার শেয়ার করার পলিসি নিয়ে আজ আমাদের ভাবা জরুরি। সাবেক সচিব জনাব মোঃ ফয়জুল্লাহ বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় যতদিন থাকবে এবং পার্টির সেক্রেটারী যতদিন এর দায়িত্বে থাকবেন ততদিন শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। এছাড়াও তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যানদের মধ্যে প্রবল দ্বন্দ্ব বিরাজমান বলেও মন্তব্য করেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জনাব রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হলে মানুষকে সম্পৃক্ত করে এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই করতে হবে। এছাড়া আসন্ন বাজেটে স্থানীয় সরকারকে অন্তত এক তৃতীয়াংশ বরাদ্দ দেবার দাবি জানান তিনি।

জনগণের প্রাপ্য সেবা নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতেই হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান ঐক্যপরিষদের আহ্বায়ক জনাব আব্দুল মজিদ আগামী ১৫ জুন ঐক্যপরিষদের ১০ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ২ ঘন্টার রাজপথ-নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি সকলকে সফল করার আহ্বান জানান। নালিতাবাড়ী উপজেলার চেয়ারম্যান এবং উপজেলা চেয়ারম্যান এসোসিয়েশনের সদস্য-সচিব জনাব বদিউজ্জামান বাদশা বলেন, বর্তমানে উপজেলা একটি প্রতিবন্ধী প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে। উপদেশ বাধ্যতামূলক হবে এমন উপদেষ্টা তো কাম্য হতে পারে না। তিনি বলেন, উনারা স্থানীয় উন্নয়নে অবশ্যই যুক্ত হবেন কিন্তু উনার উপদেশ অবশ্যই পরিষদের মধ্য দিয়েই দেয়া উচিত হবে। উপজেলাকে ‘জগাখিঁচুড়ি’ পরিষদ হিসেবে আখ্যায়িত করে স্বশাসিত ইউনিয়ন পরিষদ এ্যাডভোকেসি গ্র“পের সভাপতি এবং রাজবাড়ী ইসলাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জনাব আবুল হোসেন খান বলেন, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের দায়-দায়িত্ব ও ক্ষমতা সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়া প্রয়োজন। সকলকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানান উপজেলা চেয়ারম্যান ভাইস-চেয়ারম্যান ফোরামের আহ্বায়ক এবং চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান ঐক্যপরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক জনাব মহিবুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান চাই। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের যতটুকু ক্ষমতা আছে তার প্রয়োগ সাহসিকতার সাথে করার আহ্বান জানান ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান জনাব ফয়জুর রহমান ফকির। ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার চেয়ারম্যান জনাব সুধীন কুমার সরকার বলেন, নাকের কাজ মুখ দিয়ে হয় কখনোই হবার নয়। যিনি আইন প্রণয়ন করবেন তিনি স্থানীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গেলে সমস্যা সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান জনাব ফাতেমা মনির রাজনীতিবিদদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমাদের মনের সংকীর্ণতা দূর করে যার যার জায়গায় যতটুকু ক্ষমতা জরুরিভিত্তিতে দিতে হবে। এছাড়া বৈঠকে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, রাজেন্দ্র কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর কামাল আতাউর রহমান, ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্র“পের সাবেক ডিরেক্টর জনাব জহুরুল আলম, এনজিও কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার জনাব মুসবাহ আলীম, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান জনাব আতাউর রহমান, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান জনাব দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার চেয়ারম্যান জনাব আফজাল হোসেন জকি প্রমুখ। গোলটেবিল আলোচনায় অন্যান্যের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের জনাব মহিদুল হক খান প্রমুখ।

Advertisements