সুশাসন: যুক্তরাজ্যের নির্বাচন থেকে শিক্ষণীয়

samakal_logo

বদিউল আলম মজুমদার

কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এ নির্বাচনের মাধ্যমে ‘হাউস অব কমন্স’ বা কমন্স সভার ৬৫০ জন সদস্যের মধ্যে ৬৪৯ জন নির্বাচিত হয়েছেন_ একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনে নির্বাচন হয়নি। কমন্স সভাকে বলা হয় ‘মাদার অব অল পার্লামেন্টস’ বা সব আইনসভার মাতৃতুল্য। আর যুক্তরাজ্যের আইনসভার এ নির্বাচন থেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে।

যুক্তরাজ্যে সাল্ফপ্রতিক নির্বাচনে লক্ষণীয় বিষয়গুলো ছিল_ নির্বাচন সম্পূর্ণ সুষ্ঠুভাবে ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে, এতে কোনো কারচুপির অভিযোগ ওঠেনি। অভিযোগ ওঠেনি কোনো ভোট জালিয়াতির। জোর করে ব্যালটে সিল মারার ঘটনাও ঘটেনি। নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়নি। কারও নির্বাচনী এজেন্টকে কেউ ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়নি। ভোট গণনায় কোনো অনিয়ম হয়নি। কেউ নির্বাচনী ফল প্রত্যাখ্যানও করেনি।

নির্বাচনের আগে কিংবা নির্বাচনের দিনে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়নি। এমনকি নির্বাচন কেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ আয়োজনেরও প্রয়োজন পড়েনি। তা সত্ত্বেও নির্বাচনে কোনো ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটেনি। এমনকি প্রতিপক্ষের কেউ কাউকে গালি দিয়েছে বলেও শোনা যায়নি। রাজপথে কোনো মিছিল হয়নি। মাইক বাজিয়ে নাগরিকের শান্তি বিঘি্নত করা হয়নি। পোস্টার-লিফলেটের ছড়াছড়ি ছিল না নির্বাচনে। কোনো দেয়ালে কেউ চিকাও মারেনি।

নির্বাচনে ভোট কেনাবেচার তথা অর্থের অবৈধ ব্যবহারের কোনো অভিযোগ ওঠেনি। কোনো মাস্তানকেও কোনো নির্বাচনী এলাকায় দেখা যায়নি। নির্বাচনে অস্ত্রের ব্যবহার হয়নি। ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসা থেকেও কেউ বিরত করেনি। অর্থাৎ নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও সব ধরনের অশুভ প্রভাবমুক্ত।

নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে দলীয় সরকারের অধীনে_ দলীয় সরকারই তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা পালন করেছে_ আমাদের মতো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তত্ত্বাবধানে নয়। তা সত্ত্বেও কেউ পাতানো নির্বাচনের অভিযোগ তোলেনি। কারও পদত্যাগও কেউ দাবি করেনি। অনেক সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ভোট দিতে পারেনি বলে কিছু ভোটার প্রতিবাদ করলেও, তারা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেনি।

নির্বাচন প্রাক্কালে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে চোখে পড়ার মতো কোনো ঝামেলা সৃষ্টি হয়নি। কেউ দলের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে শোডাউন করেনি। রাস্তা ব্যারিকেড করেনি। কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বলেও শোনা যায়নি। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে অর্থকড়ি লেনদেনের অভিযোগও ওঠেনি।

মনোনয়নপত্র বাছাই পর্বে নির্বাচন কমিশনকে গলদঘর্মর্ হতে হয়নি। ফরম পূরণের এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো প্রার্থী চতুরতার আশ্রয় নেননি। কেউ কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেননি। কেউ আদালতে গিয়ে নিজের প্রার্থিতা সিদ্ধ করেও আনেননি। আদালতের হস্তক্ষেপের ফলে কমিশনকে ছাপানো ব্যালট পেপার পুড়িয়ে ফেলতে হয়নি এবং নতুন করে ব্যালট পেপার ছাপাতে হয়নি।

নির্বাচনের পরেও দলগুলোর মধ্যে সরকার গঠনের জন্য কোনো ধরনের অশুভ প্রতিযোগিতা দেখা যায়নি। কনজারভেটিভ পার্টি, যারা অধিক আসনে বিজয়ী হয়েছে, লিবারেল পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছে। লেবার পার্টির সঙ্গেও এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু সরকার গঠনের পর লেবার পার্টির পক্ষ থেকে কোয়ালিশনের অংশীদারদের বিরুদ্ধে কোনো অসদাচরণের প্রশ্ন তোলা হয়নি। কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও ওঠেনি। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই সরকার গঠনের প্রক্রিয়া অগ্রসর হয়েছে এবং যথাসময়ে সরকার গঠিত হয়েছে।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর লেবার পার্টির নেতা গর্ডন ব্রাউনের পদত্যাগের দাবি ওঠে। তিনিও পরাজয়ের দায়দায়িত্ব স্বীকার করে পদত্যাগ করেন। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের উচ্চবাচ্য হয়নি এবং তিনি কাউকে দোষারোপও করেননি। এ ব্যাপারে কেউ তার পক্ষে-বিপক্ষে বাকবিতণ্ডায়ও লিপ্ত হননি।

সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাজ্যের সাল্ফপ্রতিক নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ উত্তাপহীন। এতে তেমন কোনো উৎসবের আমেজ ছিল না। এতে ছিল না কোনো প্রতিবাদ, কোনো প্রত্যাখ্যান। কোনোরূপ বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা। ছিল না ছলে-বলে-কলে-কৌশলে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার প্রচেষ্টা। এটি ছিল যেন নিতান্তই একটি রুটিন বিষয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কিত বিতর্কের সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। নির্বাচনে টাকার খেলা ও ভোট কেনাবেচা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। পেশিশক্তি প্রয়োগ ও হানাহানির প্রবণতা ব্যাপক, যদিও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোরতার কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা বিচার না করে মার্কা দেখে ‘কলাগাছে’ ভোট দেওয়া যেন একটি সাধারণ ব্যাপার। মনোনয়ন বাণিজ্য, মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব, নির্বাচনী বিরোধ ও প্রার্থীর বৈধতা নির্ধারণে আদালতের হস্তক্ষেপ যেন চিরাচরিত ঘটনা। সব দলই যে কোনো মূল্যে, বিশেষত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার এমপি হওয়া চাই-ই _ এ যেন সব প্রার্থীরই মূল ‘মটো’ বা দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা।

বাংলাদেশে পরাজিত দল সবসময়ই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনে এবং নির্বাচনী ফল প্রত্যাখ্যান করে। পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করে। পক্ষান্তরে বিজয়ী দল নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে মত প্রকাশ করে। অনেক সময় তারা বিজিতদের ওপর প্রতিহিংসাও চরিতার্থ করে। অর্থাৎ প্রত্যেকটি নির্বাচনই যেন সংশিল্গষ্ট সবার জন্য একটি অস্তিত্বের লড়াই।

নির্বাচন রুটিন বিষয়ে দাঁড়ানোই যুক্তরাজ্যের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বড় ইতিবাচক দিক। বলাবাহুল্য, এটাই ‘ম্যাচিউরড’ বা পরিপকস্ফ গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। যে দেশে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক থাকে এবং যে দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অপারগ, নিশ্চিত করে বলা যায়, সে দেশে গণতন্ত্র কার্যকারিতা অর্জন করেনি। কারণ গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে ধারাবাহিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অতি গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যকীয়।

কীভাবে যুক্তরাজ্যে নির্বাচন রুটিন বিষয়ে পরিণত হলো? এর পেছনে কী কারণ রয়েছে? যুক্তরাজ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কয়েকশ’ বছরের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যার পর্যালোচনা থেকে এ প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর পাওয়া সম্ভব।

সব জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অবাধ নির্বাচন, এমনকি নির্বাচনের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়নি। গণতন্ত্রের যাত্রাপথের সূচনা হয়েছে মানুষের কতগুলো অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। বাক্-স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমতা-সমসুযোগ, সম্পদের মালিকানা ইত্যাদি এসব অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। এ যাত্রাপথে আরও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আইনের শাসন। ক্ষমতার বিভাজনের নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে সামন্তবাদী শাসকের একচ্ছত্র ক্ষমতার অবসানও এ দীর্ঘ যাত্রাপথের অর্জনের অংশ। আর এজন্য প্রয়োজন হয়েছে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের_ যেমন, কমন্স সভা, স্বাধীন বিচার বিভাগ ইত্যাদি।

যুক্তরাজ্যে নাগরিকের এসব অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে সামন্তবাদী রাজা-মহারাজাদের হাত ধরেই। নির্বাচিত সরকারের উদ্যোগে নয়। অর্থাৎ এসব অর্জনের পরই এবং এগুলোকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই সব জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৮৩০ সালে যুক্তরাজ্যে তথা ইউরোপের প্রায় সব দেশেই মাত্র ২ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার ছিল, যা ১৮৬৭ সালের পর ৭ শতাংশে এবং পরে ১৮৮০ সালের দিকে ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বস্তুত ১৯৪০ সালের পরই প্রায় সব পশ্চিমা দেশে সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে, পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে মানুষের কতগুলো মৌলিক অধিকার ও কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর ভিত্তি করেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুদৃঢ় হয়েছে এবং পরিপকস্ফতা অর্জন করেছে। নির্বাচন রুটিন বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

পক্ষান্তরে, আমাদের মতো দেশে ভোট আর গণতন্ত্র সমার্থক হয়ে গিয়েছে। ভোটাধিকার অর্জনের আগে তো দূরের কথা, তারপরেও মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলোর ফিরিস্তি সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকলেও, নির্বাচিত সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের কারণে এগুলো পদে পদে পদদলিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করা হয়েছে। ফলে গণতন্ত্র হয়ে পড়েছে নির্বাচনসর্বস্ব একদিনের বিষয়। বলাবাহুল্য, এ ধরনের ‘একদিনের গণতন্ত্র’ কার্যকারিতা অর্জন করেনি এবং পর্যায়ক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়নি।

তাই যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা হলো, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অতি আবশ্যক। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠানই যথেষ্ট নয়_ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন রুটিন বিষয়ে পরিণত হতে হবে। আর ভোটের অধিকার অর্জন সত্ত্বেও, নাগরিকের কতগুলো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে এবং এগুলো কার্যকর করার জন্য কতগুলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠলে গণতন্ত্রের খুঁটি নড়বড়ে থেকে যাবে এবং তা স্থায়িত্ব অর্জন করবে না। সুতরাং আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যদি সত্যিকারার্থেই কার্যকর করতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হয়, তাহলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে জোরদার করার ওপর ক্ষমতাসীনদের মনোনিবেশ করতে হবে। তা না হলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে অনিয়মতান্ত্রিক পন্থায় রাজপথে সমস্যা ‘সমাধানে’র প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আর অনিয়মতান্ত্রিকতা সমস্যার সমাাধান না করে ভবিষ্যতের জন্য বিষবৃক্ষই রোপণ করে, যা জাতিকে পরে সামরিক জান্তার মতো বিষফলই উপহার দেয়।

যুক্তরাজ্যের নির্বাচন থেকে এটি সুস্পষ্ট, সেখানে ছলে-বলে-কলে-কৌশলে নির্বাচিত হওয়ার ও ক্ষমতায় যাওয়ার প্রচেষ্টা অনুপস্থিত। সেখানে যুগোপযোগী আইনি কাঠামো এবং আইনগুলো প্রয়োগ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিরাজমান থাকায়, ক্ষমতাসীনরা লুটপাট ও ফায়দাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ পান না। আর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হওয়ার কারণে কেউ অন্যায় করে পার পেয়ে যেতেও পারেন না। তাই যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ‘ইনসেনটিভ’ বা উৎসাহ কাঠামো যুক্তরাজ্যে অনুপস্থিত। অর্থাৎ আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলেও, যথার্থ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সৃষ্টির মাধ্যমে দুর্নীতি ও ফায়দাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ করতে হবে। হালুয়া-রুটির আকর্ষণ দূরীভূত করতে হবে।

যুক্তরাজ্যের সম্প্রতি নির্বাচনে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়_ সেখানে কনজারভেটিভ পার্টি ৩৬ শতাংশ ভোট পেয়ে ৪৭ শতাংশ আসন পেয়েছে এবং লেবার পার্টি ২৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ৪০ শতাংশ আসন পেয়েছে। পক্ষান্তরে লিবারেল পার্টি ২৩ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র ৯ শতাংশ আসনে বিজয়ী হয়েছে। এটাই বিরাজমান নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের একক বিজয়’ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা। এ সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য লিবারেল পার্টির পক্ষ থেকে নির্বাচনী সংস্কারের তথা এক ধরনের আনুপাতিক পদ্ধতির দাবি উঠেছে। কনজারভেটিভ পার্টির সঙ্গে তাদের যৌথভাবে সরকার গঠনের একটি অন্যতম পূর্বশর্ত হলো এ ধরনের নির্বাচনী সংস্কার প্রবর্তনের লক্ষ্যে গণভোটের আয়োজন। উলেল্গখ্য, ইউরোপের অনেক দেশসহ পৃথিবীর বহু দেশেই আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের প্রবর্তন করা হয়েছে।

আমরা নিজেরাও বারবার এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। উদাহরণস্বরূপ, ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জাতীয় সংসদের ৭২ শতাংশ আসন পেয়েছিল। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র ২১ শতাংশ আসনে বিজয়ী হয়েছিল। এমনিভাবে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ৭৭ শতাংশ আসন লাভ করে, আর বিএনপি ৩৩ শতাংশ ভোটের বিনিময়ে মাত্র ১০ শতাংশ আসন লাভ করে। তাই এ ধরনের অসঙ্গতি দূর করার জন্য আমাদেরও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব কিংবা এক ধরনের মিশ্র পদ্ধতির দিকে যেতে হবে। তবে যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা না গেলে এ ধরনের পদ্ধতিগত সংস্কার সুফল বয়ে আনবে না।
হ ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক

সূত্র: সমকাল, ২০ মে ২০১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s