সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রাসঙ্গিক আইন

jugantor_logo

ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র
গণতান্ত্রিক শাসন কায়েমের জন্য রাষ্ট্রের সব স্তরে নির্বাচন অপরিহার্য। তবে নির্বাচন হতে হবে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও অর্থবহ। আর এর জন্য প্রয়োজন একটি যথার্থ আইনি কাঠামো ও কতগুলো কার্যকর প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন কমিশন এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার কার্যকারিতা এবং একই সঙ্গে আদালতসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার ওপর সুষ্ঠু নির্বাচন বহুলাংশে নির্ভরশীল। বিশেষত সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার লক্ষ্যে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সচেতন নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আসন্ন। সংসদ প্রণীত আইন এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তৈরি নির্বাচনী বিধিমালা ও আচরণবিধি এ নির্বাচনের জন্য প্রাসঙ্গিক আইনি কাঠামোর অংশ। আমাদের জাতীয় সংসদ ১৫ অক্টোবর, ২০০৯ তারিখে ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯’ পাস করে। কমিশন ৬ এপ্রিল, ২০১০ তারিখে ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০’ এবং একই তারিখে ‘সিটি কর্পোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০১০’ প্রকাশ করে। এসব আইন ও বিধিতে অনেক বিধান রয়েছে, যা সম্পর্কে আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং নির্বাচনের অব্যবহিত পরে নির্বাচিতদের সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। এ সম্পর্কে ভোটারদের সচেতনতাও অর্থবহ নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে একজন মেয়র, ৪১ জন কাউন্সিলর সাধারণ আসন থেকে এবং ১৪ জন সংরক্ষিত মহিলা আসন থেকে নির্বাচিত হবেন। মেয়র ও কাউন্সিলরদের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৮ মে। আইনানুযায়ী মেয়াদ শেষের পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আর নির্বাচনের ক্ষেত্রে (১) প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা, (২) শপথ গ্রহণ ও সম্পত্তি সম্পর্কিত ঘোষণা, (৩) নির্বাচনী বিরোধ নিষপত্তি, (৪) রিটার্নিং/প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিয়োগ, (৫) হলফনামা প্রদান, (৬) নির্বাচনী ব্যয় এবং (৭) নির্বাচন কমিশনের প্রার্থিতা বাতিল সম্পর্কিত বিধানগুলো সর্বাধিক প্রাসঙ্গিক। এছাড়াও প্রাসঙ্গিক নির্বাচনী প্রচারণার বিষয়, যা আচরণবিধিতে উল্লেখ আছে।

(১) মেয়র ও কাউন্সিলরদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা (আইনের ধারা ৯ ও ১০) : ২৫ বছর বয়স্ক যে কোন বাংলাদেশী নাগরিক সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বা কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। সাধারণ আসনের কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের নাম সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। মেয়র পদপ্রার্থীদের নাম যে কোন ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেই তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

কোন ব্যক্তি মেয়র বা কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হওয়ার বা পদে থাকার যোগ্য হবেন না- যদি তিনি ক. বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেন বা হারান; খ. কোন উপযুক্ত আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষিত হন; গ. দেউলিয়া ঘোষিত হন এবং সে দায় থেকে অব্যাহতি লাভ না করেন; ঘ. কোন ফৌজদারি বা নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দু’বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে; ঙ. প্রজাতন্ত্রের বা সিটি কর্পোরেশন বা কোন সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের বা অন্য কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের লাভজনক পদে সার্বক্ষণিক অধিষ্ঠিত থাকেন; চ. কোন বিদেশী রাষ্ট্র থেকে অনুদান বা তহবিল গ্রহণ করে, এমন কোন বেসরকারি সংস্থার প্রধান কার্যনির্বাহী পদ থেকে পদত্যাগ বা অবসরগ্রহণ বা পদচ্যুতির পর তিন বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে; ছ. কোন সমবায় সমিতি এবং সরকারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি ব্যতীত সরকারকে পণ্য সরবরাহ করার জন্য বা সরকার কর্তৃক গৃহীত কোন চুক্তির বাস্তবায়ন বা সেবা কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য, তার নিজ নামে বা তার ট্রাস্টি হিসেবে কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের নামে বা তার সুবিধার্থে বা তার উপলক্ষে বা কোন হিন্দু যৌথ পরিবারের সদস্য হিসেবে তার কোন অংশ বা স্বার্থ আছে এমন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে থাকেন; জ. তার পরিবারের কোনও সদস্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের কার্য সম্পাদনে বা মালামাল সরবরাহের জন্য ঠিকাদার নিযুক্ত হন বা এর জন্য নিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হন বা সিটি করপোরেশনের কোন বিষয়ে তার কোন প্রকার আর্থিক স্বার্থ থাকে বা তিনি সরকার কর্তৃক নিযুক্ত অত্যাবশ্যক কোন দ্রব্যের ডিলার হন; ঝ. বসবাসের নিমিত্তে গৃহনির্মাণের জন্য কোন ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণ ব্যতীত মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার তারিখে কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত কোন ঋণ বা তার কিস্তি পরিশোধে খেলাপি হয়ে থাকেন; ঞ. এমন কোন কোম্পানির পরিচালক বা ফার্মের অংশীদার হন, যা কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত ঋণ বা ঋণের কিস্তি পরিশোধে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার তারিখে খেলাপি হয়েছে; ট. ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত কোন ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় অনাদায়ী রাখেন; ঠ. সিটি কর্পোরেশনের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে তা অনাদায়ী রাখেন বা কর্পোরেশনের কাছে কোন আর্থিক দায়দেনা থাকে; ড. কর্পোরেশন বা সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত নিরীক্ষকের প্রতিবেদন অনুযায়ী দায়যোগ্য অর্থ কর্পোরেশনকে পরিশোধ না করেন; ঢ. অন্য কোন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা জাতীয় সংসদের সদস্য হন; ণ. কোন সরকারি বা আধা-সরকারি দফতর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, সমবায় সমিতি ইত্যাদি থেকে নৈতিক স্খলন, দুর্নীতি, অসদাচরণ প্রভৃতি অপরাধে চাকরিচ্যুত হয়ে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত না করেন; ত. সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভার তহবিল তছরুপের কারণে দণ্ডপ্রাপ্ত হন; থ. গত পাঁচ বছরের মধ্যে যে কোন সময়ে দণ্ডবিধির ধারা ১৮৯ ও ১৯২-এর অধীন (সরকারি কর্মচারীকে ক্ষতিসাধনের হুমকি এবং নিরাপত্তা বিধানার্থে সরকারি কর্মচারীর কাছে আবেদন করা থেকে বিরত রাখার জন্য কাউকে প্রলুব্ধ করার উদ্দেশে ভীতি প্রদর্শনের জন্য) দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজাপ্রাপ্ত হন; দ. বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে যে কোন সময়ে দণ্ডবিধির ধারা ২১৩, ৩৩২, ৩৩৩ ও ৩৫৩-এর অধীন (অপরাধীকে শাস্তি থেকে লুকিয়ে রাখার জন্য উপহার ইত্যাদি গ্রহণ এবং সরকারি কর্মচারীকে তার কর্তব্য পালনে বাধাদান করার জন্য স্বেচ্ছাকৃতভাবে আঘাত প্রদান, আক্রমণ ও অপরাধমূলক বল প্রয়োগের জন্য) দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজাপ্রাপ্ত ও অপসারিত হন; ধ. কোন আদালত কর্তৃক ফেরারি আসামি হিসেবে ঘোষিত হন; এবং ন. জাতীয় বা আন্তর্জাতিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হন। প্রত্যেক প্রার্থী ম
নোনয়নপত্র দাখিলের সময় এই মর্মে একটি হলফনামা দাখিল করবেন যে, উপরোল্লিখিত ধারা অনুযায়ী তিনি মেয়র বা কাউন্সিলর নির্বাচনের অযোগ্য নন।

কোন ব্যক্তি একই সঙ্গে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হতে পারবেন না, যদি কোন ব্যক্তি একই সঙ্গে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন দাখিল করেন। এতে উভয় মনোনয়নপত্র বাতিল হবে। তবে সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদকালে মেয়র পদ শূন্য হলে কোন কাউন্সিলর স্বীয় পদত্যাগ করে মেয়র পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। যোগ্যতা অযোগ্যতার এসব বিধিবিধান মেনে চললেই সজ্জনরা নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন এবং নির্বাচনের সুফল নাগরিকরা পাবে।

(২) মেয়র ও কাউন্সিলরদের শপথ গ্রহণ (আইনের ধারা ৭) ও সম্পত্তি সম্পর্কিত ঘোষণা (বিধিমালা ধারা-৮) : মেয়র ও কাউন্সিলররা সরকার কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তির সামনে শপথ গ্রহণ করবেন এবং ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করবেন। গেজেটে নাম প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে তারা টিআইএন নম্বরসহ (যদি থকে) কর অফিসে দাখিলকৃত ও গৃহীত তার ও তার পরিবারের সদস্যদের দেশে-বিদেশে অবস্থিত সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণ হলফনামা আকারে সরকার কর্তৃক মনোনীত কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করবেন। দাখিলকৃত লিখিত বিবরণ অসত্য প্রমাণিত হলে তা অসদাচরণ বলে গণ্য হবে এবং ক্ষেত্রমতো মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। অতীতেও আইনে সম্পদের বিবরণী দাখিলের এমন বিধান ছিল, যা অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে কোন উচ্চবাচ্য করেনি। ফলে রাজনীতি আর দুর্নীতি আমাদের দেশে বহুলাংশে সমার্থক হয়ে পড়ে।

(৩) নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল ও নির্বাচনী আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন (আইনের ধারা ৩৮, বিধিমালা ৬১) : নির্বাচন সম্পর্কিত বিরোধ নিষপত্তির জন্য নির্বাচন কমিশন একজন উপযুক্ত পদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল এবং একজন উপযুক্ত পদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও একজন উপযুক্ত পদমর্যাদার নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তার সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্বাচনী আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করবে। নির্বাচনী ফলাফল গেজেটে প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করা যাবে। নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল মামলা দায়ের করার ১৮০ দিনের মধ্যে সব প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী বিবাদীকে শুনানির সুযোগ দিয়ে এবং উভয় পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণের পর তা নিষপত্তি করবে। মামলার রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনী আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করা যাবে এবং আপিল ১৮০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল নিষপত্তি করবে এবং আপিল ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। অতীতে নির্বাচনী বিরোধ মীমাংসার পদ্ধতি যথাযথভাবে কাজ করেনি, ফলে অনেক অযোগ্য ও অবাঞ্ছিত ব্যক্তি নির্বাচিত হয়ে তাদের মেয়াদ পার করতে পেরেছেন। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি।

(৪) প্রিসাইডিং/রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ (বিধি ৫, ৮) : নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনার উদ্দেশে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে একজন কর্মকর্তাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ করবে। একই সঙ্গে কমিশন নির্বাচন পরিচালনার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে সহায়তা প্রদানের জন্য যে কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অধীনস্থ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ করবে।

রিটার্নিং কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন এলাকার সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণকে, প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা প্যানেল প্রস্তুতের জন্য বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি তালিকা সরবরাহের জন্য লিখিতভাবে অনুরোধ করবেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা ওই তালিকা অনুসারে একটি প্যানেল প্রস্তুত করে তাদের চাকরি কমিশনে ন্যস্ত করার উদ্দেশে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধানদের কাছে লিখিতভাবে অনুরোধ করবেন এবং এর একটি কপি নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ করবেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রস্তুতকৃত প্যানেল থেকে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের জন্য একজন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে সহায়তা প্রদান করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ করবেন। এক্ষেত্রে বিতর্কিত ব্যক্তিরা যাতে এসব পদে নিয়োগ না পান তা নিশ্চিত করতে হবে, তা না হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

(৫) হলফনামা (বিধিমালা ১২) : মেয়র বা সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইচ্ছুক প্রার্থীকে তার মনোনয়নপত্র যথাক্রমে ফরম ‘ক’, ‘ক-১’ বা ‘ক-২’ এর সঙ্গে নির্ধারিত ফরমে হলফনামা জমা দিতে হবে। হলফনামায়- (১) প্রার্থীর সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেটের সত্যায়িত কপি; (২) বর্তমানে তিনি কোন ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত আছেন কিনা; (৩) অতীতে তার বিরুদ্ধে কোন ফৌজদারি মামলার রেকর্ড আছে কিনা, থাকলে তার রায় কী ছিল; (৪) তার ব্যবসা বা পেশার বিবরণী; (৫) তার আয়ের উৎস বা উৎসগুলো; (৬) তার নিজের বা অন্য নির্ভরশীলদের সম্পদ ও দায়ের বিবরণী এবং (৭) কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তদকর্তৃক একক বা যৌথভাবে বা তার ওপর নির্ভরশীল সদস্য কর্তৃক গৃহীত ঋণের পরিমাণ অথবা কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা পরিচালক হওয়ার সুবাদে সব প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত ঋণের পরিমাণ ইত্যাদি তথ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। হলফনামায় প্রদত্ত এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভোটারদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হলে তারা জেনে-শুনে-বুঝে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে, নির্বাচিতদের গুণগত মানে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে এবং ভবিষ্যতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। এক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

(৬) সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয় এবং উৎসের বিবরণী (বিধিমালা ৪৮, ৫০, ৫২) : নির্বাচন বিধিমালার ৪৮ ধারা অনুযায়ী প্রত্যেক প্রার্থী মনোনয়নপত্রের সঙ্গে তার নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে নিম্নবর্ণিত তথ্যগুলো প্রদর্শনপূর্বক ফরম ‘ঢ’-তে একটি বিবরণী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিল করবেন: (ক) নিজ আয় থেকে যে অর্থের সংস্থান করা হবে তার পরিমাণ ও আয়ের উৎস; (খ) আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে কর্জ করা হলে বা দান হিসেবে পাওয়া যাবে এমন সম্ভাব্য অর্থ এবং তার আয়ের উৎস; (গ) কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা থেকে স্বেচ্ছা প্রদত্ত দান বাবদ প্রাপ্য সম্ভাব্য অর্থ; এবং (ঘ) অন্য কোন উৎস থেকে প্রাপ্য এমন অর্থ বা ওই আয়ের উৎস। এসব দাখিলকৃত বিবরণীর সঙ্গে প্রার্থী আয়কর দাতা হলে তার সম্পদের বিবরণীসহ সর্বশেষ দাখিলকৃত রিটার্ন এবং কর পরিশোধের প্রমাণপত্রের কপি সংযুক্ত করতে হবে।

নির্বাচনী বিধি ৫০ ও ৫১ অনুযায়ী, প্রত্যেক নির্বাচনী এজেন্ট, বা যে ক্ষেত্রে প্রার্থী নিজেই তার নির্বাচনী এজেন্ট, সেক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ব্যক্তিগত খরচ ব্যতীত নির্বাচনী ব্যয় পরিচালনার জন্য যে কোন তফসিলি ব্যাংকে একটি স্বতন্ত্র হিসাব খুলবেন এবং ব্যক্তিগত খরচ ব্যতীত নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য সব অর্থ জমা দেবে। এছাড়াও প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট নির্বাচিত প্রার্থীর নাম ঘোষিত হওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে নির্ধারিত ফরমে নির্বাচনী ব্যয়ের রিটার্ন দাখিল করবেন: যেখানে প্রত্যেক দিনে ব্যয়িত অর্থের সব বিল ও রসিদসহ একটি বিবরণী, খোলা হিসাবে জমাকৃত ও উত্তোলিত অর্থের ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত হিসাব বিবরণীর একটি কপি, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ব্যক্তিগত খরচের মোট পরিমাণ, নির্বাচনী এজেন্ট অবহিত আছেন এমন সব অপরিশোধিত দাবির বিবরণী, নির্বাচনী খরচের জন্য যে কোন উৎস থেকে প্রাপ্ত সব অর্থের পরিমাণ ও উৎসের নাম অন্তর্ভুক্ত বা উল্লেখ করতে হবে।

নির্বাচনী বিধি ৫২ অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তার দাখিলকৃত নির্বাচনী ব্যয়ের রিটার্ন তার অফিসে সুবিধাজনক স্থানে সংরক্ষণ করবেন, যা ১০০ টাকা প্রদান করে পরবর্তী এক বছর সময়ের মধ্যে যে কোন ব্যক্তির পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এসব দাখিলকৃত হলফনামা, উৎসের বিবরণী, নির্বাচনী ব্যয়ের রিটার্ন নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে জনগণের অবগতির জন্য প্রকাশ করা হবে এবং নির্বাচনী ব্যয়ে রিটার্নের কোন অংশের কপি পৃষ্ঠাপ্রতি ৫ টাকা ফি প্রদান সাপেক্ষে সরবরাহ করা যাবে। এসব তথ্য অতীতে কখনও যাচাই-বাছাই করে দেখা হয়নি। তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে অসত্য ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলেই আমাদের রাজনীতি কলুষমুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়াও নির্বাচনে টাকার খেলা বন্ধ করতে হলে প্রার্থীরা যাতে নির্বাচনী ব্যয়সীমা মেনে চলে তা নিশ্চিত করতে হবে।

(৭) নির্বাচন কমিশনের প্রার্থিতা বাতিল (বিধিমালা ৯১) : যদি কোন উৎস থেকে প্রাপ্ত রেকর্ড অথবা মৌখিক বা লিখিত রিপোর্ট থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, মেয়র বা কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বী কোন প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট এই বিধিমালার কোন বিধান লংঘন করেছেন বা লংঘনের চেষ্টা করেছেন এবং অনুরূপ লংঘন বা লংঘনের চেষ্টার জন্য তিনি মেয়র বা কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য হতে পারেন, তাহলে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ প্রদান করবে। তদন্তের রিপোর্টে যদি তিনি তার স্বীয় কর্মের জন্য মেয়র বা কাউন্সিলর নির্বাচনের অযোগ্য বলে বিবেচিত হন, তাহলে নির্বাচন কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত আদেশ দ্বারা ওই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে। নির্বাচন কমিশনের এটি নতুন ক্ষমতা। আশা করি, প্রয়োজনে কমিশন এ ক্ষমতা ব্যবহারে দ্বিধা করবে না।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক,
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ৫ জুন ২০১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s