রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন আজ জরুরি

jugantor_logo

ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র
কয়েক সপ্তাহ আগে গত আওয়ামী লীগ সরকারের একজন সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য আইলাদুর্গত এলাকার ওপর এক আলোচনা সভায় একটি গল্প বলেছিলেন। পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে তৈরি এ গল্পটির সারকথা হল : অবতার রাম একবার শিকার থেকে ফিরে এসে তার ধনুকটি মাটিতে পুঁতে রাখেন। কিছুক্ষণ পর তিনি লক্ষ্য করেন, একটি ব্যাঙ ধনুকবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছে। রাম তাড়াতাড়ি ব্যাঙটিকে মুক্ত করে জিজ্ঞেস করেন, তীর বিদ্ধ হওয়ার সময় কেন সে চিৎকার করে ওঠেনি? উত্তরে ব্যাঙটি বলে, আগে তো বিপদে পড়লে রাম রাম ডাকতাম, কিন্তু স্বয়ং রামই যখন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন আর কাকে ডাকি?

নিঃসন্দেহে এটি একটি বানানো গল্প এবং এর সঙ্গে অবতার রামের কোন সম্পর্ক নেই। তবে গল্পটি একটি গূঢ় মর্মার্থ বহন করে। এর প্রতীকী অর্থ হল, অতীতে চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল, এখনও প্রায়ই একই অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরও আমাদের রাজনীতিতে তেমন কোন গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। লক্ষ্য করা যায় না গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শাসন ব্যবস্থায়। বস্তুত অনেকে বর্তমান অবস্থাকে ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে ঝাঁপ দেয়ার সঙ্গে তুলনা করেন। তাই যদিও অতীতে চারদলীয় জোটের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও মহাজোট সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করা যেত, এখন জনগণ কোথায় যাবে?

স্বয়ং আওয়ামী লীগেরই ‘দিন বদলের সনদ’ অনুযায়ী চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল : ‌‌”বিএনপি-জামায়াত জোট দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদের ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতায় এলেও দুর্নীতি-লুটপাট ও দুর্বৃত্তায়নই এই সরকারের নীতি হয়ে দাঁড়ায়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অতি নিকটজনের নেতৃত্বে ১১১ জন গডফাদারের দৌর্ত্যা হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। ‘হাওয়া ভবন’কে রাষ্ট্রক্ষমতার প্যারালাল কেন্দ্রে পরিণত করা হয় এবং এটি হয় দেশের সব দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের প্রসূতি কেন্দ্র। বিএনপি-জামায়াত জোটের মন্ত্রী, সাংসদ, নেতাকর্মী এবং দলীয় প্রশাসনের অকল্পনীয় দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, লুটপাট, চাঁদাবাজি প্রভৃতির ফলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল পরপর পাঁচবার বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেঃ জোট সরকার জনপ্রশাসন, পুলিশ বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ রাষ্ট্র ও সরকারের সব অঙ্গ প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। শত শত উচ্চপদস্থ বেসামরিক, সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তাকে পদচ্যুত, বাধ্যতামূলক অকালীন অবসর প্রদান করার পাশাপাশি দলীয় অনুগত অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি প্রদান ও নিয়োগ দান করেঃ অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের বিচারপতি নিয়োগ করে সর্বোচ্চ আদালতের মর্যাদা ও মানুষের শেষ ভরসাস্থলটিকে ধবংস করা হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সংসদকে অকার্যকর ও সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধবংস করে। সংসদে বিরোধী দলকে কথা বলতে না দেয়া, স্থায়ী কমিটিগুলোর কর্মকাণ্ডকে স্থবির এবং ব্রুট মেজরিটির জোরে গণতন্ত্রের চর্চার সব পথ রুদ্ধ করে দেয়ঃ।”

অনেকের মতে, দলতন্ত্র, ফায়দাতন্ত্র, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি বর্তমান সরকারের আমলেও বেপরোয়াভাবে চলছে। নীতি-আদর্শ বিবর্জিত ছাত্রলীগের বাড়াবাড়ি ক্ষমতাসীনদের অঙ্গ/ সহযোগী সংগঠনের অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডার ও দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারির দৃশ্য কল্পনাকেও হার মানায়। সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে সরকার বাক-স্বাধীনতা হরণের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সরকারের নিম্নপর্যায়ে দুর্নীতি এখনও লাগামহীন এবং উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিবিশেষ সম্পর্কেও গুজব শুরু হয়েছে। অতীতের ন্যায় বিচার বিভাগে এবারও দলীয় ব্যক্তিদেরই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে, মাননীয় প্রধান বিচারপতি যাদের দু’জনের শপথ পাঠ করাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। নাম বদলের সংস্কৃতি এখনও অব্যাহত। এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না! মহাজোট সরকার তো ক্ষমতায় এসেছে ‘দিন বদলের’ অঙ্গীকারের ভিত্তিতে। সে অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই জনগণ তাদের ঘরে মহাবিজয় তুলে দিয়েছিল।

দিনবদলের সুস্পষ্ট অঙ্গীকারের অন্যতম হল ‘নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন পদ্ধতির চলমান সংস্কার অব্যাহত থাকবে। জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব এবং আয়ের উৎস প্রতি বছর জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবেঃ (ক্ষমতাধরদের জন্য) একটি সর্বসম্মত আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’ দুর্ভাগ্যবশত, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গৃহীত সব নির্বাচনী সংস্কার নবম জাতীয় সংসদ অনুমোদন করেনি। যেমন, ‘না’ ভোটের বিধান, হলফনামার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ‘সাত-তথ্য’ প্রদান, যদিও নির্বাচন কমিশন বিধি প্রণয়ন করে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার জন্য তা বহাল রেখেছে। জাতীয় সংসদকে এখনও কোনভাবেই কার্যকর বলা যায় না। সম্পদের হিসাব প্রদানের ক্ষেত্রেও সরকার কথা রাখেনি। আরও কথা রাখেনি আচরণবিধি প্রণয়নের বিষয়ে। আমাদের সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ উপেক্ষা করে জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থেই কাজ করছেন।

এছাড়াও দিন বদলের সনদে ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা’র অঙ্গীকার করা হয়। উপরন্তু প্রধানমন্ত্রী নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন, ‘আমাদের সরকার হবে সকলেরঃ বিরোধী দলকে আমরা সংখ্যা দিয়ে বিচার করব নাঃ আমরা প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। হানাহানির রাজনীতি পরিহার করতে চাই। দেশে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দিতে চাই।’ (দৈনিক প্রথম আলো, ১ জানুয়ারি, ২০০৯)। তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে সবকিছু ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার, সরকারে গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার না করার এবং এমনকি বেগম খালেদা জিয়ার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ সহযোগিতা নেয়ার, বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেয়ার এবং রাজি হলে বিরোধী দলকে মন্ত্রিত্ব দেয়ার কথাও সংবাদ সম্মেলনে বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আসুন, সব ভেদাভেদ ভুলে দেশের মানুষের জন্য একসঙ্গে কাজ করি। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। বিরোধী দলের ইতিবাচক সমালোচনা, পরামর্শ এবং সংসদকে কার্যকর করতে তাদের ভূমিকা ও মর্যাদাকে সমুন্নত রাখব।’ উল্লেখ্য, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এমন আহবানের কথা শুনে নাগরিক হিসেবে সেদিন আমরা বড় গর্ববোধ করেছিলাম এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি সম্পর্কে দারুণ আশাবাদী হয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত, সবই যেন গুড়েবালি- আমাদের রাজনীতি অতীতের ন্যায় আবারও রাজপথমুখী হচ্ছে এবং দমন-পীড়ন ও হানাহানির দিকেই যাচ্ছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অঙ্গীকার করেছিল, তারা বিরোধী দলে গেলেও হরতাল করবে না। একইভাবে ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপিও হরতাল ও অন্যান্য অনিয়মতান্ত্রিক পন্থার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দলে এসে বিএনপি তাদের অতীতের অবস্থানের কথা ভুলে গেছে এবং প্রতিবাদের জন্য অনিয়মতান্ত্রিক পন্থাই বেছে নিয়েছে। আইন-শৃংখলা বাহিনীর বাড়াবাড়িও অতীতের মতো অব্যাহত রয়েছে। এ ব্যাপারে অতীত সরকারের দলীয়করণ ও ব্যর্থতাকে দায়ী করে ক্ষমতাসীন সরকার কি নিজেদের দায় এড়াতে পারবে?

এককালে হরতাল ছিল ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের অসহযোগিতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিফলন। কিন্তু বর্তমানে এটি হয়ে গেছে নাগরিকের মৌলিক অধিকার- তাদের চলাফেরার অধিকার ইত্যাদি হরণের অন্যতম হাতিয়ার। উল্লেখ্য, হরতাল তথা অনিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সাধারণত কোন সমস্যার সমাধান হয় না। বরং হরতালের মতো কর্মসূচি অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাকে আরও নিয়ন্ত্রণহীন করে ফেলে এবং তা আরও জটিল আকার ধারণ করে।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে অকার্যকর এবং সংসদ সদস্যদের স্থানীয় উন্নয়ন কাজে কর্তৃত্ব করার বিষয়ে আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেন একটি বিরল ঐকমত্য বিরাজ করছে। এ লক্ষ্যে তারা তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করতেও কুন্ঠাবোধ করেন না। যেমন, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে ‘স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা’ শিরোনামে অঙ্গীকার করে, ‘বিএনপি প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রশাসনের সব পর্যায় ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিশ্চিত করার নীতিতে বিশ্বাসী। এ নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা ঘোষণা করছি যে- প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে উপজেলা পরিষদ এবং জেলা পরিষদ গঠন এবং পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেগুলোকে সব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে অধিকতর কর্মক্ষম, গতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ স্থানীয় সংস্থার পর্যায়ে উন্নীত করার বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ দুর্ভাগ্যবশত, বিএনপির বিকেন্দ্রীকরণ ও জন-অংশগ্রহণ সম্পর্কিত অঙ্গীকার বাস্তবে রূপায়িত হয়নি, বিএনপি’র আমলে জেলা-উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি এবং ইউনিয়ন পরিষদকেও একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগও তার দিন বদলের সনদে স্থানীয় সরকার সম্পর্কে প্রায় একই অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। তারাও ‘ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন করে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদকে শক্তিশালী’ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে। এছাড়াও দিন বদলের সনদে অন্তর্ভুক্ত ২০২১ সালের জন্য প্রণীত ‘রূপকল্পে’ আওয়ামী লীগ অঙ্গীকার করে : ‘স্থানীয় সরকারকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনৈতিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন সাধন করা হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে স্থানীয় সরকার। এ উদ্দেশ্যে জেলা ও উপজেলার স্থানীয় সরকারকে স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে।’ উপরন্তু, প্রধানমন্ত্রী তার লেখা ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ : কিছু চিন্তাভাবনা’ (আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৫) গ্রন্থে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী, স্বশাসিত, জন-অংশগ্রহণমূলক ও সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার ব্যক্তিগত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। দুর্ভাগ্যবশত, গত দেড় বছরে আমরা তার প্রতিফলন দেখিনি। বরং অনেকের মতে, বর্তমান সরকার স্থানীয় সরকারের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ধবংস হয়ে গেলে জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎও অন্ধকার হয়ে যাবে।

উল্লেখ্য, সংসদ সদস্যরা স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত হলে তার যে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সংসদ সদস্যদের অনেকেই তাদের পছন্দের দলীয় ব্যক্তিদের নিয়ে এক ধরনের ‘এমপি সরকার’ গঠন করে অনেক ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিলেন, যার ফলে নির্বাচনে তারা কচুকাটা হয়েছিলেন। বর্তমানেও আমাদের কিছু সংসদ সদস্য নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বেসামাল আচরণ করছেন এবং দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন পর্যায়ে যেতে পারে।

আইনের শাসনের বিষয়ে আসা যাক। অতীতের বিএনপি সরকার সংবিধান ও আইন নিয়ে খেলা করেছে। তারা মূলত তাদের পছন্দের আইন প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছে। বর্তমান সরকারের আমলেও সে সংস্কৃতির ঊধের্ব যেন আমরা উঠতে পারিনি। উদাহরণস্বরূপ, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধিত) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, নিবন্ধিত দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন থাকা অবৈধ। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলই আইনের এ বিধান লঙঘন করে আসছে। এছাড়াও বিচারবহির্ভূত হত্যা এখনও চলছেই।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট, সরকার বদল হলেও দিন বদল হয়নি এবং আমাদের রাজনীতির গুণগত মানে তেমন পরিবর্তন আসেনি। এ ব্যাপারে সরকারদলীয় এবং সরকারের সহযোগীদের অনেককেও অভিযোগ করতে শোনা যায়। অনেক সাধারণ নাগরিকও, যারা চারদলীয় জোটের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে মহাজোটকে মহাবিজয় উপহার দিয়েছে, তাদেরও মোহভঙ্গ ঘটা শুরু হয়েছে। অনেকের আশংকা, বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের এ প্রিয় মাতৃভূমি ভবিষ্যতে শাসনের অযোগ্য হয়ে পড়বে এবং আমরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হব, যা কারোই কাম্য নয়। তাই আজ সরকারের জেগে ওঠার এবং আমাদের রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থায় যথাযথ পরিবর্তন সাধনের সময় এসেছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, সুপ্রিমকোর্ট বার এসোসিয়েশন নির্বাচন, ঢাকা বার এসোসিয়েশন নির্বাচন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি নির্বাচন ইত্যাদি এ বার্তাই বহন করে এনেছে বলে অনেকের বিশ্বাস। ভবিষ্যতে অনাকাঙিক্ষত পরিণতি এড়াতে হলে সরকারকে এ বার্তার প্রতি কর্ণপাত করতে হবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ৯ জুলাই ২০১০

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s